#শুনলাম_বসন্ত_নাকি_আবার_এসেছে
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান
#পর্বঃ৭
পুরো রুম ভার হয়ে উঠল তুবার কান্নার আওয়াজে ৷ সাভাশের কথা শোনার পর থেকেই ও গলা ফাটিয়ে কান্না করা শুরু করে দিয়েছে ৷ তানজিদ কোনোভাবেই মেয়েকে সামলাতে সক্ষম হচ্ছে না ৷ অন্যদিকে সবাই অ*গ্নিদৃষ্টিতে সাভাশের দিকে তাকিয়ে আছে তবুও সাভাশ নির্লিপ্ত ভাবে দাঁড়িয়ে আছে যেন ও কিছু করেই নি ৷
ছেলের এমন আচরণ দেখে সিনু লম্বা লম্বা পা ফেলে সাভাশের কাছে গিয়ে ওর কান টেনে ধরে বলল,,, অ*সভ্য ছেলে এসব মিথ্যা কথা বলতে তোমার লজ্জা করল না?
আয়েশা গলা উচিয়ে বলল,,, মাম্মা তুমি মনে হয় ভুলে গেছো যে তোমার ছেলের লজ্জা নেই ৷
মেয়ের কথায় মনোযোগ না দিয়ে সিনু আরো জোরে সাভাশের কান টেনে ধরে বলল,,, তুবার কাছে ক্ষমা চাও বলছি ৷ এক্ষুণি চাবে ৷
সাভাশ অনিচ্ছা সত্ত্বেও তুবার দিকে তাকিয়ে আফওয়ান বলল ৷ এতে করে তুবার কান্নার বেগ কিছুটা কমে গেল ৷ সাভাশ চাপা আ*র্তনাদ করে বলল,,,
মাম্মা ক্ষমা চেয়েছি তো ৷ এখন অন্তত কান ছেড়ে দাও ৷ ব্যা*থা পাচ্ছি ৷
সিনু সাভাশের কান ছেড়ে দিল ৷ সাভাশ চোখমুখ কুঁচকে কানে হাত বোলাতে লাগল ৷ তুবার দিকে খানিকটা এগিয়ে গিয়ে সিনু নরম স্বরে বলতে লাগল,,,
তুমি তো সাভাশকে চেনোই ও কেমন ৷ ওর কথা একদম বিশ্বাস করবে না ৷
ক্রন্দনরত চোখে সিনুর কথা শুনে তুবা শান্ত হলো ৷ হঠাৎ সামনের দিকে তাকাতেই দেখল সাভাশ শব্দ না করে মুখ নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলছে,,, মাম্মা মিথ্যা বলছে , বিশ্বাস করিস না ৷ আমি যেটা বলছি সেটাই সত্যি ৷
তা দেখে তুবার ঠোঁট কাঁপতে লাগল অর্থাৎ আরো একদফা জোরে কান্না করার পূর্ব প্রস্তুতি শুরু হতে লাগল ৷ সাভাশ ওর অবস্থা দেখে নিঃশব্দ হাসতে লাগল ৷ আচমকা পাশে তাকাতেই সাভাশের মুখের হাসি হাওয়ায় মিলিয়ে গেল ৷ সাজিদ ওর দিকে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছে ৷ তা দেখে সাভাশ ঢোক গিলে মাথা নিচু করে ফেলল ৷
সাজিদ ছেলের থেকে মুখ ঘুরিয়ে তুবাকে উদ্দেশ্য করে শান্ত স্বরে বলল,,, এতোগুলো মানুষের কথা বিশ্বাস না করে তুমি ওই আ*হাম্মকের বিশ্বাস করছো? আমরা কি কখনো তোমাকে মিথ্যা কথা বলেছি মা?
তুবা অস্ফুট স্বরে মাথা নাড়িয়ে বলল,, না ৷
তাহলে কান্না থামিয়ে মুখে হাসি ফোটাও ৷
তুবা এবার সামান্য হাসল ৷ তা দেখে সবাই স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলল ৷ অন্যদিকে সাভাশ ওই যে মাথা নিচু করেছে এখনও তোলেনি ৷ তানজিদ তুবার মাথায় হাত রেখে বলল,,,
আজ তোমাকে একজন নতুন সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে নিয়ে যাব ৷ এবার ইং শা আল্লাহ তুমি একদম সুস্থ হয়ে যাবে মামনি ৷
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
এক বেলা তানজিদদের বাড়িতে থেকে হাসান পরিবার নিজেদের বাড়িতে চলে গেছে ৷ বর্তমানে ড্রয়িংরুমে বসে সবাই বিকেলের নাস্তা করছে ৷ অবশ্য সাভাশ সবার থেকে দূরে আলাদা একটা জায়গায় বসে বাদাম খাচ্ছে ৷ বাদাম ওর সবচেয়ে পছন্দের তাই সবসময় বাদাম খায় ৷ এছাড়াও ওর আরেকটা গুণ আই মিন দোষ হচ্ছে ও পরিবারের সাথে আড্ডায় বসে না ৷ কেউ অসুস্থ হলে অন্য ব্যাপার যেমনটা তুবার পার্সোনাল ডিসঅর্ডার কিন্তু বাকি সময় একলা থাকতেই বেশি পছন্দ করে ৷
সাভাশ ব্যতীত বাকিরা একসাথে বসে খাওয়ার পাশাপাশি গল্পগুজব করছে ৷ এমন সময় সিনুর ফোনটা বেজে উঠল ৷ ফোনের স্ক্রিনে তাকাতেই ওর মুখে মুচকি হাসি ছড়িয়ে পড়ল ৷ ফটাফট ফোন রিসিভ করে বলতে লাগল,,,
আরে ক্যারাটে কুইন কি অবস্থা তোর? ওখানে সব ঠিকঠাক? নাভিন ভাইয়াকে ডাক্তার দেখিয়েছিস?
অপর পাশ থেকে রাইমা রহমান বলে উঠল,,, আলহামদুলিল্লাহ্ উনার কোনো রোগ নেই ৷ সামান্য প্রেসার বেড়েছিল আর কিছু না ৷
যাক একটু স্বস্থি পেলাম ৷ তোরা সিলেট থেকে কবে আসবি ৷
কাল বা পরশু ৷ উনাকে ডাক্তার দেখানোর চক্করে তুবার এই খারাপ সময়ে ওর পাশে থাকতে পারলাম না ৷
সমস্যা নেই ৷ তোর কাছে তো উপায় ছিল না ৷ তা বান্ধবী দ্রুত চলে আয় সিলেট থেকে ৷
রাইমা, সিনু, তানিয়া আর রাইশা ছোট থেকে বেস্ট ফ্রেন্ড ৷ আল্লাহর রহমতে ওদের বিয়েও প্রায় কাছাকাছি জায়গায় হয়েছে ৷ তানিয়া আর সিনু তো দুই জা ৷ রাইশার বিয়ে তানিয়ার ভাইয়ের সাথে হয়েছে আর রাইমার বিয়ে সিনুর দুর সম্পর্কের ভাইয়ের সাথে হয়েছে ৷
সিনু ফোন কেটে দিল ৷ অতঃপর পুনরায় সকলের সাথে আড্ডায় মেতে উঠল ৷
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
তুবা বর্তমানে একজন সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে এসেছে ৷ ও অবশ্য বাইরে বেঞ্চে বসে আছে ৷ ভিতরে তানজিদ আর রাইশা সাইক্রিয়াটিস্টের সাথে কথা বলছে ৷ কিছুক্ষণ পর ওরা কেবিন থেকে বাইরে এসে তুবাকে একলা ভিতরে পাঠিয়ে দিল ৷ তুবা দরজার নক করে বলল,,,
আসতে পারি?
একটা ভরাট গলার কন্ঠস্বর ভেসে আসল,, ইয়েস কাম ইন ৷
যুবকটা অন্যদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে ৷ তুবা ভেবেছিল বয়স্ক কেউ হবে কিন্তু যুবক কাউকে দেখে খানিকটা অবাক হয়েছে বটে ৷ নির্দিষ্ট আসনে বসে ও কেবিন টা ভালোমতো দেখতে লাগল ৷ টেবিলে দেখতে পেল লেখা আছে ‘ডক্টর স্বাধীন মুত্তাকী’ ৷ এরই মাঝে স্বাধীন চেয়ার টেনে ওর সামনে বসে পড়ল ৷ প্রথমবারের মতো চোখাচোখি হতেই স্বাধীন আর তুবা হতভম্ভ হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকল ৷
তুবা বিরবির করে বলল,,, আরে এনার সাথে তো আমার ঝ*গড়া অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে ৷ ইশশ এ্যা*টাক টা একটু পরে হলে ঝ*গড়া টা কমপ্লিট করা যেত ৷
স্বাধীন গলা খাকারি দিয়ে বলল,,, সেদিনের আচরনের কারনটা আজ বুঝলাম ৷ আপনার হঠাৎ আচরণে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমি একজন সাইক্রিয়াটিস্ট ৷
তুবা জোরপূর্বক হাসল ৷ কিন্তু মনে মনে বলল,,, কারন আপনি গা’ধা!
স্বাধীনকে দেখে খানিকটা বিব্রত মনে হচ্ছে যদিও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নিজের বি*ব্রতিভাব কাটিয়ে উঠেছে ও ৷ তুবার সাথে ও কথা বলতে যাবে এমন সময় একজন চশমা পড়া বৃদ্ধ লোক কেবিনে ঢুকে পড়ল ৷
স্বাধীন আর তুবা উনার দিকে চকিতে তাকাল ৷ বৃদ্ধ লোকটি সামান্য হেসে বলল,,, আফওয়ান এভাবে ঢুকে পড়ার জন্য ৷ কিন্তু তোমার সাথে কিছু জরুরি কথা ছিল বাবা ৷
স্বাধীন তড়াক করে বসা থেকে উঠে অমায়িক হাসি হেসে বৃদ্ধ লোকটার কথা শুনতে লাগল ৷ এমনকি তার সাথে হাসি ঠাট্টাও করল ৷ কয়েক মিনিট পর বৃদ্ধ লোকটি যেতে ধরলে স্বাধীন পিছন থেকে বলল,,,
আমার জন্য বাইরে অপেক্ষা করুন ৷ আজ একসাথে ডিনার করব ৷
স্বাধীনের ঠোঁটের কোণে এখনও হাসি লেপ্টে আছে ৷ তুবা কৌতূহল বশত জিজ্ঞাসা করল,,, উনি আপনার কে হন?
কেউ না ৷ উনাকে কোনোদিন দেখেছি কিনা সন্দেহ ৷
তুবা অবাক হয়ে বলল,, কেউ না মানে? আপন মানুষ ছাড়া এতোটা ক্লোজ আচরণ কেউ কারো সাথে করার কথা না ৷
স্বাধীন চোখের চশমা টা ঠিক করে অত্যন্ত সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল,,, আসলে চশমা পড়া কাউকে দেখলে আমার তাকে খুব আপন আপন লাগে ৷ মনে হয় তার সাথে আমার আত্মার সম্পর্ক রয়েছে ৷ ইচ্ছা করে তাকে জরিয়ে ধরে থাকি , তাকে নিজের বাসায় নিয়ে গিয়ে রাখি , একসাথে বসে আড্ডা দিই,খাওয়া দাওয়া করি ৷
তুবার চোয়াল ঝুলে গেল ৷ বিরবির করে বলতে লাগল,,, সাইক্রিয়াটিস্টের দেখছি নিজের ই একটা সাইক্রিয়াটিস্ট দেখানো জরুরি ৷ বাবা কার কাছে নিয়ে এলো আমাকে!
তুবাকে বিরবির করতে দেখে স্বাধীন ভ্রু কুঁচকে বলল,,, কিছু বললেন?
তুবা স্বাভাবিক হয়ে বলল,,, বলেছি কিন্তু আপনার শোনার মতো কিছু বলিনি ৷ এই কথা টা আপনার শোনা নি*ষিদ্ধ ৷
চলবে,,,,,,

