#প্রেম_অপ্রেম_অধ্যায় |৯|
#আফরিন_সুলতানা.
_
কাচের জানালা ভেদ করে সূর্যের তীক্ষ্ণ রশ্নি মুখে এসে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেল মৌনির। সারারাত ব্যথা, য”ন্ত্রণায় কাতরিয়েছে সে। তার উপর অযাচিত চিন্তা। যার জন্য সারারাত ঘুমাতে পারেনি সে। যখন ভোরের আজান দিচ্ছিল তখনো জেগে সে কিন্তু তারপরেই নিজের অজান্তেই কখন চোখ লেগে এসেছিল বুঝতে পারেনি। মাত্র সুবেহ সাদেকের সময় ঘুমিয়েছিল। এখন সবে সূর্য উঠেছে। এই অল্পক্ষণ ঘুমানোর ফলে তীব্র একটা টনটনে ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে মস্তিষ্ক জুড়ে। হাতটা আপনাআপনি মাথায় চলে যায়। এ ঘরে কোনো ঘড়ি নেই৷ যার জন্য ঠিক ঠাহর করতে পারল না কয়টা বেজেছে। সে আলগোছে উঠে বসল। এলোমেলো চুলগুলো আঙুল দিয়ে ঠিক করে খোপা করল৷ পাশেই রুপা ঘুমাচ্ছে। চার হাত-পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমাচ্ছে৷ অনেকটা টারবাইনের মতো। রুপার ছোট ছোট চুলগুলো চোখেমুখে এসে পড়েছে। মৌনি হাত দিয়ে সেগুলো সরিয়ে দিল। তারপর পাশে রাখা ওষুধ গুলো দেখল। এগুলো কি তার? রুপাও তো অসুস্থ এগুলো হয়তো রুপার হতে পারে। সে অযথাই ভুল ভাবছিল রাতে৷
“ ওগুলো তোমার মৌনি, কোনটা খালি পেটে খেতে হবে কোনটা ভরা পেটে সব কাগজে লেখা আছে৷ একবার পড়ে নিও। আর মলমটাও আছে লাগিয়ে নিও সময়মতো। এখন অনেক বেলা হয়েছে, আমি খেতে দিয়েছি। হাত মুখ ধুয়ে রুপাকে নিয়ে খাওয়ার টেবিলে এসো। সকালের নাস্তা আমাদের বাড়ি থেকে করে তারপর নিজের বাড়িতে যেও। ”
মৌনির ভাবনার মাঝেই রুপার মা এলেন। দরজার কাছ থেকে কথাগুলো বলে তিনি ব্যস্ত পায়ে আবারো চলে যান।
উনার কথামতো মৌনি ওষুধগুলো আর প্রিসকিপশনটা একবার পড়ে নিল। ওয়াশরুম থেকে হাতমুখ ধুয়ে এসে খালি পেটের ওষুধ দুটো খেয়ে নিল। শরীর অসহ্য ব্যথায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। তবুও নিজেকে সামলে নিল। প্রথম প্রথম এরকম অমানবিক নির্যাতনের পর নিজেকে সামলে নিতে বেগ পোহাতে হতো তবে এখন ভেতরে ব্যথা করলেও বাইরে থেকে নিজেকে স্বাভাবিক দেখাতে সক্ষম সে।মৌনি ড্রেসিনটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে গাঢ়ো চোখে তাকালো। গায়ে কাল রাতের জামাটা নেই। অন্য একটা পোষাক। জামাটা রুপাকে আগে পড়তে দেখেছে। হয়তো রুপার মা চেইঞ্জ করিয়ে দিয়েছে।গায়ের দাগগুলোতে নজর বুলালো সে। মারের দাগগুলো স্পষ্ট ফুলে উঠেছে। একবার আনমনেই মুখে হাত বুলালো। প্রিসকিপশন দেখে উল্লেখিত মলমটা লাগালো। তারপর রুপাকে ডাকল। রুপাকে জাগাতে বেশ বেগ পোহাতে হলো তাকে। মেয়েটা উঠতেই চায় না। প্রায় পনেরো মিনিট ডাকাডাকি করে তাকে তুলতে সক্ষম হলো মৌনি। রুপার ফ্রেশ হয়ে আসতে আরো বিশ মিনিটের মতো সময় লাগলো। মৌনি যে জায়গাগুলো মলম লাগাতে পারিনি রুপার থেকে লাগিয়ে নিল। সে খুব যত্ন করেই লাগালো। মৌনির এতো আরাম বোধ হচ্ছিল! সে কন্ঠে কিছুটা বিস্ময় ঢেলে বলে,
“ তুই তো খুব সুন্দর মলম লাগাতে পারিস রুপা৷ ”
রুপা প্রতিউত্তর করতে বেশ সময় নিল। তার কন্ঠস্বর অন্যরকম শোনালো,
“ তোর খুব ব্যথা করছে না রে?”
“ না রে। মনের ব্যথার কাছে শরীরের ব্যথা কিছুই নয়৷ কাল যা বলেছে আমায় সেগুলো সহ্য করার মতো না। তোরা শরীরের রক্তক্ষরণটা দেখতে পাচ্ছিস, হৃদয়ের রক্তক্ষরণটা দেখতে পাচ্ছিস না। ”
রুপা প্রতিউত্তরে আর কিছুই বলল না। দুজনের মাঝে নীরবতায় ছেয়ে গেল।
__
রুপার পরেই রুশার ঘর৷ রুশার ঘর অতিক্রম করে ড্রয়িংরুমে যেতে হয়। রুশার ঘর অতিক্রম করার সময় ওর ঘরের দরজার পাশে এসে থমকে দাঁড়ালো মৌনি৷ খোলা দরজা দিয়ে সরাসরি নজর ফেললো ঘরের মধ্যে। মৌনির দেখাদেখি রুপাও দাঁড়ালো। গোলগোল চোখে উঁকি দিল ঘরের মধ্যে। রুপার মা রুশাকে ঘুম থেকে তোলার চেষ্টা করছে। রুশা উঠতে চাইছেনা। মা ধৈর্য্য ধরে তাকে ঘুম থেকে তুলে হাতের বাহু ধরে ওয়াশরুম থেকে ব্রাশ করিয়ে আনলো। চুল আচড়িয়ে সুন্দর করে পরিপাটি করে স্কুলের জন্য রেডি করতে লাগল। এক ফাঁকে ব্যাগের বইগুলোও গুছিয়ে দিল। রুপা সেসব দেখতে দেখতে শুধালো,
“ কি দেখিস? ”
“ জানিস রুপা আমার মা-ও আমাকে এভাবে আদর করে ঘুম থেকে তুলতো। আমাকে স্কুলের জন্য তৈরি করত। নিজের হাতে খাইয়ে দিত। কত্তো আদর করতো। তারপর.. তারপর আস্তে আস্তেই মায়ের আদর গুলো কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। কতোদিন মায়ের আদর পাই না। আগে তাও মাকে দেখতে পেতাম, মায়ের বুকে শুতে পেতাম, মাকে মা বলে ডাকতে পারতাম। আর এখন সেটুকু পাই না। ”
“ তোর মা নেই, আর আমার থেকেও নেই। তোর মায়ের আদরগুলো প্রকৃতগতভাবে মিলিয়ে গেছে আর আমার মায়ের আদর গুলো প্রবৃত্তিগত ভাবে। আমিও আমার মায়ের আদরগুলো অনেকদিন পাই না রে। ”
রুপার বিরবির করে কথাগুলো মৌনির কান অব্দি পৌছাল না। পৌছুবেই বা কি ভাবে, তার শুধু ঠোঁট নড়ল, শব্দ হলো না।
_______
মৌনিকে আর বাড়ি উঠতে দেবে কিনা সেই চিন্তাটা অবশ্য কিছুক্ষণের মধ্যেই মিলিয়ে গেল। মৌনিকে বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হলো। অবশ্য তাকে যে বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হবে এটা সে রুপার বাড়ি থেকেই অবগত হয়েছিল। রুপার মায়ের থেকে শুনেছিল বাড়িওয়ালা তাসলিমাকে কড়া ভাবে বলে দিয়েছে তাকে যেন বিনা বাক্যে বাড়ি ঢুকতে দেওয়া হয়৷ সাথে আর যেন তাকে এভাবে মারধর করা না হয়৷ ফের যদি একই ঘটনার পুনারাবৃতি হয় তাহলে তারা পুলিশ ডাকতে বাধ্য হবেন৷ তাছাড়া তাসলিমার ছোট ছেলে সোহান বাড়িওয়ালার আন্ডারে একটা ছোটখাটো চাকরি করে। হয়তো সেজন্যই বাড়িওয়ালার কথার উপর তারা উচ্চবাচ্য করেনি। এখন অসম্ভব নিস্তব্ধতায় বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হলো তাকে। মৌনির সাথে কারো বাক্যালাপ হলো না। তবে প্রতিদিনকার কাজগুলো যে তাকেই করতে হবে সেটাও নীরবে বুঝিয়ে দিল।
মৌনি সে কাজ গুলোই নীরবে সম্পন্ন করল। গায়ে গতরে ব্যথা থাকার কারণে একটু বেশিই সময় লাগলো। এদিক দিয়ে দুই দুইটা টিউশানি মিস করে গেল। কাল নিশ্চিত ডাবল পড়াতে হবে। মৌনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। আজ আর ভার্সিটিতেও গেল না সে। পরদিনও ভেবেছিল ভার্সিটিতে যাবে না। তবে আজ অভ্রনীল স্যারের ক্লাস আছে। স্যারের ক্লাস নেওয়ার ভঙ্গি মারাত্মক। কঠিন কঠিন টপিকগুলো এমন ভাবে বোঝান যেন মনে হয় মাখন। আর মৌনি মাখনের মতো ক্লাসটা মিস দিতে চাইছে না কোনোমতেই।
তাড়াহুড়ো করে বেরোনোর সময় মৌনি দেখল বিল্ডিংয়ের সামনে পাঁচ ছয়টা ভ্যান গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। এক ভদ্রলোক সেগুলো থেকে ফার্নিচারগুলো নামিয়ে নিচ্ছে দায়িত্ব সহকারে। কৌতুলী মৌনি দারোয়ান চাচার কাছ থেকে শুনে বুঝতে পারল আজ নাকি চার তলায় নতুন ভাড়াটিয়া উঠছে। দারোয়ান চাচা নিজেও জানেনা কে আসছে তবে মৌনির কেন জানি মনে হলো কল্প নামের ছেলেটিই আসছে। ও-ই তো কাল বাড়িওয়ালা দাদুর সাথে কথা বলতে এসেছিল৷ হয়তো বাড়ি ভাড়া নিতে এসেছিল আর পছন্দ হয়ে হয়ে যাওয়ায় ভাড়া নিয়ে নিয়েছে। এমনিতেই চার তলা তো অনেকদিন ধরে ফাকা পড়েই ছিল। কি জানি বাবা!
______
ভার্সিটি চত্ত্বরের উত্তরকোণ ঘেষে তৈরী সুবিশাল লাইব্রেরীর মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে মৌনি। সে মূলত রিডিং এরিয়াতেই দাঁড়িয়ে আছে। রিডিং এরিয়াটা নিস্তব্ধতায় ছেয়ে। যে যার মতো বইয়ে মুখ ডুবিয়ে বসে আছে। মৌনিও পড়তে এসেছিল তবে আর জায়গা নেই দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই চিন্তায় পড়ে গেল সে। হাতে থাকা ফিলোসোফির বইটার দিকে তাকালো সে। আজ এই বই জমা দেওয়ার লাস্ট ডে। তবে বইটার অবস্থা বেগতিক। কাল তাকে মারার সময় বইটা মৌনির হাত থেকে কোথায় যেন ছিটকে পড়েছিল। যার দরুণ হার্ড কভারটা কিছুটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এখন বইটা ফেরত নেবে কি না কে জানে। মৌনি ভীত হলো। যদি বই নষ্ট হওয়ার জন্য জরিমানা চাওয়া হয় সেজন্য ভীত হলো।
“ কি ব্যাপার, বাংলার ছাত্রীর হাতে দর্শনের বই! ”
পিছন থেকে নিচু স্বরের কন্ঠস্বরটা কানে পৌছাতেই মৌনি চমকে পিছু ফিরে তাকালো। সেদিন অভ্রনীল স্যারকে দেখে আরো চমকালো। তার চমকানোর মাঝেই স্যার তার সামনে এসে দাঁড়ালো।
“ আমি যতদূর জানি আপনি তো বাংলার ছাত্রী তাই না? ”
বিহ্বল মৌনি হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ল।
“ তাহলে কি গ্রুপ চেইঞ্জ করার কথা ভাবছেন? ”
এবারেও মৌনি দুদিকে মাথা নাড়ল।
“ আই আম সরি বাট, আমার মনে হয় না আপনি বোবা। পরশু ক্লাসে আসতে লেট করেছিলেন বলে আমি যখন কারণ জানতে চেয়েছিলাম ঠিকঠাক-ই জানিয়েছেন। আবার পরে সাহায্যের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। আজ এভাবে বোবার মতো বিহেভ করছেন কেন? ”
“ সরি স্যার। ”
কথাটা বলেই ইতস্তত মৌনি এদিকওদিক দৃষ্টি ফেলে বুঝতে পারল এখানে উপস্থিত প্রায় সবাই তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের চোখেমুখে যেন বিস্ময় খেলা করছে। হুট করেই মৌনির মনে বিলুর বলা সেদিনের কথা। ভার্সিটির অন্যতম হার্টথ্রব হলো এই স্যার। ভার্সিটির হার্টথ্রবকে এভাবে তার মতো একটা মেয়ের সাথে কথা বলতে দেখে হয়তো তাদের বিস্ময়। মৌনি নিজেও কিছুটা বিস্ময় অনুভব করছে। ভার্সিটিতে আসার পর বিলু ছাড়া আর কেউ তো তার সাথে কথা বলতে আসেনি। আজ হঠাৎ স্যার কথা বলতে আসাতেই সে বিস্ময় অনুভব করলো। তবে সকলের চোখের দৃষ্টি খেয়াল হতেই বিস্ময় ছাপিয়ে ইতস্ততায় ছেয়ে গেল তনু মন।
তবে স্যার বোধহয় মৌনির মতো সকলের দৃষ্টিকে ওতোটা পাত্তা দিল না। তিনি নিচু স্বরেই কথা বলছেন সেজন্য কারো পড়ায় ডিস্টার্ব না হওয়ার-ই কথা। তিনি পিছু ফিরে কিছুটা গলা উঁচিয়েই বললেন, এদিকে শোনার মতো কিছুই নেই৷ ইউ গাইজ ক্যারি অন প্লিজ৷ ”
স্যারের একবার বলাতেই যে যার মতো ফের পড়ায় মন দিল৷ অভ্রনীল স্যার ফের বলল, “ ওহ হ্যাঁ, যা বলছিলাম, বাংলার স্টুডেন্টের হাতে ফিলোসোফির বই কি করে? ”
“ তেমন কিছু নয় স্যার। আসলে বেশকিছু দিন ধরেই দর্শনের প্রতি আগ্রহবোধ করছিলাম সেজন্য আর কি। ”
ইতস্ততাটুকুকে মনের মধ্যে চেপে এবার বেশ পরিষ্কার ভাবেই উত্তর দিল মৌনি। স্যার আর তেমন কিছু বললেন না৷ তার প্রশ্নের উত্তর পেতেই ‘ ও, আই সি ’ বলে চলে গেল।
মৌনি একটা লম্বা সমীরণ ত্যাগ করে লাইব্রেরীয়ানের দিকে এগিয়ে গেল। মনে মনে ভাবতে লাগল আমার মনে এসব ইন্টারেস্ট যে কেন অনূভব হয় আল্লাহই ভালো জানেন। আমি যে কেন বারবার ভুলে যাই যে আমি গরীব৷ শখ পূরণের জন্যও সামর্থ্য লাগে, আমার তো সেটাও নেই। এখন এই বইটা নষ্ট করার জন্য নিশ্চিত তাকে এক্সট্রা চার্জ দিতে হবে। সে এখন এক্সট্রা চার্জ কোথায় পাবে?
তার ভাবনার মাঝেই কেউ একজন তার হাত টেনে বাইরে নিয়ে এলো। মৌনি চমকে পাশে তাকালো। বিলুকে দেখে ধাতস্থ হলো। বিলু হড়বড় করে বলল, “ উফ! তুমি এখানে? আমি কোথায় না কোথায় তোমায় খুজেছি। তুমি বলবে না যে এখানে আছো? ”
বিলুর কন্ঠস্বর উঁচু ছিল। সেজন্য স্বাভাবিক-ই সবাই দৃষ্টি নিক্ষেপ করল তাদের উপর। মৌনি বিলুর হাত চেপে আস্তে কথা বলার জন্য ইশারা করল। বিলু জিহ্বা কেটে বলে,
” সরি সরি গাইজ। তোমরা কান্টিনিউ করো। ”
এভাবে দু দুবার তাদের পড়ায় বিঘ্ন ঘটানোর জন্য মৌনি নিজেই লজ্জিত হলো। বিলুকে নিচু কন্ঠে বলল,
“ আমরা বাইরে গিয়ে কথা বলব বিলু, চলো বইটা ফেরত দিয়ে আসি। ”
বিলু চুপচাপ মৌনির সাথে এগিয়ে গেল। লাইব্রেরীয়ান বইটা নিয়ে নাড়াচাড়া করে একবার চশমার ফাঁক গলিয়ে চোখা চোখে মৌনির দিকে তাকালেন। এর বেশি আর কিছুই বললেন না তিনি। মৌনি অবাক হলেও মনে মনে খুশিই হলো। যাক বাবা, এ যাত্রায় বেঁচে গিয়েছি।
_______
লাইব্রেরী থেকে বাইরে বের হতেই বিলু তার চেপে রাখা অস্থিরতা টুকু হড়বড় করে প্রকাশ করতে থাকল। মৌনি দেখল মেয়েটা অত্যাধিক চঞ্চল, সেই সাথে বাচালও। ঠিক তার বিপরীত স্বভাবের। বিলু অস্থির ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল,
“ এই মৌনি, কাল তুমি নিষাদ ব্রোর মাথায় কাচের প্লেট ভেঙেছ? ”
“ হু। ”
“ আরে কি হু করছ? তুমি নিজেও জানো ব্রোর গায়ে হাত তুলেছ মানে তোমার কি হতে পারে? তুমি নিষাদ ভাইয়ের মুখে প্লেট ছুড়েছ মৌনি! আগেরদিন সামান্য রুবাবকে ধাক্কা মারার জন্য আজ তোমায় এতোটা হেনস্থা হতে হলো। আজ যদি নিষাদ ভাইয়ের মুখে প্লেট ছুড়লে! ভাবতে পারছ তোমায় পরবর্তী ঠিক কি কি ফেস করতে হতো? ”
“ কি করবে? ”
মৌনির নির্লিপ্ত স্বর।
“ আজ যে হেনস্তার শিকার হয়েছ এরকমটা বারবার ঘটবে। ভার্সিটিতে থাকা তোমার জন্য দুষ্কর হয়ে পড়বে। ”
মৌনি চোখ ঘুরিয়ে সামনে তাকালো৷ বিষন্ন কন্ঠে বলল,
“ আচ্ছা বিলু, বড়লোকরা কি এমন মানুষ্যত্বহীন হয়? তারা শুধু নিজেদেরকেই মানুষ বলে ভাবে আর গরিবদের জন্তু জানোয়ার মনে করে? যে তাদের উচ্ছিষ্ট খেতে দেয়? ”
“ সব বড়লোকরা এক নয় মৌনি। ”
“ তেমন সব গরিবরাও তো এক নয়৷ ওদের একটু বলে দিও তো, সব গরিবরা পেটের দায়ে বাঁচে না, অনেক গরিবরা স্বপ্নের দায়েও বাঁচে। ”
বিলু নিষ্পলক চেয়ে রইল মৌনির দিকে। সেই সাথে মৌনির চোখে যেন দেখতে পেল তার জ্ব/ল/জ্ব/ল করতে থাকা স্বপ্নটুকুকে।
“ মৌনি? তুমি স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসো? ”
“ খুব। আমার স্বপ্নগুলো কখনো পূর্ণতা পাবে না জেনেও আমি স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখতে তো আর দোষ নেই তাই না? ”
মৌনি ফিচেল হাসলো। বিলুর অস্থিরতা ভাবটা এবার যেন একেবারেই কমে গেল, “ আচ্ছা মৌনি কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করি? ”
“ অবশ্যই। ”
“ আমাদের এই দুইদিনের এই পরিচয়ে তুমি উত্তরটা দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে কিনা জানিনা তবে আমার প্রশ্নটা করতে ভীষণ মন চাইছে। ”
“ করে ফেল। ”
“ তোমার স্বপ্ন কি? ”
“ জানো বিলু, আমি যে পরিবেশটার মধ্যে আছি সেটা আমার জন্য চরম অস্বস্তিকর। দমবন্ধকর একটা পরিবেশ। আমি সেখানে ঠিকঠাক নিশ্বাসও নিতে পারিনা৷ আমি বেঁচে থাকার জন্য একটা সুস্থ-স্বাভাবিক পরিবেশ চাই। যেখানে আমি একটু শান্তিতে শ্বাস নিতে পারবো৷ নিজের মতো করে বাঁচতে পারবো। মুক্ত পাখির মতো আকাশজুড়ে ডানা মিলে উড়তে পারবো৷ সেখানে থাকবে না কোনো বাঁধা, কোনো দ্বিধা। শুধু থাকবে একটা সুস্থ-স্বাভাবিক পরিবেশ। আর সেই পরিবেশটা হবে একান্তই মৌনির। শুধু আর শুধুই মৌনির। আমি অন্যের জন্য নয়, আমি শুধু নিজের জন্য বাঁচতে চাই। আপাতত এতটুকুই..
কথাগুলো বলেই ফিচেল হাসলো মৌনি৷ একভাবে বিলুকে উদ্দেশ্য করে বলল, “ চলো যাওয়া যাক। তোমার স্বপ্নগুলোও বলতে হবে কিন্তু…
বিলু প্রতিউত্তর না করে মাথা নাড়লে মৌনি হাটতে লাগলো।
বিলু যে তার পিছনে থেমে গিয়েছে সেটা সে খেয়ালই করেনি। বিলু মৌনির যাওয়ার পানে নির্নিমেষ চেয়ে থাকার মাঝেই হাতে থাকা বন্ধ ফোনটা এবার সচল হলো। ওপাশ থেকে কেউ তার নাম ধরে ডেকে উঠল ৷ আনমনা বিলু উত্তর দিল, “ তুমি শুনেছ ভাই ওর স্বপ্নগুলো। তুমি কি পারবে ওর স্বপ্নগুলো পূরণ করতে। ”
ওপাশ থেকে ভেসে এলো দৃঢ় কন্ঠস্বর-
“ আজ থেকে ওর সব স্বপ্নপূরণের দায়িত্ব আমার। ওর মাকে দেওয়া কথা রাখতে পারেনি, কিন্তু আমার নিজেকে দেওয়া কথা আমি অবশ্যই রাখব। ওর স্বপ্নপূরণের পথে পাথেয় হবো আমি। আগুন নিয়ে খেলা অনেকদিন আগেই শুরু করেছিলাম, নিজে পুরোপুরি ঝলসে যাওয়ার আগে ওর ঝলসানো ভাগ্যকে ঠিক করার দায়িত্ব নিলাম আমি। নিষাদ মাজহার হয়ে নয় কল্প চৌধুরী-ই হয়ে সে দায়িত্ব নিলাম। কারণ নিষাদরা হেরে গেলেও কল্পরা কখনো হারেনা। ”
_________
—চলবে.
📌 কার্টেসি ছাড়া কপি নিষিদ্ধ📌

