#চন্দ্রাবতীর_রাতে
#সৌরভে_সুবাসিনী(moon)
#পর্বঃ৬
সকাল থেকেই বাড়িতে এলাহি আয়োজন চলছে। আজ প্রত্যাশাকে দেখতে আসবে।
আশ্চর্য হলেও এই বিষয়ে আয়েত্রী শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়েছে আজ পাত্রপক্ষ প্রত্যাশা কে পছন্দ করবেই করবে।
আয়েত্রীর শরীর অনেকটা সুস্থ হলেও পায়ে পানি এসে খানিকটা ভারী হয়ে উঠেছে। তাই চুপচাপ দুয়ারে বসে সবাই কে দেখছিলো সে।
গতকাল বিকেলে খিচুনি উঠে মরণাপন্ন অবস্থা হয়ে যায় আয়েত্রীর। ঘাড়ের ক্ষত থেকে এক প্রকার কালো ধোঁয়া নির্গত হচ্ছিলো, সাথে আয়েত্রীর মুখের বর্ণ ধীরেধীরে ফ্যাকাসে হচ্ছিলো।বাড়ি নিয়ে আসার পর সবাই বেশ ঘাবড়ে যায়। ঠিক সে সময় বাড়িতে প্রবেশ করে ইয়েমেন থেকে আগত যুবক দল।উচ্চস্বরে তেলাওয়াত করে কোর-আন শরীফের আয়াত। কিছুক্ষণ পর আয়েত্রীর শরীর ঘামিয়ে ঠান্ডা হয়ে অবচেতন হয়ে যায় আয়েত্রী।
সর্বকনিষ্ঠ বালক মওলানা সাহেব কে কিছু বলেন,কথার ভিত্তিতে আয়েত্রীর ব্যবহারের সকল প্রসাধনী একত্রে বাহিরে আনতে বলেন মওলানা সাহেব।
আয়েত্রীর ব্যবহারের সকল প্রসাধনী, শ্যাম্পু থেকে শুরু করে হ্যান্ডওয়াশ সকল জিনিস নিয়ে আসা হয়। সাথে নিত্যকার ব্যবহৃত টিস্যুপেপার।
বালক কিছুক্ষণ সেসব জিনিসের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে নেয়। তখন সন্ধ্যে নেমে এসেছে।
আজান পড়ার কারণে সবাই আজ ও বাড়িতে নামাজ পড়েন।
নামাজ শেষে দুয়ারে এসে পুনরায় মোমবাতি জ্বালিয়ে প্যাকেট থেকে একটি টিস্যু পেপার বের করে মোমবাতির আলোর সামনে ধরেন।
কিছু লেখা ভেসে উঠে, অথচ সাধারণ আলোয় এসব দেখা যাচ্ছে না।
লেখাগুলো খুব স্পষ্ট ভাবে খেয়াল করলেই বুঝা যায় কোন আয়াত ইচ্ছাকৃত ভাবে কুফরি কাজের জন্য উল্টো করে লেখা হয়েছে।
আয়েত্রীর চুলের তেলের বোতল থেকে ফিনফিনে হালকা কাপড় পাওয়া যায়। একই লেখার।
বুঝতে বাকী নেই এসব দিয়েই করা হয়েছে আয়েত্রীর উপর কুফরি কাজ।
বালক হাতের ইশারায় এক গ্লাস পানি চায়। পানিতে কিছু আয়াত পড়ে ফু দিয়ে সে পানি ছিটিয়ে দেয় আয়েত্রীর সকল প্রসাধনীর উপর।
টিবওয়েল থেকে আনা সামান্য পানিতে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে আয়েত্রীর সকল প্রসাধনী।
বালক এসেছিলো আয়েত্রীর সাহায্য করতে। এতটুকুন সাহায্য করার পর নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাই দ্রুত ত্যাগ করে আয়েত্রীর নানু বাড়ি। যাওয়ার পূর্বে বলে যায়
“যে ব্যক্তিই আয়েত্রীর সাহায্য করতে আসবে তাকেই সে মেরে ফেলবে। আয়েত্রীর নিজের ভালো নিজের বুঝতে হবে। পূর্ণ আয়েত্রীর নিজের ভালো নিজের বুঝতে হবে।”
সবার রুপচর্চা দেখে নাক ফুলিয়ে বসে আছে আয়েত্রী।কাল থেকে অনেক সুস্থ। সকালে আস্ত ডিম খেয়েছে। প্রত্যাশার মেকওভার করিয়েছে অথচ মানহা, প্রতীক্ষা, মালিয়াত এদের ন্যাকামো দেখে পিত্তি জ্বলে উঠছে। ওদের সাজার কি দরকার আয়েত্রী বুঝতে পারছে না।প্রত্যাশা কে আয়েত্রী সাজায়নি। কারণ হাইলাইটারের চমক দেখে কেউ কাউকে বিয়ে করে না।বিয়ে যদি ভাগ্যে থেকে থাকে তাহলে ঘুটে কুড়ুনির বেশেও তাকে পছন্দ করবে।
বরপক্ষ আসার কিছুক্ষণ আগে নানু এসে ওদের চার বোনকে পাশের বাড়িতে চলে যেতে বললেন।
কারণ ভদ্রমহিলা কোন ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না।
গ্রাম্য কথায় আছে,
“মেয়ে দেখতে গেলে না কি মেয়ে বাদে মেয়ের বাড়ির বিড়াল কেও পছন্দ হয়। ”
পিছনবাড়ি দিয়ে আয়েত্রী বের হয়ে আসতে পারলেও বাকী তিনজন পাত্রপক্ষের সামনে পড়ে যায়। অগ্যতা ওদের আর বের হওয়া হলো না।
আয়েত্রী মাথায় কাপড় তুলে দিয়ে হেটে হেটে নদীর পাড়ে চলে আসে। নদীর পাড়ের এক বাঁকে বসে সদ্য গাছ ছেঁড়া ঝাল পান চিবুচ্ছে।
পানির দিকে খেয়াল করে দেখলো অবলীলায় কেউ একজন সাঁতার কাটছে।
আয়েত্রীর দৃষ্টি সেদিকে আর মুখে পান।
সাঁতার কেটে ক্লান্ত,পরিশ্রান্ত যুবক উঠে এসে আয়েত্রীর পাশে বসলো।
গা থেকে ফোটায় ফোটায় পানি পড়ছে।
“পান খুব পছন্দ মিস আত্রী?”
” নাই কাজ তো খৈ ভাজ। বাই দি ওয়ে মি.শাওন ডোন্ট কল মি আত্রী!”
“ওকে, এখানে কেনো? প্রতীকে দেখতে এসেছে না?”
“তাইতো আমি এখানে। জানেন না? এক মেয়েকে দেখতে আসলে বাকী সব মেয়েদের পারলে মায়ের পেটে ঢুকিয়ে রাখতে হয়। এটাই তো গ্রামের রীতিনীতি।”
“বুঝেছি।কিন্তু এখানে কি করছেন? জানেন না? এটুক জায়গা ভালো না। এখানে সাত জোড়া মহিষ ডুবে মরেছিলো। ”
“জানি। তাইতো মহিষবাতান নাম দিয়েছে। শুনেছি এখানে না কি অতৃপ্ত আত্নারা থাকে। তাই সাক্ষাৎ করতে আসলাম।”
শাওন একথা শুনে মুচকি হাসে। এক চিলতে হাসি। হাসির রেখা মুখে টেনেই বলে
“ভয় পাবেন না বুঝি?”
“কেনো?”
“যদি কখনো জানতে পারেন আমি মৃত তাহলে?”
“মৃত মানুষ কখনো ফিরে আসে না। তাদের রুহ্ সৃষ্টিকর্তার কাছে থাকে। ”
“সবার রুহ্ সৃষ্টিকর্তা নেয় না।কারণ সবার মৃত্যু এক হয় না।”
“এসব কুফুরি কথা। আমি এসব মানি না। ”
শাওন একদৃষ্টিতে আয়েত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকে। একটু ক্ষণ, অনেক ক্ষণ। এতটুক সময় যতটা সময়ে একটা ফুটন্ত গোলাপকে পায়ের নিচে পিষে ফেলে অস্তিত্বহীন করে দেওয়া যায়।
দৃষ্টি ফিরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে শাওন বলল,
“আয়েত্রী! নিজের ভালো বুঝতে শিখুন। নিজেকে সামলে নিন। পূর্ণ করুন নিজেকে….. মুক্তি দিন আমায়….. ”
শাওনের কথা শেষ হতেই আয়েত্রী বিস্ময় চোখে তাকায়। মৃদু রাগী স্বরে বলল,
“আমি আপনাকে কোন বন্ধনে আবদ্ধ করিনি যে মুক্তি দিবো। আপনি মুক্তো।”
শাওন এবার গা দুলিয়ে উচ্চস্বরে হেসে বলল,
“আজান দিবে।এবার আমায় উঠতে হবে আজ শুক্রবার কি না! আজান আগেই হবে। ”
বিজ্ঞের মতন আয়েত্রী কপাল কুঁচকে বলল,
“হ্যাঁ! শুনেছি তিন জুম্মার নামাজ বাদ দিলে না কি স্ত্রী তালাক হয়ে যায়। কিন্তু সত্যি কি তাই? ”
“ভাগ্যিস মনে করালেন! না হলে তো আমার বউ তালাক হয়ে যেতো। বাই দি ওয়ে এটা আমিও শুনেছিলাম সত্যতা জানি না। আসছি আমি। আপনিও চলে যান।”
( উক্ত কথা শুধু মাত্র আমার শোনা কথা। তাই কোন ব্যক্তি আবার এটার রেফারেন্স কই,ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান নিয়ে লিখুন এসব বলবেন না। কারণ এটা সত্যি মিথ্যা আমি নিজেও জানি না। আশা রাখছি বুঝেছেন)
“আপনি বিবাহিত? ”
আয়েত্রীর এমন প্রশ্নে শাওন কোন উত্তর দেয় না। মুচকি হেসে পা বাড়ায় তার গন্তব্যে।
শাওনের শেষ কথায় আয়েত্রীর কেমন কেমন যেনো লাগছে। সত্যি কি সে বিবাহিত? না হলে ওমন করে বলবে কেনো?
এদিকে পাশের বাড়িতে আয়েত্রীকে না পেয়ে আয়াত বাড়িতে বেশ চেঁচামেচি করছে। কারণ আয়েত্রীর বর্তমান অবস্থা কারো অজানা নয়।
বাড়িতে মেহমান রেখেই খুঁজতে বেরিয়েছে অনেকে।
কাল রাতে সেই ছেলেটি বলে গিয়েছিলো আয়েত্রীর নিজের উপর কোন কন্ট্রোল থাকবে না যদি সে পুনরায় কোনকিছুর সংস্পর্শে আসে।
মেয়ের চিন্তায় মরিয়া হয়ে বাবা দ্রুত ছুটে যায় নদীর পাড়ের দিকে। আয়েত্রী তখন মাথায় কাপড় দিয়ে কাঠফাটা রোদে বসে আছে।
বাবা এগিয়ে গিয়ে দ্রুত মেয়ের দুবাহু ধরে দাঁড় করায়।
গাল দুটো অসম্ভব লাল হয়ে আছে। হয়তো রোদের কারণে। কালো ওড়না মাথায় দেওয়া ছোট্ট ছোট্ট দুটি চোখ এবং আপেলের মতো লালা হয়ে যাওয়া গাল দেখে আয়েত্রীর বাবার পিছনে থাকা ছেলেটি যে এক নিমিষেই হারিয়ে যাচ্ছিলো তা হয়তো তখনো কারো জানা ছিলো না।
চলবে
#ছবিয়ালঃফারিহা

