প্রিয়_অর্ধাঙ্গীনি #সুমাইয়া_সুলতানা_সুমী #পর্ব_২৩

0
839

#প্রিয়_অর্ধাঙ্গীনি
#সুমাইয়া_সুলতানা_সুমী
#পর্ব_২৩
,
উঠতে ইচ্ছে করছে নাহ? এভাবে থাকার ইচ্ছে আছে নাকি? যদি থাকে তাহলে থাকতে পারো আমার কোনো সমস্যা নেই।

কথাটা বলে সমুদ্র দুইহাতে শশীকে জড়িয়ে ধরতে গেলে শশী লাফ দিয়ে সমুদ্রের বুক থেকে উঠে পড়ে অতঃপর কোনো দিকে না তাকিয়ে ওখান থেকে দৌড়ে বেরিয়ে আসে। রুমের বাইরে আসতেই বুকে হাত দিয়ে দেওয়াল ঘেঁষে বসে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো। যেনো এতোক্ষণ শ্বাস আটকে রেখেছিলো এখন ছাড়া পেতেই হা করে সব বাতাস নিজের মধ্যে টেনে নিচ্ছে। শশী চোখ বন্ধ করতেই চোখের সামনে সেই দৃশ্য টা ভেসে উঠলো ওমনি চট করে চোখ খুলে ফেলল ওমা চোখ বন্ধ করলেও তো ওনাকে দেখতে পাচ্ছি। এখন তাহলে আমার কি হবে আমি রাতে ঘুমাবো কীভাবে? সব দোষ ওনার, রাতে আমার বইটা দিয়ে দিলেই তো হয়ে যেতো তাহলে এমনটা হতো নাহ, এখন আমার কী হবে? আচ্ছা কোনো ভাবে কি চোখ খুলে রেখে ঘুমানো যাই নাকি।

চেষ্টা করে দেখতে পারো কারণ মাছেরা নাকি চোখ খোলা রেখেই ঘুমায় তুমিও একবার চেষ্টা করতে পারো। তবে এটা করার জন্য অবশ্যই তোমাকে পানিতে নামতে হবে, এখন তুমি যদি আমার এতোবড় বাড়ি রেখে পানিতে গিয়ে ঘুমাও আর সেটা যদি তোমার আব্বা জানতে পারে তাহলে কী জামশেদ মাস্টার আমায় ছেড়ে কথা বলবে?

পাশ থেকে কথার আওয়াজ পেতেই শশী মাথা ঘুরিয়ে পাশে তাকিয়ে দেখে সমুদ্র দরজার সামনে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে দুহাত বুকে গুঁজে রেখেছে৷ এতোক্ষণে সে তার উদম শরীলটা কালো টির্শাট দ্বারা ঢেকে ফেলেছে। সমুদ্র কে দেখতেই শশী দুহাতে নিজের মুখ ঢেকে ইস কি লজ্জা কেউ আমারে বাঁচাও কথাটা বলেই পড়িমরি করে দৌড়ে ওখান থেকে নিজের রুমে চলে গেলো। শশীর এহেন কান্ডে সমুদ্র শশীর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বিরবির করে বলল,

এতো লজ্জা হলে তো আমার বাসর করাই হবে নাহ৷ দেখা যাবে রাতে বাসর করলাম সকালে বউ লজ্জায় আর আমার সামনেই আসলো নাহ বাকি জীবনটা তার ঘোমটা দেওয়া মুখটাই দেখা লাগলো, এই জন্যই ছোটো মেয়ের প্রেমে পড়তে হয় নাহ কিন্তু কি আর করার যা হওয়ার তাতো হয়েই গেছে। এই জন্যই বোধহয় গুরুজনেরা বলে গিয়েছেন, ভাবিয়া করিও কাজ করিয় ভাবিও নাহ।
,,,,,,,,,,

আজকে কেনো জানি ক্লাসেও মন বসতে নাহ সামনে স্যার দাঁড়িয়ে লেকচার দিচ্ছে এদিকে শশী গালে হাত দিয়ে সকালের ঘটে যাওয়া কাহিনীটা ভাবছে। পাশ থেকে মিলি কনুই দিয়ে শশীকে ধাক্কা দিয়ে বলল, কিরে তোর মন কোথায়? সেই কখন থেকে দেখছি গালে হাত দিয়ে কি একটা ভেবেই যাচ্ছিস। স্যার যদি একবার দেখে নাহ তাহলে এতোক্ষণ কি পড়ালো সবটা তোকে জিগাস করবে তখন বলতে পারবি?

মিলির কথাশুনে শশী গাল থেকে হাত সরিয়ে মিলির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, দেখ আমার চোখের দিকে তাকা দেখেছিস কেমন লাজুক লাজুক ভাব, আর আমার গাল দুটো কেমন ফুলে ফুলকো লুচির মতো হয়ে গেছে, আর আমার ঠোঁট স্টোব্রেরির মতো কেমন লাল লাল হয়ে গেছে৷ এই মিলি আমি এই মুখ নিয়ে বাড়ি যাবো কীভাবে? আজকের দিনটা তোর বাড়িতে থাকতে দিবি আমায়? কাল হতে হতে আবার সব ঠিক হয়ে যাবে।

শশীর এমন অদ্ভুত কথার মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝতে পারলো নাহ মিলি উল্টো চোখ বড় বড় করে শশীর দিকে তাকালো যেনো সে শশীর কথা অনুযায়ী সবটা মিলাচ্ছে৷ সত্যি কি কারো গাল ফুলে ফুলকো লুচির মতো হয়? মিলি যখন এসব ভাবতে ব্যাস্ত শশী তখন আবারও নিজের ভাবনায় মত্ত। ও কীভাবে মিলিকে বোঝাবে সদ্য যৌবনে পা দেওয়া মেয়েটা যে খুব গভীরভাবে কোনো এক পুরুষের প্রেমে পড়েছে। হঠাৎ তার অতি অল্প ছোঁয়ায় সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, ভালোবাসার মানুষের একটু ছোঁয়ায় ও যে ভিতরটা এভাবে উল্টো পাল্টা করে দেওয়া যায় সেটাতো ভাবনারও বাইরে ছিলো। এই ছোঁয়ায় যেনো ভিতরে অগ্নি কান্ড ঘটিয়ে দিয়েছে কিন্তু কি আশ্চর্য ভিতরে আগুনে দগ্ধ হলেও বাইরের শরীলটা বরফের মতো ঠান্ডা। যেনো মনে হচ্ছে যেই পুরুষের এই সামান্য ছোঁয়ায় এমন হতে পারে তাহলে সে যদি আরো গভীর করে ছুঁয়ে দেয় তাহলে কি হবে? কথাটা মনে হতেই শশী দুহাতে মুখ ঢেকে বলল,

হায়হায় তাহলে তো আমি মরেই যাবো।

আচমকা শশীর এমন কথায় মিলি এবার বেশ জোরে সরে শশীকে ধাক্কা দিয়ে বলল, আর একটু পড়ে মরিস বোইন স্যার ক্লাস টা শেষ করে বের হোক তারপর আমি নিজ দায়িত্বে তোকে কলেজের বিল্ডিং এর ছাঁদ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবো তখন না হয় আরামসে মরিস। এখন অন্তত আমাকে ক্লাসটা করতে দে আর তুই নিজেও কর এভাবে নতুন বউ এর মতো লজ্জা পাওয়া বন্ধ কর।

মিলির কথা শুনে শশী নিজেকে ঠিক করে চুপচাপ ভালো হয়ে বসলো, নিজেকে মনে মনে বেশ কয়েকটা কঠিন কথা শুনালো যেনো পরবর্তী তে এমন ভুলভাল কাজ সে না করে। ক্লাস শেষ হতেই সবাই বেরিয়ে গেলো শশী বের হতেই মিলি ওর পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল, এখন বল কাহিনী কি তখন ওভাবে নতুন বউয়ের মতো লজ্জা পাচ্ছিলি কেনো? আর কি সব উল্টো পাল্টা কথা বলছিলি গাল ফুলে গেছ ঠোঁট স্টোব্রেরি হয়ে গেছে এসব কি?

মিলির কথাশুনে শশী কিছু বললো নাহ বা হাতে নিজের মুখটা ভালো করে মুছে নিয়ে বলল, সত্যিই কি এমন কিছু হয়েছে? আমার দিকে ভালো করে তাকিয়ে সত্যি করে বলতো।

তুই সত্যি পাগল হয়ে গেছিস এবার সত্যি সত্যিই কিন্তু তোকে এই দোতলার বারান্দা থেকে ফেলে দেবো। মিলির কথায় আর কোনো জবার দিলো নাহ শশী, দুজনে সিঁড়ি বেঁয়ে নিচে নেমে মাঠ পেরিয়ে কলেজের গেটের সামনে এসে দাঁড়ালো। কলেজ ছুটি হয়ে গেছে বিধায় একে একে সবাই বেরিয়ে যাচ্ছে, শশী আর মিলি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো, তখনি ওদের সামনে কালো জীপ এসে থামলো শশী মাথা উঠিয়ে দেখে সমুদ্র। সমুদ্র কে দেখতেই মিলির পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো কেননা এই মুখ সে সমুদ্র কে কীভাবে দেখাবে, সমুদ্র গাড়ি থেকে নেমে সানগ্লাস টা বুকের সাথে রেখে মিলির সামনে এসে দাঁড়ালো। মিলি হা করে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে, একদম সামনে এসে দাঁড়ানোই মিলি সমুদ্রের টানটান বুকটাই দেখতে পাচ্ছে। গাড়িতে থাকাকালীন তো পুরোটাই দেখা যাচ্ছিলো এখন সামনে এসে দাঁড়ানোই মাথা উঁচু করে দেখা লাগছে। সমুদ্র শশীকে উদ্দেশ্য করে বলল,

চলো দেরি হয়ে যাচ্ছে।

যেহেতু শশী মিলির পিছনে তাই সমুদ্রের কথাশুনে মিলি ভাবলো কথাটা ওকে বলেছে তাই থতমত খেয়ে বলল, হ্যাঁ যাবোতো কিন্তু কোথায়? আর আপনি কে?

মিলির কথাশুনে সমুদ্র এবার মিলির দিকে তাকালো পরক্ষণেই আবার শশীর দিকে তাকিয়ে বলল, কি হলো শুনতে পাওনি? যলদি চলো আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।

মিলি এবার ব্যাপারটা বুঝতে পারলো আসলে লোকটা কথাটা ওকে নয় বরং ওর পিছনে থাকা শশীকে বলেছে। কিন্তু লোকটা কে আর শশীকে কীভাবে চেনে? কথাগুলো ভেবে মিলি পাশে একটু সরে গিয়ে শশীর দিকে তাকালো দেখলো শশী ব্যাগ দিয়ে ওর মুখ ঢেকে রেখেছে। মিলি শশীর এহেন কাজে বড়ই বিরক্ত হলো ওর মুখের থেকে টান দিয়ে ব্যাগটা নিয়ে বলল, এখানে এভাবে লুকিয়ে আছিস কেনো ওনি তোকে ডাকছে শুনতে পাচ্ছিস নাহ?

শশী দুহাতে নিজের মুখ ঢেকে ফিসফিস করে মিলিকে বলল, আমার সামনে থেকে সরিস নাহ মিলি ওনি আমার এই মুখ দেখে ফেলবে তো।

মিলি বোকার মতো একবার শশীর দিকে তো আবার সমুদ্রের দিকে তাকালো, সমুদ্র ভ্রু কুঁচকে শশীর দিকে তাকালো শশী তখনো মুখ ঢেকে আছে সমুদ্র মিলির দিকে তাকাতেই মিলি সরে গেলো। সমুদ্র শশীর কাছে গিয়ে বাম হাত ধরে মিলির থেকে ব্যাগটা নিয়ে গাড়ির দিকে গেলো। পাশের সিটে শশীকে বসিয়ে দিয়ে নিজে ড্রাইভিং সিটে বসলো, ওদিকে মিলি এখনো হা করে শশী আর সমুদ্রের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।

কি ব্যাপার ওইদিকে মুখ করে আছো কেনো?

গাড়ি চালাতে চালাতে কথাটা বলল সমুদ্র, শশী বাইরের দিকে তাকিয়েই বলল, এমনি বাইরের দৃশ্য দেখছিলাম।

জীবনে কখনো দেখনি? আমার দিকে তাকাও।

সমুদ্রের গম্ভীরকন্ঠে কথাটা শুনতেই শশী আস্তে আস্তে সমুদ্রের দিকে তাকাতেই সমুদ্র মজার সূরে বলল, কি ব্যাপার তোমার গালগুলো ওমন ফুলে আছে কেনো যেনো লাল টমেটো।

ব্যাস সমুদ্রের কথা শুনতেই লজ্জায় আবার মুখ ফিরিয়ে নিলো, সমুদ্র হালকা হেসে গাড়ি চালানোই মন দিলো। মাঝে মধ্যে মেয়েটাকে লজ্জায় ফেললে মন্দ হবে নাহ এমন ফুলো ফুলো লাল লাল লজ্জায় রাঙা মুখ দেখা যাবে।
,,,,,,,,,,

বিছানায় আধসোয়া হয়ে একমনে জানালার দিকে তাকিয়ে আছে শাহানারা, কালকে রোদ্র আসবে এতো চেষ্টা করেও ছেলেটাকে বলতে পারেনি। ভেবেছে ফোনে বলার থেকে কাছে বসায়ে বোঝালেই রোদ্র বুঝবে। তবে কিছুতেই ভাইয়ে ভাইয়ের মধ্যে বিবাদ লাগতে দেবো নাহ অন্তত আমি বেঁচে থাকতে। শাহানারার এমন ভাবনার মাঝেই সমুদ্র দরজায় নক দিলো। অনুমতি পেয়ে সমুদ্র রুমে এসে মায়ের পায়ের কাছে বসে বলল,

কালকে রোদ্র আসবে আমার সাথে তুমিও যাবে তো এয়ারপোর্টে?

শাহানারা সমুদ্রের দিকে তাকালো ছেলেটা কার মতো হয়েছে সে এটা ভেবেই চিন্তিত, তবে কিছুটা বাবার ধাতও পেয়েছে। সেই ছোটো বেলা থেকেই নিজেকেই নিজের বন্ধু বানিয়েছে রোদ্রকে জয় কে শাসন করেছে ঠিকই তবে তার আড়ালে ভালোবাসা দিতে কার্পণ্য করেনি। সমুদ্র যদি কোনো ভাবে জানতেও পারে রোদ্র শশীকে চাই তাহলে বিনা প্রশ্নে নিজের ভাইয়ের হাতে ওর ভালোবাসাকে তুলে দেবে কিন্তু শশী? মেয়েটা যে সমুদ্রকে বড্ড চাই ও কখনোই রোদ্রের সাথে ভালো থাকবে নাহ। নাহ আমাকে শক্ত হতে হবে রোদ্রকে বোঝাতে হবে আমি জানি আমার রোদ্র বুঝবে।

কি হলো মা কোথায় হারিয়ে গেলে।

হ্যাঁ শুনেছি, তুই আর জয় যাস আমি আর যাবো নাহ শরীলটা ভালো লাগছে নাহ।

আরো কিছুক্ষণ মায়ের সাথে কথা বলে উঠে দাঁড়ালো, বেরিয়ে যাওয়ার আগে পিছন ফিরে শাহানারার দিকে তাকিয়ে বলল, তাহলে রোদ্র আসলেই কথাটা বলো আমি আর বেশি দেরি করতে চাই নাহ।

,,,,,,,,,,,,

কি হলো রোদ্র ভাইয়া আপনি আমাকে এখন ছাঁদে নিয়ে আসলেন কেনো? আপনার ভাই যদি জানতে পারে তাহলে আমাদের দুটোকেই এই ছাঁদ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবে।

শশীর কথাশুনে রোদ্র হাসলো তবে কিছু বলল নাহ,রেলিং এর সাথে হেলান দিয়ে শশীর দিকে তাকিয়ে আছে। শশী রোদ্রের সামনে তুড়ি বাজিয়ে বলল, আরে কোথায় হারিয়ে গেলেন আর আপনি এতোদূর থেকে জার্নি করে এসেছেন চলুন নিচে যায়।

একটু চুপ করে দাঁড়াও তো এতো ছটপফ করো কেনো? তোমাকে আমার একটা কথা বলার আছে। এতোদিন অপেক্ষা করেছি আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি নাহ, কথাটা তোমাকে না বলা অবধি মোটেও শান্তি পাচ্ছি নাহ। শেষের কথাটা আস্তে আস্তে বলল।

কি বলবেন বলেন তারপর আমিও তো বলবো।

রোদ্র শশীর সামনে এসে দাঁড়ালো হাতের মুঠোয় কিছু রাখা আছে। কেবলি রোদ্র কিছু বলবে তখনি শশী সামনে থেকে সরে আকাশের দিকে তাকিয়ে বেশ উচ্ছাসিত গলায় বলল, রোদ্র ভাইয়া ওই দেখুন তারা ছুটছে শুনেছি এই সময় কিছু চাইলে নাকি তার সেই চাওয়া আল্লাহ পূরণ করে। আসুন আসুন আমার সাথে চোখ বন্ধ করে নিজের জন্য কিছু চেয়ে নিন।

চলবে?

আগেই বলেছি পরিক্ষা চলছে এই জন্য দেরি হচ্ছে, খুবি অমনোযোগী হয়ে পর্বটা লিখেছি কোনো কোনো জায়গায় ভুল হতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here