#চন্দ্রাবতীর_রাতে #সৌরভে_সুবাসিনী(moon) #পর্বঃ৫

0
430

#চন্দ্রাবতীর_রাতে
#সৌরভে_সুবাসিনী(moon)
#পর্বঃ৫

শীতের সকালে কোথাও একটা কোকিল করুণ সুরে ডাকছে। ডাক শুনে মনে হচ্ছে কোকিলের মনের গহীনে মেঘের ঘনঘটায় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে ছোট্ট কোকিলের হৃদয়।
শুকনো পাতার মড়মড়ে শব্দ, কেউ যেনো হেটে যাচ্ছে গহীনে।
ঘুমের ঘোরে আয়েত্রী নিজেকে বড্ড হালকা অনুভব করছে।
শরীরের ভিতরে বেশ পরিবর্তন অনুভব করছে। এই মনে হচ্ছে সে হয়তো এক টুকরো তুলোর মতন উড়ছে।

পাশ ফিরতেই অনুভব হলো কিছু একটা আঁকড়ে ধরে আছে তাকে।
হাতড়ে অনুভব করলো প্রত্যাশা ঘুমিয়ে আছে পাশে। আয়েত্রীর উরুর উপর দিয়ে পা এবং গলার উপর দিয়ে হাত দিয়ে। মনে হচ্ছিলো আয়েত্রী, আয়েত্রী নয়। একটা কোলবালিশ মাত্র।

আয়েত্রীকে নড়তে দেখেই প্রত্যাশা উঠে বসেছে।কপালে হাত দিয়ে জ্বর আছে কি না দেখে নিয়ে ওড়নার কোণা দিয়ে আয়েত্রীর নাকের নিচে জমাট বাধা রক্ত মুছে দিয়ে বলল,

“খারাপ লাগছে? আচ্ছা আয়েত্রী! তোকে গতকাল আমি একা রেখে চলে আসাতে ভয় পেয়েছিলি? বারবার হাত ধরে টানছিলাম কিন্তু তোর কোন হেলদোল ছিলো না।”

“আমি ঠিক আছি। কয়টা বাজে রে প্রতী? ক্ষুধা লেগেছে। ”

প্রতী দ্রুত উঠে আয়েত্রীকে নিয়ে বাহিরে নিয়ে বসিয়ে দেয়। আয়েত্রীর মা চুপচাপ আয়েত্রীর পাশে বসে মেয়ের হাত-পা, গলা,মুখ দেখছিলো। মেয়েটার মুখ বড্ড ফ্যাকাশে লাগছে।
আয়েত্রীর গলায় প্রচন্ড ব্যথা থাকার দরুন সে ঠিকমতন কিছুই বলতে পারছে না।
ভাঙা ভাঙা গলায় আয়েত্রী তার মায়ের উদ্দেশ্যে বলল,

“মা! আমাকে একটু গোসল করিয়ে দেবে? গা দিয়ে কেমন যেনো রক্ত, রক্ত গন্ধ আসছে। ”

গোসলের সময় আয়েত্রীর মা শিউরে উঠেছিলেন।মাথায় পানি দিতেই খেয়াল করলেন মেয়ের চুলে জমাট বাধা রক্ত সাথে বর্ণহীন পানি রক্তিম বর্ণ ধারণ করে ছড়িয়ে পড়েছে গোসলখানার ফ্লোরে।

হালকা রোদে বসে আছে আয়েত্রী। শরীরে অস্বাভাবিক কাঁপন। এমন কিছুটা আন্দাজ করেছিলেন আয়েত্রী নানু।তাই আগেই তেল গরম করে রেখেছেন উনি।হাত-পায়ে মালিশ করে দিচ্ছিলেন। এমন সময় আয়েত্রীর নানা বাড়িতে প্রবেশ করেন। কথা বলার এক ফাকে প্রত্যাশা খেয়াল করলেন ডুমুর গাছ থেকে কেউ একজন নেমে আসছে। পরণে তার অফ হোয়াইট কালারের পাঞ্জাবী, এভাবে নেমে আসতে দেখে প্রত্যাশা বেশ ঘাবড়ে গিয়েছে৷ মায়ের পিছনে লুকিয়ে পড়েছে সে। বুঝতে বাকী নেই উনি কে।
উনি সে ডুমুর গাছের তিনি? ভেবেই ঢোক গিললো প্রত্যাশা।

আয়েত্রীর কাছাকাছি এসে বেশ জোরে সালাম দিলো। সালামের উত্তর দিয়ে আয়েত্রীর নানা আয়েত্রীর উদ্দেশ্যে বললেন,

“মা! অনুমতি দাও। উনি তোমার রোগের দাবা খুঁজতে যাবেন।”

আয়েত্রী মুখ তুলে তাকিয়ে দেখলো।ঝাপসা চোখে মুখের আদলে তার মৃত দাদার আদল ভেসে উঠেছে।

আয়েত্রীর নানা আবার অনুমতি চাওয়াতে আয়েত্রী মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিলে সালাম দিয়ে কয়েক মূহুর্তের মাঝে অবয়ব টি অদৃশ্য হয়ে যায়।

মসজিদ থেকে আনা এক বাটি সবজি খিচুড়ি এগিয়ে দিলেন আয়েত্রীর নানা।ইয়েমেন থেকে আগত যুবক দলের কনিষ্ঠ বালক আয়েত্রীর জন্য পাঠিয়েছেন।
আয়েত্রীর কেনো জানি ছেলেটা বড্ড আপন মনে হলো। ঠিক তার ভাই আয়াতের মতন।

আয়েত্রীকে ঘিরে বসে আছে তার মা-খালা।খাওয়ানোর চেষ্টা করছে কিন্তু আয়েত্রী কিছুতেই খাচ্ছে না।মুখের স্বাদ হঠাৎ কাঠখোট্টা তেতো হয়ে আছে কি না!

নানু সদ্য পানানো গরুর কাঁচা দুধ নিয়ে এসেছেন। হাতে দুধ দেখেই ভ্রু-কুঁচকে ফেলেছে প্রত্যাশা। এই দুধের স্বাদ জঘন্য হয়। তাকে জোড় করে খাওয়ানো হয়েছিলো যখন তার জন্ডিস হয়েছিলো। সে কথা মনে হতেই গা গুলিয়ে উঠলো প্রত্যাশার। আয়েত্রীর দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে নানুর উদ্দেশ্যে বলল,

“নানু! ও যদি বমি করে? এর গন্ধ কিন্তু ভীষণ বিশ্রী। ”

“তো আর কি করা? প্রতী তুই আত্রীর দুই পা ধর।বড় আপা হাত আর মাথা। আমি নাক চেপে ধরে খাইয়ে দিচ্ছি। ”

ঘাড় ঘুরিয়ে দুই ভাগ্নি মামাকে দেখে উচ্ছ্বাসে হত-বিহবল হয়ে পড়েছে। প্রত্যাশা দৌড়ে মামার কাছে চলে গেলেও আয়েত্রী ঠিকমতন দাঁড়াতেই পারছিলো না। সামিউল সাহেব দ্রুত এসে হাত ধরে মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন,

“এতটা অসুস্থ কবে হলে? ও কি দশা মেয়ের ছোট আপা?”

সামিউলের কোথায় ফোড়ন কেটে প্রত্যাশার বাবা বললেন,

“সামিউল! ক্রিটিকাল কন্ডিশন মেয়েটার বাহির থেকে এসে এভাবে ধরবে না।যাও ফ্রেশ হয়ে এসো।”
ততক্ষণে আয়াত দ্রুত ফ্রেশ হয়ে এসে জোর করেই খিচুড়ি খাইয়ে দিচ্ছিলো।বার দুয়েক সমস্যা হলেও পরে সম্পূর্ণ বাটি আয়েত্রী অনায়াসে শেষ করে দিলো।অনেকটা সুস্থ অনুভব করছিলো।

জোহরের নামাজের পর মওলানা সাহেব খবর পাঠিয়েছেন।উনার কথা মতন আয়েত্রীকে নিয়ে সামিউল সাহেব বেরিয়ে পড়লেন।
আয়েত্রী বাইকের পিছনে বসে মামার পিঠে মাথা ঠেকিয়ে রেখেছে।চোখ দুটো প্রায় বুজে আসছিলো। ঠিক এমন সময় কারো চাপা আর্তনাদের শব্দ কানে আসে।চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে আয়েত্রী নীরু খালার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
মামার হাত খুব শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছে।
বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতেই দেখলো নিম গাছের নিচে জলচৌকিটে কাউকে শুয়িয়ে রাখা হয়েছে। কিছু দূরে কয়েকজন কোর-আন তেলাওয়াত করছে। মামার হাত ছেড়ে আয়েত্রী এগিয়ে যায় জল চৌকির দিকে।
পুরো শরীরে কোন চামড়া নেই।শুধু কালচে আবরণ। মাংস পঁচতে শুরু করেছে৷ নাকের তরুণাস্থি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কানের লতির মাংস নেই।হাত-পায়ের আংগুলের নখ তো আছে অথচ চামড়া নেই। শরীরের উপরে পাতলা ওড়না দেওয়া।
কি বিভৎস লাগছে দেখতে। কেমন একটা বাজে গন্ধ। এসব দেখার পর আয়েত্রী ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু এখন এতটা স্বাভাবিক কিভাবে?
সামিউল সাহেব চুপচাপ ভাগ্নিকে নিয়ে চলে আসতে চাইলে আয়েত্রী হাত ছাড়িয়ে পাশে রাখা টুলে বসে জিজ্ঞেস করে,

“এখন কেমন অনুভব করছেন? খুব কষ্ট হচ্ছে? ”

আয়েত্রীর কথার কোন উত্তর এলো না।কিন্তু শুয়ে থাকা প্রায় মৃত চোখের চাহনীতে ছিলো একরাশ আতংক।
মওলানা সাহেব আয়েত্রীকে বললেন,

“কানে কানে চার কালেমা পড়ে দাও।উনার মুক্তি প্রয়োজন। ”

আয়েত্রী কিছু না ভেবেই কানের কাছে চার কালেমা পড়লো। পড়া শেষ হতেই নীরুর দেহ নিস্তেজ হয়ে পড়েছে।
নীরুর মৃত্যুর সাথে সাথেই আয়েত্রীর শরীর নিস্তেজ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। দেহের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে বেড়ে চলেছে ঘাড়ের ক্ষত।
মওলানা সাহেব চিন্তিত মুখে আয়েত্রীর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললেন,

“তবে কি শেষ অবধি প্রেত সাধক সফল হয়ে নিয়ে যাচ্ছে আয়েত্রীর রুহ্?”

চলবে
#ছবিয়ালঃপুষ্প

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here