#ফুলকৌড়ি
(৩৬)
#লেখনীতে_শারমীন_ইসলাম
ছাঁদের উপর শান বাধানো বসার স্থানে দুহাঁটু একসাথে মুড়ে ফুপিয়ে কেঁদে চলেছে কৌড়ি।সেই নিঃশব্দে কান্নার দমকে থেকে থেকে কেঁপে উঠছে তার পেলব শরীর।ফর্সা চোখমুখ লালাভ বর্ণায় ছেয়ে গেছে।ঠোঁটে দাঁত চেপে কান্নার ফলে ঠোঁটজোড়াও গোলাপিবর্ন ছেড়ে রক্তিম আভায় ছেয়ে পিষ্টে আছে যন্ত্রণায়।এতো পোড়া কপাল নিয়ে পৃথিবীতে কেনো জন্মছিলো সে!দূর্ভাগ্য বুঝি শুধু তারই প্রাপ্য!কেনো ওই মানুষটা তার ভিতরটা বুঝতে চাইলো না?ইদানিং তার সুখ-অসুখ সব নিজ থেকে বুঝে নিতে পারছে।আর এটুকু বুঝে নিতে পারলো না,কেনো সে মানুষটাকে দেখতে যেতে পারিনি। কৌড়ি কি এতোই,নিষ্ঠুর অমানবিক।মানুষটা এক্সিডেন্ট করেছে শুনে কি অনুভব অনুভূতি হয়েছিলো তার,এটা শুধু সেই জানে।একটা পলক মানুষটাকে দেখার জন্য মনটা কিভাবে ছটফটিয়ে ছিলো,সেটাও শুধু তার ভিতরটা জানে।অথচ সেই মানুষটা তাকে কিছু বলার বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়ে রেগে-মেগে চলেই গেলো!তাকে একটাবার বোঝার চেষ্টা-ও করলো-না!এই বুঝল মানুষটা তাকে?এতো রাগ, এতো ক্ষোভ জন্মেছে তারউপর?কৌড়ির কান্নার গতিবেগ বাড়লো।হঠাৎ সামনে দু’খানা ফর্সা গোটালো পা দেখেই কান্নারা এবার হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে এলো।বসা অবস্থায় মান্যতার কোমড় জড়িয়ে তার পেটে মুখ গুঁজে হেঁচকি তুলে কাঁদতে থাকলো।মান্যতাও পরম যত্নশীলতায় নিজের সাথে জড়িয়ে নিলো তাকে।নিজের রুম থেকে বেরিয়ে নিচে যাচ্ছিলো সে।হঠাৎ দাদাভাইকে হনহনিয়ে ছাঁদ থেকে নামতে থেকে দাঁড়িয়ে পড়েছিলো সে।নিভান কাছে আসতেই তাঁকে দেখেই চলা ধীর করলো।ফের গম্ভীর কন্ঠে তাঁকে আদেশ করলো ছাঁদে আসতে।বলেই চলে গেলো।মান্যতা ভেবে পায়নি দাদাভাইয়ের এমন আদেশর কারন।কেনো সে ছাঁদে যাবে!হঠাৎ কিছু মাথায় খেলতেই দ্রুত ছাঁদে এসে দেখলো,দাদাভাইয়ের রাগের কারন।
‘উনি আমার কথা কিছুতেই শুনলোই না আপু।আমি কেনো যেতে পারিনি,কারনটা উনি জানতেও চাইলেন না,শুনতেও চাইলেন না।বরং তার বিনিময়ে আমাকে ভুল বুঝে কতো উল্টো পাল্টা কথা শুনিয়ে চলে গেলেন।তুমি বিশ্বাস করো, আমি যেতে চেয়েছিলাম।উনি সেকথা কিছুতেই মানতে চাইছেন না।বিশ্বাসও করছেন না।আরও উল্টে আমার সম্পর্কে সবচেয়ে নিচু ধারনা করে বলে গেলেন,আমার প্রার্থনায় উনার দীর্ঘায়িত কামনা না করে মৃতু কামনা করবো!এটা উনি কিকরে বলতে পারলেন?কিকরে মুখে আনলেন উনি?
একাধারে কৌড়ির পিঠে আর মাথায় হাত বুলিয়ে স্বান্তনা দিতে থাকলো মান্যতা।কৌড়ির কান্নার দমকে বেঁধে বেঁধে বলা কথাগুলো মন দিয়ে শুনলো।ফের মুখে মৃদু হাসি টেনে নরম গলাশ শুধালো।–দাদাভাইকে ভালোবেসে ফেলেছিস?
তড়িৎ মাথা নাড়ালো কৌড়ি।অর্থাৎ না।মান্যতা ফের শুধালো—তবে তার কথায় এতো কাঁদছিস কেনো?সে তার অনুভূতির আবেগ থেকে নাহয় শুনিয়েছে কথা।তোর মোটেও কান দেওয়া উচিত হয়নি।আর না এতো কান্নাকাটি করার প্রয়োজন আছে।
সব যেনো কেমন এলোমেলো মনে হলো কৌড়ির।নিজের আবেগ অনুভূতি ওই মানুষটার প্রতি আগ্রহী।তাই বলে কি তারপ্রতি ভালোবাসা জন্মেছে?কি জানি!তবে ওই মানুষটার প্রতি যে নিজের অগাধ মায়া।এটা অনুভব করে কৌড়ি।সেই মায়া থেকেই মান্যতার কথার উত্তর সরূপ বললো –আমি কিচ্ছু জানিনা।তবে উনার খারাপ আমি কখনো চাইনি আর চাইবোও-না কখনো।
সেখানে উনার মৃত্যু কামনা করবো আমি!উনি এটা কিছুতেই বলতে পারেনন না।রাগে হোক বা ক্ষোভে কথাগুলো বলে তিনি দোষ করেছেন। অন্যায় করেছেন।উনি সব দোষ আমার উপরে বর্তায়ে রাগ প্রকাশ করতেই পারেন।তাই বলে উল্টো পাল্টা যেকোনো কথা বলতে পারেন না।
হাসলো মান্যতা।ভালোবাসা জন্মায়নি নাকি!স্বীকার না করলেও কথার আচে ঠিকই বোঝা যাচ্ছে, চৈত্রের খরা নেমে মনে আষাঢ়ে শ্রাবণধারা নেমেছে মেয়েটার তার দাদাভাইয়ের জন্য।কৌড়ির পিঠে ফের হাত বোলাতে বোলাতে কোমল গলায় বললো।
‘আচ্ছা ঠিক আছে।দাদাভাইয়ের হয়ে মানলাম আমি।ভুল হয়ে গেছে।আর কাঁদিস না।মাইগ্রেনের ব্যথাটা আবার শুরু হয়ে যাবে।দু’দিন বাদ ফাইনাল পরিক্ষা।ব্যথা বাড়লে বুঝতে পারছিস,কি হবে?আর দাদাভাই রাগ করে উল্টো পাল্টা বলেছে,আবার ঠিক হয়ে যাবে।প্রিয় মানুষ বলতে,সে তাদের থেকে পাওয়া কষ্ট, ব্যথা মনে রাখেনা।রাখে-না বলতে ভুল।হয়তো ঠিকই মনে রাখে তবে তাদেরকে বুঝতে দেয় না।তোর সাথে রাগারাগি করেছে।বিশ্বাস কর আমি অখুশি হতে পারছি-না।দাদাভাই প্রিয়জনদের দেওয়া শত কষ্ট, শত ব্যথা সহ্য করতে সদা প্রস্তুত।তাকে এমনটা জেনে এসেছি,দেখেও এসেছি।,তবে বিপরীত মানুষটাকে সেই ব্যথা কষ্ট ফিরিয়ে দিতে কখনো প্রস্তুত হয়না।পছন্দ করে না সে।আমার দেখা,কষ্ট ব্যথা পেতে দেয়নি কখনো।আমার নজরে পড়েনি সেরকম কোনো ঘটনা।তবে তোর কাছে যখন নিজের ব্যথার,কষ্টের অনুভূতির কৈফিয়ত চাইছে।বহিঃপ্রকাশ করছে।তবে বিশ্বাস কর, সে অত্যন্ত তোকে ভালোবাসে।তোকে নিজের ভাবে।সম্পূর্ণ নিজের।যার প্রতি ও হকদার।নাহলে কখনো এরকমটা করতোনা।রাগ করে উল্টো পাল্টা বলেছে তাই কি,সে তোর কাছেই ফিরবে।
একটু থেমে ফের বললো–দাদাভাই রাগ করেছে কেনো সেটা তো বললিনা?
কান্না থেমে গেলেও এখনো বারবার চোখ মুছছে কৌড়ি।তারমানে নিঃশব্দে কেঁদে চলেছে।হাত ডলে আবারও চোখ মুছে নিয়ে রয়েসয়ে বললো–আমি কেনো তাকে দেখতে যায়নি,সেই অভিযোগে অভিযুক্ত করে দুনিয়ায়র আজেবাজে কথা আমাকে শুনিয়ে গেছেন।
এবার শব্দ করে হাসলো মান্যতা।সেই হাসিতে লজ্জা পেলো কৌড়ি।মান্যতা বললো—তা তুই বলিসনি,তুই পরিস্থিতিতে পড়ে যেতে পারিসনি।এখানে তোর দোষ কোথায়?
‘সময় দিয়েছেন আমাকে বলতে?আর আমার কথা শোনার প্রয়োজন মনে করেননি উনি।শুধু নিজের মতো নিজেরটা বলে রাগ দেখিয়ে চলে গেলেন।
শব্দকরে দীর্ঘশ্বাস ফেললো মান্যতা। ফের বললো–যাই হোক খেয়াল তো আমারও ছিলোনা তুইও যে দাদাভাইকে দেখতে যেতে চাস বা তোরও দাদাভাইকে একবার হলেও দেখতে যাওয়া উচিত।এটা মাথায় ছিলো না।দাদাভাইয়ের এক্সিডেন্ট আবার হঠাৎ আমার পরিক্ষার প্রেশার পড়ে গেলো।সবমিলিয়ে কি এলোমেলো হয়ে ছিলাম,দেখলিইতো এইকয়দি।আমিও বা ঠিকঠাক এই চার-পাঁচটা দিনে কয়বার যেতে পেরেছি দাদাভাইকে দেখতে বলতো?প্রথমদিনতো ওই তাড়াহুড়োয় চলে গেলাম।তারপর তো বাড়ি থেকে দাদাভাইকে আর দেখতে যাওয়া হয়নি।পরিক্ষা পড়ে গেলো,পরিক্ষা দিয়ে আসার পথে সময় করে দেখা করে এসেছি,এই যা।বাড়ি থেকে উহ্য করে তো যাওয়া হয়নি।এজন্য তোর কথাও বিশেষ খেয়ালে ছিলো-না।স্যরিরে সোনা।তোর বকার অর্ধেক ভার আমি নিলাম।যদিও বকা তোর শোনা হয়ে গেছে।তবে এবার দাদাভাই উল্টো পাল্টা কিছু বললে বা রাগ দেখালে,আমি বুঝিয়ে বলে দেবো তোকে না বকতে।কেমন?আর কাঁদিস না।
মান্যতার কথার ছলে এবার কৌড়ির কান্না পুরোপুরি থেমে গেলো।হঠাৎই নিচ থেকে জোরে কিছু ভাঙার আওয়াজ আসতেই চমকে উঠলো দু’জনে। মান্যতার কোমর ছেড়ে, তার মুখের দিকে প্রশ্নবিদ্ধ নজরে তাকালো সে।মান্যতাও কপাল কুঁচকে কৌড়ির মুখের দিক তাকিয়ে রইলো।ফের আবার জোরেশোরে কাচ ভাঙার শব্দ হতেই মান্যতার কোমর ফেরছে খামচে ধরলো কৌড়ি।মান্যতারও হুশ ফিরলো জেনো।মনেমনে কিছু ভাবলো,ফের কৌড়ির হাতটা চেপে ধরে চোখ বড়বড় করে বললো।
‘চল নিচে।আমার কেনো জানি মনেহচ্ছে নিশ্চিত এটা দাদাভাইয়ের কাজ।
আতঙ্কে কৌড়ির হরিনী চোখগুলোও আকার ছাড়ালো।
ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ হলো।একটু আগে যা রাগ দেখিয়ে গেলো।আবার?তাকে আর কিছু ভাবার বা বলার সুযোগ না দিয়ে মান্যতা তার হাত খিঁচে টান দিয়ে নিচে দৌড় দিলো।অগ্যতা তাঁকেও দৌড়াতে হলো।
★
‘এই নিভান কি হয়েছে?
কথাটা জিজ্ঞেস করতেই,নিভানের দরজায় পা আঁটকে গেলো নীহারিকা বেগমেরম।পরিপাটি করে রাখা ঘরের অবস্থা দেখে আতঙ্কিত হলো চোখমুখ।সহসা ডান হাতটা মুখে চেপে ধরলেন।উনার পিছে আস্তে আস্তে এসে ভীড় করলো বাড়িতে থাকা সমস্ত মানুষ।ঘরের অবস্থা দেখে সবার মুখাবয়বের এক্সপ্রেশন একই রূপ ধারন করলো।সবার আতঙ্কিত মনে প্রশ্ন জাগলো।
ছেলেটা তো কখনো এতো রেগে যায়না?যায় না বললে ভুল,তবে বহিঃপ্রকাশ তো সহজে ঘটায় না।আর এতো বাজেরূপে তো কখনো ঘটায়না।তবে কি এমন হলো যে এতো রেগে গেলো?আর এই অসুস্থ অবস্থায় রেগেমেগে রুমের বেহাল দশা করে ফেলেছে! কি বাজে অবস্থা! একাকার অবস্থা করে ফেলেছে রুমের।দরজার পাশের বিশাল আকারের ফুলদানিতে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ। তার খন্ডিত কোনো রূপ নেই।রুমের ওয়ালসেট আয়নাটারও বিশ্রী অবস্থা।ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে।অল্প একটু অবশিষ্ট কোনোমতে লেগে আছে ওয়ালে।সেই ভাঙা আয়নার সম্মুখে দাড়িয়ে আছে নিভান।তার ক্রোধিত মুখ আর বুঁজে থাকা নজর সেখানে দেখা মিলছে।হঠাৎ কি হলো ছেলেটার?আর এতো রেগেই বা গেলো কিসে বা কার উপর?নীহারিকা বেগম ভিতরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই নিভান গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো।—ভিতরে এসো না মা।লেগে যাবে।
আমাকে একটু নিজের মতো থাকতে দাও।যাও।
ছেলের কথা শুনে কপাল কুঁচকে গেলো নীহারিকা বেগমের।তবে নিভানের কথা কর্ণপাত না করে ভিতরে
পা বাড়াতে গিয়েও,কোথায় পা ফেলবেন খুঁজে পেলেন না।থেমে গেলেন।প্রশ্নবিদ্ধ করলো নিভানকে।
‘ভিতরে আসবোনা কেনো?আর এই অসুস্থ অবস্থায় এসব কেনো নিভান?দুনিয়া গোল্লায় যাক,এতো হাইপার হলে নিজের কি অবস্থা হতে পারে জানা নেই তোর!তবুও এসব কি!কেনো?এতো রেগেও বা গিয়েছিস কি জন্য?আর আমাকে একা থাকতে দাও মানে?হয়েছে টা কি?কেনো এই অবস্থায়ও এতো হাইপার হচ্ছিস?
‘আমার যা হয়ে যায় যাক।প্লিজ মা,আপতত আমাকে একা থাকতে দাও।প্লিজ,ট্রায় টু আন্ডারস্ট্যান্ড।
জেদালো ভারী গম্ভীর কন্ঠস্বর আরও ভারী শোনালো।
অদ্ভুত দৃষ্টিতে নিভানের পানে চেয়ে রইলেন নীহারিকা বেগম।এরকম রাগ জেদ সহজে করেনা ছেলেটা।তবে যখন করে খুবই কঠিন হয়ে যায়।সামলানোও দ্বায় হয়ে পড়ে।কারও কথা শুনতে চায়না।নিজের রাগজেদে অনড় থাকে।কারও ভালোমন্দ কথায় টলতে চায় না।কাজই হয়না।ওর মতো ওকে ছেড়ে দিলে,মাথা যখন ঠান্ডা হয় নিজে থেকেই স্বাভাবিক হয়ে যায়।তবে হঠাৎ এতো রাগলো কি নিয়ে?প্রশ্নটা যেনো মনস্তাত্ত্বিকে ঘুরেফিরে বাড়ি খেতে লাগলো।উনার মতো দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যেকের মনে প্রশ্ন জাগলো।এতো রেগে গেলো ছেলেটা কি নিয়ে?কি হলো হঠাৎ ছেলেটার কেউ বুঝে উঠতে পারলো-না।তবে সদ্য দরজায় এসে দাঁড়ানো কৌড়ি আর মান্যতা ঠিকই বুঝতে পারলো,রুমের এই করুন দশা কিসের জন্য আর কার জন্য!রুমের দৃশ্য দেখেই মূহুর্তেই মুখে হাত চেপে ধরলো কৌড়ি।সেটা আর কেউ খেয়াল না করলেও দীবা খেয়াল করলো।মেয়েটার চোখমুখ লাল।বড়বড় চোখগুলোও ফুলোফুলো।কেঁদেছে কি?কিন্তু কেনো?
কৌড়ি ছাঁদ থেকে নেমে এলোনা?নিভান তো একটু আগে ছাঁদ থেকে নামলো।আর তারপর পরপরই তো এসব কান্ড।ড্রয়িংরুমে বসেছিলো সে।নিভানকে ছাদ থেকে নেমে নিজের রুমে ঢুকতে দেখেছে সে।তবে কি দু’জনের মধ্যে কিছু হয়েছে।ঝগড়াঝাঁটি বা কথা-কাটাকাটি!নাহলে?ভাবনা সেখানেই স্থির রেখে নিভানের পানে চাইলো দীবা।ছেলেটা সেভাবেই অনড় দাঁড়িয়ে আছে।নিভানের সিদ্ধান্ত টলানো এতো সহজ নয়!মনেহলো তার ধারনাই ঠিক।সংগোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেললো দীবা।ফের আস্তে আস্তে পা পিছিয়ে নিয়ে চলে গেলো।খালি জায়গায় উপস্থিত হলো ইভান।বাড়িতে ছিলোনা সে।রুমে ঢুকতে গিয়েই নিভানের রুমের সামনে জটলা দেখে চলে এলো।দরজার সামনে দাঁড়াতেই সবার মতো তার-ও একই অবস্থা হলো।মনে জাগলো একই প্রশ্ন।সন্দেহের দৃষ্টি ফেললো ফুপুমনির দিকে।তবে না তিনিও ঢ়েনো তার মতো অবাক নজরে হা হয়ে নিভানের রুমের পানে তাকিয়ে আছে।তবে ব্যাপারটা কি?দাদাভাই এতো রেগে গেলো কি নিয়ে?
নীহারিকা বেগম ফের ডাকলেন।
‘নিভান
নিভানের এতো সময়ের বুঁজে থাকা ক্ষোভিত মন মায়ের ডাকে শান্ত হলো ঠিকই তবে সহসা চোখ খুললো না সে।বিষাদে টলমলা হরিণী চোখগুলো আবারও দুনয়নে ভেসে উঠছে তার।নিজ স্বার্থে মেয়েটাকে কাঁদিয়েছে সে!
আর তার কারনেই বিষাদে ছেয়ে গেছে ওই মায়ময় দুনয়ন।উফফ,চোখগুলো বারংবার ভেসে উঠছে মানসপটে আর সবকিছু শেষ করে দিতে ইচ্ছে করছে। সব জায়গায় এতো এতো ধৈর্য সহ্যর পরিধি ঠিক রাখতে পারলেও,ওই মেয়েটার বেলায় কেনো রাখতে পারলো-না।না গিয়েছে তাকে দেখতে?সে তো বলেছিলো যেতে চেয়েছিলো,হয়তো পরিস্থিতিতে পড়ে যেতে পারিনি।সেটা বুঝে হোক বা অবুঝে,মন কেনো মেয়েটার বেলায় এতো ধৈর্য্যহীন,অবুঝ হয়ে পড়লো।কেনো?ওই মেয়েটা তারজন্য কেঁদেছে আর কাঁদছে-ও।
উফফ!
‘দাদুভাই।
ফাতেমা বেগম ডাকলেন।এবার চোখ খুলে ফেললো নিভান।সামনের দেয়ালেন ভাঙা আয়নার নজর পড়তেই মায়ের স্পষ্ট মুখ দেখতে পেলো,পাশে আরও একজনকে নজরে পড়লো তার।তবে পুরোপুরি নয়।তার কাঁধের ওড়নার অংশ।বুঝতে অসুবিধা হলো-না, ওটা কৌড়ি।মন আবারও কারণবশত জ্বলে উঠলো।একটু আগের বুঝদার মন আবার অবুঝপনার খেলায় মাতলো।কেনো,কৌড়ি তাকে গ্রাহ্য করবেনা।পরিস্থিতি যেমনই থাকুক,তার কাছে কেনো যাবে-না?যদি সে মরে যেতো তবে ওই মায়াময় মুখটা দেখার তৃষ্ণা তো তার রয়েই যেতো।এটাই অপরাধ ওর।ভাঙা আয়নার পানে দৃষ্টি অনড় রেখে গম্ভীর, ঠান্ডা গলায় বললো।
‘দাদুমা প্লিজ।আমাকে একটু একা থাকতে দিন।প্লিজ দাদুমা।
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন বৃদ্ধা।নরম গলায় বললেন–
‘ঘরের এই অবস্থার মধ্যে তুমি চলবে ফিরবে কিকরে?
‘আমি একটু পরে রানীসাহেবা ডেকে গুছিয়ে নেবো।
গম্ভীর কন্ঠস্বর।ছেলের পেট থেকে কিছু বের করতে পারবেন না,বেশ বুঝলেন নীহারিকা বেগম।তবু্ও কেমন থমকে দাঁড়িয়ে রইলেন।ইভান এসে মায়ের পাশে দাড়ালো।ফের চোখ দিয়ে আশ্বস্ত করলো,সে দেখছে।ফের ছোটো চাচিকে ইশারা করলো,মা’কে নিয়ে যেতে।স্বান্তনা রহমান ইশারা মেনে,নীহারিকা বেগমের হাত ধরে নিয়ে চলে গেলেন।উনাার পিছুপিছু চলে গেলেন ফাতেমা বেগম আর ডালিয়া বেগমও।যেতে যেতে অদ্ভুত দৃষ্টিতে কৌড়িকে দেখে যেতে ভুললেন-না।কৌড়িও যেনো দাড়িয়ে থাকার সাহস পেলোনা আর।চঞ্চলা পা সহসা বাড়িয়ে চলে গেলো।চোখ নোনাজল আসাটা যেনো দাঁতে দাত চেপে কোনো রকম রোধ করে রেখেছিলো এতোক্ষণ সে।মান্যতাও পিছু নিলো কৌড়ির।সবার যাওয়াটা স্বাভাবিক ঠিকলেও কৌড়ির যাওয়াটা কেমন অদ্ভুত ঠিকলো ইভানের।চোখমুখের হাবভাবও ভলো দেখালো-না।পায়ের চলনটা-ও কেমন এলোমেলো ছিলো।
★
পা বাঁচিয়ে বাচিয়ে নিভানের কাছে যেতে যেতে ইভান বললো–কি করেছো কি রুমের অবস্থা!তোমার থেকে এটা আশা করা যায়!আমি হলে, না কেউ প্রশ্ন করতে আসতো আর না বিস্মিত হতো।তুমি আর এসব!মানা যায়?তা কার উপর এতো রেগে রুমের এই বেহাল দশা করলে?
ইভানের মজার ছলে বলা কথাগুলো শুনেও শুনলোনা নিভান।ভিতরে ভিতরে নিজেকে ঠান্ডা করার প্রয়াস চালালো।কৌড়ির চঞ্চল পায়ে চলে যাওয়াটা সে দেখেছে।এবার মনেহলো,রাগটা মাত্রাধিক হয়ে গেছে তার!উফফ!
‘মেয়েটাকে আবার বকেছো নিশ্চয়?আর তার রাগ দেখাচ্ছো নিজের উপর,তাই না?
ইভানের কথার উত্তর দিলোনা নিভান।শুধু পূর্ন দৃষ্টিতে ইভানের মুখপানে তাকিয়ে রইলো।ইভান গিয়ে ধপাৎ করে শুশে পড়লো নিভানের বেডে।হাত ছড়িয়ে বেডে শরীর এলিয়ে দিলেও পা ঝুলছে বেডের নিচে।সেই অবস্থায় হঠাৎ গান ধরলো সে।
‘আমি তোমার দ্বিধায় বাঁচি,আমি তোমার দ্বিধায় পুড়ে যাই।
এমন দ্বিধার পৃথিবীতে আমি তোমাকে চেয়েছি পুরোটাই।
আমি তোমার স্বপ্নে বাঁচি, আমি তোমার স্বপ্নে পুড়ি যাই।
এমন সাধের পৃথিবীতে আমি তোমাকে চেয়েছি পুরোটাই।
ইভানের হঠাৎ গানের গলায় কপাল কুঁচকে তারদিকে অদ্ভুত দৃষ্টি ফেললো নিভান।তারপর গানের শব্দগুলো কেমন যেনো নিজের সাথে মিলিয়ে দেখলো।মন হলো, নিজের পরিচিতি। সব তার নিজের কথা,ভিতরের কথা।
সহসা কপালের ভাজ মিলিয়ে গেলো।পা বাড়িয়ে নিজে গিয়েও ধপাৎ করে শুয়ে পড়লো ইভানের পাশে।সহসা ইভান বললো।
‘আস্তে।ব্যথা পাবে তো।
ব্যথা পেলো,যন্ত্রণা অনুভব হলো শরীরে। তবে সে ব্যথা ভিতরের জ্বলন স্পর্শ করে মন ছুঁতে পারলো-না।সময় নিয়ে বললো।—আমি কি ওকে চেয়ে অন্যায় করে ফেলেছি ইভান?ওর আমার হতে অসুবিধা কোথায়?
‘কাওকে মন থেকে নিজের করে চাওয়াটা অন্যায় কি করে হয়!আর কৌড়ি।ও তো তোমারই।তুমি ভাবছো,ও তোমার হতে চাইছে না?তোমার প্রতি দূর্বল নয় ও,? দূর্বলতা নেই ওর?আমার লাইফের সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতা, মেয়েদের মন যেটা বলে মুখ তার বিপরীত শব্দ আওড়ায়।এটা ওদের চোখের দিকে তাকালে বুঝবে।মানুষের মনের সত্যি মিথ্যা কেনো জানি চোখে প্রকাশ পায়।ওইযে বলে-না মেয়েদের বুক ফেটে যাবে কিন্তু মনের কথা মুখে সহজে প্রকাশ করবেনা তারা।তবে এসব বলছো কেনো?সত্যিই কি তুমি কৌড়ি-কে বকেছো?
উত্তর দিলোনা নিভান।সময় নিয়ে ফের নিজের মতো বললো–আচ্ছা আমি যদি মরে যেতাম।ও কি একবারও দেখতে যেতো না আমাকে?
রাগ অভিমানের শুরু কোথা থেকে এবার বুঝি ইভান ধরতে পারলো।পাশ ফিরে একপলক পাশে শোয়া মানুষটাকে দেখে নিয়ে মৃদু হাসলো।প্রিয় মানুষটার এক্সিডেন্ট।বাড়ি,হসপিটাল।হসপিটালের বিভিন্ন ঝামেলা সামলাতে সামলাতে বিশেষভাবে কৌড়ির কথাটা মাথায় ছিলোনা।হসপিটালের মোটামুটি বাড়ির সবার যাওয়া আসা চললেও,কৌড়ির যে একবারও সেখানে পা পড়েনি।আর সেটা নিয়েই তবে তার দাদাভাই ক্ষেপেছে!রুমের এই ছেলেমানুষী লন্ডভন্ড তছনছ কাহিনী করে চলেছে।এই বুঝি তার আগের সেই দাদাভাই!কাওকে মন থেকে পাওয়ার তীব্রতা বুঝি ব্যাক্তিত্ববান মানুষটাকেও বুঝি ব্যাক্তিত্বহীন করে দেয়?
ছেলেমানুষী বানিয়ে দেয়?আশ্চর্য।এতো শক্তকঠিন ব্যাক্তিত্বপূর্ন দাদাভাইও, সেই চাওয়ার কাছে হার মেনে গেলো।
‘এতো অভিযোগ?এতো অভিমান?তুমি ওকে পেয়ে গেলে কলিজায় লুকিয়ে রাখবে দেখছি!
এবারও উত্তর দিলোনা নিভান।চোখ বুঁজে নিলো।বদ্ধ নয়নে ভেসে উঠলো,মায়া-মায়া সেই টলমলানো হরিনী নজর।গোলগাল ফর্সা লালাভ মুখ।তাকে কৈফিয়ত দেওয়ার জন্য বলতে যাওয়া কাঁপানো ঠোঁট।ওই বিষাদ নজর,লালাভ মুখ,কাঁপানো ঠোঁট।সব তার কথার ব্যথায় অস্বাভাবিক হয়েছে।কষ্ট দিয়েছে সে মেয়েটাকে!ভিতরের জ্বলনটা আবারও দপদপ করে উঠলো।তবুও নজর খুললো না। ইভান ফের বললো।
‘ও পরিস্থিতির স্বীকার। ওর উপর রাগ দেখিয়ে লাভ আছে?তুমি ওর পরিস্থিতিটা বুঝবেনা?বাড়ির সবাই তো আর আমার মতো জানেনা,ওই মেয়েটাতে তুমি কি অনুভব করো।সে তোমার কি!জানলে নিশ্চয় তোমার কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করতো।জানে-না বলে,ভেবেছে ওর হসপিটালে গিয়ে কাজ কি?আর ও-ও হয়তো কাওকে বলতে পারি-নি নিজের মনের কথা,তোমাকে দেখতে যেতে চায়।ওকে তো তুমি ভালো করেই চেনো এবং জানো।তবুও অভিযোগ কেনো?
কন্ঠ শান্ত অথচ স্বরে অভিমান ভরা।–ওর কাছে ফোন ছিল ইভান।আর সেই ফোনে আমার নাম্বারটাও ছিলো।যেটা আমি নিজ হাতে সেভ করে দিয়েছিলাম।ও আমাকে একটা ফোন দিতে পারতো না?পারতো না?
শান্ত গলায় কথাগুলো বললেও,কথার মধ্যে যেনো হাজার আকুলতা,অভিমানে টইটম্বুর।তবু-ও কৌড়ির হয়ে সাফাই গাইলো ইভান।
‘তুমিতো ওকে খুব ভালো করে এতোদিনে জেনে গেছো দাদাভাই।মেয়েটা কেমন স্বভাবের।আর জেনেবুঝে-ও অভিযোগ করবে?
‘জানিনা ওকে জেনেশুনেও কেনো ওর প্রতি অভিযোগ জন্মালো।ও বলেই হয়তো অভিযোগ।ও হসপিটালে যেতে পারিনি,ঠিক আছে।কিন্তু ,আমাকে তো একটাবার ফোন দিতে পারতো?আমার ভালোমন্দ জানার প্রয়োজন ছিলোনা।শুধু একটা বার ফোন দিতো।আমি ওর উপস্থিতি হোক বা ফোনকলের অপেক্ষায় ছিলাম ইভান।ও কেনো একটু বুঝলো না, আমার দূর্বলতা।আমার একটুখানি ওকে দেখার তীব্রতা!আমি যখন এক্সিডেন্ট করলাম,আমার মনে হচ্ছিলো।আমার বুঝি ওর কাছে আর কখনো ফেরা হবেনা।সেই তৃষ্ণা নিয়েই আমি মরতে মরতে বেঁচে গেলাম।তারপর বেঁচে গিয়েও, ও কি আমাকে একটু একটু করে মেরে ফেলার চেষ্টা করছে-না?
‘হাম তেরি মোহাব্বতমে ইউ পাগল রেহতি-হে,
‘দিয়াওনাভি আব হামকো দিয়াওনা কেহতা-হে।
মজার ছলে দারুণ কন্ঠে গানের কলিজোড়া গেয়ে উঠলো ইভান।ফের ঠোঁটে চমৎকার হাসি ফুটিয়ে পাশ ফিরে তাকালো নিভানের পানে।নিভান তখনো চোখ বুঁজে। ইভানের গানের শব্দগুলো তাকো উল্লেখ্য করে গাওয়া বুঝতে অসুবিধা হলোনা।প্রতিক্রিয়া দেখালো না সে।সেভাবেই চুপচাপ চোখ বন্ধ করে পড়ে রইলো।অনুভব করার চেষ্টা করলো,নিজের মধ্যে অন্য কারও অস্তিত্বকে।ইভান খেয়ালী নজরে বেশ কিছুক্ষণ নিভানকে পর্যবেক্ষণ করে চঞ্চলা গলায় বললো।
‘দু’দিন পর মেয়েটার পরিক্ষা।এমনিতেই প্রেশারে আছে।সারাদিন তাকে বইয়ের টেবিলে ছাড়া দেখা যায়না।আর আমার অতি ধৈর্য্যশীল,বুঝদার দাদাভাই,তার পাগলামী মেয়েটার উপর প্রয়োগ করে মেয়েটার প্রেশার দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে!মানা যায়?তুমি অবুঝপনা করেছো? সত্যি মানতে পারছিনা!
নিভান এবারও উত্তর দিলোনা। চুপচাপ সেভাবেই রইলো।ইভান-ও আর কথা বাড়ালো-না।সে-ও নিশ্চুপ হয়ে গেলো।সময় চললো।নীরবতায় ছেয়ে গেলো বিশাল বড়ো রুমটায়।চারপাশটা কেমন শুনশান নিস্তব্ধতা।বেশ সময় কেটে যাওয়ার পর ইভান উঠে বসলো।বসে থেকেও কিছুসময় ব্যয় করলো।ফের উঠে দাড়ালো।
কাঁচের টুকরো লক্ষ্য করে পা বাঁচিয়ে যেতেযেতে শিথিল গলায় বললো।
‘প্রানপাখি উড়াল দেওয়ার আগে নিজের অনুভূতির কাছে তাকে আঁটকে দাও।না-হলে আমার মতো ভুগতে হবে,পুড়তে হবে।জ্বলতে হবে!এই ভোগ,এই পোড়া,এই জ্বলন,খুব যন্ত্রণার দাদাভাই।শেষ করে দেবে তোমাকে।
চলে গেলো ইভান।হঠাৎ মাথায় যন্ত্রণা শুরু হলো নিভানের।এক্সিডেন্টে মাথায় আঘাতটা লেগেছে বেশি।তবে সেই ব্যথা জেগেছে,নাকি ইভানের কথায় নতুন ব্যথার সৃষ্টি হয়েছে?
★
পূর্ব আকাশে নতুন আরও একটিদিনের সূচনা দিয়ে সূর্য উদিত হোলো।কি অপরূপ তার ঝলমলে রূপ।তেমনই রূপের প্রশংসা পেয়েছে কৌড়িও।অথচ সেই ঝলমলে রূপে যেনো আজ ঘোর আমাবস্যা নেমেছে।ডায়নিং টেবিলে চুপচাপ খাচ্ছে সে।খাচ্ছে কম,হাত দিয়ে খাবার ঘাটছে বেশি।কাল বিকালের ওই ঘটনার পর না ঠিকঠাক মতো গলা দিয়ে খাবার নামাতে পেরেছে আর না বইয়ে মনোযোগ দিতে পেরেছে আর-না দু’চোখে ঘুম নেমেছে তার।ওই চুপচাপ শান্তশিষ্ট মানুষটা শুধু তারজন্য এতো পাগলামি করলো!এতো রেগে গেলো!
কাল যেনো কৌড়ির মনকে ধরেবেধে রোধ করে রাখার সব সীমা ছাড়িয়ে ফেললো।ভাবনায় বিভোর কৌড়ি হঠাৎ সুপরিচিত সুগন্ধে মুখ উচু করে তাকলো।হুম,সেই মানুষটাই।আজ আর কৌড়ির নজর নামলোনা।অনিমেষ চেয়ে রইলো,কপালে সাদা ব্যান্ডেজ জড়ানো শ্যামবর্ণ মুখে।নিভান এসে আশেপাশে না তাকিয়ে চেয়ার টেনে বসলো।শান্ত গলায় ডাক দিলো রানিকে।
‘রানিসাহেবা,আমাকে কফি দিন।
রানির বদৌলে তড়িৎ রানাঘর থেকে বের হয়ে এলো স্বান্তনা রহমান।ব্যস্ত গলায় বললেন—তুই কেনো অসুস্থ শরীর নিয়ে নিচে নেমে এলি।ভাবী,তোর খাবার রেডি করে রেখেছেন।ভাইয়ের খাবারটা দিয়ে এসেই,তবে তোর খাবারটা নিয়ে উপরে যাবেন।তার আগেই চলে এলি?
‘সমস্যা নেই,শরীর ঠিক আছে আমার ছোটোমা।খাবার দিতে হবে-না।এককাপ কফি বা চা হলেই আপতত চলছে।
কন্ঠে কোমলতা মিশিয়ে স্বান্তনা রহমান বললেন–অসুস্থ শরীরে খাবার না খেয়ে এখন চা, কফি খাবি?খাবারটা এখন খুব প্রয়োজন। খাবারটা খেয়ে তারপর না-হয় চা,কফি খা।
নিভানও খুব স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিলো।—খাবার খেতে এখন ইচ্ছে করছেনা ছোটোমা।
‘ঔষধ আছে তো।নরমাল নয় সব হাই-পাওয়ারের।না খেলে চলবে!
‘ খাবারটা পরে না-হয় খাচ্ছি।আপতত আমাকে এককাপ কফি দিন।
স্বান্তনা রহমান আর কিছু বললেন-না।চলে গেলেন।যেতে গিয়ে কিছু একটা খেয়াল করে পিছু মুড়ে কৌড়ির পানে তাকালেন তিনি।অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করলেন।কৌড়ি ঘনোঘনো নজর উঠিয়ে নিভানকে দেখছে।অথচ নিভানের নিরেট দৃষ্টি,তার হাতে থাকা ফোনে।অদ্ভুত!বেশ কয়েকদিন এই বিষয়টা নিভানকে খেয়াল করেছেন তিনি।তখন কৌড়িকে দেখেছে উল্টো।আজ দু’জন দুজনের বিপরীত।ব্যাপার টা কি? চলছেটা কি এদের মধ্যে?মনে প্রশ্ন নিয়ে চলে গেলেন।তিনি রান্নাঘরে ঢুকে দেখলেন,রানী কফির জন্য দুধ অলরেডি বসিয়ে দিয়েছে।এরপর তিনি নিজ হাতে কফি বানালেন।কফি বানানো শেষ হতেই,নিভানের জন্য নির্দিষ্ট করে রাখা মগটায় ঢেলে ট্রে-তে গুছিয়ে দিলেন।রানী সেটা হাতে নেওয়ার আগেই কিছু একটা ভেবে তাকে থামিয়ে দিলেন।রানী প্রশ্নবোধক নজরে তাকাতেই তিনি চোখ দিয়ে ইশারা করে বললেন পরে বলছেন।ফের কৌড়িকে গলা চড়িয়ে ডাক দিলেন।
‘এই কৌড়ি,নিভানের কফিটা একটু নিয়ে যা তো।
খাওয়া থেমে গেলো কৌড়ির।নিভানের পানে আবারও আড়চোখে চাইলো সে।আজ ভুলেও মানুষটা তারদিকে একবারও তাকায়নি।অথচওই মানুষটার দ্বিধাহীন নজর তাকে ঘিরে থাকে।অমাবস্যার ঘোর অমানিশি বুঝি এবার মনের চারধারে ছেয়ে গেলো।স্বান্তনা রহমানের ডাকে উঠার জন্য প্রস্তুতি নিতেই,নিভান ভরাট গলায় বললো।
‘ছোটোমা,কফিটা রানিসাহেবাকে দিয়ে পাঠিয়ে দিন।তাকে খাবার ছেড়ে উঠতে হবেনা।
খুব স্বাভাবিক গলায় কথাটা বললো নিভান।অথচ কৌড়ির কানে সেটা অস্বাভাবিক লাগলো।আর তার চেয়ে অস্বাভাবিক লাগলো, সামনে বসা মানুষটার আচারণ।পলকহীন চোখে নিভানের দিকে চেয়ে রইলো কৌড়ি।অথচ মানুষটার খেয়াল ধ্যান হাতের ফোনেই।ধ্যানতো আর দিকে থাক এটাতো চায়নি কৌড়ি।তবে কেনো মন কাঁদছে।স্বান্তনা রহমান কি বুঝলেন, রানীকে দিয়ে কফি পাঠিয়ে দিলেন।রানী এসে কফি দিয়ে গেলো।সেটা তুলে মুখে নিলো নিভান।অদ্ভুত শান্ত নজরে মাথা নিচুকরে,হাত দিয়ে খাবার ঘেঁটে যাওয়া কৌড়িকে খুব কৌশলে একবার দেখে নিলো।সুক্ষ হাসলো ফের সে হাসি মূহুর্তেই ঠোঁটের ভাঁজে মিলিয়ে নিয়ে মনেমনে আওড়ালো।
‘শাস্তি পাচ্ছো তুমি।একটু সময় দাও আমাকে,অপেক্ষা করো।এই শাস্তির বিনিময়ে নিভান তোমাকে তার নিজের এতো কাছে আনবে,তুমি নিজেই আর দুরত্ব চাইবে-না।তখন এই শাস্তির বদৌলে নিভান তোমাকে এক সমগ্র পৃথিবী সুখ দেবে।অজস্র ভালোবাসায় মুড়িয়ে রাখবে,নিভানের প্রানপাখি।
চলবে…

