তুমি_অপরূপা(৪১)

0
421

#তুমি_অপরূপা(৪১)

ফজরের আজান হয়ে গেছে বেশ কিছুক্ষণ হলো। রূপা নামাজ পড়ে বারান্দায় এসে বসেছে।অন্ধকার মিলিয়ে গিয়ে ধীরে ধীরে আলো ফুটছে।একটু একটু করে সময় যাচ্ছে আর একটু একটু করে সব আলোকিত হয়ে উঠছে।
সকালের এই ঠান্ডা, মধুর বাতাস রূপার দেহ প্রাণ জুড়িয়ে দিলেও রূপার বুকের ভেতর অস্থিরতা।
রাতে ঘুমানোর আগে সিরাজ হায়দার রূপাকে বলেছিলো দিনে তার সাথে কথা বলবেন কোনো একটা ব্যাপার নিয়ে।
সেই থেকে রূপার মন অস্থির হয়ে আছে।

সমুদ্র বের হয়ে রূপাকে দেখে থমকে দাঁড়ালো। এদিক ওদিক তাকিয়ে রূপার সামনে দাঁড়িয়ে বললো, “ভালো আছো অপরূপা?”

রূপা সমুদ্রের চোখের দিকে তাকালো। কি এক হাহাকার ওই দুই চোখে!
চোখ নামিয়ে নিলো রূপা।
সমুদ্র হেসে বললো, “রূপা,আমি জানি তুমি আমাকে পছন্দ কর না।আমি এটাও জানি,আমাকে পছন্দ করার সম্ভাবনা ০%
দুনিয়ার কেউ-ই এমন কাউকে ভালোবাসতে চায় না।আমি মনে হয় গুড ফর নাথিং।
আচ্ছা রূপা, ভালোবাসা কেনো ভুল মানুষের সাথে হয়ে যায় বল তো!”

রূপা কিছু না বলে উঠে চলে গেলো ঘরের ভেতরে।
সবাই একে একে উঠতে লাগলো ঘুম থেকে। দিনের আলো ফুটে গেলো পুরোপুরি।
সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলো। সকালের নাশতা সেরে রূপক লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরে বের হলো। রাস্তার ও পাশের ছোট্ট পুকুরে কয়েকটা ছোট ছেলে মিলে মাছ ধরছে।সেদিকে এগিয়ে গেলো রূপক।সারা শরীর ওদের কাঁদায় মাখামাখি। একটা চুনোপুঁটি ধরছে তো উৎসাহে চিৎকার করে উঠছে।
রূপক কখনো এই আনন্দ পায় নি,বিসমিল্লাহ বলে রূপক ও ওদের সাথে নেমে গেলো।
পায়ের নিচে নরম কাঁদামাটি,পা কাঁদায় ঢুকে গেছে অনেকখানি। কাঁদামিশ্রিত পানির কেমন একটা গন্ধ।রূপক চোখ বন্ধ করে অনুভব করতে লাগলো।
আহা মাটির শরীর। এই নশ্বর দেহখানি ও তো এই মাটির গড়া।এই সোনার দেহ একদিন আবার এই মাটিতে মিশে যাবে।
অথচ কারো কোনো চিন্তা নেই।

মাটির দেহ নিয়ে এতো বড়াই!

সমুদ্র কিছুক্ষণ পাড়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর বললো, “নামতে ইচ্ছে করছে রে রূপক।”

রূপক বললো, “না না,নামিস না।অনেক কাঁদা।উঠতে পারবি না।তাছাড়া পানি সব কাঁদায় মাখামাখি, তুই সহ্য করতে পারবি না।”

সমুদ্র নামতে নামতে বললো, “আমি জানি রূপক,যতোই কাঁদা হোক আর যাই হোক। তুই থাকলে আমি সবকিছুতেই নিশ্চিন্ত। পরিস্থিতি যত জটিলই হোক,তুই আমাকে ঠিক মুক্ত করে ফেলবি।”

রূপক হেসে ফেললো। মনে মনে বললো, “তোর খুশীর জন্য আমি সব কিছুই করতে পারি বন্ধু।তোকে যে প্রাণের বন্ধু করেছিলাম আমি।প্রাণের দায় এড়াই কি করে! ”

সমুদ্র আর রূপক দু’জনেই কাঁদায় লুটোপুটি খাচ্ছে। এমন সময় রূপা ছুটে এলো সমুদ্রর ফোন নিয়ে।

অনেকক্ষণ ধরে ফোন বাজছে দেখে সালমা রূপাকে পাঠালো সমুদ্রের ফোন দিয়ে যেতে।
এসে দেখে দুই বন্ধু ভূত সেজে লুটোপুটি খাচ্ছে কাঁদায়।
রূপা হাসতে হাসতে মাটিতে বসে পড়লো।

তারপর সমুদ্রের পাশে দাঁড়িয়ে বললো, “আপনার কল এসেছে। ”

সমুদ্র কাঁদায় গড়াতে গড়াতে বললো, “আমার মা কল দিয়েছে? মা দিয়ে সেইভ করা নাম্বার থেকে কল আসলে কেটে ফোন অফ করে দাও।”

রূপা বললো, “না,আননোন নাম্বার। ”

সমুদ্র বললো, “রিসিভ করে লাউডস্পিকার দাও।”

রূপা তাই করলো। রিসিভ করতেই সমুদ্র সালাম দিলো।

অপর পাশে থেকে রেখার ক্রুদ্ধ স্বর ভেসে এলো।চিৎকার করে ছেলেকে বলছে,”এতো বড় স্পর্ধা তোমার? আমার কল রিসিভ কর না তুমি?
ওই সালমার বাড়িতে গিয়ে উঠেছ তুমি!
যে আমার শত্রু তার সাথে তোমার এতো মাখামাখি!
আমি তোমার পর হয়ে গেলাম?কি ভেবেছ,তুমি সালমার মেয়েকে বিয়ে করে আনবে?এতো সোজা!
সালমা কে যেমন আমি এই বাড়ির বউ হতে দিই নি,সালমার মেয়েকে ও দিব না।ভালো করে মাথায় ঢুকিয়ে নাও এই কথাটা।”

ফোন রূপার হাতে থাকায় সমুদ্র কল কাটতে পারছে না,কিছু বলতে ও পারছে না।
রূপা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। রেখা অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে যাচ্ছে। সমুদ্র হাত পেতে ফোন নিতে চাইলে রূপা দিলো না।

রূপার কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে এসব শুনে।

অন্তরা এসেছিলো রূপার পেছন পেছন। হতভম্ব হয়ে অন্তরা ও শুনতে লাগলো সব কথা। রূপা কোনো জবাব দিতে পারলো না।কিন্তু অন্তরা চুপ থাকলো না।এগিয়ে এসে রূপার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে বললো, “অনেক কথা বলছেন এতক্ষণ ধরে, সব শুনছি।আমার মায়েরে নিয়ে আর একটা খারাপ শব্দ উচ্চারণ করবেন তো আমি আপনার জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো। যেই ঠোঁটে আমার মায়েরে নিয়ে নোংরা শব্দ উচ্চারিত হয় সেই ঠোঁট আমি ১০ নাম্বার সুঁই দিয়ে সেলাই করে দিব।আপনি দেখতে যতটা সুন্দর, আপনার অন্তর ততটা নোংরা। আপনার অন্তরের চাইতে সিটি কর্পোরেশনের নর্দমার পানি ও পরিস্কার আছে।নিজেরে মন পরিস্কার করেন,নয়তো ব্লিচিং পাউডার দিয়ে ঘষে ঘষে আমি আপনার মন পরিস্কার করে দিমু খালা।”

রেখা হতভম্ব হয়ে গেলো এই ধরনের কথা শুনে। একটা মেয়ে তাকে এসব কথা বলতে পারলো তার ছেলের সামনে!
সমুদ্র একটা মেয়েকে দিয়ে এভাবে অপমান করালো তাকে!এতটা চেঞ্জ হয়ে গেছে তার ছেলে!

রেখা ভেবে পেলো না এটা কিভাবে সম্ভব। তার নিজেকে কেমন পাগলের মতো লাগছে।নিজের ছেলে তাকে এভাবে অপদস্ত করতে দিলো!

সমুদ্র লজ্জায় মাথা নত করে রাখলো। এই পরিস্থিতি কিভাবে সামাল দিতে হয় সমুদ্রের জানা নেই।

অন্তরা আহত বাঘিনীর ন্যায় ফুঁসছে।সবাই জানে অন্তরা মুখরা,অন্তরা ঝগড়াটে,অন্তরা প্রতিবাদী।
শুধু একজনের কাছেই অন্তরা নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলো।নিজেকে বদলে নিয়েছিলো।
আর না।যে থাকার সে এই মুখরা,ঝগড়াটে অন্তরাকে মেনে নিয়েই থাকবে।

অন্তরা কিছু বলার আগে রূপক বললো, “সাবান,গামছা আর লুঙ্গি নিয়ে আয় তো অন্তরা।এক দৌড়ে যাবি।যেতে যেতে উল্টো কাউন্ট করতে থাকবি ১০০ থেকে।”

রূপকের কথার উপর কথা বলার সাহস পেলো না অন্তরা।কিছু মানুষ থাকে যারা তাদের ব্যক্তিত্ব দিয়েই অন্যকে নিজের কন্ট্রোলে নিয়ে আসতে পারে। রূপক তাদের একজন।

অন্তরা ছুটে গেলো যেই রাগ নিয়ে, ফিরে আসার পর সেই রাগ আর রইলো না।
তবুও কিছু বলতে চাইলো,রূপক সরাসরি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো অন্তরার দিকে।
অন্তরা জানে এই চোখের ভাষা। কি বলতে চাচ্ছে আর কি বুঝাতে চাচ্ছে রূপক তা বুঝে গেছে অন্তরা।

দু’জনে মিলে নদীতে গিয়ে গোসল করে এলো।এসে খেতে বসলো। খুদের ভাত আর কয়েক রকম ভর্তা করা হয়েছে।
সমুদ্র হামলে পড়লো ভর্তা ভাত দেখে।

আরাম করে খেলো সবাই মিলে। খাওয়া শেষে সমুদ্র আর রূপক দুজনেই ঘুরতে বের হলো। সালমা অন্তরা আর রূপাকে ডাকলেন।রূপার বুক কেঁপে উঠলো মায়ের ডাক শুনে।
বারান্দার মাঝখানে পাটি বিছিয়ে বসেছে সিরাজ হায়দার আর সালমা।
রূপার পেটের ভেতর মোচড়াচ্ছে।

সালমা রূপাকে পাশে বসিয়ে বললো, “রূপকরে তো জানস তুই রূপা,একই বাড়িতে থাকতি যখন তোর ভালো কইরাই চেনার কথা ওরে।রূপক আমার কতো আদরের তা আমি জানি শুধু।
মায়ের ভালোবাসা না পাওয়া ছেলেটার জন্য আমার অন্তর পোড়ে কেমন আমি জানি তা।
তোর বড় দুই বোনরে তো আমরা পছন্দ কইরা বিয় দিতে পারি নাই,ভাগ্যে আছিলো না।তোর বিয়া যদি আমরা রূপকের লগে দিতে চাই তোর কি আপত্তি আছে? ”

রূপা কি বলবে ভেবে পেলো না। এতো সহজে নিজের প্রিয় মানুষকে কাছে পেয়ে যাবে রূপা ভাবে নি।বুকের ভেতর কেমন হাতুড়ি পেটা করছে।
জীবন এতো আনন্দের লাগছে কেনো!

নদীর পাড়ে বিশাল আকারের একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ।সবুজ চিরল পাতার ফাঁক গলে আলো আসছে।
কেউ একজন এই জায়গাটা বাঁধাই করেছে। যে এই কাজটা করেছে সে যে বেশ সৌখিন সেই বিষয়ে সন্দেহ নেই।
সমুদ্র আর রূপক দুজনেই বসলো ওখানে।
ঠান্ডা হাওয়ায় শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছে। সমুদ্র এদিক ওদিক তাকিয়ে বললো, “এরকম জম্পেশ একটা খাওয়ার পর এই প্রাকৃতিক হাওয়ায় ঘুমাতে পারলে আরাম লাগতো বেশ।”

রূপক বললো, “ঘুমাবি,ঘুমা তাহলে। আমি বসে পাহারা দিই।”

সমুদ্র সাথে সাথে রূপকের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। রূপক মুচকি হাসলো। স্কুল,কলেজ এভাবেই পার করেছে সমুদ্র।সবকিছুতে রূপককে লাগতো তার।

রূপক বসে বসে সুর তুললো গানের,
“খাঁচার পাখি ছিলো সোনার খাঁচাটিতে
বনের পাখি ছিলো বনে
একদা কি করিয়া মিলন হলো দোঁহে
কি ছিল বিধাতার মনে”
বনের পাখি বলে, “খাঁচার পাখি ভাই
বনেতে যাই দোঁহে মিলে”
খাঁচার পাখি বলে, “বনের পাখি আয় খাঁচায় থাকি নিরিবিলে”………

সমুদ্র হেসে বললো, ” খাঁচার পাখি যদি খাঁচা ছেড়ে বের হয়ে আসে এবার তাহলে? ”

রূপক ভ্রুকুটি করে জিজ্ঞেস করলো, “মানে?”

সমুদ্র হেসে বললো, “কাল আমি আংকেলকে বলেছি তোর কথা। মোটামুটি পজিটিভ মনে হলো আমার। আমার মনে হয় দুই এক দিনের ভেতরেই খাঁচার পাখি তোর হয়ে যাবে।”

রূপক চমকে উঠে বললো, “মানে কি এসবের?কি বলছিস তুই?”

সমুদ্র উঠে বসে রূপকের হাত ধরে বললো, “আর কতো আমাকে ঋণী করবি তোর কাছে? ”

রূপক বুঝতে না পেরে বললো, “মানে কি?”

সমুদ্র পকেট থেকে ফোন বের করে বললো, “আমার ফোনে অনেকগুলো মেসেজ আছে। যেগুলো আমি ভাবতাম আমাকে মাহি পাঠাচ্ছে।
অথচ আমি বোকা বুঝতেই পারি নি সেটা তুই পাঠিয়েছিস।”

রূপক বিরক্ত হয়ে বললো, “আবোলতাবোল বলছিস কেনো!
আমি এসব করতে যাবো কোন দুঃখে?”

সমুদ্র সেই নাম্বারে কল দিলো। সাথে সাথে ফোন ভাইব্রেট করে উঠলো। রূপক চমকে উঠলো। সিম কার্ডটা অফ করতে মনে ছিলো না।

সমুদ্র হাসতে লাগলো। রূপক বিব্রত হয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো। যতই যা হয়ে যাক,বন্ধুর দায়িত্ব পালন করতে রূপক কখনো ভুল করে নি।রূপার সব খবর তাই সমুদ্রকে নিজে দায়িত্বে জানিয়ে দিতো রূপক।যাতে করে সমুদ্র রূপার মনের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পায়।অথচ নিজেও রূপাকে মন দিয়ে ভালোবাসে।
মানুষের মন কতো বিচিত্র!

নয়তো কেউ কি এরকম কাজ করতে পারে?

সমুদ্র বললো, “পরশু যখন তুই আমাকে মেসেজ দিলি তোদের বাসায় যেতে,আমি মাহি মনে করে ওদের বাসায় গিয়ে হাজির হই।তারপর মাহিকে ডাকতেই মাহি বললো ও এসব ব্যাপারে কিছুই জানে না।আর ওর একটা সিম কার্ড। তখনই আমার মনে হলো তুই নয়তো।
তোদের বাসার দরজা খোলা ছিলো। ভেতরে ঢুকে সেই নাম্বারে কল দিতেই দেখি তুইকল কেটে দিয়েছিস।”

রূপক চুপ করে রইলো। তাড়াহুড়া করে সমুদ্রকে মেসেজ দিতে গিয়ে নিজের নাম্বার থেকে না দিয়ে ভুল করে ওই নাম্বার থেকে মেসেজ দিয়েছিলো।

সমুদ্র রূপকের হাত চেপে ধরে বললো, “অনেক ঋণী হয়েছি আমি তোর কাছে। এবার আমাকে কিছু করতে দে।তোদের বিয়ের সব দায়িত্ব কিন্তু আমার। ”

রূপক হাসলো। যে কঠিন লৌহ মানবীকে ভালোবেসেছে, সে কি এতো সহজে রাজি হবে?

চলবে…….

রাজিয়া রহমান

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here