#শুনলাম_বসন্ত_নাকি_আবার_এসেছে
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান
#পর্বঃ৮
কেবিনে প্রগাঢ় নিস্তবতা ৷ তুবা আর স্বাধীন মুখোমুখি বসে আছে ৷ স্বাধীন মুখের হাসি গায়েব করে প্রফেশনাল মুডে এসে গেল ৷ গলা খাকারি দিয়ে বলতে লাগল,,,
আপনার এই সমস্যার সূত্রপাত কবে থেকে? আপনার আব্বু আম্মুর থেকে শুনেছি সব তবুও আপনার মুখে আবারও শুনতে চাচ্ছি ৷
তুবা কিছু পল চুপ করে থাকল ৷ তারপর লম্বা করে একটা শ্বাস নিয়ে বলতে লাগল,,,
আমার বয়স তখন ৭ কি ৮ ৷ দাদুর সাথে মিলে আমি পার্কে ঘুরতে গিয়েছিলাম ৷ এটা আমাদের প্রতিদিনকার রুটিন ছিল ৷ বিকেল হলে দুজনে চলে যেতাম পার্কে আড্ডা দিতে কিন্তু ভাবিনি এই পার্কে যাওয়া আমাদের জীবনে অমানিশা ডেকে আনবে ৷
স্বাধীন মনোযোগী শ্রোতার ন্যায় তুবার দিকে তাকিয়ে আছে ৷ তুবা কিছুক্ষণ শ্বাস নিয়ে পুনরায় বলতে লাগল,,,
পার্ক থেকে বেরিয়ে সামনে একটা আইসক্রিমের দোকান চোখে পড়তেই আমি আইসক্রিম খাওয়ার জন্য জেদ করছিলাম ৷ দাদু আমাকে পার্কের সামনে দাঁড় করিয়ে দোকান টার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল ৷ এ সময় একটা মালবাহী ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সেদিক দিয়েই যাচ্ছিল ৷ হঠাৎ এমন ঘটনায় দাদু কি করবে বুঝে উঠার আগেই ট্রাক টা আমার দাদুকে আমার চোখের সামনে পি*ষে…….
তুবার গলা কেঁপে উঠল , চোখের কর্ণিশ বেয়ে নোনাজল গড়িয়ে পড়তে লাগল ৷ স্বাধীন এক গ্লাস ঠান্ডা পানি ওর দিকে নিঃশব্দে বাড়িয়ে দিল ৷ তুবা তৎক্ষণাৎ গ্লাস টা নিয়ে ঢকঢক করে পানি খেতে লাগল ৷ অতঃপর কম্পিত গলায় বলে উঠল,,,
তখন থেকেই ট্রাকের হর্ণ আমার কানে আসলেই আমি দাদুর চরিত্রে রুপান্তরিত হয়ে যাই ৷
বলে তুবা মাথা নিচু করে নিশ্চুপ কাঁদতে লাগল ৷ স্বাধীন একটা রুমাল ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল,,,
নিন চোখের পানি মুছুন ৷
তুবা এক পলক স্বাধীনের মুখের দিকে তাকিয়ে ওর বাড়িয়ে রাখা হাত থেকে রুমাল টা নিয়ে নিল ৷ স্বাধীন তুবাকে একটু স্বাভাবিক করতে ইচ্ছা করে বলে উঠল,,,
একটা কথা চোখের পানি মুছুন ঠিক আছে ৷ নাকের সর্দি যেন মুছে ফেলবেন না ৷
তুবা হতভম্ভ দৃষ্টিতে স্বাধীনের দিকে তাকাল ৷ স্বাধীন পুনরায় বলে উঠল,,, আপনি যদি চশমা পড়তেন তাহলে হয়তো মাইন্ড করতাম না কিন্তু যেহেতু চশমা পড়েন না তাই ভুলেও সর্দি মোছার কথা কল্পনাতেও আনবেন না ৷
তুবা নিজের হতভম্ভ ভাব কাটিয়ে দু*ষ্টু হাসল ৷ তারপর শব্দ করে টেনে টেনে নাকে যত সর্দি ছিল সব স্বাধীনের রুমালে মুছে ফেলল ৷ স্বাধীন চোখমুখ কুঁচকে বলল,,,
ছিহ!
তুবা ৩২ পাটি দাঁত বের করে রুমালটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,,, এই নিন সাইকো সাহেব আই মিন সাইক্রিয়াটিস্ট সাহেব আপনার রুমাল যেটা আমার ডায়মন্ডের চেয়েও দামী সর্দি দিয়ে মোড়ানো ৷
স্বাধীন হাত উচিয়ে বলল,,, রেখে দিন ৷ এটা আমার পক্ষ থেকে আপনার জন্য ছোট্ট উপহার ৷ প্রথমবার আমার চেম্বারে এসেছেন গিফট তো দিতেই পারি ৷
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
সিনু আর তানিয়া ডায়নিং টেবিলে খাবার সাজাচ্ছে ৷ তানিয়া খাবার সাজানোর পাশাপাশি হাক ছেঁড়ে বলতে লাগল,,,
জমিদারের বংশধররা তোমাদের ছুটি শেষ হয়েছে সেটা ভুলে যেও না ৷ দ্রুত নিচে আসো ৷ ভার্সিটিতে কি তোমাদের হয়ে সিনু আর আমি যাব?
চার ভাই বোন হুড়মুড় করে সিড়ি বেয়ে নামতে লাগল কারন ওরা বুঝে গেছে ওদের মায়েরা ক্ষে*পেছে ৷ সবাই ভার্সিটির জন্য তৈরি হয়েই এসেছে ৷ আয়েশা আর সাভাশ থার্ড ইয়ারে, তুষার সেকেন্ড ইয়ারে আর শেহনাজ সবেমাত্র কলেজ লাইফে পদার্পন করেছে ৷ সবাই ডায়নিং টেবিলে গিয়ে বসে পড়ল ৷ শেহনাজ বেছে বেছে তুষারের পাশের সিট টাতেই বসেছে ৷
সাজিদ আর মেহমেতও চলে আসল ৷ পরিবারের সব সদস্য উপস্থিত আছে ৷ খাওয়ার পাশাপাশি সাজিদ বাচ্চাদের উদ্দেশ্য করে বলল,,
ভার্সিটিতে এমন কোনো কাজ করো না যেন বাসায় রিপোর্ট চলে আসে ৷
আয়েশা তৎক্ষণাৎ বলে উঠল,,, সেটা সাভাশকে ভালো করে বলো বাবা ৷ তুষার আর আমার জন্য তোমাদের কোনোরুপ ভো*গান্তিতে পড়তে হবে না গ্যারান্টি দিচ্ছি ৷
সাজিদ ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল,, শোনো সাভাশ ভার্সিটিতে তোমাকে পড়াশোনা করার জন্য পাঠিয়েছি ৷ ক্লাসমেট , জুনিয়র কিংবা সিনিয়রদের সাথে ঝা*মেলা করার জন্য পাঠাইনি ৷
সাভাশ খাবার খেতে খেতে বলল,,, আমি জানি বাবা কিন্তু কেউ যদি আমার বোন তো দূর অন্য কোনো মেয়েদের নিয়ে কোনো বা*জে উক্তি করে আমি ছেড়ে কথা বলব না!
মেহমেত উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলে উঠল,,, একদম ওগুলোকে মে*রে হাড়গোড় ভে*ঙে দিবি ৷ Whatever কম করে হলেও এক মাসের জন্য যেন ট্রমায় থাকে ৷
সাজিদ চোখ পাকিয়ে তাকাতেই মেহমেত এদিক ওদিক তাকাতে লাগল ৷ তানিয়াও ওর দিকে গরম চোখে তাকিয়ে আছে ৷ সাজিদ গম্ভীর গলায় বলে উঠল,,,
বিভিন্ন ভাবে একটা বিষয় হ্যান্ডেল করা যায় ৷ সবসময় যে ঝুঁ*কিপূর্ণ রাস্তাই বেছে নিতে হবে তা না ৷ শান্তিপূর্ণ ভাবেও একটা বিষয় সামলানো যায় ৷
মেহমেত বিরবির করে বলল,,, হ্যাঁ তুই তো খুব ঠান্ডা মাথায় কাজ করতি! Whatever আমার ভাতিজা কিন্তু তোরই রক্ত অতএব তোর মতোই আচরণ করবে ব*লদ!
ডায়নিং টেবিলে আবারও নিরবতা নেমে আসল ৷ সাভাশ শুরু থেকে যেভাবে খাচ্ছিল এখনও সেভাবেই খাচ্ছে ৷ ও আদৌই বাবার বলা কথাগুলো মানবে কিনা আল্লাহ মালুম!
খাওয়া দাওয়া শেষে সবার থেকে বিদায় নিয়ে চার ভাইবোন বাইরে চলে আসল ৷ সাভাশ আর তুষার নিজেদের বাইক বের করল ৷ শেহনাজ ছুটে গিয়ে তুষারকে হাসি হাসি মুখে বলল,,,
আপনার বাইকের পিছনে বসি?
তুষার শেহনাজের আগ্রহী মুখটার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,, জ্বি না ৷ আমার বউ ছাড়া আমার বাইকের পিছনে ওঠার অধিকার কারো নেই ৷
বলেই তুষার বাইক স্টার্ট করে মেইনগেট পেরিয়ে গেল ৷ সেদিকে তাকিয়ে থেকে শেহনাজ বলে উঠল,,, সে তো আমাকেই বসাতে হবে ৷ তাহলে এখন এতো নাটক করে লাভ কি তুষার ভাই?
এমন সময় সাভাশের গলা ভেসে আসল,,, শেজু দ্রুত আয় ৷ তোকে কলেজে ড্রপ করে দিই ৷ ড্রাইভার আঙ্কেল এখনও আসেননি অসুস্থতার কারনে ৷ তাই আজ আমার সাথেই যেতে হবে তোকে ৷
শেহনাজ দ্রুতপদে ভাইয়ের কাছে চলে গেল ৷ বাইকে উঠে বসতেই সাভাশ বাইক স্টার্ট দিতে উদ্যত হলেই আয়েশা দু হাত মেলে বাইকের সামনে গিয়ে পথ আটকে বলল,,,
আজব আমি কিভাবে যাব? আমাকে ফেলে যাচ্ছিস কোন সাহসে?
সাভাশ কাটকাট গলায় বলল,,, কোনে ঝ*গড়ি মহিলাকে আমি আমার বাইকে বসাব না ৷ সর বা*ল সামনে থেকে ৷
সাভাশের বাচ্চা বেশি বাড়াবাড়ি করবি না বলে দিলাম!
করব তাতে তোর কি?
শেহনাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল দুই ভাই-বোনের ঝ*গড়া দেখে ৷ অতঃপর সাভাশের কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,,, ভাইয়া আপুকেও সাথে নাও ৷
সাভাশ হতাশ শ্বাস ফেলে আয়েশার দিকে তাকিয়ে বলল,,, উঠে পড় ৷
আয়েশা দাঁত কেলিয়ে বাইকে উঠে পড়ল ৷ তা দেখে সাভাশ ব্যঙ্গ করে বলল,,, আকাশে উড়ার দরকার নেই বোনু বলেছে জন্য বাইকে চড়ার অনুমতি দিয়েছি নয়তো তোর মতো কুমড়োপটাশ কে আমার বাইক তো দূর স্টোর রুমে পড়ে থাকা আমার পুরনো সাইকেলেও উঠাতাম না!
একদম পরিষ্কার পিচ ঢালা রাস্তা দিয়ে বাইক ছুটে চলেছে ৷ এই ১৮ বছরে বাংলাদেশের বেশ উন্নয়ন হয়েছে ৷ এখন আর যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখা যায় না ৷ তার পাশাপাশি মানুষও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বেশ সচেতন হয়ে উঠেছে ৷
তখনের অ*পমানের বদলা নেওয়ার জন্য আয়েশা মুখ থেকে সেন্টার ফ্রুট বের করে সেটা সাভাশের চুলে আটকে দিল ৷ ফ্রন্ট মিররে সেটা খেয়াল করে সাভাশ ব্রেক কষল তারপর অত্যন্ত গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল,,,
আয়েশা বাইক থেকে নাম ৷
বাইক থেকে নামব মানে?
নামতে বলেছি বে*য়াদব!
ভাইয়ের ধ*মকে আয়েশা চট জলদি বাইক থেকে নেমে পড়ল ৷ ও নামার সাথেই সাভাশ সর্বোচ্চ স্প্রিডে বাইক স্টার্ট করে সেখান থেকে চলে গেল ৷ আচমকা এমন হওয়ায় আয়েশা হতভম্ভ হয়ে গেল ৷ হুশ ফিরতেই ও দাঁতে দাঁত চেপে বলল,,,,
সাভাশের বাচ্চা দেখে নিস একটা ডা*য়নির সাথে তোর বিয়ে হবে যার চোখ হবে গরুর মতো টানা টানা, চুল হবে ঝাড়ুর মতো সিল্ক, ঠোঁট হবে বাঁন্দরের পা*ছার মতো লাল আর চেহারা হবে জ*লহস্তির মতো চিকন! সারাজীবন জামাই বউ কয়লার খনিতে কাজ করে ম*রিস ব*লদের ব*লদ!
চলবে,,,,,

