#প্রেমহিল্লোল||১৬||
#তাসনীম_তামান্না
পরিবেশ কয়েক মুহুর্তের জন্য থমথমে হয়ে উঠলো। কারোর মুখে কোনো শব্দ নেই। তারা আসলে বুঝতে পারছে না কুয়াশার এমন সিদ্ধান্তে কী বলা উচিৎ। কিন্তু কুশান মেজাজ হারিয়ে তেতে উঠে বলল “তুই যা চাইবি তাই হবে না-কি? একবার বলেছিস রাজকে বিয়ে করবি না মেনে নিয়েছি। আবার রাজকে বিয়ে করবি বলে লাফাচ্ছিস। কী চাইসিস তুই?”
–বললামই তো রাজকে বিয়ে করতে চাই। তোমাদের কষ্ট কমিয়ে দিতে চাইছি। তা-ও এমন করছ কেনো? রাজ একটু খারাপ তবে মানিয়ে নিবো সমস্যা নেই।
–তোর সমস্যা না থাকলেও আমার সমস্যা আছে। ওমন ছেলের সাথে আমি তোর বিয়ে দিব না। আর না তুই বিয়ে করবি।
পাখি অবস্থার বেগতিক দেখে ওদেরকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলল “প্লিজ শান্ত হও তোমরা। কুয়াশার এমন সিদ্ধান্তের কারণ কী? সেটা না জেনে চিৎকার চেচামেচির করে কোনো লাভ আছে?”
কুশানের কাছে পাখির কথা যুক্তি সংযত মনে হলো বলল “রাজকেই কেনো বিয়ে করতে চাস?”
কুয়াশা রোবটের মতো করে বলল
–তোমাদের কষ্ট কমাতে যত দ্রুত সম্ভব চলে যেতে চাই।
কুশান আবারও মেজাজ হারিয়ে ফেললো
–দেখছো নাটক করছে ও সবসময় কাহিনী না করা অব্ধি ওর মুখ দিয়ে কথা বের হয় না। কার কাছে কী জিজ্ঞেসা করবো? ও যা মনে করবে সেটাই ও করবে। এখন তো বাবা-মা ও নেই। আমি ও ওর কেউ না। আমার কথা কেনো মানবে ও?
ভাইয়ের কথার বাণে কুয়াশার চোখ জোড়া ছলছল করে উঠলো দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলল “আব্বুর শেষ ইচ্ছা ছিলো রাজের সাথে আমার বিয়ে দিবে। আব্বুর ইচ্ছা আমারও সেটাই ইচ্ছা।”
কুশান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল “তোর মাথায় এসব ফালতু কথা কে ঢুকিয়েছে?”
–কেউ না আমি নিজের ইচ্ছেতেই বলছি।
–পাখি তোমার ননদ যে পাগল হয়ে গেছে সেটা প্রমাণ করতে বারণ করো আমি কিন্তু বারবার মেজাজ ঠিক রাখতে পারব না। যা বলার সরাসরি বলতে বলো এমন অর্ধেক কথা শুনতে ইচ্ছে করছে না। আর বলতে ইচ্ছে না করলে আমার চোখের সামনে থেকে যেতে বলো। কোনো রাজ টাজের সাথে বিয়ে হবে না।
কুয়াশা হুট করে চিৎকার দিয়ে বলল “তোমার ভাব বেড়ে গেছে ভাইয়া? এমনভাবে কথা বলছ কেনো? আমার জীবনের সব সিদ্ধান্ত কী তুমি নিবে? আমার কোনো দাম নেই মতামত নেই?”
–না নেই তোর এমন ফালতু, ভেল্যুলেস সিদ্ধান্ত কেউ জানতে চাই নি। আর বাবা কখনো বলে নি রাজের সাথেই তোর বিয়ে হবে। বাবা আমাকে যা বলার বলে গেছে আর সেটাই হবে।
কুয়াশা চোখের পানি মুছে ভুরু কুঁচকে বলল “কী বলে গেছে আব্বু? আমাকে নিয়ে বলেছে? কী বলেছে?”
–তোকে বিয়ে দিতে বলেছে কিন্তু সেটা রাজের সাথে নয়।
–তুমি মিথ্যা বলছ! রাজের সাথে বিয়ে করতে দিবে না বলে মিথ্যা গল্প বানাচ্ছ! আমি বুঝতে পারবো না ভেবেছ? বোকা বানাচ্ছ আমাকে?
–তোকে কিছু বলার নেই আমার। যে বোঝে না তাকে শত বুঝিয়েও লাভ নেই।
কুশান চলে গেলো রুমে। পাখিও স্বামীর পিছনে পিছনে গেলো। মেঘ এগিয়ে এসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল “কী হয়েছে সোনা? এমন বিহেভ করছিস কেনো? ভাইয়া কষ্ট পেয়েছে না? মাথাটা ঠান্ডা করে ভাব। মৃত মানুষের নামে ভাইয়া মিথ্যা কথা বলবে? তা-ও কিনা সে বাবা। ভাইয়াকে এতোটাও অবিশ্বাস করিস না।”
তুতুল বলল “একজ্যাক্টলি! ভাইয়া তুমি বাবা-মা দুজনকেই হারিয়েছ। বাড়ির কারোরই মনমেজাজ ভালো নেই। ভাইয়াও তোমার এমন ব্যবহার নিতে না পেরে একটু রাগ করেছে। তুমি একটু বোঝার চেষ্টা করো অবুঝের মতো করছ কেনো? হঠাৎ!”
–তুই নিজের মাথায় ভাব। কী চাস? কোথায় ভুল হচ্ছে। তারপর যদি তোর মনে হয় তুই ভুল করেছিস। ভাইয়ার কাছে গিয়ে সরি বলে আসিস। ভাইয়া বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারবে না।
মেঘ বাড়ির বাইরে চলে গেলো। মেঘা দুদিন আগে শশুড়বাড়িতে চলে গেছে। তুতুল এঁটো থালাগুলো জড়ো করে রান্নাঘরের কাজে লেগে পড়লো। কুয়াশার কী যেনো হলো। দাঁড়িয়ে থেকে দুনিয়ার সব কথা ভেবে ফেললো। তার যে ভুল হয়েছে সেটাও বুঝতে পারলো। ভাইকে কীভাবে দোষারোপ করলো! কথা শোনালো! নিশ্চয়ই সে কষ্ট পেয়েছে তার এমনভাবে কথাগুলো বলা ঠিক হয় নি। চোখ দিয়ে অর্নগল পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। পানি মোছার বৃথা চেষ্টা করে ভাইয়ের রুমের উদ্দেশ্য গেলো।
কুয়াশা ওদের রুমের সামনে এসে ওদের কথোপকথন শুনে দাঁড়িয়ে গেলো। পাখি কুশানকে বলছে “বাবা তো একদম সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে গেছে। তুষার ছেলে হিসাবেও ভালো কোনো খারাপ দিক চোখে পড়ে নি আজ অবধি।”
–কিন্তু এটা কখনো সম্ভব নয় পাখি।
–কেনো সম্ভব নয়? চাইলে সবই সম্ভব!
–তুমি বুঝতে পারছো না। বাবা প্রথমে ওদেরকে রিজেক্ট করে দিয়েছিলো। কুয়াশাকে দূরে পাঠাবে না বলে আমিও আমার বোনকে অতো দূরে পাঠিয়ে ঠিক থাকবো?
–দেখো কুশান চাইলে সবই সম্ভব। আজকালর যুগে ভালো ছেলে খুঁজে পাওয়া খুবই দুষ্কর। সেখানে আত্মীয়দের মধ্যে আত্মীয় করলে আরো সেটা ভালোই হবে তুষার ভালো ওর বাবা-মা সবাই ভালো কুয়াশা ওদের সাথে ভালো থাকবে। তুষারের বাবা-মা’কে দেখলে না বিয়ের প্রস্তাব না করে দেওয়ার পরও কেমন স্বাভাবিক ব্যবহার করছিলো। তাছাড়া বাবাও শেষ মুহূর্তে এসে তুষারকে কুয়াশার বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে।
–আমরা মেয়ে পক্ষ হয়ে প্রস্তাব পাঠাবো? কুশুও তো রাজি ছিলো না।
–আচ্ছা, আমি বলি এখনই বিয়ে বিয়ে করে লাফিয়ো না। বিয়ে দেওয়া তো পালিয়ে যাচ্ছে না। তোমরা নিজেদেরকে একটু সামলিয়ে উঠো। তারপর বিয়ের কথা ভেবো। তাছাড়া পরপর তিনজনের মৃত্যুর পর বিয়ের কথা উঠালে বাইরের লোকজন জানলে কী বলবে? অফিস নিয়ে কিছু ভেবেছ? তুমি আর মেঘ দুজনেই এবার বাবাদের ব্যবসাটা ধরো। নাহলে তো ব্যবসা ডুববে।
–ঠিকই বলেছো। তোমরা কুশুটাকে বুঝিও পাগলিটার মাথায় যে মাঝেমাঝে কী পাগলামি চাপে। এসবের জন্য না ভুল কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে জীবনটা নষ্ট করে না ফেলে।
–তুমি চিন্তা করো না আমরা সবাই আছি কুয়াশাকে সামলে নিবো। বাচ্চা অবুঝ ঠিক হয়ে যাবে। শোকে আছে কী থেকে কী করবে বুঝতে পারছে না জ্বরে ভুল বকছে। ওর কথায় কষ্ট নিও না।
–আমি ওর কথায় কষ্ট পাই নি। শুধু ওকে নিয়ে টেনশন হয়। আমারই তো বোন। ওকে বুঝি আমি। বাবা-মা ছাড়া সব কিছু এলোমেলো লাগছে। কী থেকে কী করবো বুঝতে পারছি না কিছু। খুব অসহায় লাগছে।
কুয়াশা আর কিছু শুনতে ইচ্ছে করলো না। ধীর পায়ে প্রস্থান করলো রুমে গিয়ে চুপচাপ বসে রইলো। কী হচ্ছে তার সাথে? ভাগ্য তার সাথে লুকোচুরি খেলছে। এর শেষ কোথায়? কার সাথে জুড়বে ভাগ্য?
চলবে ইনশাআল্লাহ
গল্পটি সম্পর্কে রিভিউ, আলোচনা, সমালোচনা করুন আমাদের গ্রুপে। গ্রুপ লিংক নিচে দেওয়া হলোঃ
https://facebook.com/groups/holde.khamer.valobasa/

