#ভালোবাসার_কাব্য_গাঁথবো
(৫০)
লাবিবা আজ একটা ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তানভীর স্যারের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত। আগে জামাই ছিলো না সাজুগুজু করেনি সাধাসিধে থেকেছে সেই এক কথা। এখন বিয়ে হয়েছে ইচ্ছা মতো সাজবে। জামাইয়ের সামনে সামনে ঘুরবে । আহ্লাদ করবে। টুপ টাপ চুমু খাবে। গলা ধরে ঝুলবে। মুড অনুযায়ী রোমান্স জুড়ে দিবে তা না একটু সাজলেই বেচারার নাকি মাথা খারাপ হয়ে যায়। লাবিবা মাথায় হাত দিলো।
” নারে লাব্বু না। এতো আবেগ জমিয়ে কি লাভ হলো? ম্যারিড লাইফে তুই একদমি সুখী না। আগেই ভালো ছিলাম। সুখে থাকতে ভুতে কিলায়! ”
কলাপাতা রঙের একটা শাড়ী নিলো লাবিবা। তানভীর গিফট করেছিলো। পড়া হয়নি। আজ পড়বে। ব্যাগ প্যাক করে বড় কাকীর বাসায় চলে এলো। ভাবীর কাছে শাড়ি পড়িয়ে নিলো। ছোট্ট করে হিযাপ করে পার্টি সাঝ দিলো। গলায় লকেট সহ সাদা পাথরের বড় চেইন পড়লো। ভাবী বললো,
” তুই আমার কাছে শাড়ী পড়ার ট্রেনিং নিবি। আমাদের মা কাকীরা শাড়িই পড়তো। আমরাই এখন নিয়ম পরিবর্তন করেছি। তুই শাড়িই পড়বি। সুন্দর লাগে তোকে। ”
লাবিবার দুঃখ অনুভুত হলো। একরাশ মন খারাপ নিয়ে বললো, “উনি পছন্দ করেন না ভাবী। ”
“কি বলিস?”
” পছন্দ করে বাট পড়তে দেয় না। আমি জানিনা ভাবী কোথাও যেন মনে হয় আমাদের মধ্যে একটা ফাড়াক রয়ে গেছে। সেটা কি আমি জানি না। উনি আমার সব কথাই মেনে নেন। কিন্তু নিজের কাজেই বেশী ব্যস্ত থাকেন।”
” কেন এমন মনে হয়?”
” আমার মনেই এমন লাগে। উনি আমাকে যথেষ্ট কেয়ার করে বাট আমার.. আমারই মনে হয় প্রবলেম তাইনা ভাবী?”
” হবে হয়তো। তোর ভাই কলকাতা থেকে আসুক। উনার তো ফ্রেন্ড। যদি তানভীরের দিক থেকে কোনো অসুবিধা থাকে তাহলে ও ম্যানেজ করে নিতে পারবে।”
” আমারই যেন কেমন লাগে।”
” আচ্ছা বাদ দে। খুব সুন্দর লাগছে। জামাই এসে নিয়ে যাবে?”
” উনি বিজি। আব্বুর সাথে যাবো। ”
” বেরিয়ে পর। সময় হয়ে আসছে। ”
লাবিবা কলেজে নেমে স্টেজের দিকে না গিয়ে যায় তানভীরের রুমের দিকে। ওকে দেখা দিয়েই তারপর যাবে। লাবিবা দ্যা গ্ৰেট ! শাড়ির সাথে ক্যাটস পরে দুর্দান্ত হাঁটছে। তার পাশে চলা মেয়েগুলো ধীরে ধীরে হাই হিল পড়ে হাঁটছে। গ্ৰীলের বাইরে থেকে উর্মিলা দেখে হাত নাড়ে। লাবিবা ইশারায় বোঝায় পরে আসছি। তানভীর এখনো পৌঁছে নি। লাবিবা জানে না কখন আসবে। লাবিবা মনে মনে প্লান করে। সে তানভীরের সামনে বেশিক্ষন থাকবে না। দেখা দিয়েই চলে যাবে। নয়তো পরে দেখা যাবে তাঁকে বলবে বাড়ি চলে যাও। প্রোগ্ৰামে যাওয়ার দরকার নেই। তানভীরের বসার জায়গাতেই বসে পায়ের উপর তুলে। সেলফি ক্যামেরায় হুয়াইট ব্ল্যাক ফিল্টার দিয়ে দারুন দারুন ছবি তুলে। একেবারে নব্বই দশকের মতো । লাবিবার বেশ পছন্দ। বড় বড় চোখ দুটো কলমের কালিতে যেনো ফোঁটে উঠে। বসে বসে সেসব সেলফি ইডিট করে সময় পার করে। গ্লাসের বাইরে দেখে পিয়ন এসে মাত্রই দাঁড়িয়েছে। তারমানে তানভীর এখনি এসে পড়বে।
বেশ বেগে রুমে ঢুকে তানভীর। টেবিলের উপর ফোন ওয়ালেট রেখেই ওয়াশরুমে ঢুকে। লাবিবাকে খেয়াল করে না। মিনিট পাঁচেক পর বেরিয়ে আসে। এমন তাড়াহুড়ো করে ওয়াশরুমে ঢুকতে দেখেই লাবিবা মুখ টিপে হাসে। তানভীরকে বের হতে দেখে আবার চুপচাপ হাসে। এতো চাপ নিয়ে থাকলে আশে পাশের আর খেয়াল থাকে না। লাবিবা তানভীরকে ডাকবে তখনই তানভীর লাবিবার দিকে এসে তাঁকে টেনে চেয়ার থেকে নামিয়ে কোমড় জড়িয়ে ধরে টেবিলের উপর বসিয়ে দেয়। নিজেও চেয়ার টেনে বসে মুখোমুখি হয়। লাবিবার পা দুটো নিজের পায়ের ফাঁকে নিয়ে। ইসস! লাবিবা এখন কি করবে? যদি বলে এখানেই বসে থাকো তাহলে তো সর্বনাশ। তানভীর হাত বাড়িয়ে লাবিবার কোমড় জড়িয়ে ধরে। গলায় মুগ্ধতা জড়িয়ে বলে,
” ডারলিং আই ক্যান গিভ য়্যু টেন মিনিটস অফ টাইম।
এন্ড দ্যান আই হ্যাভ টু গো।”
” আপনি জানতেন আমি এখানে?”
” জানতাম। ”
“কে খবর দিয়েছে?”
” পিয়ন।”
” তাহলে আমরা মাত্র দশ মিনিট প্রেম করবো? আচ্ছা নো প্রবলেম। ”
” আচ্ছা! প্রেম করতে আসছি আমি? তো প্রেম কিভাবে করে তুমি জানো?”
” আপনি জানেন না প্রেম কিভাবে করে? কোনদিন প্রেম করেন নি?”
“নাহ।”
” ছি ছি! শেষ মেষ আনএক্সপেরিয়েন্স পার্সনকে বিয়ে করলাম!”
” আপনার দুর্ভাগ্য। কি আর করার? সুযোগ করে দেওয়া হোক। ”
তানভীর দুঃখী দুঃখী মুখ করে বলে।
” ঐযে হাত ধরে একসাথে পার্কে হাঁটে। আঙুলের ফাঁকে আঙুল। বসে বসে গল্প করে করে। মিষ্টি মিষ্টি গল্প। বাদাম ছুলে খায়। ”
” তোমাকে নিয়ে আমার নিব্বা নিব্বি ক্যাটাগরিতে নাম লেখানোই বাকি আছে। ”
” ছিহ! আমি এডাল্ট। কি বলুন তো আসলে আপনি আমাকে ভ্যালুই দেন না। এই যে আপনার এতো সুন্দর একটা বউ নামের প্রেমিকা অন্যরা হলে কি করতো জানেন? এত্তো এত্তো ভালোবাসতো। চোখে হারাতো। খাওয়া দাওয়া চান্দে তুলে দিতো। আপনি কি করেন? কিছুই করেন না।”
” কিছুই করিনা?”
” নাহ। ”
” মিথ্যা কথা আমি নিতে পারিনা লাবিবা।”
” একটু নিলেই কি আসে যায়?”
” এতো এতো ভালোবাসি কে বলে?”
” আপনি। একটু একটু । বেশী না।”
” যা চাও তাই কে দেয়?”
” আপনি দেন।”
” তোমার কেয়ার কে করে?”
” আপনি।”
” হাত ধরে কে হাঁটে?”
” একটু হাঁটেন বলেই বলতে হবে?”
” খাইয়ে দিই না?”
” হটাৎ হটাৎ।”
” এতো এতো শপিং কার সাথে করো?”
” আপনার সাথে।”
” কাছে টেনে নিই না?”
” নেন।”
” তারপর কি করি?”
” রোমান্স করেন।”
” তারপর?”
” বলবো না। ”
” বলো কি করি?”
” উহু বলবো না।”
” তাহলে বলো মাঝরাতে কি করি?”
লাবিবা লাফ দিয়ে নেমে দাঁড়ায়। ঝটপট তানভীরের পা সরিয়ে দৌড় দেয়। সে বলবেনা। দরজা খুলার আগেই তানভীর কোমড় চেপে ধরে। টেনে উপরে তুলে ধরে। কানে মুখ নিয়ে বলে,
” না বললে ছাড়ছিনা।”
” খান সাহেব। আমার ভীষন লজ্জা করছে। ছাড়ুন না!”
” লজ্জা ভেঙে দিই?”
” আমি লাব্বু তো। লজ্জা আমার সাথে যায়ই না। ”
“তাহলে বলো আর কি করি?”
লাবিবা তানভীরের উপর লজ্জায় গলে গেলো। গলায় মুখ গুঁজে দিলো। ধীরে ধীরে বললো, “আদর করেন।”
তানভীর উচ্চস্বরে হাসলো। ছটফটানি বউটা যে তার হুটহাট এমন লজ্জা পেয়ে বসে ভেবেই হাসি পায়। আরেকটু লজ্জা দেবার জন্য বললো,
” এখন একটু করি?”
লাবিবা মাথা নাড়ালো।
” উঁহু ।”
” সুন্দর লাগছে তো।”
” উঁহু।”
” টাইম ইজ ওভার জান।”
লাবিবাকে ছেড়ে দাঁড়ালো।
” চোখে চোখে থাকবে। একদম চোখের আড়াল হবেনা। আমি বের হবার পর বেরিয়ে যাবে।”
দরজার সামনে গিয়ে ফিরে তাকালো। আঙুল উঠিয়ে বললো, ” আর শোনো। সময় পেলে বিকালে দেখি পার্কে নিয়ে যাবো। বাদাম ছুলে খাওয়াবো । হ্যাপি থেকো। ”
হাতে গোলাপ আর রজনীগন্ধার বুকে নিয়ে অপেক্ষা করছে লাবিবা এবং তার সহপাঠিরা। সিনিয়র স্টুডেন্টরা একে একে অতিথি এবং টিচারদের অভিনন্দন জানাবে। ফিরোজ খানের নাম এনাউন্স করতেই লাবিবা চঞ্চল হয়ে উঠে। শ্বশুর সাহেব ও যে আসবেন সে তো জানতোই না। সে যাই হোক, লাবিবাদের সামনে দিয়ে একে একে প্রিন্সিপালের সহিত অতিথি গন যার যার আসন গ্ৰহণ করেন। লাবিবা নিজের সিরিয়াল গুণে গুণে দেখলো। সর্বনাশ! তানভীরের তিন জনের পেছনে সিরিয়াল হয়ে যাবে তার। এখন কি হবে? সে উপস্থিত থাকতে তার হাজবেন্ড কে অন্য কেউ এসে ফুল দিয়ে যাবে! এটা কখনোই হতে পারে না। লাবিবা দাঁড়িয়ে থেকেই টেনশনে মোচড়া মোচড়ি শুরু করে দিলো। এখন? কি হবে? একপা দুপা পিছিয়ে গেলো। বিরবির করতে করতে গিয়ে তিনজনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। হুট করেই ধাক্কা দিয়ে জায়গা করে নিলো। পাশের দুজন বাঁকা চোখে তাকালো। লাবিবা ঘাবড়ে না গিয়ে দাদা দাদা ভাব নিয়ে বললো,
“এই সরো তো। গায়ে পড়ছে কেমন যেন !”
ক্লাসমেট দুটো ভ্যাবাচ্যেকা খেয়ে গেলো। লাবিবা মুখ টিপে হাসলো। ঐ যে বলে না? জোর যার মল্লুক তার! যেই জো হয়েছে। লাবিবা চুপচাপ থাকলো। দৃষ্টি তানভীর বরাবর। গ্ৰে কালার স্যুটে একদম মাখনের মতো লাগছে। উহু। পেষ্টীর মতো লাগছে। ইসস! লাবিবা বড্ড লোভী হয়ে গেছে।
একে একে সবাই এগুতে লাগলো। লাবিবা গিয়ে দাঁড়ালো তানভীরের সামনে। তানভীর মুখ টিপে হাসলো। লাবিবাকে এখানে বসেই খেয়াল করেছে। কিভাবে জায়গা করে নিতে হয় মেয়েটা ঠিকই জানে। নির্দেশনা পেতেই সবাই একসাথে ফুল নিবেদন করল। লাবিবাও ফুল এগিয়ে দিল। সাবধানে সামান্য একটু ঝুকেও গেল। তানভীর ও সামঞ্জস্য রাখতে একটু ঝুঁকে গেল। এভাবেই ম্যানেজ করতে হয় তাকে সবসময়। লাবিবা ফিসফিসিয়ে বললো,
” স্যার আই লাভ য়্যু।” তানভীর রিপ্লাই করলো,
” লাভ য়্যু ট্রু মাই স্টুডেন্ট। সোজা হয়ে দাড়াও। ”
লাবিবা সবার সাথে নেমে এলো। আসার সময় ফিরোজ খানের সাথে ক্রস হলো। দুজনেই চোখে হাসলো। তানভীর লক্ষ্য করলো। বক্তৃতা শেষ করে কেক কাটা হলো। নতুনদের উদ্দেশ্য অনেক কিছুই বলা হলো। তারপর শুরু হলো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অংশগ্ৰহনকারীরা নিজেদের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ পেলো।
এতোক্ষন লাবিবা তানভীরের চোখে চোখেই ছিলো। তার নির্দেশ। সামনে থেকে সরে যাওয়া যাবেনা। অনুষ্ঠানের মাঝে হটাৎ তানভীরের দেখলো লাবিবা নেই। তার চোখ জোড়া লাবিবাকে খুঁজে পাচ্ছে না। ওয়াশরুমে যেতে পারে বলে ওয়েট করলো। একটু পর পর তাকালো। লাবিবাকে আর দেখতে পারলো না। আধঘন্টার বেশী সময় চলে গেলো। তানভীর আর স্থির থাকতে পারলো না। উপস্থিতদের বলে আসন ছেড়ে বেরিয়ে এলো। ফিরোজ খান ছেলের কুচকানো কপাল দেখে দুঃখ প্রকাশ করলো। সুন্দর বউ যেমন শান্তি দেয় তার চেয়ে বেশি দেয় টেনশন। এই সময় সেও পার করে এসেছে। তবুও ছেলে তো! আফসোস টা ঠিকই বেরিয়ে এলো।
তানভীর নিজে খুঁজলো না। একটা ফ্লোর নিজে খোঁজে যখন পেলো না তখন উপরের ফ্লোর গুলোতে তিনজনকে খোঁজতে পাঠিয়ে দিলো। লাবিবা নেই।কোথাও নেই। ফোন টাও তুলছে না। তানভীরের মাথা ঘুরতে লাগলো। গেইটে, গাড়িতে, ক্যাম্পাসে সব জায়গায় পাগলের মতো খুঁজলো। উর্মি তো পুরো যেনো কেঁদে দিলো। ছুটতে ছুটতে ভেতরের দিকে বড় বিল্ডিং টার পাশ থেকে লাবিবাকে প্রাণপনে ছুটে আসতে দেখলো। তানভীর সেদিকেই ছুটলো। কিন্তু শেষ রক্ষা হলোনা। তানভীর লাবিবার কাছে পৌছোনোর আগেই লাবিবা মাটিতে নুইয়ে পড়লো। রক্তে রঙিন হলো সবুজ ঘাস।
চলবে ____

