#চন্দ্রাবতীর_রাতে #সৌরভে_সুবাসিনী(moon) #পর্বঃ৭

0
393

#চন্দ্রাবতীর_রাতে
#সৌরভে_সুবাসিনী(moon)
#পর্বঃ৭

এইবার নিয়ে মোট সতের বার লিপস্টিকের কালার চেঞ্জ করলো মালিয়াত।প্রত্যেকের লিপস্টিক ট্রাই করা শেষ।নাহ্! কারোটা পছন্দ হচ্ছে না।এবার আয়েত্রীর লিপস্টিকগুলোর জন্য বড্ড আফসোস হচ্ছে তার। গতকাল সব জিনিসপত্র জ্বালিয়ে দিয়েছে সেই পিচ্চিটা।তা না হলে আয়েত্রীর গুলো থেকে একটা না একটা অবশ্যই ভালো লাগতো।
মালিয়াতের এতটা হা-হুতাশ দেখে প্রতীক্ষা বলল,

“আমি বুঝতে পারছি না, যেখানে প্রতীকে দেখতে এসেছে, আপু নিজেই সাজ নিয়ে এতটা কনর্সান না সেখানে তুই এত উতলা কেনো হচ্ছিস একটু বলবি?”

প্রতীক্ষার কথায় আদৌও মালিয়াতের কান অবধি পৌঁছেছে বলে মনে হলো না কারোর। মালিয়াতের বাড়াবাড়ি রকমের মন খারাপ দেখে মানহা বলল,

“আত্রীর জন্য ছোট মামা লিপস্টিকের ২৪শেড বক্স নিয়ে এসেছেন। আত্রী বক্স খুলেছে বলে মনে হয় না। তুই একবার দেখতে পারিস। ”

মানহার কথা বেশ মনে ধরেছে মালিয়াতের। তাইতো দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে রুম থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। সে মুহূর্তে বাহিরে বেশ শব্দ শোনা যাচ্ছিলো।শব্দের উৎস জানার জন্য উঠানের দিকে এগিয়ে গেলো সবাই।

উঠানের মাঝখানে কাঠের টুলে বসিয়ে রাখা হয়েছে আয়েত্রীকে।মুখে ঝাল পান সাথে গরমের কারণে আয়েত্রী বেশ হাসফাস করছে।
পারিবারিক ভিড় ঠেলে যখন মালিয়াত, মানহা, প্রতীক্ষা আয়েত্রীর কাছে পৌঁছালো তখন মালিয়াতের মাথায় খানিকটা আকাশ না আস্ত আকাশ ভেঙে পড়লো।
আয়েত্রীর এক হাত ধরে বসে আছে আয়াত এবং অন্যহাত ধরে আয়েত্রীকে পানি খাওয়াচ্ছে তার সদ্য তৈরী হওয়া মি.ক্রাশ।যাকে একটু আগে দেখে কয়েক মূহুর্তের মাঝেই তার উপর সমস্ত অনুভূতি পিষে ফেলেছে মানে ক্রাশ খেয়েছে।

দুই একটা ফাকা ঢোক গিলে মালিয়াত এগিয়ে যায় ওদের দিকে। কিন্তু সামিউল তাকে সরিয়ে আয়েত্রীর দিকে চার্জার ফ্যান চালিয়ে দেয়।

“আপনারা প্লিজ ভীড় করবেন না।উনাকে একটু সময় দিন। কয়েক মূহুর্ত,উনি নিজেই আপনাদের কাছে আসবে। প্লিজ।”

পাশ থেকে অপরিচিত কন্ঠস্বর শুনে আয়েত্রী পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখে একজন সুদর্শন পুরুষ তার ডান হাত ধরে বসে আছে। শুধু যে এখন হাত ধরেছে তা নয়, নদীরপাড় থেকেই এভাবে ধরে নিয়ে এসেছেন। এমন নয় যে আয়েত্রী উনাকে চেনে কিংবা পূর্বপরিচিত।

বেশ সজোরে হাত ছাড়িয়ে আয়েত্রী উঠে দাঁড়ায়। অচেনা ব্যক্তির কাছাকাছি আসা মটেও পছন্দ হচ্ছে না আয়েত্রীর। দাঁড়িয়ে বেশ দৃঢ়স্বরে আয়েত্রী বলল,

“এতটা প্যানিক হওয়ার কিছুই হয়নি। আমি ঠিক আছি। ”

কথা শেষ হতে না হতেই আয়েত্রীর হাত ধরে টান দিয়ে অপর পাশে নিয়ে আসে সেই অচেনা ব্যক্তি।পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আয়েত্রী বেশ বুঝতে পারলো এই লোকের হাইট বেশ, বডি ফিটনেস, হেয়ার স্টাইল, কথা বলার ভঙ্গি এসব থেকে খুব যদি ভুল না হয় তাহলে লোকটা প্রশাসনে আছে। হতে পারে সেনাবাহিনী কিংবা বিজিবি। জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে পাশে দাঁড়ানো ব্যক্তিটি বললেন,

“ইউ শুড বি ভেরি রেস্পন্সিবল এবাউট ইউ। এক্ষুনি আপনার হাত ফ্যানে লাগতে পারতো। আপনার ফ্যামিলির কথা শুনে মনে হচ্ছিলো আপনি অসুস্থ। অসুস্থ হয়ে এই রোদে আপনি নদীর পাড়ে কি করছিলেন মিস? উইল ইউ এক্সপ্লেইন ইট?”

“ভাই! এখানে আমরা বড় ভাইয়ার জন্য পাত্রী দেখতে এসেছি। দেশদ্রোহী ধরতে না। প্লিজ জেরা করা বন্ধ কর।না হলে এরা কি ভাববে?আর তুই আয় আমার সাথে। ”

আয়েত্রী চোখ তুলে তাকিয়ে দেখলো তার সামনে একজন নয়, দুই জন পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে। সাথে একজন মেয়ে। মেয়ের কোলে আবার পিচ্চি এক বাবু। কথাটা অবশ্যই এই মেয়ে বলেছে।ছেলেটা তাহলে পাত্রের ছোট ভাই। ওহ্! বেয়াই মশাই?
বেয়াই মশাই শব্দটা বার দুয়েক আওড়িয়ে এক পৈশাচিক হাসি হাসলো আয়েত্রী।

বয়স্ক এক মহিলা এসে আয়েত্রীর নানুর হাত ধরে বললেন,

“কিছু মনে করবেন না।ও আমার ছোট ছেলে ইশরাক চৌধুরী।আসলে কি বলবো! সেনাবাহিনীতে আছে তো, তাই হয়তো কথার ধরণ আমাদের কাছে এমন লাগছে। ও আসলে ওভাবে বলতে চায়নি। ”

“আমরা কিছু মনে করিনি। আপনারা আসতে না আসতেই ঝামেলায় ফেলে দিয়েছি। আসলে আমার নাতনী একটু অসুস্থ, বাবার একমাত্র মেয়ে।বাপ-ভাইয়ের জান এই মেয়ে। তাই….
মাফ তো আমাদের চাওয়া উচিৎ। আপনারা প্লিজ ভিতরে চলুন।”

কোনো কথা না বাড়িয়ে সকলে ভেতরের দিকে পা বাড়ালো।আয়েত্রীও তার রুমের দিকে পা বাড়াবে এমন সময় ইশরাক তাকে থামিয়ে দিলো।আয়েত্রীর দিকে কিছুটা ঝুঁকে সে বলল,

“এত অল্প বয়সে মিস পান খাবেন না।তা নয় নানি ভেবে কেও আর বিয়ে করবে না।”

ইশরাক এর কথা শুনে বেশ কিছুক্ষণ তার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাঁকিয়ে রইলো আয়েত্রী।কিছু একটা ভেবে একটা মুচকি হাসি দিয়ে মুখটা কিছুটা নিচু করে ইশরাকের চকচকে ঝলমলে জুতোতে পানের পিক ফেলে রুমের দিকে একটা দৌড় লাগালো।

আয়েত্রী গভীর ঘুমে ডুবে আছে।তবুও ঘুম যেনো কোথাও একটা ছন্নছাড়া।আচ্ছা?শাওন কেনো দিলো না সে প্রশ্নের জবাব? সে কি সত্যি বিবাহিত? হলে তাতেই বা তার কি? একটা না করুক দশটা করুক।সে কেনো এসব ভাবছে?
সে ভাবছে কারণ শাওনের ও হাসি তার চাই। শাওনের ঐ চাহনী তার চাই,শাওনের নীরবতা,কথা,শ্বাস-প্রশ্বাস সব। মোট কথা শাওন কে তার চাই। কিন্তু কেনো?সে তো কেউ না।শুধুই অচেনা এক মানুষ।সে অচেনা মানুষের কাছে আদৌও কি আমার অনুভূতির কোন মূল্য আছে?

ঘুমের ঘোরেই নিজের অনুভূতির সাথে লড়াই করছিলো আয়েত্রী।

আয়েত্রীর যখন ঘুম ভাঙলো তখন রুমের কানায় কানায় মানুষে পরিপূর্ণ। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো মাত্র দশ মিনিট আগে সে বালিশে মাথা রেখেছে।অথচ দশ মিনিটের এই ঘুম যেনো শরীর মনে আলাদা এক প্রশান্তি এনে দিয়েছে।প্রতীকে যারা দেখতে এসেছেন সেখানের মহিলারা এই রুমেই চলে এসেছেন। আয়েত্রী উঠে বসতেই ওর মা ওকে রুম থেকে বের করে নিয়ে আসে। মূলত কেউ চাইছিলো না আয়েত্রী, প্রতী পাশাপাশি থাকুক। কেনোনা ওরা পাশাপাশি থাকলে তুলনা আপনাআপনি চলে আসবে।

দুপুরের খাওয়ার সময় একটা কান্ড ঘটিয়ে বসলো সামিউল। কি ভেবে যেনো উনি আয়েত্রী,প্রতীক্ষাকে ডাকলো খাবার পরিবেশণ করতে।
আয়েত্রী সবে মাত্র গোসল করে বেরিয়েছে। ভেজাচুল গামছায় আবৃত৷ কপালে, নাকে বিন্দু বিন্দু পানি নিয়ে মাথায় কাপড় তুলে দিয়ে আয়েত্রী রুমে প্রবেশ করল।

একে একে সবার প্লেটে খাবার বেড়ে দিচ্ছে আয়েত্রী। প্রত্যাশা দাঁড়িয়ে আছে। শত হলেও মেয়ে মানুষ। পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছে সেখানে স্বাভাবিক আচরণ করা হয়ত তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
আয়েত্রী তো সবাইকে খাবার দিতে ব্যস্ত। অথচ একজন মানুষের দৃষ্টি তখন আয়েত্রীর চুড়ি বিহীন শূন্য হাত, কপালের বিন্দু বিন্দু পানি এবং অনবরত কথা বলা ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে বার বার অনুভূতির কাছে হেরে যাচ্ছে।

খাওয়াদাওয়ার পাট চুকিয়ে ছেলের মায়ের কানে ছেলে কিছু একটা বললেন। ভদ্রমহিলার দৃষ্টি তখন আয়েত্রীতে।

ভদ্রমহিলা তার পাশে বসে থাকা লোককে কিছু বললে উনি আয়েত্রীকে ডাকে।
এই ভয় সবাই পাচ্ছিলো। শেষমেষ এটাই হওয়ার ছিলো?

পরিবারের বড়রা সবাই বসে আছেন।সবার উদ্দেশ্যে ভদ্রমহিলা বললেন,

“আমার বড় ছেলে ইস্তিয়াক চৌধুরী। বর্তমানে সেনাবাহিনীর মেজর হিসেবে আছেন এবং আমার ছোট ছেলে ইশরাক চৌধুরী লেফটেন্যান্ট পদে আছেন। একমাত্র মেয়ে বিয়ে দিয়েছি। আমার পরিবারের সব আমার ছেলে-মেয়েদের। আসলে ভাই ভণিতা না করে সরাসরি বলছি
ইস্তিয়াকের জন্য আমি আপনার মেয়ে প্রত্যাশা এবং ছোট ছেলে ইশরাকের জন্য আয়েত্রীকে চাইছি এবং আজকেই ওদের আকদ করতে চাচ্ছিলাম যদি আপনারা অনুমতি এবং সম্মতি দেন। ”

মালিয়াত যেনো এবার সত্যি অথৈজলের মাঝে ডুবে যাচ্ছে। আঠারো বছর বয়সে প্রথম কাউকে এতটা পছন্দ হয়েছে। এভাবে সে আয়েত্রীর জন্য তাকে ত্যাগ করে দিবে এতটা মহান সে নয়।
প্রয়োজনে আয়েত্রীর সকল কু-কীর্তির কথা এক্ষুণি সবার সামনে বলে দিবে। যে মেয়ের মুখের কথায় পরপর দুজন মানুষের মৃত্যু হতে পারে সে মেয়েকে অবশ্যই কেউ বাড়ির বউ করে নেওয়ার চিন্তা করবে না। ”

চলবে

#ছবিয়ালঃসোফিয়া

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here