প্রেমহিল্লোল||১৫|| #তাসনীম_তামান্না

0
369

#প্রেমহিল্লোল||১৫||
#তাসনীম_তামান্না

একটা মানুষের জীবনে বাবা-মা’র অবদান অতুলনীয় তারা সবসময় নিঃসার্থ ভালোবেসে যায়। পৃথিবীর সকল আবদার তাদের সাথে নিঃকোচ বলা যায়। যারা কিছু বলার আগেই মন বুঝে যায়। তারা এমন মাঝ পথে সন্তানদের নিঃসঙ্গ করে না ফেরার দেশে চলে যায়। তারা একরাশ মায়া, তাদের সাথে কাটানো সৃতি নিয়ে বাকিটা জীবন পার করতে হয়। মাঝেমধ্যে বাচ্চা হয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে অভিযোগের সুর তুলে পরমূর্হুতে মনে পড়ে জন্মালে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে এটাই প্রকৃতির নিয়ম।

পর পর তিনজনের মৃত্যুতে চৌধুরী বাড়ির লোকজন স্তব্ধ শোকাভিভূত হয়ে গেলো। বাবা-মা’কে হারিয়ে নিঃস্ব অনাথ হয়ে গেছে। বাড়ির সবার এক অবস্থা। কুশান আর কুয়াশা চুপচাপ থাকে কেউ কারোর সাথে কথা বলে না। ঠিকমতো খায় না, ঘুমায় না। বাড়ির সবাই জোর করেও কিছু করতে পারে না। তারা যেনো নিশ্চুপ অনুভূতিহীন পাথর হয়ে গেছে।

গভীর রাতে পাখির পানির তেষ্টায় ঘুম ভেঙে গেলো। পাশে কুশানকে না দেখে বারান্দায় গিয়ে দেখলো সেখানের দোলনাতে বসে আছে। দৃষ্টি তার নিকষ কালো অম্বরিতে। পাখি ওর পাশে গিয়ে বসে বলল “এভাবে বসে আছো কেনো? ঘুম নেই, খাওয়া দাওয়া নেই। এভাবে কী জীবন চলে? অসুস্থ হয়ে পড়ছো। তুমি ছাড়া তোমার ছেলেদের কী হবে ভেবে দেখেছো?”

কুশান দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলল “তুমি গিয়ে ঘুমাও। তোমার শরীর খারাপ করবে।”

–আর তুমি? কুয়াশা? কী শুরু করছ তোমরা? একটু স্বাভাবিক হও। তুমি এভাবে আছো ছোট বোনটাকে সামলাবে কে? তোমাদেরকে এভাবে মানাচ্ছে না।

কুশান পাখির কাঁধে নিজের ভর ছেড়ে দিয়ে বলল
–চেষ্টা করছি হচ্ছে কিন্তু পারছি না। নিজেকে কেমন অসহায় লাগছে। বাবা-মা’র কথা খুব মনে পড়ছে তারা কীভাবে আমাদেরকে একা করে চলে গেলো?

–তোমরা একা কে বলল? আমরা সবাই আছি। আমাদের জন্য অন্তত স্বাভাবিক হও। কুশুকে স্বাভাবিক করো। এভাবে থাকলে তো ও ম*রে যাবে।

কুশান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর উঠে রুম থেকে বের হয়ে গেলো। কুয়াশার রুমে গিয়ে দেখলো সবটা অন্ধকার লাইট জ্বালিয়ে দিলো ও রুমে নেয়। বারান্দার ফ্লোরে গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে। ও কুয়াশার পাশে গিয়ে বসতে দেখলো কুয়াশা বিড়বিড় করে কী সব বলছে। “আব্বু আম্মু তোমরা খুব খারাপ। এভাবে চলে গিয়েছ। আমার কথা ভাবলে না। আমার যে কেউ নেই।”

কুশান ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল “আমি আছি তো। সবাই আছে।”

কুয়াশার কোনো সাড়াশব্দ নেয়। কুশান কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলো ওর জ্বর এসেছে। ওকে বেডে নিয়ে আসলো। ভীরু মনে কাঁপা হাতে ওকে ঔষধ খাইয়ে দিলো। পানি এনে জলপট্টি দিলো। জ্বর নামছে না। কুশান ফিরছে না দেখে পাখি কুয়াশার রুমে আসলো “কী হয়েছে ওর?”

–জ্বর এসেছে কিছুতেই নামছে না।

ওরা দু’জন মিলে সারারাত কুয়াশার সেবা করলো। জ্বর নামলেও রুমে না গিয়ে ওর পাশে বসে ঘুমালো। কুয়াশা সকালে ঘুম ভেঙে ওদেরকে পাশে দেখে ভড়কে গেলো।

–এই ভাবিপু! এই ভাইয়া!

ওর ডাকে ওরা ধড়ফড়িয়ে উঠে বলল “কী হয়েছে? বাবুইপাখি, কোথায় কষ্ট হচ্ছে?”

–কী বলছ ভাইয়া? আমার আবার কী হবে? আমি ঠিক আছি। তোমরা এখানে কী করছো?

কুশান ওর কথার উত্তর না দিয়ে জ্বর চেক করে বলল “আর কোনো পাকনামি চলবে না। ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করতে হবে। ঘুমাতে হবে কথার যেনো কোনো হেরফের না হয়।”

কুশান চলে গেলো। ও হা করে ভাইয়ের চলে যাওয়া দেখলো। এমন শক্ত কণ্ঠে কখনো কথা বলে নি। প্রথমবার এমন হওয়ায় হজম করলে সমস্যা হচ্ছে। পাখি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল “কী খাবি বল? ঝাল ঝাল করে নুডলস বানিয়ে দি। জ্বর থেকে উঠে ওটাই ভালো লাগবে। আর শোন বেশিক্ষণ সাওয়ার নিবি না। নাহলে আবার জ্বর চলে আসবে।”

পাখির কথায় ও বুঝলো ওর জ্বর এসেছিলো তাই কুশান এমনভাবে কথা বলছে। দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলল “শুধু শুধু কষ্ট করতে হবে না ভাবিপু। আমার ক্ষুদা নেই। তুমি কুশ, শানকে গিয়ে সামলাও ওরা সারারাত একা ছিলো। তোমার এখানে ছিলে। বাচ্চা দুইটা ভয় পেয়েছে কী না কে জানে!”

–ওরা ঠিক আছে। নাহলে এতোক্ষণে কেঁদে বাড়ি মাথায় তুলতো। আর শুনো, তোমার ভাইয়া কী বলে গেলো? তার কথা শুনবে না? তোমার ভাইয়া কিন্তু রেগে যাবে তখন আমাকে বলতে এসো না।

কুয়াশা চুপচাপ বসে রইলো পাখি চলে গেলো।

বাড়ির তিনজন মানুষের মৃত্যুে পুরো পরিবার চুপসে গেছে। আগে বাড়ির বেশিরভাগ কাজ দুই শাশুড়িই করতো। এখন তুতুল আর পাখির উপরেই সব দায়িত্ব এসে পড়েছে। মুন্নিও স্বামী, জা নামক বোন, ভাসুর নামক ভাই হারিয়ে শোকাভিভূত হয়ে আছে। কোনো দিকে তার খেয়াল নেই। পাখি যথাসম্ভব সকালের নাস্তা তৈরি করলো তুতুলের ঘুম থেকে দেরি হয়ে যাওয়ায় নিচে নামতে দেরি হয়ে গেছে এসে দেখলো পাখির সব কাজ করা শেষ মনে মনে অপরাধ বোধ নিয়ে বলল “সরি, ভাবিপু। আসলে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেছে। তোমার একা কষ্ট হয়ে গেলো।”

পাখি হেসে বলল “কোনো ব্যাপার না। তোমার তো এমনিতেই নতুন বিয়ে আমাকেও এমন সময় মা, ছোটমা রান্নাঘরেই ঢুকতে দিতো না। কয়েকদিন আগ অব্দি ও রান্নাঘরে আসতাম না। কিন্তু তুমি শাশুড়ি আদর কম পেলে। এমন একটু আধটু দেরি হলে আমি কিছু মনে করবো না তাই বলে প্রতিদিন এমন করো না আমি একা পেরে উঠবো না। ছেলে দু’টোকে নিয়ে হিমসিম খাবো।”

–ঠিক আছে ভাবিপু। তুমি যাও কুশ, শানকে ঘুম থেকে তুলো। আমি টেবিলে খাবারগুলো সার্ভ করছি।

পাখি চলে গেলো। তুতুল শাশুড়ির খাবার তার রুমে নিয়ে গেলো। তিনি অতিরিক্ত প্রেশারে বিছানা সোজ্জায়। তুতুল ওনাকে জোর করে খাইয়ে ঔষধ খাইয়ে দিলো। মুন্নি আগে কখনো বউদের সাথে খারাপ ব্যবহার করতো না তবে ইদানিং অসুস্থতায় তিনি খারাপ ব্যবহার করে ফেলে ওরা দুবউ সেটা বুঝতে পারে। ওরাও সে কথা গায়ে মাখে না। মেঘ, কুশান মুন্নির হয়ে বার বার বউদের কাছে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চায়।

সকালে সকলে খাবার টেবিলে উপস্থিত হয়েছে অনেকদিন পর এমন দৃশ্য তবে সেখানে চারজন মানুষ অনুপস্থিত। খালি চেয়ারগুলোর দিকে তাকিয়ে তারা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো। দোয়া ছাড়া কিছু করার নেই তাদের। কুয়াশা তেমন খেতে পারলো না কুশানের খাবার শেষে ও বলল “ভাইয়া, আমি বিয়ে করতে চাই!”

উপস্থিত সকলে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এমন পরিস্থিতিতে কুয়াশার এমন কথা কেউ আশা করে নি। কুশান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল “হুম, দিবো।”

–যত তাড়াতারি সম্ভব

–সুপাত্র খুঁজতে তো সময় লাগবে। তেমন ছেলে পেলে, তোর পছন্দ হলে রাজী থাকলে বিয়ে হবে।

–ছেলে খুঁজেতে হবে না। রাজকেই বিয়ে করবো।

সকলের মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়লো। যে মেয়েটা রাজকে বিয়ে করবে না বলে কান্নাকাটি জুড়ে দিয়ে ছিল আজ তাকে বিয়ে করতে রাজী হয়ে গেলো কী কারণে এমন পরিবর্তন? কেউ বুঝতে পারছে না কুয়াশার কী হয়েছে? এমন সিদ্ধান্তের কারণ কী? কুয়াশা কী শোকে পাগল হয়ে গেলো?

চলবে ইনশাআল্লাহ

গল্পটি সম্পর্কে রিভিউ, আলোচনা, সমালোচনা করুন আমাদের গ্রুপে। গ্রুপ লিংক নিচে দেওয়া হলোঃ
https://facebook.com/groups/holde.khamer.valobasa/

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here