#কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
৫.
মাগরিবের নামাজ শেষে মসজিদ থেকে দলেদলে বেরিয়ে আসলো যুবকেরা। ভার্সিটির কেন্দ্রীয় মসজিদে নামাজ আদায় করে সবাই রওনা হলো নিজনিজ উদ্দেশ্যে। তাশদীদের নামাজ তখনে শেষ হয়নি। সালাম ফিরিয়ে মোনাজাত শেষ করলো ও। প্রায় সবার শেষে বেরোলো মসজিদ থেকে। ওযুর পর খয়েরী পান্জাবীর বড় হাতাটা ছেড়ে দিয়েছিলো। সেটা আবারো গুটাতে গুটাতে দ্রুতপদে মেইনগেইটের দিকে এগোলো ও। হঠাৎই এক ছেলে এসে ওর বুকে হাত রেখে ওকে থামিয়ে দেয়। মৃদ্যু আওয়াজে বলে,
– তাশদীদ ভাই না?
ডিপার্টমেন্টের জুনিয়রকে দেখে অবাক হলো না তাশদীদ। একপলক আশপাশে তাকালো ও। পুনরায় সামনেরজনের দিক দৃষ্টি নিয়ে, ওর কাধে হাত রাখলো। ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে মাথা ওপরনিচ করলো। ছেলেটা উত্তেজনা নিয়ে জরিয়ে ধরলো তাশদীদকে। ছেড়ে দাড়িয়ে আবারো বললো,
– আরেহ ভাই আছেন কেমন? ক্যাম্পাসে কখন আসলেন? বলেন নাই কেনো যে ক্যাম্পাসে আছেন?
– একটু কাজে বেরিয়েছিলাম রে। বাড়ি পৌছাতে পৌছাতে জামায়াতের সময় পার হয়ে যাবে, তাই এখানেই পরলাম।
– ভালো করেছেন! চলেন ভাই! আজকে হলে চলেন! আপনার সাথে আড্ডা দেইনা অনেকদিন! আজকে প্রাণখুলে আড্ডা জমাবো চলেন!
তাশদীদ নিশব্দে হাসলো। ছেলেটা আবারো বললো,
– মাস্টার্সের ক্লাস কবে থেকে শুরু আপনাদের? ক্যাম্পাসে নিয়মিত হবেন কবে থেকে? জানেন তাশদীদ ভাই? আপনার ওভারহুয়েল্মিং বাস্কেটবল ইনিংস মিস করছি প্রচন্ড! অনার্সের চারবছরে আন্তঃবিভাগ বাস্কেটবল টুর্নামেন্টের চারটাই তো ডিপার্টমেন্টে দিয়ে গেছেন। মাস্টার্স দুবছরের দুইটাও কিন্তু আমাদেরই লাগবে!
তাশদীদ ছেলেটার উৎসাহ দেখছিলো। ওর চোখের তারায় তাশদীদকে নিয়ে যাওয়ার খুশির ঝলকানি। হবেই বা না কেনো? চারবছরের একাডেমিক ক্যারিয়ারে তাশদীদ রেজাল্টের সাথে আনন্দও কুড়িয়েছে। নিজের জন্য, সবার জন্য। বাসা থেকে ভার্সিটিতে যাতায়াত করলেও, হলের ছেলেদের সাথে পুরো ক্যাম্পাস চরিয়েছে ও। এই সুবিশাল সাতশ একরের একটাএকটা কোনা ওর চেনা। তাশদীদ ঠোঁটের হাসিটা আরো একটু বাড়িয়ে বললো,
– মাস্টার্স অন্য ভার্সিটি থেকে করছি। এখানকার কোনো টুর্নামেন্টে আমার আর থাকা হবেনা।
ছেলেটার চোখমুখের সবটুকো উচ্ছ্বাস খোয়া গেলো। তাশদীদ কাধ উচিয়ে উপায় নেই বুঝালো। ছেলেটা কিছুটা অভিমান নিয়েই বললো,
– কি? আমাদের এমন করে পর বানিয়ে দিলেন ভাই? কাজটা কি ঠিক হলো?
তাশদীদ ছেলেটার কাধে আবারো হাত রাখলো। বললো,
– জেনেবুঝে অবুঝ কেনো হচ্ছিস বলতো? ক্যাম্পাস আলাদা হলেই মানুষ পর হয়ে যায়?
– তবুও! অন্য ভার্সিটিতে যাচ্ছেন কেনো ভাই? এখানে ফ্যাসিলিটিজ কি কোনোঅংশে কম ছিলো?
– পয়তাল্লিশ ব্যাচের সবগুলোকে কাল হলে থাকতে বলিস। আমি যাবো।
প্রসঙ্গ পাল্টে দিলো তাশদীদ। ছেলেটা আর কথা বাড়ালো না। সৌজন্যে মাথা ওপরনিচ করলো। তাশদীদ ওর কাধে চাপড়ে পড়াশোনা নিয়ে আরোদুচারটে কথা বলে বেরিয়ে আসলো ক্যাম্পাস থেকে। মেইনগেইটে এসে মাথা থেকে টুপিটা খুললো। আঙুল চালিয়ে মাথার চুল উল্টে দিলো। বাসের অপেক্ষায় দাড়িয়ে, পকেট থেকে বের করলো ফোনটা। তাশদীদের দৃষ্টি ফোনে ছিলো। হঠাৎ পাশ থেকে শুনতে পেলো,
– ভার্সিটিই বদলে দিলে তাশদীদ? বুদ্ধি মন্দ আটোনি৷ তবে আমার মনে হয় না এতে তোমার খুব একটা লাভ হবে।
তাশদীদ ফোন থেকে চোখ তুলে পাশে তাকালো। মধ্যবয়স্ক লোকটি ওর ডিপার্টমেন্টের স্যার। সৌজন্য হেসে ফোনটা পকেটে পুরলো তাশদীদ। ও কিছু বলার আগেই ভদ্রলোক আবারো বললেন,
– আরেকবার ভেবে দেখতে পারতে।
তাশদীদ কপালের দিকটা একটু চুলকে হাসি আড়াল করলো। পরপরই দৃষ্টি তুলে বললো,
– ইটস ওকে স্যার। আমার মতো এক তাশদীদ আপনাদের আন্ডারে মাস্টার্স না করলে আপনাদেরও কোনো ক্ষতি হবে না। এরকম আরো অনেক তাশদীদ আসবে ক্যাম্পাসে।
ওর জবাবে আরো গম্ভীর হয়ে গেলেন ভদ্রলোক। তাশদীদ একপা এগোলো। উচ্চতায় কাধ বরাবর মানুষটার চোখে চোখ রেখে শীতলস্বরে বললো,
– কিন্তু আপনারা আর কোনো তাশদীদের মেধা চুরি করার সুযোগ পাবেন না। আসি। ভালো থাকবেন। আসসালামু আলাইকুম।
তাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো তাশদীদ। পেছন থেকে ওর চলে যাওয়া দেখলো ভদ্রলোক। যেনো এক দৈববাণী শুনতে পেলো সে, পশ্চিমের প্রান্তে সূর্য ডুবেছে। বিদায় নিয়েছে জ্বলন্ত নক্ষত্র। আরোবেশি তীব্রতা নিয়ে ফিরবে বলে…
•
ভোর সাড়ে চারটা। নির্ঘুম রাতের শেষপ্রহরেও চোখের কোনা বেয়ে জল গরালো তাথৈয়ের। এলোমেলোভাবে হাতপা ছেড়ে দিয়ে শুয়ে আছে ও বিছানায়। পরনে গেন্জি, পাজামা। দৃষ্টি মাথার ওপরের ছাদের দিকে। ঘরের সমস্ত আসবাব পুনরায় ঠিক করে দিয়েছেন তৈয়ব আলফেজ। সময়ের সাথে ঠিক হয়ে গেছে বাকিসবকিছুই। শুধু ঠিক হয়নি তাথৈয়ের মন। যে মন ভেবেছিলো, অনেকবেশি ভালোবাসতে জানা অন্তু কখনো ওকে ছেড়ে যাবে না। সে মনকে ঠকিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করে নিয়েছে অন্তু। এই ঠকিয়ে শব্দটা ভাবতে গেলেও চারপাশ জ্বলে উঠছে ওর। তীরের মতো বিধছে মস্তিষ্কে। মাথার রগ দপদপ করছে। যেনো এই শব্দ অন্তুকে নয়, বরং ওকেই তাক করছে। তাথৈ উঠে বসলো। নাক টেনে, দুহাতে মাথার চুল উল্টে ধরলো। হাতের পিঠে চোখ মুছে, নেমে আসলো বিছানা থেকে। তারপর রুম থেকে বেরিয়ে বাড়ির সম্মুখদিকের ব্যালকনিতে এসে দাড়ালো। সূর্যোদয়ের সময় হয়নি এখনো। কিছুসময় পর তৈয়ব আলফেজ গাড়ি ঢুকলো অম্বুনীড়ে। পুনরায় রাগ হলো তাথৈয়ের। দ্রুততার সাথে নিজের ঘরে চলে আসলো ও। বেডসাইড টেবিলের ওপর থেকে গাড়ির চাবি নিয়ে, বেরিয়ে আসলো ঘর থেকে। সিড়িতে নামার সময় তৈয়ব আলফেজের মুখোমুখি হলো তাথৈ। ওকে আপাদমস্তক দেখে উনি বললেন,
– এসময় কোথায় বেরোচ্ছো?
– এসময় কোথ্থেকে আসছো, এমন কিছু আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করিনি ড্যাড।
জবাব দিতে দিতেই বাবাকে পাশ কাটিয়ে চলে আসলো তাথৈ। দাড়ালো না, বাবার দিকে তাকালোও না। তৈয়ব আলফেজ আজও প্রতিত্তোর করলেন না। মেয়েকে বাসার বাইরে বেরোতে দেখে বুকপকেটে হাত ঢুকিয়ে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার বের করলেন উনি। সিগারেট ধরিয়ে মুখে নিয়ে পা বাড়ালেন নিজের ঘরের দিকে। করিডোরে তুল্যর ঘর পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় দরজা থেকে একবার উকি দিলেন সে ঘরেও। বিছানায় উপুর হয়ে ঘুমোচ্ছে তুল্য। খালি গায়ে। মাথার পাশেই বইখাতা ছড়ানো ছিটানো। তৈয়ব সাহেব চোখ ঘুরিয়ে তাকালেন তুল্যর পড়ার টেবিলে। সেখানে কিছু একটা দেখে মাথা নেড়ে চলে আসলেন তিনি। তুল্যর টেবিলের সামনে একটা কাগজ ঝুলানো। তাতে লেখা ‘Chapter 9=Club 9’ যার মানে, নবম অধ্যায় পড়া শেষে ক্লাব নাইন নামক বারে পার্টি করতে যাবে ও।
তাথৈ গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছে। শেষরাতের ফাকা রাস্তায় অতিদ্রুত ড্রাইভ করছে ও। কানে রিকশা, প্রাইভেট কার, ট্রাকের আওয়াজ আসছে। অসহনীয় লাগছে ওর এই আওয়াজগুলো। সামনে জনশুন্য রাস্তা দেখে আরো গতি বাড়িয়ে দিলো। উদ্দেশ্য, কোলাহলের বাইরে যাওয়া। একটাসময় পর তাথৈ হুট করেই ব্রেক কষে। চারপাশ কিছুটা পরিষ্কার হতে শুরু করলেও, তখনও আশপাশ লক্ষ করেনি ও। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ের দিক তাকিয়ে থাকা অবস্থাতে ওর মনে হলো, ওর কানে এখন গাড়ির হর্ণ না, পাখির কলকাকলি বাজছে। কিচিরমিচির আওয়াজে ওর অশান্ত মনটা আস্তেআস্তে স্বস্তিতে ভরে উঠছে। আস্তেধীরে চোখ তুলে সামনে তাকালো তাথৈ। নিজের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করলো। রাস্তায় বাদিকটায় ওর গাড়ি। ঘনঘন বহুতল ভবন নেই ধারে। ডানপাশের দেয়ালের ওপারে সবুজ মাঠ। তাথৈ বা দিকে তাকালো। এদিকটায়ও দেয়াল তোলা। ওপারে কি আছে, দেখা যায় না। তবে বড়বড় গাছ আছে বোঝা যায়। দুরে একটাদুটো মানুষ যাচ্ছে। লোকজনের আনাগোনা সীমিত৷
গাড়ি থেকে নেমে আসলো তাথৈ। ভোরের বিশুদ্ধ বাতাস গা ছুইয়ে হৃদয় শীতল দিলো ওর। সবুজ চারপাশ ওর চোখের সমস্ত যন্ত্রণাকে ভুলিয়ে দিলো নিমিষেই। পাখিদের আওয়াজ যেনো কর্ণকুহরে স্বাগতবাণীর মতো কুন্জন তুললো। আশপাশ দেখতে দেখতে, খালি পায়ে ফুটপাত দিয়ে হাটতে লাগলো তাথৈ। অম্বুনীড়ের চারপাশে বা গুলশানের রাস্তাগুলোতে দালান আর বিলাশবহুল গাড়ি ব্যতিত কিছুই নজরে পরেনি ওর। বহুদিন নিজের সাথে লড়াইয়ের পর, আজকে এই জায়গাটা যেনো ওকে বুকভরে শ্বাস নিতে বলছে। তাথৈ ফুটপাতের ইটে খালি পা ঘষে। শান্তি পায় না। তবুও পা বাড়ায় সামনে। রাস্তাটা পুর্বমুখী। সুর্যোদয় হলে রোদ বরাবর মুখে লাগবে তাথৈয়ের। সে সময়টা দেখার জন্য আগ্রহী হয় তাথৈ। দালানের ফাঁকফোকড়ে উকি দেওয়া সূর্য আজ সবার আগে ওর চোখেমুখে লাগবে ভেবে এগোতে থাকে। কিন্তু কয়েকপা এগোতেই ‘আহ’ শব্দে চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো ও। আস্তেধীরে চোখ খুলে ডানপা উচালো। উকি দিয়ে পায়েরদিক তাকিয়ে দেখে খালি পায়ে কাটা ফুটেছে। ব্যথার পরিবর্তে তাথৈয়ের তাচ্ছিল্য আসে নিজের ওপর। কতোদিন পর একদিন খালিপায়ে হাটতে বেরিয়েছে, কাটা ফুটে ওকে বুঝিয়ে দিচ্ছে, তোর স্বস্তির কোনো সুযোগ নেই। তাথৈ ওপরে তাকালো। তিনতলা ভবনের গা ছুয়ে বাগানবিলাস। ফুল ফুটে গোলাপী রঙে ছেয়ে আছে বাড়িটা। বাইরের গ্রিলে গোলাপ গাছও আছে। কাটাটা সেটারই। কানে আসলো ওপরতলা থেকে এক বৃদ্ধ স্বর গলা খেঁকিয়ে বলছে,
– বেলা বাড়লে মানুষজন আইবো। ফুলদানিগুলা এখনই পরিস্কার কইরা ফালা মফিজ। কাগজির গাছটাও বাইকা গেছে। একটু গ্রিলের পাশ থাইকা ছাড়ায়া দে।
তাথৈ নিচু হয়ে হাত বাড়ালো পায়ের কাটা বের করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু তার আগেই কেউ একজন ওকে জাপটে জরিয়ে ধরে। কোমড় জরিয়ে, শুন্যে তুলে ঘুরে ওঠে সে মানুষটা। ঠিক তখনই একটা গাছসহ মাটির ফুলদানি ওপর থেকে ওর পুর্বের অবস্থানে পরে, সশব্দে ভেঙে যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় বাহাতে গলা আর ডানহাতে অজ্ঞাতজনের কাধের শার্ট খামচে ধরে তাথৈ। একপা উচিয়ে রাখায় শরীরের সমস্ত ভর ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় সে মানুষটার ওপর। চোখ তুলে তাকায় ওকে জড়িয়ে রাখা মানুষটার দিকে। কিন্তু ভোরের প্রথম আলোতে তার চেহারা দেখেই মাথায় রক্ত চরে যায় ওর। ওকে জড়িয়ে নেওয়া মানুষটা অন্য কেউ নয়, সেরাতে ফ্লাইওভারে ওকে নানান কথায় প্রলোভিত করা যন্ত্রণা, তাশদীদ ওয়াসীর।
তাশদীদ স্তব্ধ। ও কল্পনাও করেনি ওর বাহুডোরে থাকা রমনী কোনোভাবে তাথৈ হতে পারে। সিনিয়র, জুনিয়র, ব্যাচমেটদের জন্য আগেররাতটা জাবির হলেই কাটাতে হয়েছে। সেখান থেকেই বাড়ি ফিরছিলো ও। লোকাল থেকে নেমে এখান থেকে অটোতে যেতে হয় ওদের বাড়ি। কিন্তু এতো সকালে অটো পাওয়া যায় না তেমন। তাই ভোরের সুন্দর পরিবেশটা উপভোগ করতে পায়ে হেটেই রওনা হয়েছিলো ও। হঠাৎ চোখে পরে ওর কিছুটা সামনে খালি পায়ে একটা মেয়ে হাটছে। পরনে কমলা রঙের গেন্জি, ঢোলা পায়জামা। সোজা চুলগুলো ছাড়া। পরিধান বাচ্চাদের মতো বলে, পেছন থেকে দেখে তাশদীদ বুঝে উঠতে পারলো না মেয়েটার বয়স কেমন হবে। হঠাৎই দেখে ওপরতলার একজন টব রেলিংয়ের ওপরে রেখেছে। বাগানবিলাসের বাকানো ডালটা গ্রিলের ফোকড় থেকে বের করার চেষ্টা করছিলো সে। অসাবধানতাবশত টবটায় লেগে ওটা নিচে পরে একদম মেয়েটার মাথার ওপরেই পরতে যাচ্ছিলো। কোনোমতে ছুটে এসে ওকে সরিয়ে নিয়েছে তাশদীদ। তখনও তাথৈয়ের চেহারা দেখেনি ও। কিন্তু কাধে নখের আঁচড়ের জন্য ব্যথা লাগতেই রমনীর মুখের দিকে তাকায়। আটকে যায় তার রুষ্ট দৃষ্টিতে।
ওপর থেকে গোলাপী বাগানবিলাস গায়েমুখে পরছিলো তাথৈ-তাশদীদের। ওটুকো সময়েই তাশদীদ অবাক হয়ে চেয়ে ছিলো তাথৈয়ের দিকে। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে অতি কাছে চলে আসা মেয়েটার বসে যাওয়া চোখে দৃঢ়তা, খোলা চুলে গাঢ় গোলাপী বাগানবিলাস আর রাগে একহাতে শক্তমুঠো করা ওর কলার। ঘুরে উঠে খানিকটা সরে এসেই তাথৈকে নামিয়ে ওর কোমড় ছেড়ে দিলো তাশদীদ। তাথৈ দাঁতে দাঁত চেপে ছলছল চোখে চেয়ে রইলো ওর দিকে। যার মানে, এই ভোরে, এই শহরে, তাশদীদের সাথে দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ চায়নি ও! তাশদীদ নিজেও বিমুঢ়। সারেন্ডার করার মতো করে দুহাত ওপরে তুলে নিলো ও। বললো,
– ওপস্। ভুল করে বাচিয়ে ফেলেছি।
তাথৈয়ের চোখ থেকে একফোটা জল গরায়। রাগে। পা তুলে পায়ের কাটা বের করে ও। তাশদীদ ওর পায়ের দিকে তাকালো। রক্ত বেরোচ্ছে সেখান থেকে। ভেবে নিলো, সে ব্যথাতেই কাদছে তাথৈ। হাত নামিয়ে নিয়ে, ভ্রু কিছুটা কুচকিয়ে বললো,
– সামান্য কাটা ফোটার ব্যথায় কাদছেন৷ সুইসাইড করবেন কিকরে?
পুরোটা কানে গেলো তাথৈয়ের। আবারো তাশদীদের দিকে তাকালো ও। সূর্যোদয় হয়েছে। সকালের প্রথম রোদটাই মুখে পরেছে তাশদীদের। দুইপা এগিয়ে শক্তকন্ঠে বললো,
– আপনাকে বলেছিলাম আমার সামনে না আসতে।
– দেখুন ম্যাডাম, আমি জানতাম না এটা আপনি। আপনি যে পরিমানে সুইসাইডে আগ্রহী, তাতে এতোদিনে তো আপনার পোস্ট সুইসাইড খানাপিনার আয়োজন হয়ে যাবার কথা। তাছাড়া ঢাকার মধ্যে এতো সুন্দরসুন্দর ফ্লাইওভার থাকতে আপনি যে এই আশি বয়সের বুড়োর বারান্দার টবে মাথা ফাটিয়ে মরতে আসবেন, এটাই বা আমি কিকরে জানবো বলুন?
– আপনি…
– পৃথিবীর আটশ কোটির মানুষের মাঝে নিজেকে আর আপনাকে বাদ রেখে, বাকি সাতশ কোটি নিরানব্বই লক্ষ নিরানব্বই হাজার নয়শো আটানব্বই জনের মধ্যে একজনকে ভেবে আপনাকে বাচিয়ে ফেলেছি। এখন আপনি যদি এই হিউজ নাম্বারটাকে টক্কর দিয়ে আমার কোলে উঠে পরেন, সে দায় কার?
তাশদীদের স্বাভাবিক জবাব। তাথৈ কিছু বলতে যাবে, ওপর থেকে আওয়াজ এলো,
– শব্দ কিসের অইলো? কারো মাতায় পরলো নি টব? অ মফিজ? কারো মাতায় ফেললি নাকি?
চোখ তুলে ওপরে তাকালো তাথৈ। তৎক্ষনাৎ এক মাঝবয়সী লোকের মাথা সরে যেতে দেখে। উকি দিয়ে সে ওকে আর তাশদীদকেই দেখছিলো। তাথৈ চেচিয়ে বললো,
– এইভাবে কেউ টব রাখে? কেইস করবো আমি আপনার নামে! পুলিশ এসে কোমড়ে দড়ি দিয়ে টানতে টানতে পুলিশস্টেশনে নিয়ে যাবে, তখন জানবেন কারো মাথায় টব পরেছে কিনা!
তাশদীদ ঠোঁট টিপে হাসলো। ফুঁসে ওঠা মেজাজ নিয়ে তাথৈ ওরদিক ফিরতেই তৎক্ষনাৎ হাতজোড় করে বললো,
– আ্ আমার ভুল হয়েছে। ক্ষমা করে দেন। আর কখনো ভুল করেও আপনাকে বাচাবো না। ইনফ্যাক্ট তার প্রয়োজনই পরবে না। সামনে একটা পথচারীদের ওভারব্রিজ আছে। সেখান থেকে বান্জীজাম্পিং ট্রাই করবেন চলুন। আসুন আপনাকে এগিয়ে…
কথা শেষ করার আগেই তাথৈ দুহাতে ধাক্কা লাগালো তাশদীদের বুকে। অপ্রস্তুত হওয়ায় ফুটপাত থেকে নিচে নেমে যায় তাশদীদ। তাথৈই হনহনিয়ে গিয়ে গাড়িতে চড়ে বসে। তাশদীদ ওর গাড়ির বরাবর দাড়ানো। উচু আওয়াজে বললো,
– জান বাচানোর বিনিময়ে জান লোগে কেয়া?
তাথৈ হাতের পিঠে ভেজা গাল ডলা মারলো। দম নিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলো ও। তাশদীদ হচকিয়ে যায়। দ্রুতগতির গাড়িটা কয়েকসেকেন্ডে একদম কাছে চলে আসে। কোনোমতে হুড়মুড়িয়ে সরে গিয়ে নিজেকে বাচিয়ে নেয় ও। তাথৈ কিছুটাদুরে গাড়ি থামায়। লুকিং মিররে দেখে তাশদীদ বড় দম নিচ্ছে। শার্টের গলার দিকের খোলা বাটনদুটো দিয়ে বুকে ফু নিলো। তাথৈ গাড়ি না ঘুরিয়েই উল্টোদিকে গাড়ি চালাতে লাগলো। তাশদীদের কাছাকাছি এসে গাড়িটা থামালো। তাশদীদ শার্ট ঠিকঠাক করছিলো। সামনে তাকাতেই তাথৈ শান্তভাবে বললো,
– আ’ম নট গোয়িং টু স্পেয়ার ইউ।
মুচকি হাসি দিলো তাশদীদ। তাথৈর গাড়িতে হাত ঠেকিয়ে বললো,
– আমারও মনে হয়না এই থৈ থৈ রাগ থেকে এতো সহজে রেহাই পাবো।
তাথৈ জানালার কাচ তুলে দিলো। হাত সরিয়ে পিছিয়ে দাড়ালো তাশদীদ। গাড়ি ইউটার্ন নিয়ে ঢাকা অভিমুখে রওনা হলো ও। তাশদীদ কিছুক্ষণ প্যান্টের পকেটে দুহাত গুজে দ্রুতগতির গাড়িটা দেখলো। পরে হেসে, মাথা নাড়তে নাড়তে পা বাড়ালো বাড়ির দিকে।
#চলবে…

