#ভালোবাসার_কাব্য_গাঁথবো
৩৫ (খ)
শ্বশুর জামাইয়ের বৈঠক বসেছে। মূলত তানভীরকে খোঁজে বের করে জোর করে ইসমাইল সামনে বসিয়ে রেখেছে। তানভীরের মতি গতি ইসমাইল বেশ বুঝতে পেরেছে। সেও একদিন তানভীরের বয়সী ছিল। লাবিবার শরীর খারাপ করছে ইসমাইল দেখেই বুঝতে পেরেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব লাবিবাকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেই শ্বাস পড়ে। তানভীরের উদোম গা দেখে ইসমাইল বেশ বিরক্ত হলো। বুকে পিঠে আচড়ের দাগ। ছেলেটা চাইছে টা কি? নির্লজ্জপনা দেখাচ্ছে। বাকি কথা রেখে ইসমাইল আগে এটাই জিজ্ঞেস করলো,
” তোমার কি শার্ট নেই আব্বু? ”
” আছে। কিন্তু ট্রাস্ট মি আব্বু, আপনার মেয়ে বাড়িতে আছে বলে একটাও পরতে ভালো লাগছে না। ”
ইসমাইল মনে মনে একটা বিচ্ছিরি গালি দিলো। কিন্তু মুখে হাসি হাসি ভাবটা ধরে রেখে বললো,
” কোনটা ভালো লাগবে আমাকে বলো। আমি পাঠিয়ে দিবো। ”
“আমার জন্য এতো কষ্ট করতে হবেনা আব্বু। আপনি লাবিবাকে রেখে যান। ও একটু সুস্থ হোক আমি ওকে নিয়ে যাবো। ”
মূল কথায় আসতেই ইসমাইল কোমড়ে হাত রেখে তানভীরের দিকে ঝুঁকে বসলো।
” তুমি আমার মেয়ের গায়ে হাত তুলেছো। সাহস কি করে হয়? আমার মেয়ের গায়ে আমি ফুলের টোকা অব্দি কখনও পড়তে দিই নি। আমার মেয়ে যতই ভুল করুক তাকে শুধরে নিয়েছি বার বার। আর তোমার হাতে তুলে দিতে না দিতেই গালে দাগ বসে গেল। মেয়ে আমার মাথা ঠেকিয়ে রাখছে সব সময়। তোমার থেকে আমি এটা কখনও আশা করিনি তানভীর। আর যাই হোক এটা বিশ্বাস ছিলো তোমার হাতে অন্তত আমার মেয়ে সেফ থাকবে। ”
নিজের কৃতকর্মে তিরষ্কার পেয়ে মাথা নিচু করে থাকলো তানভীর। ইসমাইলের আরো রাগ বাড়ল।
” তোমাকে আমার মোটেও মেয়ের পাশে পছন্দ নয় তানভীর। তুমি জানো তার যথেষ্ট কারণ আছে । তবুও তুমি আমার মেয়ে জামাই। আমার মেয়ে আমার একমাত্র অবলম্বন। আমি চাই তুমি আমার মেয়েকে হ্যাপি রাখো সব সময়। কিন্তু তুমি নিজের রাগ সংবরণ করতে পারলে না? নিতু আপার থেকে শুনে তোমার প্রতি বিশ্বাস ভেঙে গেছে তানভীর। তুমি যতই আমার মেয়ের হাজবেন্ড হওনা কেনো মেয়ে কিন্তু আমার।আমি আমার মেয়েকে পুতুলের মতো করে বড় করেছি। মেয়ের যাতে অসুবিধা না হয় সেজন্য প্রতিটা পদক্ষেপ হিসাব করে ফেলি। কিন্তু এবার তো মনে হচ্ছে হিসাবটা কষা ঠিক হয়নি। ”
শ্বশুরের কথা শুনে তানভীর নির্দিধায় নিজের ভুল স্বীকার করে। প্রমিজ করে,
” এরকম ভুল আর হবে না আব্বু। আমি সব ঠিক করে দিবো। ”
” আমার মেয়ে ভয় পেয়ে আছে তানভীর।”
তানভীর ভাবে। তাইতো কথা তো বলেনি। এতো এতো কথা বলা মেয়েটা চুপচাপ হয়ে গেছে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কোনো একটিভিটিসও দেখায় নি।
সত্যিই ভয় পেয়েছে?
” ঐ ছেলেটাকেও হসপিটালে পাঠিয়ে ছেড়েছো। ওর বাবা যা নয় তা বললো। আমি চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়ে এসেছি। তোমার পাপার কানে কথাটা যায়নি। তুমি কন্ট্রোললেস এটা প্রায় সবাই জানি। আমার মেয়ে জানে না। ওর হার্ট দুর্বল। ওর সামনে ওভার কিছু করবেনা। ”
” ছেলেটাকে আপনার মেয়ে সুযোগ করে দিয়েছিলো আব্বু। ধীরে ধীরে ব্রেইন ওয়াশও করতো। আপনি তো আমার কথা বিলিভ করেননি। ”
” হুম। তবে এরকম একটা কাজ না করলেও পারতে।”
” কি করবো আব্বু? বয়সটা তো আমার একটু বেশি। ”
জায়গা মতো খোটাটা ঠিকই দিয়ে দিলো। এই ছেলেকে কিছু বললেও যেন দোষ! ইসমাইল অন্য দিকে মুখ ঘুরায়।
ফিরোজ খান বের হবেন। তানভীর , ইসমাইলকে দেখে এদিকেই আসছেন। জবেদা এসে দাঁড়ায়। হাতে ল্যাভেন্ডার কালার টি শার্ট। তানভীরের দিকে এগিয়ে দিয়ে জানায় লাবিবা পাঠিয়েছে। লাবিবার কথা শুনে তানভীর টি শার্ট পড়ে নেয়। কিচেনের সামনে লাগানো গ্লাসে চোখ রাখে। বাহ! হুয়াইট থ্রি কোয়ার্টার এর সাথে ল্যাভেন্ডার টি শার্ট বেশ মানিয়েছে তো। ড্রেস সেন্স নিয়ে বরাবরই খুঁতখুঁতে তানভীরের এই প্রথম এক চান্সে নিজেকে ভালো লাগলো। ফিরোজ খান এসে বললো,
“বেয়াইসাহেব আজ থেকে যান। একটা রাত মেয়ের বাড়ি থাকলে কিছু হবেনা।”
” মেয়েই তো তুলে দিলাম না বেয়াই সাহেব। আগে মেয়ে তুলে দেই তারপর এসে থাকা যাবে। ”
” হ্যা সেটাই। মেয়ের বাড়ি মানে বাবার ও বাড়ি। একসাথে থাকবো। কোনো না শুনছি না।”
” সেতো অবশ্যই । অবশ্যই। বিকেল হয়ে আসছে। এবার তাহলে মেয়েকে নিয়ে বেরোই। ”
তানভীর নাকচ করে বসলো ।
” পাপা লাবিবা এখানেই থাকবে। ঐ বাড়িতে একা একা আমি আর পাঠাচ্ছি না। ”
নিতু ইসলাম এসে শুনে ধমক দিলো,
” চুপ থাকো বেয়াদব। হুট করেই এরকম একটা কান্ড ঘটিয়েছো। এখনো বাড়ির বউ কে তুলে নিয়ে আসা হয়নি। বরণ করে চৌকাঠ পেরোনো হয়নি। জেদ করে নিয়ে আসলে লোকে শুনলে কি বলবে?”
সোহানা ইসলাম ও মুখ খুললো।
” তানভীর এতো পাগল হয়েও আমি যেখানে চুপ করে আছি অপেক্ষা করছি তখন তোমার বোঝা উচিত। কে জানে তোমাদের বিয়ের কথা? সবাইকে জানিয়েই বউ ঘরে তুলবো। তাছাড়া এ পরিবারের নিয়ম তুমি জানোনা? বউ তুলে আনার আগে বাড়ির বউ এ বাড়িতে পা রাখে না। সেখানে একটা রাত এলাও করেছি। ”
” প্লিজ মম। তোমার দাদী শ্বাশুড়ী কি নিয়ম বলে গেছে সেই নিয়ম ধরে টেনো না। এসব সব ভ্যালুলেস নিয়ম আমি মানি না। ”
” জেদ করে না তানভীর। এই কথা তোমার প্রতিষ্টানে এখন পাবলিশ হলে পাঁচজনের হাসির খোরাক তুমিই হবে। এমনিতেই তোমাদের মাঝে অনেক ডিস্টেন্স তার উপর স্যার স্টুডেন্ট এর ব্যপারটা নিয়ে মাতামাতির অন্ত থাকবে না। এই সম্পর্ক ঘুচুক। আর একটা বছর ওয়েট করো। ”
” মম আমার গ্ৰামে যেতে প্রব্লেম হয়। এটা কেনো বোঝো না?”
” ম্যানেজ করে নাও বাবা। নিতু বউমাকে নিয়ে আয়। ”
তানভীর যা বোঝার বুঝে গেলো। এরা কিছুতেই লাবিবাকে রেখে যাবে না। নিতু ইসলাম লাবিবাকে আনতে গেলে সোহানা বললো,
” বউমা রেসপন্স করলে আমি ম্যানেজ করার চেষ্টা করতাম। কিন্তু বউমাই থাকতে চাইছে না। ”
তানভীরের মুখটা বড্ড অসহায় দেখালো। ফিরোজ খান বলে গেলো, “আমি যাওয়ার পথে ড্রপ করে দিবো। ”
ইসমাইল সেখানে বসেই মেয়ের জন্য অপেক্ষা করল। সোহানা কিচেনের দিকে ছুটল। উপস্থিত শুধু ইসমাইল এবং তানভীর। দুজনের মধ্যে নিরবতা চললো। তানভীর কিছু একটা নিয়ে গভীর ভাবে ভাবলো । ইসমাইল কে জিজ্ঞেস করলো,
” চরের জমিগুলো শুনলাম বিক্রি করে দিচ্ছেন?”
” হুম। প্রয়োজন নেই। এতো দিক সামাল দিতে পারিনা। বিক্রি করার পর থানার ভেতরের বাড়ির কাজ ধরবো।”
” থানার ভেতরে বাড়ির কাজটা অফ আছে অফ ই রাখেন। কাচারিপাড়ায় যে নয় শতাংশ জমিটা আছে সেখানে কাজ ধরেন। তিনতলা ফাউন্ডেশন দিয়ে দুতলা কমপ্লিট করে রাখেন। এখান থেকে বিশ মিনিটের হাঁটার রাস্তা। সুবিধা হবে আব্বু। ইচ্ছা করলেই যেখানে ইচ্ছা সেখানে মেয়ের সাথেই থাকতে পারবেন। বাড়ির ভেতরকার ডেকোরেটটা অনেকটা এবাড়ির মতো করতে চাই। যাতে আমার ফ্যামিলির কারও কোন প্রব্লেম না হয়। দু বাড়িতে মিলেমিশেই থাকতে পারে। লাবিবা চলে এলে আপনাদের একা রাখতে চাইছি না আব্বু। কাকাদের বাসাও অনেকটা দূর। রিস্কের হয়ে যায়। টেনশন নিতে চাইছিনা। ”
” ঐ বাড়িটার অর্ধেক কাজ হয়ে আছে। ”
” থাক। পরে কমপ্লিট করা যাবে। আগে সদরে কাজ ধরুন। ক্যাশ যদি শর্ট পরে আমি তো আছিই। আফটার অল আপনিতো এটা অস্বীকার করতে পারবেন না বাড়ীটার মালিক আমিই। ”
তানভীরের প্রস্তাবে ইসমাইল মৃদু হাসলো। ভালো লাগলো। আসল উত্তরাধিকারীর মতো কথা! এতো দিন ভাবনা ছিলো জামাই তার সম্পদের প্রতি উদাস হবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে জামাই নিজে থেকেই সবটা নিজের ভেবে নিয়েছে। ইসমাইলের আর নিজে থেকে আগ্ৰহ দেখাতো হলো না। ইসমাইল মাথা ঝুকালো।
” হুম। রাস্তার পাশে ফসলি জমিগুলো একসময় তোমাকে দেখিয়ে দিবো। সিদ্ধান্তটা তুমিই নিবে। মেইন প্লটের জায়গা আশেপাশে বড় দালানকোঠা হচ্ছে। যদি মনে হয় বিল্ডিং করবে তাহলে করো। বেশ ভাড়া চলবে।”
” কতটুকু জমি হবে আব্বু?”
” চার একর দুই কাঠা হবে।”
” অনেক! আমার বিল্ডিং অনেক থাকলেও ফসলি জমি নেই। ফসল ই হোক। ফ্রেশ খাবার পাওয়া যাবে। জমিটা কি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া? আমার দাদা শ্বশুড়ের?”
” ছিলো। এখন তোমার আম্মু আর লাবিবার নামে দলিল করে দিয়েছি।”
আলোচনার মাঝেই লাবিবা এসে দাঁড়ায়। ফিরোজ খান গাড়িতে অপেক্ষা করছে। তানভীর সহ সবাই যায় লাবিবাকে গাড়িতে তুলে দিতে। লাবিবা গাড়িতে উঠে বসলে তানভীর একপাশে ছড়িয়ে নেওয়া উড়নাটা গুটিয়ে নিয়ে কোলের উপর তুলে হাতের ভাঁজে গুঁজে দেয়। ঠিকঠাক ভাবে সিটবেল্ট লাগিয়ে বসে লাবিবা তাকায় তানভীরের পানে। তানভীর আগে থেকেই তার দিকে তাকিয়ে আছে। দৃষ্টির পলক নেই। চোখে চোখে বলা হয় হাজারো কথা। তানভীর মুখটা একটু এগিয়ে নেয়। মৃদু স্বরে রাগ ঝাড়ে
” নিষেধ করেছিলাম। করিনি?”
লাবিবা মাথা ঝুমায়। নিষেধ করেছে।
” না করলেনা কেনো?”
লাবিবা মুখে এঁটেছে। উত্তর দিবে না। তানভীর ঘাড়ে হাত দিয়ে একটা মোচড় দেয়। কট করে শব্দ হয়।
” যাচ্ছো যাও। পৌঁছেই ফোন দিবে। খান সাহেবের বউ অবাধ্যতা করলে খান সাহেব কিন্তু বউকে দিন রাত উপোস করাবে,একটুও আদর খাওয়াবে না। ”
চলবে___

