#ভালোবাসার_কাব্য_গাঁথবো
(৫২)
তানভীর লাবিবার সন্দেহের লিস্টে যুক্ত হয়েছে। মাথায় ভীষন প্রেসার পড়ছে। তানভীরের মুখ থেকে কোন কিছু বের করা সম্ভব হবেনা। কিন্তু এখানে নিশ্চয় কোন ঘাপলা আছে। তানভীরকে কতটুকুই চেনে! একসাথে থাকতে গেলে চেনা যায় কিছুটা। কিন্তু এই ব্যক্তি রাতে আসে সকালে যায় তাও কয়েকদিন পর পর। প্রতিদিন তাকে ধরা ছোঁয়ার সুযোগ কোথায়? লাবিবার টেনশন হচ্ছে। দুর্বল মস্তিষ্কে নানারকম কথা উঁকি দিচ্ছে। এ কয়দিনে তানভীরের সম্পর্কে লাবিবা ভেবেছিলো অনেকটায় আয়ত্ত করে নিয়েছে। সবটুকুই তো অন্যজনের আদৌলে। সব থেকে বেশি ইনফরমেশন পেয়েছে ফ্লোরার থেকে। কিন্তু সেটা কতটুকু! লাবিবার মস্তিষ্ক ঘুরে ফিরে একটা দিকেই যাচ্ছে। তানভীর কোনো খারাপ কাজের সাথে জড়িত নয়তো? কাঁদতে কাঁদতে তানভীরকে জিজ্ঞেস করলে তানভীর হেসে উড়িয়ে দেয়। অবাক হবার ভান করে।
” কেমন টাইপ খারাপ কাজ?”
” আপনাদের এমপি মন্ত্রী দের তো অনেক ক্ষমতা তাই না? ক্ষমতাবান মানুষরা তো মারামারি কাটাকাটি নিয়ে ব্যস্ত থাকে। ”
” আমাকে দেখেছো ব্যস্ত থাকতে?”
” তারা তো আন্ডার গ্ৰাউন্ডের_”
” স্টপ ইট। এতোদূর চলে গেছো? আমাকে দেখে কি তোমার তাই মনে হয়?”
” দেশের যতগুলো বড় বড় মাফিয়া ডিলার আছে তাদের এক দেখাতেই যে কেউ বলতে বাধ্য এদের থেকে সুদর্শন জ্যান্টলম্যান কোথায়ও নেই। ”
লাবিবার কথায় তানভীর চোখ ছোট ছোট করে তাকায়।
” কয়জন মাফিয়ার সাথে যোগাযোগ আছে তোমার?”
লাবিবা চোখ মুখ কুঁচকে নেয়। সর্বনাশ কান্ডকারখানা! তানভীর হাত ধরে ঝাঁকি দেয়। ধমক দিতেই লাবিবা ঠোঁট ভেঙে ফেলে।
” আপনার যতজনের সাথে যোগাযোগ।”
” তাঁদের নাম্বার পেলে কোথায়?”
” আপনার ফোন থেকে।”
” ইনভেস্টিগেশন !”
” পাপা,আপনার সাথে ফ্রেন্ডশীপ কিভাবে হতে পারে উনাদের?”
তানভীরের দৃষ্টি শান্ত। কপালে ফুটে উঠে কয়েকটা ভাঁজ। লাবিবা মাথা নিচু করে আছে। এরপর তানভীর তাকে কি বলবে সে জানে না। আশানুরূপ কোন রিয়েক্টই তানভীর করলোনা। লাবিবাকে দু হাতে আগলে নিলো।
” ঝামেলার গভীরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই কেমন? আপাতত শুধু আমার গভীরে কখন ডুব দিবে সেই প্রহর গুনো। ”
” আপনাকে নিয়েই তো আমার যত চিন্তা। ”
” দলের কাজের জন্য তাদের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখতে হয়। তোমার শ্বশুর একজন লয়্যাল নেতা। আমি তার ডান হাত। জাস্ট এটুকুই। আর কিচ্ছু না। শীঘ্রই তোমাকে আমার অন্দরে নিয়ে যেতে চাই লাবিবা। যদি আমায় চাও আমার মমের সাথে থাকবে। তার থেকে তোমার অনেক কিছু শেখার আছে।”
“ফ্লোরা আপু আমাকে একটা কথা বলতো জানেন?”
” কি?”
” আপনি অনেক বড় একজন খেলোয়াড়। ”
” লাবিবা তুমি আমার বউ। আমার জান। তোমার কথা শুধু প্রেমের কথা হওয়া চাই অন্য কোনো বিষয়ে না।”
” আমাকে খোলাশা করুন প্লিজ। আপনার প্রত্যেকটা গতি আমাকে জানতে হবে। আপনার সব বিষয়ে আমার নজর থাকতে হবে। আপনার আচরণ সম্পর্কে আমার পূর্বেই ধারণা করে নিতে হবে। নয়তো কেমন স্ত্রী আমি? আমি অনান্য স্ত্রীদের মতো হতে চাই। আপনার মতো চাই যেভাবে আপনি আমাকে বুঝেন আমাকে আগলে রাখেন। এইযে আমার এতো অস্থিরতা আপনি কেন বোঝেন না আমার কষ্ট হয়। আপনাকে আমি আর চার পাঁচটা মেয়ের মতোই অবজার্ব করতে চাই। আমাকে ধাঁধায় ফেলে রেখেছেন। আমি এর থেকে বের হতে চাই।”
” কি জানতে চাও তুমি? আমি একজন কলেজের প্রিন্সিপাল। এ এলাকার এমপির ছোট ছেলে। আর কিছু?”
” মেয়র প্রার্থী। ”
” সেটা আপাতত হচ্ছে না। আমি অলরেডি নিজের পেশায় বিজি। ”
“আপনার পর আপনার জায়গায় কে বসবে খান সাহেব?”
” অফকোর্স আমার ছেলে।”
তানভীর সরাসরি লাবিবার চোখে তাকায়। লাবিবার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। চোখ ঘোলাটে। তানভীর চোখ সরিয়ে নেয়। দূরদৃষ্টিতে তাকায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ”
ভাইয়ার ছেলে। বিয়েটা হোক। অতি শীঘ্রই খান বংশের উত্তরসূরী আসবে। ”
“তাহলে আমাকে কেন বিয়ে করলেন খান সাহেব? আমাদের ফিউচার কি হবে?”
” সেটা সময়ই বলে দিবে।”
লাবিবা বিন্দু মাত্র শান্তি পাচ্ছে না। মেডিসিন দিয়ে গেছে সাবিনা। সেটাও ভুলে গেছে। মাথায় তীব্র ব্যাথা বুকে আকাশসম হা হা কার। দুইয়ে মিলে একদিনেই মুখটা শুকিয়ে গেছে। অপেক্ষাকৃত বেশি অসুস্থ দেখায় তাকে। সাবিনা এসে জানালো, ”
তোমার জন্য বিয়েটা পিছিয়ে গেলো। এই শুক্রবার হচ্ছেনা। পরের শুক্রবার হবে। প্রথমে সবাই গাই গুই করলেও রোজী যেই বললো তেমনি সেই সবাই মেনে নিলো। বড্ড ভালো মেয়েটা। তোমার কথা ভাবে।”
“রোজী আপুকে একটু আসতে বলো আম্মু। তার সাথে কথা আছে। ”
” আচ্ছা বলে দিচ্ছি।”
” তোমাদের জামাই ফোন দিয়েছিলো?”
” নাতো। কেনো তোমাকে ফোন দেই নি? ”
” নাহ।”
” ঝগড়া করেছো লাবিমা? পরশু রাতে যখন চলে গেলো দেখলাম একদম শান্ত। প্রতিবার আমাকে বলে তারপর গাড়িতে উঠে। এবার তো কিছু বললো না।”
” ঝগড়া করেছি আম্মু। মাঝে মাঝে ঝগড়া করা ভালো। এতে টান বাড়ে।”
” ছেলেটা আসেই কিছুক্ষনের জন্য এরমধ্যে ঝগড়া করো কেন বলতো? তুমি তো অবুঝ না। মিলেমিশে চলবে বুঝলে। ছেলেরা বাইরে কত ঝামেলা পোহিয়ে আসে! বউয়ের কাছে আসে শান্তির খোঁজে। সেই যখন ঝগড়া করে তখন কার ভালো লাগে?”
লাবিবা উত্তর দেয়না। বিরবিরিয়ে বলে, ” তুমি বুঝবেনা আম্মু, তুমি বুঝবেনা।”
সাবিনা উঠে যায় রোজীকে ফোন দিতে। লাবিবা হুট করেই পিছু ডাকে, ” আম্মু তুমি কি আগে থেকে তোমাদের জামাইকে চিনতে?”
” তো চিনবো না? তানভীরকে কে না চিনে!”
” তাহলে আমি কেনো চিনিনা?”
” কি বলো? তুমিও তো চেনো। হয়তো খেয়াল করো নি। বেশ কয়েকবার কবিরের সাথে তোমার বড়কাকার বাসায় এলো না? সেখানেই তো ছেলেটাকে আমার বেশ লেগেছে। মনে মনে আশাও করে বসছিলাম এমন চাঁদের মতো ছেলে যেনো আমার জামাতা হয়। তোমার কাকা তো ঝোঁকের বসে তোমার আব্বুকে নিয়ে প্রস্তাবও দিয়ে বসেছিলো। উনারা রিজেক্ট করে দেয় সাথে সাথে। আমারো রাগ হয়। তোমার আব্বুকে কতো বকা ঝকা করলাম এরকম পাগলামির জন্য। তুমি কিছুই জানোনা। তখন তুমি মাত্র ইন্টারে। ওতো ছোট মেয়ে আমি বিয়েও দিতাম না। তারপর তো কলেজে ভর্তি হয়েই দেখলে।”
লাবিবার পাগল হবার উপায়। কিসব বললো আম্মু? বিয়ের সমন্ধ! রিজেক্ট! চার বছর পর তাকেই বিয়ে! হেল্প করা! ঘটকালি করা! ইগনোর! আচমকা ভালোবাসা। আর চাপ নিতে পারলো না লাবিবা। বেহুসের মতো পড়ে রইলো। এই প্রথম অন্য কারণে তার জ্বর হলো। ভীষন জ্বর। রোজী এসে লাবিবার মাথায় জলপট্টি লাগিয়ে বসে রইলো। সন্ধ্যে হলে সাবিনা নিজে রোজীর বাবাকে ফোন করে রোজীর থেকে যাওয়ার জন্য অনুমতি নিলো। রোজীরও ইচ্ছে করছিলো না লাবিবাকে ছেড়ে যেতে। লাবিবা রোজীর কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে। রোজীর নরম মনে অদ্ভুত এক টান ফিল হয় লাবিবার জন্যে। যেনো কতো আপন! লাবিবাকে আপন ভাবার স্পেসিফিক কোন কারণ কেউ দেখাতে পারবেনা। কিন্তু বাধ্যতামূলক যেনো টান ফিল করবে। মেয়েটার মধ্যে বিশেষ একটি শক্তি আছে।
লাবিবা রোজীর দিকে নিভু নিভু চোখে তাকায়। ধীরে গলায় বলে,” ওকে ডাকো।”
” কাকে? তানভীর কে?”
” ডাকো।”
” তানভীর তো আজ সকালে চট্টগ্ৰাম গিয়েছে শিপমেন্টে কি একটা প্রবলেম হয়েছে। উনাদের ব্যবসা সংক্রান্ত ডাক্তারসাহেব বলছিলো।”
লাবিবা অনেক কষ্টে মৃদু হাসলো।
” আর কি কি বলে তোমার ডাক্তারসাহেব?”
” তানভীরের সম্পর্কে?”
” হুম।”
” তেমন কিছু না। এই এমনিই যা।”
” রোজী আপু। আমি তো তোমাকে কতো হেল্প করি। তুমি আমাকে একটা হেল্প করো না।”
” কি হেল্প করবো?”
” একটা সলুশন দাও। ঠিক সলুশন ও না। পথ দেখাও।”
রোজীর মুখটা হা হয়ে যায়। ঝটপটিয়ে বলে,
” আমিই তো তোমার কাছে পথ দেখিয়ে চাই। আমি কিভাবে পথ দেখাবো?”
” ইজি। তুমি পারবে।”
” আমার বিয়েটা একটা ধাঁধা আমার কাছে। তানভীর খান নিজেই একটা ধাঁধা আমার কাছে। আমার আশেপাশে অনেক ক্লু। কিন্তু আমি মেলাতে পারছি না। আমি এমন একটা সম্পর্কে আছি কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারছি না। এতে নিজেরই লজ্জা। তুমি আমার খুব কাছের মানুষ। তাই তোমাকে বলছি। আমি আমার হাজব্যান্ড কে পুরোপুরি চিনি না। আমি এটাও বলছি চিনতেও চাইনা। এইযে তুমি বললে তাঁদের বিজনেস। আমি এই সম্পর্কেও জানতাম না। আমি আসলে ধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই।”
“তানভীর ভাই তোমাকে অনেক ভালোবাসে লাবিবা।”
” সেটা তুমি বুঝবেনা। বউ বলে ঠেকে গেছে। ভালোতোবাসতেই হবে।”
” তুমিও কি একি কারণেই ভালোবাসো লাবিবা?”
লাবিবা মাথা নাড়ায়।
” তাহলে বিয়ের আগে থেকেই ভালোবাসো?”
” ঐ ছিলো কিছু একটা। ”
” ক্রাশ?”
রোজী হাসে। লাবিবার মাথায় হাত বুলায়।
” চিন্তা করে দেখো লাবিবা তোমার বিয়ের সাক্ষী এমন কে আছে যে তোমাকে দ্বিধামুক্ত করতে পারবে। পুরোপুরি না পারুক একটু তো পারবে।”
” তোমার দেবর কেনো পারে না?”
” হয়তো তার কোথাও একটা বাঁধে। বা সে কিছুটা সাঁই ফিল করে। তুমি ও জানোনা আমিও জানিনা। সেজন্যই সাক্ষীর হেল্প নেওয়া।”
লাবিবা কিছুক্ষন চুপ চাপ ভাবে। হটাৎ তার মনে পড়ে কবিরের কথা। কবির তাকে বলেছিলো কয়েকবছর আগেই বিয়ের কথা। কেনো তাকে রিজেক্ট করা হয়েছিলো সেটা কবির জানে। আর কেনো তাকে বিয়ে করা হলো এটাও কবির জানে। কবির ই একমাত্র জানে পুরোটা।
” রোজী আপু। আমার ভাইয়া জানে ব্যপারটা। কিন্তু ভাইয়া তো দেশে নেই। মিশনে গেছে। কবে আসবে জানি না।”
” তাহলে সে পর্যন্ত ওয়েট করো। তানভীর ভাই তোমাকে ভালোবাসে লাবিবা। তোমার জন্য আমি তাকে অস্থির হয়ে উঠতে দেখেছি। এতো পাগল! তার সাথে কথা না হলে তুমি ফোন দাও। কথা বলো। তোমার বিয়েতে যদি কোনো ইস্যু থেকেও থাকে সেটা এখন জানলেও যা না জানলেও তা। বিয়ে হয়ে গেছে। তাছাড়া ভাইয়াই তোমাকে বলবে দেখো। সব সময় তার কাছে থাকো দেখবে কথায় কথায় বলে দিবে। সেসব চিন্তা মাথায় নিয়ে নিজেকে পেইন দিও না। তোমার ভাইয়া আসলে এমনিতেও সব জানতে পারবে। তাই বলে কি তুমি ভাইয়ার সাথে ঝগড়া করবে?”
” ঝগড়া করিনি গো।”
” আন্টি আমাকে বলেছেন। তানভীর ভাই মন খারাপ করে চলে গেছেন। তার সাথে কথা বলো। খামখা এতো চিন্তা করো না।”
লাবিবা দু হাত বুকে চেপে ধরে। মনে মনে বলে,” উনার মন খারাপ হবার কারণটাই তো আমার বড় চিন্তা। ভবিষ্যত নিয়ে কেনো এই কথা উনার? মনে মনে কি পরিকল্পনা?”
প্লিজ কেউ ছোট ছোট বলে অভিযোগ করবেন না। আমার লেখা পর্ব মোটেই ছোট মনে করছিনা। গল্পটা থামিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। আমার এখন আর গল্পের পেছনে সময় নষ্ট করার সময়টা নেই বললেই চলে। ফাইনাল পরিক্ষা সামনে।আপনাদের কথা ভেবেই কন্টিনিউ করছি। তাড়াতাড়ি শেষ করতে পারলে করবো নয়তো আবার মাঝপথে থামিয়ে দিতে হবে। প্রায় ডেইলি দিচ্ছি এতেই আমি শুকরিয়া। গল্পটা লিখতে গিয়ে এতোটাই প্রেমে পড়ে গেছি যে ছাড়তেই পারছিনা এতে নিজেরই ক্ষতি জেনেও। সামনে একদিন পর পর ও দিতে পারি। কাহিনী এখনো অনেক বাকি। আশা করি আমার পাঠকরা ধৈর্য্যের সাথে পড়বেন এবং রানিং অবস্থায় পড়বেন একসাথে পড়ার জন্য ফেলে রাখবেন না এতে লেখার তাগিদটা নষ্ট হয়ে যায়। নিয়মিত রেসপন্স করবেন,শেয়ার দিবেন,গল্প অনুযায়ী মন্তব্য করবেন। প্লিজ এড়িয়ে যাবেন না। আপনাদের ভালোবাসায় এখনো কন্টিনিউ করছি নয়তো দু তিন মাসের জন্য বিরতি নিতাম। গল্প সম্পর্কে সমস্ত আপডেট এবং আলোচনায় অংশ নিতে আমার ছোট্ট গ্ৰুপ Labiba’s Tale🧚♀ এ জয়েন করুন।
ধন্যবাদ। লেখিকা – লাবিবা তানহা এলিজা।
ছবিয়াল: তুবা

