ভালোবাসার_কাব্য_গাঁথবো (৩৬)

0
1344

#ভালোবাসার_কাব্য_গাঁথবো

(৩৬)
দুদিনের জ্বরে কাহিল লাবিবা। লাবিবার জ্বরের খবর পেয়ে ফ্লোরা এসেছে লাবিবাকে দেখতে। লাস্ট লাবিবার সাথে কথা হয়েছিলো চার দিন আগে। এরপর থেকেই মেয়েটা লাপাত্তা। ফোন করেও পাওয়া যায়নি। আজ খোঁজ নিয়ে জানতে পারে ফাহাদ সহ যাবতীয় ব্যপারটা। ফ্লোরা এ শহরে এই আসে এই যায়। কর্মক্ষেত্রের জন্য বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। কিন্তু গিয়ে টিকতে পারেনা। দু তিন দিন হলেই ছটফট করে আবার ফিরে আসে তার ছোট্ট ফ্ল্যাটে। এখানে থাকলে তামিমের সাথে না থাকুক। দিন একবার হলেও তো দেখতে পারে। চোখের তৃষ্ণা মেটানো যাকে বলে। যদি চায় কাছে গিয়ে কথাও বলতে পারে। হসপিটালের সবাই এখন প্রায় ফ্লোরাকে চিনে। ফ্লোরার তামিমের কাছে যেতে অনুমতি নিতে হয়না। পরিচয় জিজ্ঞাসার্থে তামিম জানিয়েছে ফ্লোরা তার ওয়াইফ। এক্স শব্দটা মনে হয় উচ্চারণ করা হয়নি। তাইতো ফ্লোরাকে কেউ কেউ মেম,কেউ কেউ ভাবী বলেই ডাকে। যদিও ফ্লোরাকে দেখেনি তারা। সব সময় মাস্ক ক্যারি করে। ফ্লোরা যখন দূরে থাকে তখন দম বন্ধ হয়ে আসে। যখন কাছে আসে তখন ছটফট করতে থাকে। আগে অনেক ফ্রেন্ডস, সিনিয়রের সাথে ভালো রিলেশন থাকলেও ফ্লোরা ইদানিং সবার থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। টাকা খ্যাতি তাকে সুখ দিতে পারেনি। সুখ দেয় তামিমের কন্ঠস্বর, তার উপস্থিতি। লাবিবাকে পেয়ে তার বেশ ভালোই কাটে। ফ্লোরা বিভিন্ন কথায় লাবিবাকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করে ‌। খারাপ খারাপ কথা বলে যাতে লাবিবা রেগে যায়। নিজের যে একটা সুপ্ত রাগ রয়ে গেছে তানভীরের প্রতি সেটাও লাবিবার উপস্থিতিতে ফ্লোরা বুঝতে পেরেছে। সব কিছু মেনে নেওয়া ভুলে যাওয়া মেয়েটা জানতোই না এ কথা। সেটাও এখন পড়ে গেছে। তানভীর যে তার জীবনে কি এটা ফ্লোরা কোনদিন অস্বীকার করতে পারবেনা। তানভীর হচ্ছে ফ্লোরার জীবনে লাকি চার্ম। ফ্লোরা যখন যা চেয়েছে তানভীরের জন্যই সম্ভব হয়েছে। এখনও ফ্লোরা যা চায় তানভীর ছাড়া সম্ভব নয়। জীবনের প্রত্যেকটা মোড়ে মোড়ে যখন এই একটা ব্যক্তির আঙুল ধরে দাঁড়াতে হয় তখন তাকে কোন স্থানে বসাতে হয় ফ্লোরা জানে। আর সেই ব্যক্তির একটা মাত্র হৃদয়হরিনী, সুখ লাবিবা নামের এই মেয়েটি। তার জীবনের দুঃখ কষ্ট গুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখা তো তার কর্তব্য। ছোট্ট মেয়েটার দিক নির্দেশনা দিতে গিয়ে তাঁকে কত খারাপ খারাপ কথা বলতে হয়েছে সে জানে। তবুও মেয়েটা তার কাছ ছাড়েনি। কি পেয়েছে? পেয়েছে কিছু খুঁজে? আজ লাপাত্তা হবার কারণ টা জানার পর তো তাই মনে হচ্ছে। এর ভেতরেও কিছু ঘটে।

ফ্লোরাকে দেখে সাবিনা বেশ অবাক হয়। ছোট খাটো প্রায় জনপ্রিয় মুখ ফ্লোরা। এতবড় মাপের একজন মডেল তার বাড়িতে হটাৎ! লাবিবার কথা জিজ্ঞেস করতেই হুস ফেরে। মেয়ে তার সোস্যাল মিডিয়ায় ছোট বড় ভালোই লোকজনের সাথে আলাপচারিতা আছে তার উপর ফ্লোরার অভিনয়ের ফ্যান বলা চলে। এইতো বছর পাঁচেক আগে যখন ফ্লোরার প্রথম টেলিফিল্ম বেশ জনপ্রিয়তা পেলো তখন লাবিবা খুশিতে বাকবাকুম হয়ে জানালো, ” জানো মা? এই মেয়েটা আমাদের জেলার মেয়ে। কী সুন্দর দেখতে! কী সুন্দর অভিনয়!”
সত্যি নিজ জেলা থেকে বড় মাপে কেউ পৌঁছলে তার প্রতি আলাদা একটা টান থাকে। সাবিনা লাবিবার অসুস্থতার কথা বলতে বলতে লাবিবার রুমে নিয়ে আসে ফ্লোরাকে। লাবিবা শুয়ে আছে। সাবিনা ডাকে। ফ্লোরা এসে কপালে হাত রাখতেই লাবিবা চোখ মেলে তাকায়। না এখন আর জ্বর নেই। লাবিবা ফ্লোরাকে দেখে অসুস্থ মুখেই মিষ্টি একটা হাসি দেয়। ফ্লোরা নিজস্ব ধরনেরই বলে, ‘ স্ট্রং মানুষের নারী এতো দুর্বল! বিছানা নিয়েছে দেখছি।”

লাবিবা উত্তর করে না। ফ্লোরাকে বেশ ভালো করেই চিনেছে। বাঁকা কথা লাবিবাকে না বললে যেনো লাবিবা কষ্ট পায়! লাবিবা মনে মনেই হাসে। উঠে বসে খাটের বোর্ডে হেলান দেয়।
” আপু। বসো।” ফ্লোরা তার পেছনে সোফায় একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। পা বাড়িয়ে এসে কম্বল একটু সরিয়ে লাবিবার পাশেই বসে।
সাবিনা বলে, ” তোর ফ্লোরার সাথে আলাপ আছে আমাকে একদিনও তো বললি না? এখানে যে আসছে সেটাও তো বললি না। ”

” আমিই জানতাম না।”

” কথা বল। আমি নাস্তার ব্যবস্থা করছি। তোর কাকীদের ফোন লাগাই। খবরটা দেই। ফ্লোরা মা তুমি কিছু মনে করোনা। একটু বসে যেও হ্যা?”

” আমার তাড়া নেই আন্টি। আপনার হাতে খেয়েই যাবো। ব্যস্ত হবেন না।”

” আচ্ছা আচ্ছা। ”
সাবিনা দরজায় পা রাখতেই লাবিবা ডাকে,
“আম্মু।”

” হ্যা বল।”

” কাকী দের বলো ফ্লোরা আপু তামিম ভাইয়ের ওয়াইফ। আমার জা।”

” কিন্তু _”
লাবিবার হাস্যজ্জ্বল মুখে দেখে সাবিনা চুপ হয়ে যায়। ফ্লোরার দিকে তাকিয়ে হাসে। তারপর নিজ কাজে চলে যায়। লাবিবার হাসিতে ফ্লোরার মুখের উপর কালো ছায়া পড়ে। বিনয়ী ভাবটা দূর হয়ে গম্ভীর হয়। সেই প্রসঙ্গে আর যায়না।
” শুয়ে আছো কেনো? হাঁটাহাঁটি করো। জ্বর তো নেই দেখলাম। একটিভ থাকো। শুয়ে থেকে যদি শরীরকে বুঝতে দাও তুমি অসুস্থ তাহলে শরীর আরো পেয়ে বসবে। ”

” এতোক্ষন ড্রয়িংরুমেই ছিলাম। দিনে তেমন জ্বর থাকেনা। রাতে গা কাঁপিয়ে জ্বর আসে। দুটো কম্বল চাঁপা দিয়েও হয়না। ”

” তানভীর জানে?”

” না। কথা হয়নি তার সাথে।”

“কেন? তুমি তো ওদের বাসায় থেকে এলে। লাবিবা সব তো মিটমাট হয়ে গেছে তাইনা?”

ফ্লোরার চোখে মুখে সন্দেহ। আবার জিজ্ঞেস করে,
” হয়নি? এখন প্লিজ এটা বলোনা এতো কিছু করেও তানভীরকে বাঁকাতে পারোনি। ”

ফ্লোরা অধৈর্য্য হয়ে উঠে লাবিবার চুপ থাকাতে।‌ লাবিবার ফেসটা কাঁদো কাঁদো হয়ে উঠে। অভিমানী সুরে প্রশ্ন করে, ” তুমি কেনো আমার সাথে এমন করলে আপু? উনি সত্যিই আমাকে খারাপ ভেবেছে। ”

” তো কি ভালো হয়ে থাকতে চাও? জীবনে যদি ঐ ঘাড়ত্যাড়ার ভালোবাসা পেতে। তানভীর তোমাকে ভালোবাসে নি? এই লাবিবা বলেনি লাবিবা ভালোবাসি? অস্থির লাগছে উত্তর দাও। আমিতো ভেবেছি প্ল্যান কাজে লেগেছে। এখন তুমি আমাকে আশাহত করোনা প্লিজ। খান বংশের সব গুলা লোকের ঘাড় ত্যাড়া। পাগলের ডাক্তার এই বংশের না হলে সেই কবেই আমাকে নিজের কাছে নিয়ে নিতো। ব্যাটা এখনও ত্যাড়ামী করে যাচ্ছে। ”

ফ্লোরার ছটফটানো দেখে লাবিবা আলতো ভাবে কাঁধ থেকে জামাটা নামিয়ে দেয়। আবার সাথে সাথেই তুলে নেয়। গালে ফুটে উঠে লজ্জা আভা। ফ্লোরা কি বলবে খুঁজে পায়না। খুশিতে উঠে এসে হালকা করে লাবিবাকে জড়িয়ে ধরে। লাবিবা ফ্লোরার কাঁধে মাথা রেখেই তার নামে অভিযোগ জানায় ” তুমি বলোনি কেন তোমার দেবর একটা রাক্ষস?”

” আমি কিভাবে জানবো? তুমি যদি তোমার ভাসুরের কথা জিজ্ঞেস করো তাহলে আমি বলতে পারি সিমিলারিটি আছে। তোমার শ্বশুড়ের কথা বলতে চাইছিনা। ঐ বাড়ি যাও দুই দিনেই বুঝে যাবে। ”

” কেন? ”

” বউ ছাড়া তারা কিছুই বুঝে না। এটা একেবারে হাতে কলমে প্রমাণিত। কিন্তু এটা বুঝতে পারছি না এরকম একটা মমেন্ট পার করার পরেও তানভীরের সাথে কেনো তোমার কথা হচ্ছেনা? ”
লাবিবা ফ্লোরাকে ছেড়ে বসে।

” ফোন দিতে বলেছিলো। আমি দিইনি। মনে ছিলো না। গতকাল কল করেছিলাম বললো টাঙ্গাইল গিয়েছে কে যেনো মারা গিয়েছে জানাজায় অংশগ্ৰহন করতে।এটুকুই কথা হয়েছে। আর কোনো কথা হয়নি। ”

” ফিরেনি?”

” জানিনা তো। ”

” তুমি অসুস্থ। জানাও নি?”

” না।”

” আমি জানিয়ে দিচ্ছি। ”

“কি বলবে? না না বলোনা আমার উপর রেগে আছে।”

“তো রাগ ভাঙাও।”

ফ্লোরা তানভীরকে কল করে কিন্তু কলটা রিসিভ হয় না। ছোট্ট একটা এস এম এস পাঠিয়ে দিয়ে লাবিবার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে।
” তোমার এতো রাগ কেন আপু উনার উপর?”

” রাগ নাতো। ”

” তাহলে এতো কঠিন কেন? ”

” কারণ আমি ভালোবাসা বঞ্চিত একজন মানুষ। তোমার মনে প্রশ্ন জাগে না লাবিবা আমি কেন তোমার সাথে আছি? কেন তোমার পথযাত্রী? কারণ আমার মতো তুমিও ছিলে ভালোবাসা চাওয়া একটা মানুষ। সামান্য কয়েকমাসের ভালোবাসায় কি অবস্থা করেছো নিজের লাবিবা! তোমাকে দেখেই বুঝা যায় তুমি কষ্টে আছো। তোমারো যে কষ্ট আমারো সেই কষ্ট। কিন্তু আমার কষ্টটা দীর্ঘকালের। তাই সয়ে গেছে কিন্তু ঠিক থাকতে পারিনা। আমি চাইনা আমার সবচেয়ে প্রিয় একটা পরিবারের হয়ে তুমি কষ্ট পাও। ভালোবাসা হচ্ছে খোলা আকাশের মতো। তাকে মুক্ত করে দিতে হয়। কিন্তু সেই মুক্ত ভালোবাসা বদ্ধ হয় যখন একজন পুরুষের সাথে একজন নারীর জীবন জুড়ে যায়। এই ভালোবাসা নির্দিষ্ট নিয়মে চলে। আছে চাওয়া পাওয়া। দুজনে একসাথে থাকো। দেখবে জীবন কত সহজ। মনে থাকবে প্রশান্তি। যেকোনো কাজে আগ্ৰহ পাবে। জোর পাবে। মন চাইলে বুকে মাথা রেখে কাঁদতেও পারবে আবার মন চাইলে দুইয়ে মিলে প্রাণ ভরে হাসতেও পারবে। সাময়িকী যত দূরত্বেই থাকোনা কেনো ভেতর থেকে বল পাবে। হ্যা একজন আছে। তুমি নিসঙ্গ নও। তোমার একজন আছে।”

” তামিম ভাই কি তোমার প্রথম প্রেম?”

” হ্যা।”

” প্রথম প্রেম খুব পোড়ায় আপু। ভোলা যায়না। স্যার আমার কাছে আসা প্রথম অনুভূতি। এইযে এতো অবহেলা! তুমি তো বার বার বললে এই পথ এগোবার নয়। সোজা হয়ে দাঁড়াতে। আমিতো কত চেষ্টা করেই সেই বেকেই বসলাম। আমাদের সম্পর্কে অনেক জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। আমি সত্যিই জানিনা স্যার মন থেকে আমাকে ভালোবাসি বলেছেন কিনা? হতেও তো পারে একটা সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে গেছি কিছু করার নেই আর সেজন্যই আমাকে শক্ত করে বেঁধেছেন। কিন্তু আমি উনাকে ভালোবাসি। উনি আমার নিজস্ব পুরুষ। আমি উনাকে ছাড়বোনা। মৃত্যুর দু মিনিট আগেও যদি উনি একবার আমাকে মন থেকে ভালোবাসে তাতেও আমি স্বার্থক। মানুষ তো অভ্যাসবশতও ভালোবাসে তাইনা?”

” এতো কনফিউজড তুমি এখনও?”

লাবিবা ফ্লোরার হাত দুটো মুঠোয় পুরে। ঢুক গিলে বলে,
” আমার ভীষণ ভয় করে আপু। ভালোবাসা কে যত্ন করে ভালোবেসে বুকে পুরে রাখতে হয়। তোমরাও তো দুজন দুজনকে ভালোবাসো। তাহলে এতোকাল ছন্নছাড়া কেনো? আমি পারবোনা আপু তোমাদের মতো করে জীবন কাটাতে। অনেক আগেই মরে যাবো।”

ফ্লোরার চোখ দুটো ভরে উঠে। মুখে লেগে আছে হাসি। চোখের জল গাল অব্দি ছুলেই তালুর উল্টোপিঠে মুছে ফেলে।লাবিবার হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে উত্তেজনার সাথে বলে, ” তোমাদের গ্ৰামে বলেনা সর্বগ্ৰাসী? অলক্ষী? আমি হলাম সর্বগ্ৰাসী । অলক্ষী হয়ে ঢুকেছিলাম সংসারে। প্রত্যেকের মন ভেঙে বেরিয়ে আসছি। নিজের সাথে সাথে একজনের জীবনটাও নষ্ট করেছি। দেখোনা ডিভোর্সের এতো বছর পরেও ও কোনো মেয়েকে নিজের জীবনে জড়ায়নি। দেবরকে দিয়েছি অপবাদ।”

” আমার উনার সাথে তোমার কি প্রব্লেম হয়েছিলো? কেনো তুমি উনাকে দোষী বানিয়েছিলে? আমার মুখ থেকে এই খারাপ বাক্যটা শোনার পর উনি কতটা কষ্ট পেয়েছিলো জানো? সবার কাছে আড়াল করলেও আমি ঠিকি উনার কষ্টটা বুঝে নিয়েছিলাম উনার মুখ দেখেই। আমাকে বলো আপু উনার সাথে তোমার কিসের শত্রুতা?”

চলবে ___

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here