ভালোবাসার_কাব্য_গাঁথবো (৫১)

0
1214

#ভালোবাসার_কাব্য_গাঁথবো

(৫১)
লাবিবার রক্তে ভেজা মাথাটা তানভীরের বুকে। চোখ নিভু নিভু। বার বার হাপড় টানছে। খামছে ধরেছে শার্টের কাপড়। তানভীর রোদ্রোজ্বল দুপুরে মানুষের ছাড়া দেখেই বীভৎস চিৎকার করে, ”
কুত্তার বাচ্চা বেরিয়ে আয় বলছি কলিজায় হাত দিয়েছিস আমি তোদের ছাড়বোনা। ”

তানভীর উঠতে চাইলে লাবিবা শক্ত করে ধরে। কয়েকজন স্টুডেন্ট বিল্ডিং এর পেছন দিকে দৌড় দেয়। ধরতে হবে ওদের কে। তানভীরের মস্তিষ্ক এলোমেলো। কি করতে হবে মাথা কাজ করছেনা। লাবিবাকে মেয়েরা ধরতে এলেও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। প্রেয়সীর মাথায় রক্ত দেখে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে গেছে। লাবিবা বহু কষ্টে ডাকে, “খান সাহেব!”

“আমার কলিজা! কে ছিলো ওরা?” তানভীরের কন্ঠ কাঁপছে।

” ঐ অফিসারটা।”
ফিরোজ খান ঘটনাস্থলে দৌড়ে এসে দেখেন লাবিবা রক্তাত্ব মাথায় তানভীরের বুকে কাতরাচ্ছে।‌ জলদি তানভীরকে তাড়া দেয়।
” লাবিবাকে কোলে তুলে নাও জলদি। আমি ডাক্তারকে ফোন দিচ্ছি। ”

তানভীর লাবিবাকে কোলে তুলে নিয়েই বারান্দায় বিছানো বেঞ্চিতে গিয়ে বসে। হসপিটাল কাছাকাছি হওয়ায় পাঁচ মিনিটের ভেতরেই ডাক্তার চলে আসে। লাবিবার কপাল সহ মাথার খানিকটা ওয়াশ করিয়ে দেয় তুলো ভিজিয়ে। শক্ত কিছু দ্বারা আঘাত করা হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। হিজাব খুলে ফেলায় কোমড় অব্দি ঢেউ খেলানো চুল গুলো ঝরঝর করে কোলে ছড়িয়ে পড়ে। ব্যান্ডেজ করে দেবার পর ডাক্তার সাহেব মন্তব্য করেন, ” বেশ শক্তপোক্ত মেয়ে। মাথা ফাটিয়ে দিলো অথচ একটি বারের জন্য জ্ঞান হারালো না। ”

তানভীর লাবিবাকে আরেকটু বুকের মাঝে চেপে নিলো।
ফিরোজ খান লাবিবার দিকে তাকিয়ে থেকেই বললেন,
” টেস্ট করলে ভালো হয় না?”

” টেস্ট তো করতেই হবে। রক্ত ঝরা বন্ধ হয়ে যাবে বাট ভেতরে কোনো ক্ষতি হয়েছে কিনা দেখতে হবে। এমনিতে তো উপর থেকে ভালোই দেখায়। ”

” হুম। ”

” আমি হসপিটালে যাচ্ছি এমপি সাহেব। টেস্ট করিয়ে নিয়ে আসবেন। ”

” জি আপনি আসুন। ”
ডক্টর বের হতে পারছিলো না। এতো ভিড় লেগে গেছে! অনুষ্টান আরো আগেই ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে। সেজন্যই এখানে সবাই ঢলে পড়েছে। তার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তাঁদের প্রিন্সিপালের কোলে তাদেরই কারো ক্লাসমেট কারো সিনিয়র ঘাড় ছেড়ে দিয়ে আছে। এতো গুলো মানুষের সামনে তাঁদের শীর্ষ সম্মানীয় একজনের বুকে তাদের মতোই একজন বিষয়টা সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। উৎসুক চোখে হা করে দেখছে। মুখে মুখে হৈ হৈ পড়ে গেছে। ” স্যারের কি হয়? লাবিবা বোন নাকি অন্য কেউ?” ফিরোজ খানের কনসার্ন দেখেও বলাবলি শুরু হয়েছে। ফিরোজ খান তানভীর কে বলে,
” তানভীর লবিবাকে নিয়ে হসপিটালে চলো। ”

” একটু পর যাচ্ছি। বেরিয়ে যান আপনি।”

” সিকিউরিটি রেখে যাচ্ছি। ”

” প্রয়োজন নেই। ”

ফিরোজ খান তানভীরের মনের অস্থিরতা বুঝতে পারে। লাবিবাকে এই অবস্থায় পেয়ে তানভীর এখনও স্বাভাবিক হতে পারেনি। একদম ছোট বাচ্চার মতো বুকে মিশিয়ে নিয়ে আছে। চোখে মুখে আতঙ্ক ভাব এখনো কাটেনি। একটু হলেই যেন কলিজাটা তার ছিঁড়ে যেতো। বউ তার। বউয়ের কষ্টও তার।‌ এতো সাধনার বউটার যদি কিছু হয়ে যেতো? কি নিয়ে বাঁচতো সে? সেটা ভেবেই এখনো ঠাঁয় বসে আছে। লাবিবার ক্ষতের দিকে খেয়াল কিন্তু উৎসুক জনগনের দিকে খেয়াল নেই। ধীরে ধীরে তানভীর স্বাভাবিক হয়ে উঠে।লাবিবার রক্তে রাঙা আঁচল! শুকিয়েও গেছে যেন। আলতো হাতে চুল গুলোকে হাতের ভাঁজে নিয়ে নেয়। চোখের জল গড়িয়ে পড়া গাল দুটো লাল টকটকে হয়ে আছে। অনবরত জল পড়া চোখে তাকাতে পারলো না তানভীর। কষ্ট হচ্ছে। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। চারজন ছেলে এসে বললো,
” পিংক কালার শার্ট আর রেড কালার টি শার্ট পড়া ছিল স্যার। ধরতে পারিনি। চিনতেও পারিনি। ”

তানভীর মাথা ঝুমালো। পিয়নকে বললো, ” আমার চেয়ারের উপর টাওয়েল আছে নিয়ে আসো।”

পিয়ন আদেশ পেতেই ছুটে গিয়ে টাওয়েল নিয়ে এলো। তানভীর লাবিবার উপর বড় টাওয়েল টা দিয়ে দিলো। মাথাটাও কাভার করে মুখটা খোলা রাখলো। পিয়নকে গাড়ির চাবিটা হাতে দিলো। ” গাড়িটা বের করে গেইটের মুখে নিয়ে রাখো আমি এক্ষুনি বের হবো। ”

পিয়ন গাড়ি বের করে ফিরে এলো। তানভীর ভীড়টা চোখে অবজার্ব করলো।
” যাওয়ার রাস্তা করে দাও। ”

পিয়ন সহ ডিপার্টমেন্ট গুলোর কেরানী ভিড় সরিয়ে রাস্তা করার বৃথা চেষ্টা করলো। তানভীর ছেলেগুলো কে বললো, “সিসি ফুটেজ চেক করো। লোক দুটোকে দেখা গেলে ফুটেজ পাঠিয়ে দিবে আমাকে। ”

লাবিবাকে কোলে করে সোজা ভিড় ঠেলে বেরিয়ে এলো। ড্রাইভ করে সোজা কলেজ ক্যাম্পাস ছেড়ে নির্জন একটা জায়গায় এসে গাড়ি থামালো। লাবিবাকে ফের বুকের মধ্যে টেনে নিলো। লাবিবা ব্যথা পেয়ে আহ! করে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে তানভীর ছেড়ে দিলো। চোখে চোখ রাখলো। মৃদু স্বরে ধমকালো, ” আমার জান বের করার জন্য তোর এতো তাড়া? বলেছিলাম না চোখে চোখে থাকবি? কথা কেন শুনিশ না আমার একটা? ”

লাবিবার চোখ থেকে পর পর জল গড়িয়ে পড়লো। তানভীরের সহ্য হলোনা। আবার নিজের দিকে টেনে নিলো। হাতের তালুতে গাল মুছে দিয়ে সেই গালেই ঠোঁট চেপে ধরলো। ছেড়ে আবার সারামুখে চুমু খেতে লাগলো। লাবিবা গোঙালো। ফিসফিসিয়ে জানালো,
” ঠিক আছি আমি।”

তানভীর শুনলো না। শুনলেও বুঝতে চাইলো না। প্রায় কেঁদে দিলো যেন! দেখে বুঝা না গেলেও গলার স্বর ভেঙে গেলো।
” ঠিক নেই। একদম ঠিক নেই। আজ কিছু একটা হয়ে গেলে কি অবস্থা হতো? নিঃশ্বাস আটকে আটকে আসছিলো তোমার। ”

এতো ব্যথার মাঝেও লাবিবা মুচকি হাসলো। মজার স্বরে বললো, ” এতো ভয় পাবার কি আছে? আমি একদম স্ট্রং আছি স্যার। জ্বর ছাড়া আর কিছুর সাধ্য নেই আমাকে কাবু করার। ”

তানভীর সরল চোখে তাকালো। এতো ব্যথা পেয়েও বলছে জ্বর ছাড়া তাকে কাবু করার সাধ্য কারো নাই। তানভীর লাবিবাকে চেপে ধরল। মুখ এগিয়ে নিয়ে বললো, “তোকে আমিইইইইই । ”
লাবিবা চিৎকার করলো, ” আহ! খান সাহেব! না। না। ”

মাথায় সিটি স্ক্যান করিয়ে নেওয়া হয়। রিপোর্ট দিবে বিকালের পর। তানভীর লাবিবাকে হাঁটতেই দিচ্ছে না। গাড়ি থেকে নেমেই কোলে করে হসপিটালে এখান থেকে ওখানে যাচ্ছে। টেস্ট করানোর আগে লাবিবাকে ইমার্জেন্সি কিছু মেডিসিন দিয়েছে। সেসব মেডিসিন নিয়ে লাবিবা হসপিটালেই রেস্ট নিচ্ছে। রিপোর্ট হাতে পেয়ে তারপর বাসায় যাবে। তানভীর এর ফাঁকেই সিসি ফুটেজ পেয়ে গেলো। যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে রোজীর এক্স হাজবেন্ড এবং দেবর কে। তানভীর এরই মাঝে কিছু নিউজ কালেক্ট করে নিলো। যেখানে জানতে পারলো লাবিবার সাথে হওয়া ঝামেলার কথাটা। এতোবড়ো কথাটা লাবিবা তাকে বললো না? অথচ ইনজুরেড ঠিকই ছিলো। তানভীরও তো চাপ দেয়নি।রাগে তানভীরের মাথা ফেটে যাচ্ছে। এখনই একটা খুন করতে না পারলে সে শান্ত হবে না। রাগে গজগজ করতে করতেই লাবিবাকে জিজ্ঞেস করলো,
” স্টেজের সামনে থেকে কোথায় গিয়েছিলে তুমি?”

লাবিবা ভয়ে ঢুক গিললো। মিনমিনিয়ে বললো,
” বাথরুমে গিয়েছিলাম। তারপর। তারপর বের হতেই আমাকে টেনে দেয়ালে ধাক্কা! ” বলতে বলতেই ফুঁপিয়ে উঠে লাবিবা। তানভীরের ক্রোধ আরো বেড়ে যায়। রেগে মেগে বেরিয়ে যায় কেবিন থেকে। লাবিবা ভয় পেয়ে যায়। নিশ্চয় কিছু একটা ঘটাবে। আটকাতে চায়। উঠে দাড়াতেই মাথা ঘুরে যায়। ঠায় বসে কাঁদতে থাকে লাবিবা। সাথে পার্স নেই ফোন নেই কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। নার্সের কাছে ফোন নিয়ে তামিমকে কল করে। তামিম তানভীরের রাগের কথা শুনে তেমন কোনো রিয়েকশন দেয় না। লাবিবা আহত হয়েছে এর উপর যেন কোন কিছু না। রিপোর্ট পাওয়ার পর মেডিসিন সমেত লাবিবাকে নিয়ে বের হয় তামিম। তানভীর লাবিবাকে নিতেও আসেনা। তামিমের সামনে কান্নাকাটি করলে তামিম রিলাক্স হতে বলে।
” টেনশন নিও না। লোকটার জব চলে গেছে এখন পাগলা কুকুর হয়ে গেছে। তেমন ইনজুরি হয়নি তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে যাবে। একটু ব্যথা সহ্য করে নাও।”

” উনি কোথায় গিয়েছেন তুমিও জানো না?”

” কুকুরের মস্তিষ্ক খোলাসা করতে। এসব তেমন কিছু না।রাতেই দেখতে পাবে তানভীরকে। অযথা কান্নাকাটি করে চোখের পানি নষ্ট করো না।”

মেডিসিন নিয়ে ঘুমিয়েছে লাবিবা। সারারাতেও ঘুম ভাঙেনি। সকালে চোখ মেলতেই দেখে তানভীর তাকিয়ে আছে তার দিকে। আধশোয়া হয়ে শুয়ে। লাবিবা অপলক তাকিয়ে রইল। কথা বললো না। তানভীর গালে চুমু দিয়ে বললো, ” গুড মর্নিং জান। ”

লাবিবা উঠে বসলো। একা একা বিছানা থেকে নামতে চাইল। তানভীর তা হতে দিলো না। হাত ধরে নিয়ে
গেলো ওয়াশরুমে। কত যত্মের সাথে ফ্রেশ করিয়ে দিলো! যেন কিছুই হয়নি। লাবিবা অভিমানী হলো। প্রশ্ন করলো,
” কোথায় গিয়েছিলেন কাল আমাকে ফেলে?”

” আশেপাশেই। ”

লাবিবার বিশ্বাস হলোনা। পরদিন যখন শ্বশুড়বাড়ির সবাই তাকে দেখতে এলো তখন ইসমাইলের সাথে তাদের কথপোকথন শুনতে পেলো।
” ছেলেটা কেমন আছে এখন?”

” বেশী ভালো না।হাত উপড়ে গেছে। মাঝবরাবর মাথা ফেটে গেছে। বেঁচে আছে এটাই বেশী। আমাদের বংশের ছেলেদের শরীরে আবার অনেক দয়া। ”

” তানভীরকে এতো এগ্ৰেসিভ হতে নিষেধ করবেন বেয়াই সাহেব। ”

ফিরোজ খান হাসতে হাসতে বলে, ” আরে কোনো চাপ নেই। আমার ছেলে! ভবিষ্যত লিডার বলে কথা!”

ইসমাইল মাথা ঝুমালো। দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। এর জন্যই এই ছেলেকে তার পছন্দ না। যে কেউ লিডার হতে পারে না। নেতা মানুষ! লোকসম্মূখে যতই সচ্চরিত্রবান হোক ব্যাকগ্ৰাউন্ড সহ দুর্ধর্ষ হলে না হলে কেউ নিজের জায়গা ধরে রাখতে পারেনা। ফিরোজ খান ইসমাইলের মুখ দেখে আরেকবার হাসলেন। কাঁধ চাপড়ে বললেন,
” আমি বলেছিলাম না আপনার থেকে আপনার মেয়েকে আমার ছেলেই ভালো রাখতে পারবে? সেই দায়িত্ব চার বছর আগে থেকেই কাঁধে তুলে রেখেছে। আপনি হাত পা ছড়িয়ে আছেন নির্ভয়ে। তবু কেনো এতো অস্থিরতা?”

ইসমাইল কিছুক্ষন কথা বললেন না। মিনমিনিয়ে বললেন, “ছেলেটা বেঁচে থাকলেই হয় । আর কিছু চাইছিনা। ”

লাবিবা তানভীরকে খুঁজলো। তানভীর ছাদে আছে। সেও ছাদে গেলো। তানভীরের পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, ” আপনি আমাকে চার বছর আগে চিনতেন?”

” চিনতাম।”

” কিভাবে চিনতেন?”

“বন্ধুর বোন তাই।”

” ভাইয়া আপনার বন্ধু কিভাবে হলো?”

” আত্বীয় স্বজন বন্ধুর মতোই হয়।”

” কবে থেকে বন্ধু হলো?”

” যবে থেকে বন্ধুর বোন আমার হলো।”

” ক্লিয়ারলি বলুন।”

” তোমাকে অসুস্থ লাগছে।”

” আপনাকে এখন আমার সন্ডা পান্ডা মনে হচ্ছে।”

” আমি তাই।”

চলবে ___

ছবিয়াল: তুবা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here