#শুনলাম_বসন্ত_নাকি_আবার_এসেছে
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান
#পর্বঃ২৯
হাসান ভিলাকে বাইরে থেকে যেমনটা শান্ত দেখাচ্ছে ভিতরে ঠিক ততটাই গরম হয়ে আছে ৷ সাভাশের কথায় সবাই বেশ ক্ষে*পে গেল ওর উপর ৷ কিন্তু তুবা যখন ওর কথাটাকে পাত্তা দিল না তখন সবাই সাভাশ কে ক্ষণিকের জন্য মাফ করে দিল ৷ তুবা সাভাশের কথাকে হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলল,,,
তুই আর ভালো হবি না রে সাভাশ? সবসময় একটা বাজে কথা না বললেই নয় তাই না?
সাভাশ বিরবির করে বলল,,, আমাকে নাম ধরে ডাকার সাহস কোথায় পেলি তুবার বাচ্চা! শুধু তুই নরমাল হ তোকে দেখাব মজা ৷
তুবা ক্ষণকাল চুপ থেকে বলে উঠল,,,, বাবা তুমি এসে তোমার বউয়ের পাশে বসো দেখি ৷ তোমাদের দুজনকে একটু মন ভরে দেখি ৷
বারিশ সাথে সাথেই গলা খানিকটা উচিয়ে বলল,,, নাহ! স্বাধীন বসতে পারবে না ওর পাশে ৷
এতো চিন্তার মধ্যেও সবাই মুখ লুকিয়ে হাসল ৷ তুবা অবাক হয়ে বলল,,,
কেন বসতে পারবে না?
বারিশ থতমত খেয়ে গেল ৷ কি উত্তর দেওয়া উচিত ওর? কিছুক্ষণ চুপ থেকে মনে মনে উত্তর সাজিয়ে নিয়ে ও গলা খাকারি দিয়ে বলে উঠল,,,
আই থিংক বড়দের সামনে ওদের একসাথে না বসাই ভালো ৷ বিষয়টা কেমন হয়ে যায় ৷
তুবা মাছি তাড়ানোর মতো করে বলল,,, তো আমাকে কি তোমার কচি খোকা মনে হচ্ছে? এখানে সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তি আমি ৷ তাই কোনো সমস্যা হবে না ৷
কথাটা বলে তুবা গিয়ে স্বাধীনের হাত ধরে ওকে আয়েশার পাশে এনে বসিয়ে দিল ৷ তৎক্ষণাৎ বারিশ ওদিকে এসে স্বাধীনের কানে কানে ফিসফিস করে বলল,,,,
আমার বউয়ের শরীরে যদি সুই পরিমাণ স্পর্শও লাগে তাহলে তোমার বউকে আমি ম্যানহোলে ফেলে দিয়ে আসব!
স্বাধীনও ফিসফিস করে সাথে সাথেই উত্তর দিল,,, তার দরকার পড়বে না ৷ কারন তোমার বউ চশমা পড়ে না যে আমি তার সাথে মাখোমাখো সম্পর্ক বানাতে যাব!
বারিশ ওর কথার মানে বুঝল না তাই ওর ভ্রু কুঁচকে গেল ৷ হঠাৎ আয়েশা ধীর কন্ঠে বলে উঠল,,,
এইই আপনারা তখন থেকে কি ফুসুরফুসুর করছেন? তুবা যদি বুঝে ফেলে তখন কি হবে? বারিশ স্যার আপনি দূরে যান ৷
বারিশ গম্ভীর মুখে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অন্যদিকে চলে গেল যদিও ওর কঠিন দৃষ্টি তুবা আর স্বাধীনের উপরই নিবদ্ধ ৷ স্বাধীন একপলক তুবার গদগদ হওয়া মুখটার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলল,,,
এটাই হয়তো পৃথিবীর প্রথম বউ যে কিনা নিজের স্বামীকে অন্য একটা মেয়ের পাশে বসিয়ে খুশিতে বাকবাকুম হয়ে গেছে ছ্যাহ!
তুবা মুগ্ধ নয়নে ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকল ৷ কিছু একটা ভেবে ওর ভ্রু কুঁচকে গেল ৷ কাটকাট গলায় বলে উঠল,,,
আজব তোমরা এতো দূরে দূরে বসে আছো কেন? লজ্জা পেতে হবে না ৷ একটু কাছাকাছি বসো ৷ তোমারই তো বউ নাকি?
বারিশ গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,,,খবরদার নাহ! আই থিংক এটা অতিরিক্ত হচ্ছে ৷
তুবা কপাল কুঁচকে বলল,,, তোমার কি সমস্যা বলো তো? বারবার আপত্তি করছো কেন?
উ*ত্তেজিত হয়ে কথাটা বলে তো ফেলেছে ও কিন্তু এখন কি জবাব দিবে? বারিশ চুপ করে থাকল ৷ ওর ভীষণ রাগ হচ্ছে তাই মনে মনে কোনো উত্তর ভাবতে পারছে না ৷ তা দেখে তুবা পুনরায় বলে উঠল,,,
এই ভালো কথা তুমি কে? তোমাকে তো কোনোদিন দেখি নি ৷
এবার সাজিদ শান্ত স্বরে বলে উঠল,,, ও আমার বড় আম্মুজানের স্বামী ৷ কাল তুবার পাশাপাশি আয়েশারও বিয়ে হয়েছে ৷
মেহমেত সাজিদের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল ৷ ও সাজিদের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,,,
বাহ সাব্বাশ ৷ Whatever এবার আয়েশাকে হাজির করতে বললে তুই কাকে ধরে আনিস সেটাই দেখব আমি ৷ এবার তো আমার ছেলেও কোনো বুদ্ধি দিতে পারবে না ৷
সাজিদের কপালে আসলেই চিন্তার ভাঁজ পড়ে গেল ৷ ওদের চিন্তাকে সত্য করে দিয়ে তুবা বলে উঠল,,,
তা আয়েশা মাকে দেখছি না যে ৷ কোথায় ও?
বারিশের এমনিতেই মেজাজ খারাপ হয়ে আছে ৷ তুবার প্রশ্ন শুনে সেটা আরো বেড়ে গেল ৷ ও অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলে উঠল,,,,
আমার বউকে আমি লুকিয়ে রেখেছি যেন কেউ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা না করে বুঝেছেন?
তুবা সন্দিহান দৃষ্টিতে বারিশের দিকে তাকাতেই রাইমা বলে উঠল,,,
আরে তুবা ধুররর আঙ্কেল আপনি আয়েশার কথা বাদ দিন ৷ আয়েশা কিছু কাজের জন্য ভার্সিটিতে গিয়েছে ৷ কাজ হলেই চলে আসবে ৷
তুবা অবাক হয়ে বলল,,, বিয়ের পরের দিনই ভার্সিটিতে যাওয়ার কি প্রয়োজন ছিল?
রাইমা এবার কথা হারিয়ে ফেলল ৷ বউকে দ্বিধান্বিত হতে দেখে নাভিন স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,,,
ইয়ার চেঞ্জ পরীক্ষা সন্নিকটে ৷ তাই বিয়ের দিন হলেও ভার্সিটি মিস দেওয়া যাবে না ৷ আই হোপ ইউ ক্যান আন্ডারস্ট্যান্ড ৷
তুবা হেসে উঠে বলল,,, ভার্সিটির অন্যতম লেকচারার যখন বলেছে তাহলে ঠিকই বলেছে আর ইংরেজিতে বলেছে মানে তো হান্ড্রেট পার্সেন্ট ঠিক বলেছে ৷
না চাইতেও সবাই সামান্য হাসল কিন্তু বারিশের মুখ গম্ভীর ৷ ওর দৃষ্টি স্বাধীন আর আয়েশার মধ্যবর্তী দুরত্বের দিকে ৷ পরিবেশ কিছুটা নিরব হওয়ার পর তুবা বলে উঠল,,,
স্বাধীন বাবা তুবার কাঁধে হাত রাখো তো ৷ আমি তোমাদের একটা ছবি তুলে রাখি ৷ বুড়ো হয়েছি বলে ভেবো না যে আমি ছবি তুলতে পারব না ৷
বারিশ আর সহ্য করতে পারল না , ব*জ্রনি*নাদ করে বলে উঠল,,,, যথেষ্ট হয়েছে ৷ আর বরদাস্ত করব না আমি! এসব বন্ধ করুন ৷ আই থিংক এখানেই এসব বন্ধ না করলে আমি যা কিছু করে দিতে পারি ৷
তুবা কপট রাগ দেখিয়ে বলল,,, এই নতুন জামাই তোমার সমস্যা কি বলো তো? এমনভাবে রিয়েক্ট করছো যেন এটা তোমার বউ! এএ কেউ ওর বউকে ওর কাছে এনে দাও তো, বেডা বউয়ের শোকে কাতর হয়ে গেছে ৷
আয়েশা ঘোমটার নিচে ক্রমাগত রাগে গজগজ করতেছে ৷ ও দাঁতে দাঁত চেপে বিরবির করে বলতে লাগল,,,,
সাভাশের পাশাপাশি আরও একজনকে কয়লার খনিতে রেখে আসতে হবে দেখছি!
বারিশ বহুকষ্টে নিজের রা*গ নিয়ন্ত্রণে আনল ৷ কিন্তু অন্য একজন বেশ ক্ষে*পে গেছে বোঝাই যাচ্ছে ৷ তুলি বেগম খে*কিয়ে উঠে বললেন,,,
এই বুড়ো অনেক হয়েছে নাটক ৷ বাচ্চারা ক্লান্ত ৷ ওদের একটু রেহাই দিন নয়তো আপনার এমন হাল করব যে কাউকে মুখ দেখানোর মতো অবস্থায় থাকবেন না!
তুবা এবার দমে গেল ৷ অসহায় মুখে ছেলে আর ছেলের বউয়ের দিকে তাকাল ৷ তানজিদ আর রাইশা চিন্তিত মুখে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে ৷ ওরা তুলি বেগমকে ইশারায় কিছু বলতেই উনি তুবাকে টেনে গেস্ট রুমের দিকে চলে গেলেন ৷ তুবা চলে যেতেই আয়েশা ঘোমটা তুলে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল ৷
স্বাধীন তরিৎ বেগে আয়েশার পাশ থেকে উঠে পড়ল তারপর সকলকে উদ্দেশ্য করে বলল,,,,
আপনারা চিন্তিত হবেন না ৷ আমাদের শুধু তুবার আচরণগুলো সামলাতে হবে বুদ্ধিমত্তার সাথে পাশাপাশি আমার ট্রিটমেন্ট তো আছেই ৷ আশা করছি অন্যবারের তুলনায় এবার আরো তাড়াতাড়ি তুবাকে নরমাল করতে পারব আমরা ইং শা আল্লাহ ৷
সবাই সম্মতি জানাল আর স্বাধীন বিরবির করে বলল,,, নরমাল তো হতেই হবে কারন আমার বাসর এখনও বাকি রয়েছে ৷ বিছানার ফুলগুলো মনে হয় শুকিয়েই গেল রে!
সবাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে যে যার ঘরের দিকে চলে যেতে লাগল ৷ সকলের একটু বিশ্রাম নেওয়া অতীব জরুরী ৷ স্বাধীন ধীর পায়ে বারিশের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,,,
ব্রাদার রিল্যাক্স ৷ আমি তোমার বিষয়টা বুঝতে পারছি ৷ তোমার জায়গায় আমি থাকলেও ঠিক একই কাজটাই করতাম ৷ কিন্তু কি করার আছে? একটু কোয়াপারেট করো ৷
বারিশ বড় করে একটা শ্বাস ফেলে বলল,,, ওকে ৷ কিন্তু আমার বউকে নিয়ে টানা হেঁচ*ড়া আমি স*হ্য করব না ব্রাদার ৷
স্বাধীন মুচকি হেসে বলল,,, ওকে ব্রাদার বুঝেছি ৷
স্বাধীন চলে গেল ৷ বারিশ কিছুপল আয়েশার দিকে তাকিয়ে থেকে দোতলায় চলে গেল ৷ কাল রাতে খুব একটা ঘুম হয়নি ওর ৷ একটু বিশ্রাম প্রয়োজন ৷
সাভাশ এখনও বাদাম খাচ্ছে ৷ ও তড়াক করে আয়েশার পাশে বসে টিটকারি দিয়ে বলল,,,
ভাচাকে কিভাবে পটালি রে? তোকে স্বাধীন ভাইয়ার সাথে দেখে যা জ্ব*লছিল না! আজকের বিনোদন টা দারুন লাগল ৷
আয়েশা চোখমুখ কুঁচকে বলল,,, ওসব জ্ব*লা টলা কিছু না ৷ কাল রাতে মেঝেতে ঘুমাতে হয়েছিল জন্যে আজ অল্পতেই ক্ষে*পে যাচ্ছিল!
কি রেএএ! তুই বারিশ স্যারকে মেঝেতে ঘুমাতে দিয়েছিলি? যার রুম , যার বিছানা তাকেই নিচেতে ঘুমাতে হয়েছে? ছিহ এসব অনাচার মেনে নেওয়ার মতো না!
এতোই যখন দরদ উতলে পড়ছে তাহলে নিজের রুমে নিয়ে গিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দে যাহ!
সাভাশ ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলল,,,সর বা*ল আমার বউয়ের জায়গা তোর ভাচাকে দিতে পারব না ৷
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
আয়েশা বি*রক্তি মাখা মুখে নিজের রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দিল ৷ কিন্তু বিছানায় ঘুমন্ত মানুষটার দিকে চোখ পড়তেই ওর ভ্রু কুঁচকে গেল ৷ বারিশ কপালে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে ঘুমাচ্ছে ৷
আয়েশা ত্রস্ত পায়ে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,,, এই এইই আপনি আমার বিছানায় শুয়েছেন কোন সাহসে?
বারিশ অলরেডি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে তাই আয়েশার কথা ওর কানে গেল না ৷ আয়েশা বেশ কয়েকবার বলার পরও যখন কোনো জবাব পেল না তখন ও হুঁশ জ্ঞান হারিয়ে বারিশকে ঝাকাতে লাগল ৷ এক পর্যায়ে ঝাকাতে ঝাকাতে আয়েশা বারিশকে বিছানা থেকে নিচে ফেলে দিল ৷ অবশ্য আয়েশা সেটা ইচ্ছা করে করেনি ৷ ও হতভম্ভ হয়ে জিহ্বায় কা*মড় দিল ৷
বারিশের ঘুম ছুটে গেছে ৷ ও আ*র্তনাদ করে বলে উঠল,,, আল্লাহ ভূমিকম্প এসেছে নাকি?
বারিশ চট জলদি মেঝে থেকে উঠে দরজার দিকে দৌঁড়াতে লাগল ৷ আয়েশা আহাম্মক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে আছে ৷ বারিশ সত্যি সত্যি রুম থেকে বেরিয়ে গেছে ভূমিকম্প হচ্ছে ভেবে ৷
কিছুক্ষণ পর বারিশ মাথা চুলকাতে চুলকাতে রুমে প্রবেশ করে বলল,,, ভূমিকম্প তো ছিল না তাহলে পড়লাম কিভাবে?
হঠাৎ আহাম্মক হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আয়েশার দিকে চোখ যেতেই ও ওর প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেল ৷ বারিশ কটমট চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,,,,
তুমিই আমাকে ফেলে দিয়েছো তাই না?
আয়েশা নিজের হতভম্ভ ভাব কাটিয়ে গলা খাকারি দিয়ে বলল,, আমার রুমে কি করছেন আপনি? তার চেয়েও বড় কথা আমার বিছানায় শুয়েছেন কোন সাহসে?
তোমার রুমের বিছানায় ঘুমাব না তো শ্বশুড় শ্বাশুড়ির রুমে গিয়ে বসে থাকব বেআক্কল? কাল রাতে তুমি যে আমার বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে নাক ডেকে ডেকে ঘুমালে আমি কি কিছু বলেছি?
আয়েশা রে*গে গিয়ে বলল,,,কে নাক ডাকে? মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছেন কেন?
আমি মিথ্যা কথা বলি না ৷ আর হ্যাঁ আমাকে ফেলে দেওয়ার শা*স্তি হিসেবে তোমাকে আমি ইয়ার চেঞ্জ পরীক্ষার আগ পর্যন্ত সকাল বিকাল পড়াশোনা করাব ৷ এবার দেখব কি করো তুমি!
আয়েশার মুখটা এক চুটকিতেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল ৷ করুন কন্ঠে বলতে লাগল,,,,
আমি বিছানায় শুই আর আপনি আমাকে বিছানা থেকে ফেলে দিন ৷ শোধবোধ হয়ে যাবে ৷ তবুও আমাকে পড়াশোনার মতো এতো অ*শ্লীল কাজ করতে বলবেন না বারিশ স্যার!
চলবে,,,,,

