প্রেম_অপ্রেম_অধ্যায় |১০| #আফরিন_সুলতানা.

0
536

#প্রেম_অপ্রেম_অধ্যায় |১০|
#আফরিন_সুলতানা.

_
পাতাঝড়া বসন্তের এক রক্তিম দিনে শুরু হোক নতুন অধ্যায়ের। অপ্রেম অধ্যায়ের। আমি কখনোই তার প্রেমে পড়তে চাইনা, আমি এ-ও চাইনা যে ও আমার প্রেমে পড়ুক। আমার অগোছালো, নষ্ট জীবনের সাথে ওকে কখনোই জড়াতে চাই না। আমি শুধু ওর ভাঙাচোড়া জীবনটাকে জোড়া লাগাতে চাই। ওর ক্ষতর মলম হতে চাই। আলগোছে ওর অসুন্দর জীবনটাকে সুন্দর করতে চাই। একজন অগোছালো মানুষ কীভাবে আর একটা অগোছালো জীবনকে ঠিক করতে পারে সেটা ঠিক জানা নেই আমার। আমি শুধু এতটুকুই জানি মরার আগে নীরবে আমার একটা অগোছালো জীবনকে গোছাতে হবে, মোমের মতো মানুষটাকে পাথরের মতো শক্ত করতে হবে আর তার জীবনে সীমাহীন আনন্দের বন্যা নিয়ে আসতে হবে৷

শান্ত কন্ঠে বলা কথাগুলো যেন বদ্ধ ঘরে প্রতিধ্বনিত হলো। ফোনের ওপাশে থাকা তার কলিজার টুকরো বোন ছাড়া আর কেউ শুনতে পেল না। কল কেটে সে আলগোছে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। আগাগোড়া নিজেকে একবার পরোখ করল। ফর্সা গা টা নাভি অব্দি উদোম। গতরে শুধু বাদামী রঙের কার্গো প্যান্ট। নাভির নিচে প্যান্ট নেমে যাওয়ায় সেটা একেবারে পায়ের তালুতে গিয়ে ঠেকেছে। তার দৃষ্টি তার ফর্সাটে মুখে। নিজের অজান্তেই হাত চলে যায় মুখে। বিরবির করে আওড়ালো,“ আমি কল্প, কল্প চৌধুরী। নিষাদ মাজহার নয়৷
আমি তোমার জীবনে কল্প চৌধুরী’ই হয়ে আসতে চাই, নিষাদ মাজহার হয়ে নয়। ”

পরক্ষণেই নতুন কিনে আনা ড্রেসিন টেবিলের আয়নায় আবার স্বজোরে বাড়ি বাড়ল। কাচ গুলো ঝড় ঝড় করে ভেঙে পড়ল। রাতের কাটা জায়গাটা বিলু ব্যান্ডেজ করে দিয়েছিল। সে জিদ করেই আবার খুলে ফেলেছে ৷ সেখান থেকে আবার র/ক্ত বেরোতে লাগল। সে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টিপাত না করে নজর বুলালো পুরো ঘরটায়৷ এই বাড়িতে সে সদ্যই উঠেছে৷ ফার্নিচার গুলোও সদ্য কেনা। এইতো একটু আগেই সব স্যাট করে দিয়ে গেল ফার্নিচারের দোকানের ছেলেগুলো। এর মধ্যে ড্রেসিন টেবিলটা নষ্ট করেও বিশেষ আফসোস বোধ করল না৷ হুট করেই মাথায় চড়া রাগটুকু কমছে না৷ হনহন করে কাঠের দরজা ঠেলে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। দুপুরের সূর্যের প্রখর রশ্নি গায়ে পড়তেই রাগটা যেন তড়তড় করে বাড়তে লাগল। ঘরে আসার পা বাড়াতে গিয়েও অজান্তেই যেন পা জোড়া থেমে গেল৷ দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো গেইট পেরিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে হেটে আসা তরুণীর পানে। ওমনি কপালের মাঝে দু তিনটে ভাজ পড়ল। ওড়নার আঁচলে কপালের ঘাম মুছছে। রোদ থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য মাথার ওপর ছাতার বদলে খাতা ধরা। গরমে যেন হাসফাস করছে মেয়েটা। কালো রঙের পোষাক পড়েছে কেন ও? ও কি জানেনা কালোতে গরম বেশি লাগে?

__________

সকাল হতে সূর্য প্রখর উত্তাপ ছড়িয়ে দুপুরে একটু বেলা গড়াতেই হুট করে মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়েছে সে। ঘন কালো মেঘের আস্তরণ পড়েছে আকাশ জুড়ে। তবে বৃষ্টি হবে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। আজকাল এরকম মাঝে মাঝেই হয়৷ তবে শেষ অব্দি আর বর্ষণ নামে না৷ তবে হাওয়া ছাড়ছে খুব৷ এখন এই আবহাওয়ার ভরসা নেই মোটেও। তাই মৌনি ছাদে মেলে দেওয়া আধশুকনো জামাকাপড় গুলো তুলতে এসেছে। যদি বৃষ্টি আসে তাহলে রক্ষে থাকবে না। পাঁচ তলা থেকে ছয়তলার ছাদ অব্দি আস্তে আস্তে সব ভিজে শেষ হয়ে যাবে৷ তার থেকে তুলে নেওয়ায় ভালো। তবে এখন ছাদে এসে তুলে নেওয়ার থেকে তুমুল বাতাস গায়ে লাগানো বেশি শ্রেয় বলে মনে হচ্ছে। তাইতো জামাকাপড়গুলো নিচে রেখে এসে আবার ছাদে ছুটেছে। এখন দুপুরে খাওয়ার পর সবাই ঘুমুচ্ছে। তাই কোনো চিন্তাও নেই। এখন শুধু তার এই বাতাসে গা ভাসাতে মন চাচ্ছে। মাথার উপর দিয়ে একদল ছোট ছোট কালো পাখি আকাশজুড়ে উড়ে যাচ্ছে। তাদের দলে ভীড়ে তাদের সাথে উড়ে যেতে মন চাচ্ছে৷ ইশ! আমার যদি দুটো হাত না থেকে দুটো ডানা থাকত তাহলে উড়ে যেতে পারতাম এই রাক্ষসপুরী থেকে৷ বহুদূরে!

মৌনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আকাশের দিক থেকে দৃষ্টি নিচে নামায়। কারণ আকাশের দিকে তাকালে শুধু স্বপ্নগুলোই চোখে ভাসে৷ বাস্তবতা তখন ধোয়াশা। বাস্তবতার কথা ভাবতে গেলে নিচে তাকানোটা আবশ্যক। আর এখন তার কিছু বাস্তবতার হিসাব কষতে হবে। আজ মাসের মাত্র আঠারো তারিখ। যেহেতু ফেব্রুয়ারী মাস তাই এ মাসের এখনো ১০ দিন বাকি। মানে টিউশানির টাকা পেতে এখনো দশদিন বাকি। এদিকে তার হাত একেবারেই খালি। মামা বই কেনার জন্য যে টাকা দিয়েছিল সেই টাকাটা থেকে ৭০০ টাকা ছাড়া আর কিছুই নেই। সে তিনটা টিউশানি থেকে মোট ৭০০০ টাকা পায়। প্রতিমাসে ৫০০০ হাজার টাকা এদের হাতে তুলে দিতে হয়৷ এদের করে দেওয়া নিয়ম হলো সে যা টাকা পাবে তার মাত্র ১০০০ টাকা নিজের কাছে রাখতে পারবে। অবশ্য তারাই তো খাওয়া পড়া সব দিচ্ছে। সেখানে মৌনির আর টাকার কিসের দরকার। তবে মৌনি যেহেতু পড়াশোনা করছে তাই মৌনি নিজেই অনেক আকুতি করে ১০০০টাকা নিজের কাছে রাখার অনুমতি পেয়েছে। তবে ইদানীং বিকালে যাকে পড়ায় মানে মিলির ক্লাস প্রমোশন হওয়ায় মিলির মা তার ১০০০টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। যেটা এদের অজানা। আর মৌনি জানাতেও চায় না। আগে কলেজে পড়ত সেটার কথা আলাদা। কিন্তু এখন ভার্সিটিতে খরচ বেশি। ভার্সিটিটা বেশ নামকরা এ শহরে। এরা প্রতিবছর ইন্টারমিডিয়েট ২য় বর্ষের গরিব, মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটা পরীক্ষার আয়োজন করে। সেই পরীক্ষায় যে সর্বোচ্চ র‍্যাংক করবে সেই ফুল ফ্রি স্কলারশিপে এই ভার্সিটিতে পড়ার সুজোগ পাবে। আর সেটাও প্রতি কলেজ থেকে একজন। মৌনি ভাগ্যক্রমে স্কলারশিপটা পেয়ে গিয়েছিল। সেজন্যই তো এতো বড় ভার্সিটিতে পড়ার সুজোগ পেল। নয়তো থোরাই পড়তে পারত এই ভার্সিটতে। তবুও যতোই ফুল ফ্রি বলুক না কেন কিছু অবসম্ভাবী খরচ বহন না করে উপায় নেই। ২০০০টাকায় সেগুলো কম পড়ে যায় অবশ্য। তবুও মৌনিকে মানিয়ে নিতে হয়। তাছাড়া এখন নতুন নতুন ক্লাস শুরু হওয়ায় খরচ একটু কম লাগছে। তবে পরে যে কীভাবে আল্লাহ মালুম। এদিকে আবার নতুন বই কিনতে হবে। তার জন্যও বাড়তি টাকার প্রয়োজন৷ দিন যতো যাচ্ছে খরচ যেন ততোই বাড়ছে। আর একটা টিউশানি যদি পাওয়া যেত খুব ভালো হতো।

“ এক্সকিউজ মি, একটু সাইড পাওয়া যাবে প্লিজ! ”

মৌনি আকাশ-পাতাল ভাবনার সুতো কাটলো৷ পাশে তাকিয়ে দেখল কল্প দাঁড়িয়ে আছে। কল্প! এই ভরদুপুরে তাদের ছাদে কি করে! মৌনি বিস্ময়ের চরমে। ফ্যালফ্যাল করে ক্ষণিক কল্পর দিকে তাকিয়ে রইল। হ্যাঁ, এটা তো কল্পই। সে চরম বিস্ময়ের সহিত শুধালো,

“ আপনি! আপনি এখানে কি করেন? ”

“ আপনি যা করেন আমিও তাই করি। ”

“ মানে!”

“ মানে কিছুই করিনা, আপনার মতো। তবে এবার করব? ”

মৌনির ভ্রু কুচকে এলো৷

“ কি করবেন? ”

“ আপনি যদি এতো প্রশ্ন করেন তাহলে করব কীভাবে, দেখি সরুন। ”

‘ দেখি সরুন ’ বলেই বলেই কল্প মৌনির বাহু ধরে সরিয়ে দিল সেখান থেকে। আচমকা ওর এহেন কাজে কিছুটা অবাক হলো মৌনি। হুট করে এভাবে গায়ে হাত দেওয়ার জন্য রাগ দেখাতে গিয়ে আরো একটু অবাক হয় সে। কল্প গাঁদা ফুলের পাতা ছিড়ছে। মানুষ ফুল ছিড়ে আর এই ছেলে পাতা ছিড়ছে কেন? মৌনি চোখ ছোট ছোট করে ওর কর্মকাণ্ড দেখতে লাগল। এক গুচ্ছ পাতা ছিড়ে হাতের তালুতে রেখে অন্য হাতের তালু দিয়ে ঘষছে। মৌনি কৌতুহল চেপে না রাখতে পেরে বলল,
“ পাতাগুলো ওভাবে ডলছেন কেন? ”

তার উত্তর যেন তৈরিই ছিল। সে একটু আগের কেটে যাওয়া হাতটা দেখিয়ে বলল, “ এই যে, এখানে লাগাবো। কেটে যাওয়া জায়গায় লাগালে এটা খুব কাজে দেয় জানেন। ব্যথা অনেক কমে যায়। ”

দু দুবার একই জায়গায় কেটে যাওয়ায় জায়গাটা দেখার মতো না। ক্ষত হয়ে, র/ক্ত জমে, ফুলে ফেপে ঢোল৷ সেজন্যই বোধহয় কেটে যাওয়া জায়গাটা দেখে দারুণ চমকালো। তার কন্ঠও বেশ চিন্তিত শোনালো,

“ এমা! এতো অনেকখানি কেটে গিয়েছে। শুধু গাঁদা ফুলের পাতা লাগালে হবে? ক্ষত দেখে তো মনে হচ্ছে ব্যান্ডেজ করার প্রয়োজন। ”

“ উপায় নেই ম্যাডাম। এ বাড়িতে নতুন উঠেছি। ফার্নিচারগুলো সাজাতে গিয়ে হাত কেটেছে৷ ফাস্টএইড বক্স তো নেই সাথে, তাই এটাই এখন শেষ ভরসা। মনে মনে এই গাছটারই সন্ধান খুজছিলাম, ছাদে আসতেই পেয়ে গেলাম। ”

মৌনি এবারে বুঝলো তার ভরদুপুরে ছাদে আসার কারণ। তার মানে তখন মৌনির সন্দেহই ঠিক হয়েছে। ওই ফার্নিচারগুলো কল্পর। মৌনি সেটা নিয়ে বেশি ভাবল না৷ সে একদৃষ্টে তাকিয়ে কল্পর কেটে যাওয়া হাতের দিকে। সহসাই ও কল্পকে ডেকে উঠলো, “ শুনুন কল্প ”

কল্প চমকালো যেন। ডাকটা কানে পৌছাতেই চট করে চোখ মেলে তাকালো মৌনির দিকে। অস্পষ্ট স্বরে জবাব দিল ‘ হু? ’

“ থ্যাঙ্কিউ। ”

“ কিসের জন্য? ”

“ আমার চিকিৎসা করানোর জন্য। ”

“ ওহ। এখন কেমন আছেন? তখন ওভাবে…

“ আমার কাছে ওষুধ মলম সব আছে। নিয়ে আসব? ”

“ লাগবে না। এতেই হয়ে যাবে। বিকালে ডাক্তারের কাছে যাবো। ”

বলেই সে হাতে পাতার রস লাগাতে লাগল। মৌনি ওকে বাধা দিয়ে বলল, “ যখন যাবেন তখন যাবেন। এখন আপাতত আমার ওষুধ গুলোই ব্যবহার করুন। ওগুলোও তো কাটাছেঁড়ার। আপনি একটু অপেক্ষা করুন আমি নিয়ে আসছি। আর লাগাবেন না কিন্তু, আমি এক্ষুণি যাবো আর আসবো৷ ”

মৌনি তাড়াহুড়ায় নেমে গেল ছাদ থেকে। কল্প রুপী নিষাদ ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে আলগোছে হাসল। তবে মৌনির কথা মতো থামল না। পাতার রস টুকু লাগিয়েই থামল।

________

মৌনি পাঁচ মিনিটের মাথায় ওষুধ আর মলম নিয়ে ফিরে এলো। এসেই হাপাতে লাগল৷ এইটুকু বাড়ি থেকে লুকিয়ে চুরিয়ে নিয়ে আসতে হয়েছে তাকে। ধরা পড়লে আর রক্ষে থাকত না। সেজন্য কিছুটা ভয়ও পেয়েছে সে। এসেই হাপাতে হাপাতে সেগুলো কল্পর হাতে দিয়ে বলল, “ এই নিন, হাত পরিষ্কার করে এই মলমটা আগে লাগিয়ে নিন৷ তারপর খাওয়ার পরে ওষুধ দুটো খাবেন দেখবেন ব্যথা কমে যাবে। আমার ব্যথাও অনেক কমে গিয়েছে। ম্যাজিকের মতো কাজ করবে। ”

বলতে বলতে মৌনি কপালে জমা ঘামটুকু মুছে নিল। কল্পর দিকে তাকিয়ে দেখল সে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।

“ কি হলো? আমার মুখের দিকে না তাকিয়ে ওষুধগুলো একবার দেখে নিন। ”

“ দেখছি তো। ”

“ আমার মুখে কি ওষুধের নাম লেখা আছে নাকি? ”

“ আপনি বললেন ম্যাজিকের মতো কাজ করবে তাই দেখছি। আসলেই আপনার ব্যথা সেরেছে কিনা। ”

“ দেখে নিয়েছেন, এবার লাগান। একি আমি না নিষেধ করলাম পাতার রস লাগাবেন না, তবুও লাগিয়েছেন! ”

কল্প নিজের হাতের দিকে তাকালো। ফের বিরক্তিপূর্ণ চাহনিতে এদিকে তাকিয়ে থাকা মৌনির দিকে তাকালো।

“ এতো কষ্ট করে পাতাগুলো পেস্ট করলাম আর লাগাবো না? ”

“ এখন এটার উপরেই ওষুধ লাগাবেন নাকি? ”

“ না। মুছে ফেলব। ”

“ তাহলে মুছুন। ”

“ কিসে মুছব? আমার কাছে তেমন কিছু নেই। আর এখানে মোছার মতো তেমন কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। তাহলে…

“ তাহলে আবার কি। আমার মাথায় মুছুন। ”

মৌনির কন্ঠস্বর বিরক্তির চরমে। কপালে দু তিনটে ভাজ পড়েছে। কল্প ওর রেগে যাওয়া মুখটা উপভোগ করল। আরো রাগাতে মন চাইলো। সে কৌতুক কন্ঠে বলল,
“ মাথার ঘোমটাটা ফেলুন তাহলে। আচ্ছা মাথাতেই মুছব নাকি চুলে মুছব? ”

মৌনি সত্যি সত্যি রেগে গেল। কটমট চাহনিতে তাকালো কল্পর দিকে। কল্প ফের বলল,
“ আচ্ছা ব্যাপার কি বলুন তো ম্যাডাম? আমার ক্ষততে মলম লাগানোর জন্য এতো উতলা হচ্ছেন কেন? ইউ নো না ইউ আর স্ট্রেঞ্জার্স। ”

“ ইয়েস, আই নো। আর শুনুন মি. কল্প, আপনার ক্ষততে মলম লাগানোর জন্য মোটেও আমি উতলা হচ্ছি না, আপনি ত্যাড়া ব্যাকা কাজ করছেন বলে রাগ লাগছে। আর আমরা স্টেঞ্জার্স এটা আমি খুব ভালো করেই জানি। স্ট্রেঞ্জার্স হয়েও সেদিন আপনি আমায় হেল্প করেছেন তাই আজ আমি আপনার হেল্প করছি। হিসেব শোধবোধ। আর হাতে টাকা এলে আপনার এই ওষুধের ঋণও শোধ করে দেব। আমি কারো ঋণ রাখতে পছন্দ করিনা, নয়তো আপনার উপর দরদ উতলে উঠেনি আমার। ”

কল্প মুখ বাকালো। মৌনি সেটা দেখে নিজেই অন্যদিকে ঘুরে হাটা ধরলো।

“ কাল কিন্তু আমি আপনার অনেক সাহায্য করেছি, আপনাকে সিড়ির কাছ থেকে কোলে তুলে বাড়িওয়ালার বাড়িতে নিয়ে গিয়েছি, ওখান থেকে ডাক্তার ডেকে চিকিৎসা করিয়েছি, বাড়িওয়ালাকে দিয়ে আপনার বাড়ির লোকদের ধমকিয়েছি, ছয়তলার আন্টি যখন বলল আপনি ওদের বাড়িতেই রাতটুকু থাকবেন আবার কোলে করে ছয়তলা অব্দি তুলেছি, আর আপনি একটুখানি ওষুধ দিয়ে মুখ বাকিয়ে চলে গেলেই দায় শেষ! বাহ ম্যাডাম বাহ! দিলাম কি আর পেলাম কি! ”

মৌনি যেতেই গিয়েই থমকে দাঁড়ালো। বিস্মিত বদন পিছু ফিরে বলল, “ আপনি আমায় কোলে তুলেছেন! ”

“ নো ম্যাডাম। অচেতন আপনি গড়াতে গড়াতে নিচ তলা অব্দি গিয়েছেন আবার গড়াতে গড়াতে ছয় তলা অব্দি উঠেছেন। ”

“ এই আপনি.. জানেন আপনার জন্য আমি পরশু বাড়িতে মার খেয়েছি। নেহাতই আপনার মুখ দেখেনি বলে বাঁচা। তারউপর কাল আপনি আমার জন্য এসব করেছেন আবার আজ এ বাড়িতে এসে উঠেছেন, যদি ওরা ঘুণাক্ষরেও বুঝে যায় আপনি ওই রাস্তার ছেলেটা তাহলে আমার কপালে কি হবে ভাবতে পারছেন? এমনিতেই ওরা আজেবাজে ভেবে বসে আছে, এরপর আমার আর আপনাকে নিয়ে আরো আজেবাজে রটাবে….

“ আমার আর আপনাকে নিয়ে আজেবাজে রটাবে মানেটা কি? ”

মৌনি একটু ভেবে কালকের ঘটনাটা সংক্ষেপে খুলে বলল৷ কল্প এতোক্ষণে বুঝলো কাল রাতে ওরা বাড়িওয়ালার সাথে কি গোপন আলোচনা করছিল যেটা তার থেকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। কল্প চোখ বন্ধ কপালে হাত ঘষলো। এটা সে পরে দেখে নিবে। আপাতত প্রসঙ্গ বদলে বলল,
“ এসব কথাগুলো এখন থাক ম্যাডাম। আপনি প্লিজ এই পাতার রসটা মোছার ব্যবস্থা করুন। মলম লাগাতে হবে না? ”

ওর হাত মোছার জন্য মৌনি আশেপাশে কিছুই খুজে পেল না। কল্পকে সে নিচে মুছে নিতে বলল তবে কল্প জানালো ফার্নিচার ছাড়া নাকি এখনো একটা সুতোও আসেনি ঘরে সেজন্য সে মুছতে পারবে না। শেষমেষ নিজের ঘরে কিছু না থাকায় চোখ পড়ল মৌনির ওড়নায়৷ উৎফুল্লিত কন্ঠে বলল,
” আপনার ওড়নায় মুছিয়ে দিলেই তো পারেন। ”

মৌনি এটা কখনো করবে না বলেই জানিয়ে দিল। এমনিতেই তার জামাকাপড় নেই বললেই চলে। বছরে দুই থেকে তিনটা ওই ফুটপাতের স্বল্প দামের জামার বেশি পায়না সে৷ এখন ওড়নায় পাতার রস মুছে অযথাই একটা ওড়না নষ্ট করার ইচ্ছা নেই তার। সে নাকোচ করে দিয়ে ছাদের এককোনা থেকে একটা খাতার কাগজ তুলে এনে কল্পর হাতে ধরিয়ে মুছতে বলল। কল্প নাক মুখ কুচকে সেটা ছুয়েও দেখল না। সহসাই মৌনির মনে পড়ল তার কাছে এক্সট্রা একটা কাপড় আছে। তবে কল্প সেটাতে হাত মুছবে কিনা সেটাই আসল বিষয়৷ সে কল্পকে দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ আমার কাছে একটা এক্সট্রা কাপড় আছে কল্প। সেটাতে মুছবেন? ”

কল্প মৌনি উপরনিচ দেখল। পরণের জামাকাপড় গুলো ছাড়া আর কিছুই নেই। এর আবার এক্সট্রা কাপড় কোথায়। ওড়না টড়না ছিড়বে নাকি?‌ সে এরকম কিছু ভেবেই রাজি হলো। মৌনি কল্পকে অবাক করে দিয়ে মাথার কাপড় ফেলে দিল। ভেজা চুলে জড়িয়ে খোপা করে রাখা ওড়নাটা একটানে খুলে ফেলল৷ সাথে সাথে ভেজা চুলগুলো আলগা হয়ে গেল। ক্ষণিকেই মাথায় কাপড় তুলে নিয়ে এতোক্ষণ চুলে জড়িয়ে রাখা কাপড়টা কল্পর দিকে এগিয়ে বলল,
“ নিন, এটাতে মুছুন। এটা পরিষ্কার৷ শুধু চুলের পানিই লেগেছে একটু। ভয় নেই, আমার চুলও পরিষ্কার। আজই শ্যাম্পু করেছি। ”

তার এক্সট্রা কাপড় দেখে হততম্ব হয়ে গেল কল্প। সে তো ভেবেছিল সিনেমার ওড়না দিয়ে মুছে দিবে। যেহেতু ওড়না দিয়ে মুছে দিচ্ছে না সেহেতু হয়তো ছিড়ে দেবে। অথচ হলো টা কি, শেষ অব্দি কিনা একটা চুল মোছার ন্যাকড়া দিল! ইশ! এক্সপেকটেশনটা মনে হয় বেশি হয়ে গিয়েছিল।

___________

—চলবে.

📌 কার্টেসি ছাড়া কপি নিষিদ্ধ 📌

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here