#খেলাঘর_৬
সাহেব ফোনে কথা বলতে বলতেই ছাদের দরজার সামনে চলে এলো,বাদশা আয়নাদের ছাদের পাশে গিয়ে রেলিং এর ধারে দাড়িয়েছে,সাহেব ভাবলো চলে যাবে তার আগেই,
আয়না কেদে ফেললো, হাউমাউ করে কান্না ও রেলিং ঘেষে বসে পড়লো।আয়না কাদতে কাদতেই চিৎকার করে বলে ফেললো,
—আমিই কেন? কেন সব সময় আমাকেই মানিয়ে নিতে হবে, আমার ইচ্ছেগুলোই কেন পূরণ হবে না কেন??কেন???আমি আর পারি না, আর পারি না আমি।
সাহেব স্তব্ধ হয়ে গেলো ও ফোন কাটতেও ভুলে গেলো,বাদশাও সেখান থেকে নড়লো না।ও দূরে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো।ভাবতে লাগলো সেদিন যদি ও আয়না কে অপেক্ষা না করাতো তাহলে কেমন হতো? আয়না তো ঠিকই সবটা ছেড়ে এসেছিলো অনেক্ষণ অপেক্ষা করেছিলো কাজী অফিসের সামনে বাদশা যায় নি।কেন যায় নি সেই প্রশ্নের জবাব বাদশার কাছে নেই।আজ মনে হচ্ছে এত মানুষের কথা না ভেবে এই মেয়েটার কথা ওর ভাবা উচিত ছিলো, এই মেয়েটার সুখের জন্যে এত কিছু অথচ ও ভালো নেই।বাদশা শক্ত কণ্ঠে বলল,
—আয়না,
আয়িনা থেমে গেলো আর একটা শব্দও করলো না, এতক্ষণ ও বাদশাকে খেয়ালই করে নি।
—কাদছ কেন তুমি? তোমাকে কান্না মানায়?তোমায় আমি ৯ বছর যাবত কি বুঝিয়েছি?কান্না কোনো সমাধান নয়।তুমি দেখছি ইদানীং খুব অবাধ্য হয়ে গেছো।
আয়না ফুপিয়ে কেদে উঠলো,এই লোকটা! এই লোকটার শাসনই তো ও সারাজীবন চেয়েছিলো,জীবন এত কঠিন কেন!
সাহেব নেমে এলো,ভালোবাসার কত রঙ! ও ঠিক বুঝে ওঠে না।
কায়নাত নিজেকে সামলাতে পারে নি, বিয়েতে সে ঠিকই রাজি হয়ে গেছে, মাস দুয়েক যাবত প্রহরের বাড়াবাড়ি রকম ভালোবাসায় ওকে কাবু করে ফেলেছে।কায়নাত আর প্রহরের বিয়েটা ভালো ধুমধাম করেই হয় কারণ আয়না আর আবরারের বিয়েটা হয়েছিলো অনেকটা লুকোচুরি করে। শ্বশুরবাড়িতে পা রাখতেই কায়নাতের মনে অদ্ভুত ভয় লাগা শুরু হলো সারাজীবন আপা আর বাবার সাথে থেকে হুট করে এসে একটা পরিবারে মানিয়ে নিতে পারবে কি না এরকম ভয়।বিয়ের শাড়ি পালটে গাঢ় মেরুন রঙের জামদানি পড়ে সে এখন প্রহরের ঘরে বসে আছে।প্রহর শুধু নিজেই গোছানো নয় ওর ঘরটাও সাজিয়েছে দারুণভাবে, ছেলে মানুষ এত গোছানো হয় ওর জানা ছিলো না।কায়নাতের মনে হলো ও দীর্ঘ সময় প্রহরের জন্যে অপেক্ষা করছে,ওর চোখ ভেঙে ঘুম পাচ্ছে, প্রহর এলো রাত একটা পার করে,তার চোখ অসম্ভব রকমের লাল,প্রহর কায়নাতকে বললো,
—আমার খুব ঘুম পাচ্ছে কায়নাত আমি খুব ক্লান্ত আমি কি এখন ঘুমাতে পারি?
কায়নাত বুঝলো না কি বলবে, আজকের রাত নিয়ে তো অনেক প্ল্যান ছিলো দুজনের কত রকমের স্বপ্নের জাল ওরা দুজন একসাথে বুনেছিল!ও মাথা ঝাকিয়ে সম্মতি জানালো।প্রহর সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়লো।কিন্তু কায়নাত আর ঘুমুতে পারলো না,প্রহরের এক নিঃশ্বাসে বলা একটা বাক্য শুনেই ওর চোখ থেকে সব ঘুম উড়ে গেলো সারারাত ও কাটালো জেগে।আজ তো কায়নাতের জেগেই কাটানোর কথা ছিলো কিন্তু এভাবে কি? এরকম কি কথা ছিলো,আচ্ছা যা ঘটার কথা থাকে, সেই সব ই কি আমাদের জীবনে ঘটে?
সাহেব একের পর এক সিগারেট ধরাচ্ছে সব গুলোই দুটো টান দিয়ে ফেলে দিচ্ছে, এই প্রথম ওর এত নার্ভাস লাগছে,তারেক কে আসতে দেখা যাচ্ছে।শরীফুল ইসলাম এবার খুব বাজে একটা চাল চেলেছেন ৩ দিন পর নির্বাচন,তিনি বলছেন তার বড় মেয়ে লিলি কে খুজে পাওয়া যাচ্ছে না,আর এজন্য তিনি আবারো বাদশার নামে মামলা করেছেন, পাব্লিক ব্যাপারটা ভালো ভাবে নিচ্ছে না।আসলে সেদিন সাহেব সংবাদ সম্মেলন টা না করে ভুল ই করেছিলো।এর মাঝে লিলির সাথে সাহেবের একবার দেখা হয়েছিলো মিলির পুতুল ফেরত নিতে সে এসেছিলো তখন সাহেব অনুশোচনা কমাতে সংবাদ সম্মেলনের ব্যাপারটা ক্যান্সেল করেছিলো।সাহেব এখন বুঝতে পারছে রাজনীতি তে কোনো ইমোশন চলে না।
—সাহেব এখন কি করবি বলতো
—ভাবছি
—কি ভাবছিস!এই মুহুর্তে বাদশা ভাই এরেস্ট হলে কি হবে বুঝতে পারছিস তো, বাদশা ভাইয়ের রগচটা স্বভাবের জন্যেই শরীফুল ইসলাম বারবার সুযোগে পাচ্ছে ভাইয়া কে ফাসানোর।
সাহেব চোখ রাঙিয়ে তারেকের দিকে তাকালো ভাইয়ার বিরুদ্ধে কোনো কথা সে শুনতে পারে না।
তারেক অন্যদিকে ফিরে তাকালো,সাহেবের খুব অসহায় লাগছে নিজেকে।এমন সময় সাহেবের ফোনে আননোউন নম্বর থেকে ফোন আসে,সাহেব কেটে দেয়, খবর টা হয়তো ছড়িয়ে পড়েছে এখন সবাই অযথা কথা বলে বিরক্ত করবে।বারবার কল আসতে লাগলো নম্বর টা থেকে,সাহেব ভ্রু কুচকে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে উদ্বেগ ভরা কণ্ঠে কেউ বলে উঠলো,
—সাহেব আমি লিলি….।
শেষ পর্যন্ত বাদশা এরেস্ট হয় নি পুরো খেলাটাই ঘুরে গেছে, শরীফুল ইসলাম ভাবতেই পারেন নি তার নিজের মেয়ে এমন একটা কাজ করবে,যেই মুহূর্তে তিনি আহসান চৌধুরীর বাড়িতে পুলিশ নিয়ে ঢুকেছেন তখনই লিলি আর সাহেব, চৌধুরী বাড়িতে গিয়ে উঠলো।লিলি ওসি কে গিয়ে বলল,
—অযথা ভাইয়ার ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছে আমার বাবা,আমাকে কেউ কিডন্যাপ করে নি।আমি স্বেচ্ছায় বাড়ি থেকে চলে এসেছিলাম
সবাই অবাক হয়ে লিলির কথা শুনছিল, শরীফুল ইসলাম রীতিমতো ভড়কে গেছেন তিনি নিজে লিলিকে তার বাগান বাড়িতে আটকে রেখেছিলেন এখন ও এসব কি বলছে!আর ও এখানে এলোই বা কি করে,সাহেব এগিয়ে গিয়ে শরিফুল ইসলাম কে সালাম করে বলল,
—মাফ করবেন শ্বশুর আব্বা বেয়াদবী করে ফেলেছি, আসলে আপনাকে তো অনেক অনুরোধ করলাম আমার আর লিলির সম্পর্ক টা মেনে নিতে এসব ঝামেলা মিটিয়ে নিতে কিন্তু আপনি মানলেন না তাই আমরা বাধ্য হয়ে শুভ কাজ টা লুকিয়ে করে ফেলেছি।
শরীফুল ইসলাম চিৎকার করে বললেন
—এসবের মানে কি! তুমি আমার মেয়েকে জোর করে বিয়ে করেছো তোমরা সব গুলো ক্রিমিনাল।
—উহুহ বাবা ভুল বলছো,কেউ আমাকে জোর করে নি আইনত আমি প্রাপ্ত বয়স্ক নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারি আমি সাহেব কে বিয়ে করেছি ভালোবেসে।
আহসান চৌধুরী আর বাদশাহ একে অন্যের মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগলেন।শরীফুল ইসলাম ঠাস করে লিলির গালে চড় বসিয়ে দিলেন।লিলি শান্ত চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে রইলো মেয়ের এই নজরকে শরীফুল ইসলাম ভয় পান।তিনি মাথা নিচু করে ফেলল,
—তুমি এখন আসতে পারো বাবা।ওসি সাহেব এরপরও আপনারা যদি না যান আমি বাধ্য হবো সামনে দাড়িয়ে থাকা লোকটার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করতে,প্লিজ লিভ।
সাহেব লিলির দিকে তাকিয়ে রইলো।ওসি সাহেব আহসান চৌধুরীর সাথে কথা বলে শরিফুল ইসলাম কে নিয়ে চলে গেলেন।
চলবে…..
সামিয়া খান মায়া

