প্রেম_অপ্রেম_অধ্যায় |১১| #আফরিন_আলম_মৌনি.

0
496

#প্রেম_অপ্রেম_অধ্যায় |১১|
#আফরিন_আলম_মৌনি.

_
ফাল্গুন মাস মানেই যেন প্রেমের মাস৷ ষড়ঋতুতে বসন্তের ছোয়া লাগতেই ঝলঝমলিয়ে ওঠে যেন কপোত-কপোতীদের মধুর প্রেম গুলো। বসন্তের মন মাতানো প্রকৃতিতে যেন সবসময় প্রেম প্রেম ভাব উড়ে বেড়ায়। একদিকে বসন্তের মন মাতানো প্রকৃতি অন্যদিকে প্রেমের এমন মোহনীয় রুপ এসবের জন্যই বোধহয় বসন্ত বাঙালিদের কাছে অত্যাধিক প্রিয়৷ আজকাল যেদিকেই চোখ যায় যেন কপোত-কপোতী জুগলের দেখা মিলে। এই যেমন মৌনি ব্যস্ত পায়ে ব্যস্ত সড়কের ফুটপাত ধরে হাটতে হাটতে দেখতে পেল একজোড়া কপোত-কপোতী রাস্তার পাশে ফুচকার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে। অল্পবয়সী ছেলে মেয়ে দুটো স্বামী স্ত্রী মনে হয়৷ মেয়েটার গায়ে শাড়ি, চুড়ি আর নাকফুল দেখে অন্তত তাই মনে হলো। তারা হাসাহাসি করছে। তবে ফুচকা খাচ্ছে শুধু মেয়েটাই৷ মেয়েটা খাচ্ছে আর ক্ষণে ক্ষণে ছেলেটাকে সাধছে। তবে সে মনে হয় ফুচকা খায়না৷ নাক মুখ কুচকে মুখ সরিয়ে নিচ্ছে৷ একসময় মেয়েটা সুজোগ বুঝেই ছেলেটার গালে একটা ফুচকা ঢুকিয়ে দেয়৷ ছেলেটা ফেলতে না পারে নাক মুখ কুচকে গিলে নিল। তবে পরক্ষণেই ভয়াবহ রকমের রেগে গেল৷ তবে সেটা স্ত্রীর উপর নয়৷ ফুচকাওয়ালার উপর। ঝাল বেশি কেন দিয়েছে সেটা নিয়েই বকে যাচ্ছে। ছেলেটা বোধহয় ঝাল খেতে পারেনা, মূহুর্তেই ভয়াবহ রকমের পরিবর্তন হলো তার মুখয়াবে। হয়তো ঝালে তার এলার্জি জাতীয় কিছু আছে। তাই স্বামীর পরিবর্তনে মেয়েটা অস্থির হলো মেয়েটি। আর মৌনি দু চোখ ভরে তাদের মধ্যেকার ভালোবাসা দেখল। মা-বাবা পরে মনে স্বামী/স্ত্রী একটা মানুষের পূর্ণাঙ্গ পরিপূরক হয়। একসময় মা-বাবার কাছে সন্তান যেমন খোলা পাতার মতো হয়, পরবর্তী সময়ে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের কাছে খোলা পাতার মতো হয়। মৌনির দর্শন হলো বিয়ে পর নিজের জীবনসঙ্গী ছাড়া আপন আর কেউ হতে পারে না। মা মারা যাওয়ার পর মৌনি মনে মনে এই আপন মানুষটার সান্নিধ্যে আশা করেছে। তবে সে ভুল মানুষের জন্য ভুল আশা করে ফেলেছিল। সেই আশা এখন ধোয়াশা ছাড়া আর কিছুই নয়।

মৌনি দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে সামনে হাটা ধরলো। পরপর দুইটা টিউশানি করতে হবে আজ। সে ভুলেই বসেছিল ওই কপোত-কপোতী জুগলকে দেখে। আজ আবার দেরি না হয়ে যায়। মৌনি দ্রুত সামনের দিকে হাটা ধরল।

________

মৌনি মাত্রই একটা টিউশানি শেষ করে বেরিয়েছে
।টিউশানি থেকে বেরোতে না বেরোতেই বৃষ্টি নামল ঝমঝমিয়ে৷ সকালে যখন বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল তখন আকাশ ফকফকা পরিষ্কার ছিল। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে আবহাওয়ার এহেন ভোলবদলে তব্দা খেয়ে গেল মৌনি। এই আবহাওয়া ক্ষণে ক্ষণেই তাকে চমক দিচ্ছে। সকালে দুই জায়গায় টিউশানি৷ অথচ একজায়গায় মাত্র পড়িয়েছে। এখন যে মুষুলধারে বৃষ্টি পড়ছে এই বৃষ্টি মাথায় আর কোনো জায়গায় যাওয়াও মুশকিল। অথচ আজ যাওয়াটা তার জন্য ফরজ হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ কারণ সে কাল মিস দিয়েছে। এভাবে একটানা দুইদিন মিস দেওয়া বড়ই বেমানান দেখায়। মৌনি এখন কি করবে ভেবে পেল না। চিন্তিত বদনে বৃষ্টি দেখতে লাগল। না, এভাবে আর কতোক্ষণ অপেক্ষা করবে সে৷ এভাবে অপেক্ষা করলে অযথাই সময় চলে যাবে। বৃষ্টি থামার নামও তো নিচ্ছেনা। তার কাছে না আছে ছাতা না আছে টাকা৷ টাকা থাকলে অন্তত একটা গাড়িতে যাওয়া যেত। তার থেকে ভিজে ভিজে যাওয়াটাই শ্রেয়। মৌনির ঘাড়ে একটা টটো ব্যাগ। ব্যাগটা রুবির ব্যবহৃত। তবে পুরনো হলেও কাজের ভীষণ। এই যেমন এখন ওয়াটারপ্রুফ এই ব্যাগটাই তার বইগুলোকে বৃষ্টির হাত থেকে বাচাবে। নিজে ভিজলেও সমস্যা নেই। তবে ব্যাগটা ভিজলে মহা সমস্যা।

মৌনি বিল্ডিং থেকে একদৌড়ে বেরিয়ে গেইটের কাছে এলো। তবুও অনেকখানি ভিজে গেল। গেইটের কাছে দারোয়ান বসে ঝিমুচ্ছে। তাকে দেখেই মৌনির অন্য আরেকটা খেয়াল এলো। সে দারোয়ানকে আওয়াজ দিল,
“ এই যে চাচা শুনছেন? আপনার কাছে কি একটা ছাতা হবে? ”

দারোয়ান তার লাল চোখ মেলে তাকালেন। রুক্ষ্ম গলায় বললেন,
“ না হবে না। ”

“ আচ্ছা বড় পেপার জাতীয় কিছু হবে। আমায় আরেক জায়গায় পড়াতে যেতে হবে চাচা। এই বৃষ্টির মধ্যে যাওয়া যাচ্ছে না। ”

“ না নেই। ”

তার উত্তর শুনেই মনে হলো মৌনির কথার বিশেষ পাত্তা দিচ্ছে না তিনি। মৌনির মনটা খারাপ হয়ে গেল। সবাই তার প্রতি এতো অবহেলার নজরে দেখে কেন বুঝে পায় না সে। তার গায়ে কি লেখা আছে সে গরিব? নাকি এই পোষাকের কারণে বুঝে ফেলে সবাই? কি জানি?

“ এই যে আন্টি, তাড়াতাড়ি এটা নাও। ”

বাচ্চা বাচ্চা কন্ঠস্বরটা কানে পৌছুতেই মৌনি দৃষ্টি নিচু করল। স্কুল ড্রেস পড়ুয়া, ছাতা মাথায় দুটো ছোট ছোট ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।
তারা মৌনির দিকে একটা ছাতা এগিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মৌনি বিস্মিত হলো। ছেলেদুটো তাকে ছাতাটা ধরার জন্য তাড়া দিচ্ছে। কারণ তাদের মর্নিং স্কুল। আর স্কুলের বাস চলে যাচ্ছে।
মৌনি বিস্মিত কন্ঠে বলে,
“ এটাতো আমার নয় বাবু। তুমি এটা আমাকে দিচ্ছ কেন? ”

“ না না এটা তোমারই। ভুল করে বাড়িতে ফেলে এসেছ? ”

“ তোমার কোথায় ভুল হচ্ছে বাবু। আমি কোনো ছাতা বাড়িতে ফেলে আসেনি। ”

“ না না এটা তোমারই। এটা ধরো তো তাড়াতাড়ি। তুমিও ভিজে যাচ্ছ আর আমরাও। শীঘ্রি ধরো। ”

“ তোমাদের ভুল হচ্ছে বাবু। এটা আমার নয়। ”

“ ওই আংকেল টা যে বলল এটা তোমার। ”
অপর বাচ্চাটির কথায় মৌনির ভ্রু দ্বয়ের মাঝে সূক্ষ্ম ভাজ পড়ল। কোন আংকেলটা জিজ্ঞেস করতে যাবে তার আগেই দেখল অপর বাচ্চাটি তার বাহুতে খোচা মেরে চুপ থাকতে বলছে তাকে। মৌনি আর প্রশ্ন করার সুজোগ পেল না। তার আগেই বাচ্চাটি তার হাতে ছাতাটা ধরিয়ে দিয়ে প্রস্থান করল। হতচকিত মৌনি গলা উচিয়ে শেষ প্রশ্নটা করেই ফেলল,

“ আরে কোন আংকেলটা দিয়েছে বলে তো যাও? ”

বাচ্চাটি তেমনই উচু গলায় তড়িৎ জবাব দিল,
“ ওই যে তোমার বর আংকেলটা।

__

ছাতাটা পেয়ে মৌনির উপকারই হলো। তবে সে চিন্তার অতল সাগরে ডুব দিল। বাচ্চাদুটো ছাতা দিয়ে যাওয়ার আগে কি বললো? ছাতাটা আমার বর দিয়েছে। আমার আবার বর এলো কীভাবে? ওহ হ্যাঁ, আমার তো একটা কাগজে কলমের বর আছে। এক নাম্বারের ইতর, বাটপার, অসভ্য বর। অবশ্য এখন আর তাকে বর বলে মনে হয় না। তার কথা মনে করতেও ইচ্ছা হয় না। এমন একটা ইতরমুখো মানুষের জন্য আমি তিনটে বছর অপেক্ষা করে ছিলাম সেটা ভাবলেই গা গোলায়। ছি! মানুষটা কি নিচ মানসিকতার। তবে সেদিন একটা বারের জন্যও মানুষটাকে এতোটা ইতর মনে হয়নি। মনে হয়নি তার মধ্যে মানুষ্যত্বজ্ঞান নেই৷ সেদিন সে আমাদের কাছে দেবদূতের মতো ছিল। ক্ষণিকের পরিচিত মানুষটা মা’কে আর তাকে যেভাবে আগলে রেখেছিল তাদের আপনজনেরাও এমন ভাবে আগলে রাখেনি তাদের। একজন পরিপূর্ণ পুরুষ মানুষ মনে হচ্ছিল তাকে৷ অথচ সেদিনের নিষাদ আর আজকের নিষাদের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। মৌনির তো এখন মাঝেমধ্যে মনে হয় পুরো নিষাদটাই পাল্টে গিয়েছে৷ আজকের নিষাদকে ইমম্যাচুয়্যার, মেরুদন্ডহীন এক পুরুষনানুষ বলে মনে হয়। সময়ের পরিবর্তন মানুষকে এতোটা পরিবর্তন করে দিতে পারে সেটা জানা ছিল না আমার। আচ্ছা সময় না হয় মানুষের আচরণ গুলোকে পরিবর্তন করে দিতে পারে, কিন্তু তার পেশা! সেদিন তো সে ডাক্তার ছিল আজ সে স্টুডেন্ট হলো কীভাবে? মানুষের তো প্রমোশন হিয় এর ডিমোশন হলো কীভাবে? ডাক্তার থেকে স্টুডেন্ট এটা কেমন কথা!

নিষাদের ব্যাপারে ভাবতে না চাইলেও মনের মধ্যে মৌনির এই খচখচানিটা থেকেই যায়। মৌনি বেশিক্ষণ কিউরিওসিটি নিয়ে থাকতে পারে না৷ তাই এখন এই প্রশ্নর উত্তরটা সে জানতে চাই-ই চাই। কিন্তু কীভাবে? আগের দিন বিলুর কথা শুনে মনে হচ্ছিল ও নিষাদদের ব্যাপারে অনেক কিছুই জানে৷ আমি বরং একবার ওর কাছে জিজ্ঞেস করবো।

“ বৃষ্টির মাঝে পথ চলতে গিয়ে ভাবনায় মশগুল থাকা উচিত নয় ভাবনা ম্যাডাম। পানি জমা রাস্তায় পা পিছলে পড়ে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে। পড়ে গিয়ে কোমড় তো ভাঙবেনই, সাথে মানুষ জনের সামনে পড়ে যাওয়ায় মান সম্মানও খোয়াবেন৷ সো সাবধান। ”

কথাগুলো যেন হাওয়ায় ভেসে বেড়ালো। হুট করেই উড়ে এসে তার সামনে জুড়ে দাঁড়ানো অজ্ঞাত মানুষটার কথামতো এখানে অবশ্য এখানে লোকজনের বালাই নেই, সেজন্য কথাগুলো কানের মধ্যে আরো প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। সাথে বাইকের ইঞ্জিনের শব্দটাও বেশ ধ্বনি তুললো নিস্তব্ধ জায়গাটায়।
বাইকটা এসে থামল একেবারে মৌনির পায়ের কাছে। পায়ের কাছে থাকা পানিগুলো ছিটকে উঠলো মৌনির জামাকাপড়ে। হঠাৎ আগুন্তকের এহেন কান্ডে হতচকিত, হততম্ব মৌনি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে তার পানে৷ হেলমেটের আড়ালে থাকা মুখটা দেখতে না পেলেও তার কন্ঠস্বর শুনে মানুষটাকে ঢেড় চিনল মৌনি। এটা কল্প! অসভ্য কল্প!

কল্প মাথা থেকে হেলমেট খুলে মৌনির রাগত মুখের দিকে তাকালো। মেয়েটা রেগেমেগে যে একশেষ সেটা বুঝেই মনে মনে হাসল কল্প। তবে মনের সে হাসি একটুও মুখে প্রকাশ পেল না৷ চোখমুখের অবস্থা চূড়ান্ত নির্বিকার যেন কিছুই হয়নি৷ মৌনি রেগে লাল হলো। কন্ঠ তুঙ্গে তুলে বলল, “ এই! আপনি এটা কি করলেন আমার সাথে? আমার কাচা ধোয়া জামাটা নষ্ট করে দিলেন! ”

“ উপস সর‍্যি ম্যাডাম। তবে রাস্তায় এতো পানি জমেছে আমার কি দোষ বলুন তো? আমি বাইক থামালাম আর আপনার গায়ে পানি ছিটকে লাগল৷ এতে তো আমার দোষ নেই, দোষ তো এই রাস্তায় জমা বেলেহাজ পানির৷ ”

“ ফাউল বকবেন না। বেলেহাজ পানি নয় আপনি। আমার পায়ের কাছে এসে বাইক থামাতে গেলেন কেন? একটু দূরে থামানো যেত না? এখন এই ময়লা-কাদা মাখা জামা পড়ে আমি টিউশানিতেই বা যাবো কীভাবে আর ভার্সিটিতেই বা যাবো কীভাবে? আজাইরা লোকজন, একটু দেখে চলতে পারেন না? ”

“ এই আপনি আজাইরা লোকজন কাকে বলছে৷ হ্যাঁ? আমাকে? ”

“ আপনি ছাড়া তো এখানে আর আজাইরা পাবলিক দেখতে পাচ্ছিনা, তাই আপনার অনুমানই সঠিক। ”

“ আজাইরা পাবলিক আমি নয়, আপনি! আপনি আকাশ-কুসুম চিন্তা মগ্ন ছিলেন দেখে আমি তো আপনাকে সাবধান করতে বাইক দাঁড় করিয়েছিলাম যাতে এভাবে হাটতে হাটতে রাস্তায় পড়ে-টড়ে না যান। তবে এই পানি আপনার গায়ে উঠে যাবে সেটা কি জানতাম? আমাকে একটা থ্যাংঙ্কিউ তো জানালেন না উলটে না জেনে বুঝে দোষ দিচ্ছেন…

“ আপনার আজাইরা বকবক রাখবেন? দেখুন তো আমার জামার অবস্থা কি করলেন। এখন আমি এইভাবে টিউশানি, ভার্সিটিতে যাবো? আমার মনে হচ্ছে আপনাকে… আপনাকে.. উফ!..

“ আমাকে কি? ”

“ আপনাকে গলা টিপে দিতে মন চাইছে। ”

মুখে এতটুকুও বলল মনে বলল—অসভ্য, বেয়াদব, শেয়াল-খাটাশের বাচ্চা কোথাকার। আপনাকে বাইকের চাকায় পিষতে মন চাচ্ছে। তবে দাত কটমট করে কথাগুলো ভেতরেই চেপে গেল। শুধু চোখ কটমট করে তাকালো কল্পর দিকে। কল্প তার মনোভাব বুঝে ঠোঁট টিপে হাসল। সে হাসির ঝলক টের পাওয়া মুশকিল। সে উপরে উপরে এই সমস্যা নিয়ে ভীষণ চিন্তার ভান করল। অনেক চিন্তা ভাবনা করে বলল,
“ আপনি কোথায় যাচ্ছেন? ”

“ বললাম তো টিউশানিতে যাচ্ছি…

” ঠিক আছে আমার বাইকে উঠুন। এভাবে তো আর যাওয়া যায় না, আমিই না হয় আপনার গন্তব্য অব্দি আপনাকে ড্রপ করে দিলাম, ওখানে ওয়াশরুম থেকে যে জায়গাগুলোতে কাদা পানি উঠেছে সে জায়গাগুলো ধুয়ে নিলেন, তাহলেই তো হয়ে যায়। ”

“ একদমই না, আমি আপনার বাইকে যাবো না। আমি কোনো স্ট্রেঞ্জারের বাইকে উঠিনা। আপনার বাইকে তো আরো নয়। ”

“ আমার বাইকে আরো নয় কেন? ”

“ কারণ আপনি আমার সাথে জুতো মেরে গরু দান করার মতো ব্যবহার করছেন। ”

“ কি আশ্চর্য! আমি আপনাকে জুতোই বা মারলাম কখন আর গরুই বা দান করলাম কখন? ”

কল্পর চূড়ান্ত বিস্মিত সুরে মুখ ভেঙাল মৌনি৷

“ এই যে আমার গায়ে কাদা-পানি ছিটালেন আবার আপনিই আমাকে হেল্প করতে চাইছেন, এটা হলো জুতো মেরে গরু দান। ”

কল্প ঠোঁটে ঠোঁট চাপল। মৌনি ফের বলল,
“ তাছাড়া এখন আর নিশ্বাসেরও বিশ্বাস নেই। সেদিন আপনি একটুখানি আমার হাত ধরেছিলেন বলে কে না কে বাড়িতে ছবি পাঠিয়েছে আবার আমার বাড়ির লোকেরও কান ভাঙিয়েছে। আবার যদি কেউ না বুঝে এরকম করে তাহলে আমার আর রক্ষে থাকবে না। ”

কল্প একটু চুপ থেকে বলল,
“ কাজটা কে করেছে আমি মনে হয় জানি। ”

“ আপনি জানেন! কে করেছে এই বিশ্রী কাজটা? ”

“ ব্যাপারটা অনেক কম্পিলিকেটেড মৌনি। ”

“ কেন? সে কি ভীষণ খারাপ কেউ? ”
মৌনির কন্ঠে দারুণ উৎকন্ঠার প্রকাশ পেল৷ কল্পর প্রতিউত্তর ছোট ও সাবলীল৷
“ হু ”

“ কে বলুন না! ”

“ এখন এক্ষানে এভাবে বলা যাবে না, আপনি বরং বাইকে উঠে বসুন, যেতে যেতে কথা বলি..

“ একদম না। আমি যা জিজ্ঞেস করছি তার উত্তর দিন আগে। ”

কল্প প্রতিউত্তর করল না। সে মাথায় হেলমেট পড়ে বাইক স্টার্ট দিতে উদ্যত হলো। মৌনি হততম্ব গলায় বলল,
” একি! আপনি চলে যাচ্ছেন নাকি? আমার প্রশ্নের উত্তরটা তো দিন। কে করেছে এই কাজ? ”

“ কথা অনেক ম্যাডাম। এখন দাঁড়িয়ে থেকে সেসব কথা বলা মুশকিল হয়ে যাবে। আকাশের অবস্থা দেখেছেন?এখন এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে আমাকে বৃষ্টিতে ভিজতে হবে। আপনার টিউশানিতেও যেতে লেইট হবে। আপনার যেরকম টিউশানি, ভার্সিটিত আছে আমারও আছে বুঝলেন। দেরি হলেই জরিমানা। তাছাড়া…

মৌনি বিরক্ত বোধ করল,
“ আর অজুহাত দেখানোর থাকলে সেটাও দেখান। ”

কল্প এবারে বেশ নিচুস্বরেই বলল,
“ এখানে আমাদের উপর কেউ নজর রাখছে, এখানে আর দাঁড়িয়ে না থাকাই শ্রেয়। ”

মৌনি চমকিত হলো। ঘাড়ে ঝুলানো ব্যাগের ফিতেটা চেপে ধরে একবার এদিক ওদিক চেয়ে বলল, “ কি বলছেন? কে নজর রাখছে আমাদের উপর? ”

কল্প সাবধানী বাণী ছুড়লো,
“ এভাবে তাকাবেন না মৌনি। সে বুঝে যাবে যে আমরা তাকে দেখে ফেলছি। সে আরো সতর্ক হয়ে যাবে। ”

“ সত্যি সত্যি কেউ আমাদের উপর নজর রাখছে? আপনি আবার আমাকে বোকা-টোকা বানাচ্ছেন না তো? আমি তো এখানে মানুষের বালাই দেখছি না। ”

“ বিশ্বাস হচ্ছে না? এদিকে সরে আসুন মিস। নিজের চোখেই দেখুন। ”

চোখের ইশারায় নিজের দিকে সরে আসার ইঙ্গিত দিল কল্প। তাদের মধ্যে দুই হাতের মতো দূরত্ব। মৌনি একহাত দূরত্ব ঘুচিয়ে কোথায় জিজ্ঞেস করল। তখনই কল্প মৌনির হাত টেনে একেবারে নিজের কাছে নিয়ে এলো। টেনে এনে আবার হাত ছেড়ে দিল। মৌনি কিছু বলতে চেয়েও কল্পর দৃষ্টি অনুসরণ করে থেমে গেল। সে বাইকের মিররের দিকে তাকাতে বলছে। মৌনি তাকালো। একটা কালো রঙের গাড়ি দৃষ্টিপটে আসলো। কল্প নিচু কন্ঠে বলল,
“ দিস ইজ। আমি যখন এসেছি তখন আপনার পিছু পিছু যাচ্ছিল। আমি দাঁড়িয়ে যাওয়ায় ওটাও দাঁড়িয়ে গিয়েছে। স্টিল দাঁড়িয়ে। ভালো করে খেয়াল করে দেখুন গাড়ি থেকে কিন্তু লেউ নামেনি। তাদের নজর এদিকে। তাই আমি বলছি আমার সাথে চলুন, এমনিতেই ওরা খারাপ আমি চলে যাওয়ার পর ওরা যদি আপনাকে অপহরণ টপহরণ করে নেয়। দেখুন, রাস্তা কিন্তু নির্জন আপনাকে বাঁচানোর মতো কেউ থাকবে না। ”

মৌনিকে দারুণ চিন্তিত দেখালো। চিকন ভ্রু জোড়া দৃশ্যমান রুপে কুচকে এসেছে। হাত দুটো কচলাচ্ছে। মিররে ভালো করে দেখল কল্পর কথা ভুল নয়। সে দূরুত্ব বাড়ালো। কল্পর দিকে তাকালো। কল্প সামনের দিকে তাকিয়ে বাইক স্টার্ট দিয়েও ফেলেছে। মৌনি যাবে কিনা শেষ বারের মতো জানতে চাইল। মৌনি অনেক ভেবেচিন্তে হ্যাঁ বলল। কল্পর বাইকে বসল বেশ দূরত্ব রেখে। সেফটির জন্য কল্পর গা-ও ছুলো না। সিটের একাংশ আঁকড়ে রইল। কল্প অবশ্য একবার বলল,
“ ম্যাডাম ভালো করে ধরে বসুন। আমি জ্বোরে চালালে কিন্তু পিছন থেকে উলটে পড়ে যাবেন৷ ”

মৌনি শুনলো না। উলটে শক্ত হয়ে বসে রইল৷ অবশ্য কল্প বাইকে টান দিতেই কল্পর কথায় সত্যি হলো। পিছন থেকে উলটে পড়ার মতো অবস্থা হলো। ভয়ার্ত মৌনি অজান্তেই আঁকড়ে ধরল কল্পর ঘাড়ের কাছের শার্টের কিয়দংশ।

—চলবে.

[ শুনুন! নিষাদ আর কল্পর নাম আর চেহারার ব্যাপারটা এখনো আপনারা বুঝতে পারেন নি তাই? আমি কিন্তু এই ব্যাপার নিয়ে ইশারা-ইঙ্গিত দিয়েছি৷ একটু ভালো করে খেয়াল করলেও বুঝতে পারতেন। এখুনি খোলাখুলিভাবে সব তুলে ধরতে পারছিনা। প্রতিটা পর্বে একটু একটু করে তুলে ধরা হবে। আমার ধারণা ১৩ পর্বের মধ্যেই এই পরিচয়ের বিষয়টি নিয়ে অনেক কিছু ক্লিয়ার করতে পারবো। তবে সরাসরি নয়৷ তাদের কথাপকোথনের মাধ্যমেই৷ সেটা আপনাদের বুঝে নিতে হবে। আশা করি আর একটু ধৈর্য্য ধরবেন। আর গল্প ট্রাকের মধ্যেই আছে। এটা ফ্যান্টাসিও নয় যে অবাস্তব কিছু লিখব। সবকিছু ঠিকঠাক-ই আছে। আর দুটো পর্ব গেলেই বুঝবেন৷ ধন্যবাদ। ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here