#প্রেম_অপ্রেম_অধ্যায় |৪|
#আফরিন_সুলতানা
–
আমাকে আমার মতো থাকতে দাও
আমি নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছি,
যেটা ছিলনা ছিলনা সেটা না পাওয়াই থাক
সব পেলে নষ্ট জীবন,
তোমার এই দুনিয়ার ঝাপসা আলোর
কিছু সন্ধ্যের গুড়ো হওয়া কাচের মতো
যদি উড়ে যেতে চাও তবে গা ভাসিয়ে দেও
দূরবীনে চোখ রাখবো না, না-না-না
না-না-না-না, না-না-না-না……
গিটারের টুংটাং ধ্বনি আর তার মাদকপূর্ণ কন্ঠস্বরে মূহুর্তেই যেন এক অদ্ভুত ঘোরে ডুবে যায় বিলু। আধার রাত, ঝি ঝি পোকার ডাক, মৃদু মন্দ বাতাসে গাছের পাতা নড়ার শব্দ, আর ঘরের মধ্যে তার অদ্ভুত সুন্দর সুর সবকিছু মিলে বিলুকে একটা ঘোরের মধ্যে নিয়ে গিয়েছিল। তবে তার ঘোর মূহুর্তেই কেটে যায়। ঘরে প্রবেশের পর সে গানের এই কটা লাইন মাত্র শুনতে পেরেছিল। হয়তো সে সবে গান গাওয়া শুরু করেছিল, তবে বিলুর উপস্থিতিতে থেমে গিয়েছে। এতে করে বিলু বেজায় বিরক্ত হয়, গানটাকে সবে একটু উপভোগ করছিল আর তার আগেই গানের সুর কেটে যাওয়ায় বিরক্ত হবারই কথা। সে কপালে ভাজ ফেলে জানালার ধারে বসে থাকা মানুষটার দিকে তাকায়। বিলু শুধু তার পিঠ আর মাথার পিছন দিকটাই দেখতে পাচ্ছে। উদোম গায়ে খোলা জানালার কাছে বসে আছে। জানালা দিয়ে যে কি বেগে বাতাস প্রবেশ করছে সেটা তার ঘাড় ছুই ছুই চুলগুলো উড়াউড়ি দেখেই বোঝা যায়। সাথে বাতাসের প্রতাপে তার নিশ্বাসের মাধ্যমে বের করে দেওয়া সিগারেটের সাদা ধোয়াটুকুও এদিক সেদিক উড়ে যায়। গান গাইতে গাইতে সিগারেট খায় কে ভাই? বিলু আরো বিরক্ত হলো। এতোক্ষণ সে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। এবার গটগট করে ভেতরে ঢুকে তার সন্নিকটে দাঁড়িয়ে তার হাত থেকে সিগারেট সরিয়ে নিতে চাইল। তবে ব্যর্থ সে। তার আগেই সে হাত উচিয়ে সিগারেট অন্য হাতে নেয়। বিলু বিরক্ত কন্ঠে বলে,
“ ভাই তুমি গান থামায়া সিগারেট মুখে দিলা ক্যান? আগে ফেলো বলছি! ”
“ একটা খাবি নাকি? ”
বিলু ছোট ছোট চোখ করে তার দিকে তাকায়। সে আবারো নিকোটিন টেনে নাক-মুখ দিয়ে ধোয়া উড়াচ্ছে। বিলু জিঘেস করলো,
” কি খাওয়ার কথা বলছো? ”
“ সিগারেট। ”
“ ওএমজি! এতো খেতে চাই তাও দেওনা আর আজ নিজে থেকেও অফার করছ! ব্যাপার কি? ”
“ তুই আমার একটা কাজ করে দিয়েছিস তার জন্য। ওটা তোর হাদিয়া। ”
“ মাত্র একটা সিগারেট আমার হাদিয়া! আমি এর থেকেও বেটার কিছু ডিজার্ভ করি। ”
“ সেটা তোর ইনফরমেশনের উপর ভিত্তি করছে। দেখি তুই কতোটা ইনফরমেশন জোগাড় করতে পেরেছিস। টেবিলের ওখান থেকে চেয়ার টেনে এনে পাশে বস। তারপর ওর খবর বল! ”
বিলু টেবিলের পাশের চেয়ারটা টেনে এনে বসল তার পাশে। চেয়ারের উপর পা তুলে হাটু জড়িয়ে তার দিকে ফিরে বসে। হতাশ ভঙ্গিতে বলল,
“ একটা সিগারেট এখন দেওনা ভাই। তোমার খাওয়া দেখে তো আমার লোভ লাগছে। ”
“ বড় ভাইয়ের কাছে সিগারেট চাস লজ্জা করে না তোর? ”
“ না করেনা। একটা দিবা? ”
“ নো। আগে ইনফরমেশন তারপর সিগারেট। ”
“ আচ্ছা বলছি। আর সিগারেট না দিতে চাইলে দিতে হবে না। তার বদলে ওই গানটা পুরোটা শুনিয়ো কেমন? ”
সে হ্যাঁ বলল না। আবার নাকোচও করল না৷ বিলু হতাশার ভঙ্গিতে বলল,
“ তেমন কিছুই জানতে পারেনি ভাই। ও ওই কিছ করার ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করছিল। আমি উত্তর দিয়েছিলাম আর টুকটাক কথা বলছিলাম। আমি বেশি কিছু জিজ্ঞেস করেনি, যদি সন্দেহ করে তাই। এভাবে একদিনে কি মানুষের মনের খবর জানা যায় নাকি। সবকিছু জানার জব্য আরেকটু সময় লাগবে। ”
“ কাঁদছিল কেন? ”
“ একটা লেইম এক্সকিউজ দিয়েছি৷ মাইগ্রেনের ব্যথা। মিথ্যাটাও ঠিকঠাক বলতে পারেনা। আর আই অ্যাম ওয়ান হান্ড্রেড পারসেন্ট শিউর ও তোমার জন্যই কান্না করছিল। ”
“ অন্য কারণও তো হতে পারে। হয়তো বয়ফ্রেন্ড ধোকা
দিয়েছে। ওর বয়ফ্রেন্ড বা ফিয়োন্সে আছে কিনা খোজ নে ভালো করে। ”
“ আমার মনে হয় না ভাই এরকম কেউ আছে? ”
“ থাকতেও তো পারে। এতোদিন কি আমি ওর খোজ নিয়েছি নাকি? আর আমার সাথে ওর কোনো যোযোগাযোগ ছিল না। ওভাবে কান্না কেন করবে? তবে যাই হোক না কেন, আমিও দেখতে চাই আমায় ছাড়া ও কতোটা ভালো আছে। যদি ভালো থাকে তাহলে ছেড়ে দেব। ”
“ আর যদি না থাকে? ”
“ তবুও ছেড়ে দেব। ”
“ কেন? ”
“ শি ডিজার্ভ বেটার। ”
“ তার মানে নিজেকে খারাপ বলছো? ”
“ উহু। তবে আমার থেকেও ভালো কাউকে ডিজার্ভ করে সে। শালা নিজেরই কোনো ঠিকানা নেই সেখানে ওর ঠিকানা আমার কাছে হতে পারে কীভাবে! ”
বিলু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এক অদ্ভুত নীরবতা ছেয়ে গেল দুজনের মাঝে। খানিকক্ষণ পর সে তার একটা হাত বিলুর মাথায় রাখল৷ বিলু একটু চমকে তার দিকে তাকালো। তার কঠিন চোখমুখ শীতল হয়ে এসেছে। তার কন্ঠস্বরটাও কেমন যেন শোনালো,
“ তুই ভালো আছিস বিলু? ”
বিলু উপরনিচ মাথা নাড়ল। যার অর্থ সে ভালো আছে।
“ এভাবেই ভালো থাকিস সবসময়। কারোর কথা ভাববি মা, কাউকে পরোয়া করবি না, শুধু নিজের ভালো থাকার কথা চিন্তা করবি। তোকে ভালো রাখার মতো কেউ নেই৷ তোর নিজেকেই ভালো রাখতে
হবে। ”
সে আবারো মাথা নাড়ল। অর্থাৎ সে ভালো থাকবে,
“ তুই কতোটা ভালো আছিস তোকে দেখলেই বোঝা যায়। ভালো থাকলে আজ সিগারেটের প্রতি লোভ জন্মাত না তোর, লোভ জন্মাত আইসক্রিম, চকলেট, ফুচকা এসবের উপর। তোর গায়ে ছেলেদের জামাকাপড় থাকত না। থাকত শাড়ি,চুরিদার। হাতে রাবারের ব্যান্ড বা পুতির মালা থাকত না। থাকত কাচের চুড়ি। বিলু, মনে রাখিস, তোকে এক পৃথিবী সুখ দেওয়ার জন্য কেউ পৃথিবী ছেড়েছিল। তার জন্য হলেও তোকে সুখে থাকতে হবে। ”
একটু থামল সে। মাথাটা নিচু করে ফেললো। বলল,
“ তোকে সুখে থাকতে বলছি অথচ তোকে সুখ দেওয়ার মানুষ নেই। আই অ্যাম সরি বিলু, আমি চেয়েও তোকে ভালো রাখতে পারছিনা। আমি তোরই ভালো রাখার দায়িত্বটা ঠিকঠাকভাবে পালন করতে পারছিনা সেখানে আরো একজনের দায়িত্ব কীভাবে নেব? ”
“ এভাবে বলো না ভাইয়া। ট্রাস্ট মি, আমি ভালো আছি। আর এই জীবনটা আমি নিজেই বেছে নিয়েছি। আর আমি এতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আমি ভালো আছি ভাইয়া, এবার নিজেকেও ভালো রাখো। ”
বিলু বাইরে স্বাভাবিক থাকলেও সে অনুভব করে তার ভীষণ কান্না পাচ্ছে। তবে সে কাঁদবে না কোনোমতেই। কান্না করে দূর্বলরা। সে তো দূর্বল নয়। শি ইজ এ স্ট্রং উইমিন, ইয়েস শি ইজ এ স্ট্রং উইমিন। সে প্রসঙ্গ পাল্টে বলে, “ গানটা শেষ করো না ভাইয়া। প্লিজ! ”
সে কিছু বললনা। বিলুর মাথা থেকে হাত থেকে সরিয়ে সে হাত রাখল গিটারে। একবার টুং করে আওয়াজ বাজতেই সে থেমে যায়। বলে,
“ ইনফরমেশন প্রোপার নয়। সেজন্য গান শোনা তুই ডিজার্ভ করিস না। ”
“ ভাইয়া প্লিজ! ”
সে জ্বলন্ত সিগারেটটা পায়ের নিচে পিষতে পিষতে গিটারে সুর তোলে। যেখান থেকে গান ছেড়েছিল সেখান থেকেই আবার শুরু করে,
– এই জাহাজ মাস্তুল ছাড়খার
তবুও গল্প লিখছি বাঁচবার
আমি রাখতে চাই না আর তার
কোনো রাত দুপুরের আবদার
.
তাই চেষ্টা করছি বারবার
সাতরে পার খোজার…..
____________
কাঠের জানালায় মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে মৌনি। মৌনিরা যে ফ্লাটে থাকে এটা আসলে ঠিক ফ্লাট নয়। ফ্লাটের আদলে বানানো একটা বাড়ি। বাড়িটার বয়সও নেহাৎ’ই কম নয়। সেটা বাড়িটা দেখলেই বোঝা যায়। পুরাতন বাড়ি হওয়ার দরুণ এখানকার ভাড়াটাও কম। ভাড়া কম হোক বা বাড়িটা পুরানো হোক এই বাড়িটাই মৌনির অসম্ভব প্রিয়৷ বাড়িটা দেখলেই কেমন শান্তি শান্তি অনুভব হয়। বাড়িটা যেমন প্রিয় তার থেকে অধিক প্রিয় বাড়ির জানালা গুলো। এমন ভিন্ন ডিজাইনের জানালা মৌনি আগে নিজের চক্ষে কখনো দেখেনি। টিভিতে দেখেছে আগের জমিদার বাড়ি গুলোতে বা অনেক পুরানো আমলের বাড়িগুলোতে এমন জানালা থাকত। সেই জানালাগুলোর মতোই এই জানালাগুলো। মৌনির থাকার জায়গাও একটা জানালার পাশে। ড্রয়িংরুমের উত্তরকোনের দেয়াল ঘেষে যে জানালাটা রয়েছে সেখানে একটা চৌকি পেতে মৌনি শোয়। এটাই মৌনির থাকার জায়গা৷ তার আসবাব বলতে এই চৌকিটা আর একটা মিনি সাইজের টিনের বাক্স। বাক্সের ভিতরে মৌনির জামাকাপড়, উপরে বইপত্র। যখন বই পড়ে তখন বাক্সটাকে পড়ার টেবিল হিসেবে ব্যবহার করে। আর চেয়ার হলো নিচে মেঝেটা।
তবে আজ আর তার ইউনিক চেয়ার টেবিলে বসে পড়তে বসেনি। পড়তে বসার মন মানসিকতাও নেই এখন। জানালা দিয়ে হু হু করে বাতাস আসলেও জানালাটা বন্ধ করতে ইচ্ছে হচ্ছে না। ঘরের বাতি নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে অনেক আগেই। সবাই এখন গভীর ঘুমে৷ এখন লাইট জ্বালানো অসম্ভব। মৌনি একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে বসেছে। তবে বাতাসে বাতি বারেবারে নিভে যাচ্ছে। তাই সে বাতিটাই নিভিয়ে এখন ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে বসে আছে। খোলা জানালা দিয়ে বাতাস হু হু করে এসে তার মুখ ছুয়ে দিচ্ছে। আজ বাতাসের বেগ প্রচন্ড। বৃষ্টি হচ্ছে না তবে ঠান্ডা হাওয়া ছাড়ছে। সেই ঠান্ডা হাওয়া গায়ে লেগে গায়ে শিরশিরে অনূভুতি হচ্ছে। মৌনি অন্ধকারে চোখ রেখে নির্বিকার বসে আছে। হাতে রয়েছে নিষাদের ছোট্ট ছবিটা। মোমবাতির আলোয় ছবিটা দেখছিল একটু আগে। এখন বাতি নিভিয়ে দেওয়ায় দেখা যাচ্ছে না তবে মাঝে মাঝে যখন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে তখন দৃষ্টি গোচর হচ্ছে। মৌনি সেই আলোতেই ছবিটা দেখছে আর কিছু হিসাব মিলাবার চেষ্টা করছে,
তআর হাতে এখন যে ছবিটা রয়েছে এটা তার ছবি যার সাথে মৌনির সেদিন রাতে বিয়ে হয়েছিল। এই মানুষটাকেই সে নিজের স্বামী হিসেবে জানে। যাকে গত কাল ভার্সিটতে একটা অপ্রীতিকর অবস্থায় দেখেছিল। দুটো মানুষ একই। কিন্তু দুজনের পেশা আলাদা কি করে? সেদিন লোকটা একজন ডাক্তার ছিল। আজ কীভাবে সে একজন স্টুডেন্ট হয়ে গেল? এটা কীভাবে সম্ভব!
এই হিসাব মিলাতে মিলাতে মৌনির মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
সেদিন লোকটার মুখ ওতো মনোযোগ দিয়ে দেখেনি মৌনি। দেখার মতো পরিস্থিতিতেও ছিল না সে। একদিকে মিথ্যে অপবাদ, তার উপর শারিরীক-মানসিক আঘাত, মায়ের অসুস্থতা সব মিলিয়ে তার মস্তিষ্ক এলোমেলো ছিল। সমাজ যখন তার বিরুদ্ধে ছিল, সবাই যখন তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল মৌনি পায়ের তলা থেকে তখন মাটি সরে গিয়েছিল সে তখন মৌনির পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। নিজের মিথ্যা অপবাদ আর শরীরের আঘাতের পরোয়া করেনি সে, শুধু মা’কে সুস্থ করে তোলায় ছিল তার একমাত্র লক্ষ্যে। মা’কে সুস্থ করতে তখন কেউ তাকে আর সাহায্য করছিল না। মৌনির মনে পড়ে সে কীভাবে সবার পায়ে ধরেছিল আর সবাই তাকে শুধু লাথি মেরে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। তখন তার মিথ্যে অপবাদের দায়ে বিয়ে দেওয়া সদ্য বিবাহিত স্বামী তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। তার দায়িত্ব নিয়েছিল, মাকে চিকিৎসার মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখার গুরুভার সে কাধে নিয়েছিল। তখন বোধহয় মৌনি তাকে ভালোভাবে তার দিকে তাকিয়েছিল। সারা মুখ রক্তাক্ত। সে এতোটাই আঘাত প্রাপ্ত ছিল যে সে ঠিকমতো দাঁড়াতেই পারছিল না। অথচ সে নিজের পরোয়া না করে সেই রাতে মাকে নিয়ে ছোটাছুটি সেই করেছিল। সাথে মৌনিরও চিকিৎসা করিয়েছিল। তবে মৌনির সাথে তার একটিবারের জন্যেও কথা হয়নি৷ এমনকি তারা সামনাসামনি দাঁড়াও নি৷ তখন সেরকম কোনো পরিস্থিতিও ছিল না সামনাসামনি দাঁড়ানোর বা কথা বলার৷
সেদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই সে হাসপাতাল থেকে চলে গিয়েছিল। মায়ের যাতে বাকি চিকিৎসাটুকুও ঠিকঠাক হয়, তাদের যেন কোনো অসুবিধা না হয় সে ব্যবস্থাও করেছিল। সাথে অদৃশ্য কোনো একটা কিছু করেছিল। যার জন্য হাসপাতাল থেকে ফেরার পর মৌনিকে কেউ আর কিছু বলেনি। মৌনিরা হাসপাতাল থেকে গ্রামের ফিরেছিল ২ দিন পর। সেদিন দিন রাতে ওই ঘটনার জন্য গ্রামবাসী মৌনির উপর ঠিক যতোটা চড়াও ছিল তার দুদিন পর ঠিক ততোটাই শান্ত হয়ে গিয়েছিল । মৌনিকে নিয়ে পিঠ পিছে নিন্দে করলেও তার সামনে কেউ কিছু বলেনি কখনো। চেয়্যারম্যান সাহেব নিজে এসে তার হাতে কাবিননামা দিয়ে গিয়েছিল। সাথে নিষাদের এই ছবিটাও ছিল। কাবিননামায় প্রথম মৌনির তার নাম দেখেছিল। ‘ নিষাদ মাজহার ’। সাথে একটা চিঠিও দিয়েছিল। আড়াই লাইনের চিঠিতে লেখা ছিল,
“ সরি ফর এভ্রিথিং। আমি আপনার মতোই সবকিছুর ভুক্তভোগী। আমার হাতে কোনোকিছুই ছিল না। থাকলে আপনার জীবনটা নষ্ট হতে দিতাম না। তবে আমার জন্য আপনার জীবনটা যখন এভাবে নষ্ট হয়েছে আমিই আপনার জীবন ঠিক করার দায়িত্ব নেব। আজ গেলাম, তবে যেদিন ফিরে আসবো সেদিন আপনার উপর থেকে সকল অপবাদ মুছে দেব। কথা দিলাম। ”
তার কথায় দৃঢ়তায় মৌনি অদ্ভুত এক ভরসা পেয়েছিল। তবে সেটা সেদিন নয় অনেক পরে। মা-ও বলেছিল যা হয়েছে তা মেনে নিতে। দেখিস সে নিশ্চয়ই একদিন আসবে। গ্রামের মানুষের বাঁকা নজর নষ্ট করে দেবে। সে আমায় কথা দিয়েছে তোর খেয়াল রাখবে। মায়ের কথাকে মৌনি তখন ওতোটা আমলে না নিলেও যখন মা মারা গিয়ে তার দুনিয়া শূন্য হয়ে গিয়েছিল তখন সে কথাটাই মৌনির মনে গেথে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল তার দুনিয়া তো একেবারে শূন্য হয়নি, তার জন্য তার স্বামী আছে। সে আসবে, মৌনিকে নিতে সে নিশ্চয়ই আসবে। তাদের বিয়েটা তিন বছর হলেও তার জন্য মৌনির অপেক্ষা আড়াই বছর। মা মারা যাওয়ার ঠিক পর থেকে। তাকে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্খা বাড়ল যখন সে তার বর্তমান ঠিকানায় এলো। মা মারা যাওয়ার মাস খানেক পর হুট করেই তার আরো একজন অভিভাবক বের হলো। বাবা নামক এক অভিভাবক। এই মানুষটিকে সে কখনো দেখেনি। তবে মায়ের মৃত্যুর পর সেই মানুষটি এসে মৌনির দায়িত্ব নিতে চাইল। মামারা এক পায়ে রাজি। যখন সে নিজের বাড়িতে মৌনিকে নিয়ে এলো তখন মৌনি হয়ে উঠলো তার স্ত্রীর চোখের বি/ষ। বাবা নামক সেই লোকটার দুজন স্ত্রী ছিল। একজন মৌনির মা আর একজন তাসলিমা নামক এক মহিলা। মৌনি জানেনা বাবা কাকে আগে বিয়ে করেছিল। শুধু এটুকু জানে তার মা যখন শয্যাশয়ী হয়ে বিছানায় পড়ে ছিল বছরের বছরের পর বছর তখন এই মানুষটা অন্য নারীর সাথে সুখে সংসার করছিল। সেই সুখের সংসারে মৌনিকে নিয়ে আসায় দাবানলের মতো আগুন লাগল। সেই আগুনের তেজ এতোটাই বেশি ছিল যে হার্টের অসুখে আক্রান্ত সেই মানুষটা একদিন রাতে ঘুমের মধ্যেই হার্ট এট্যাক করে মারা গেল। আর তার মৃত্যুর সমস্ত দায়ভার আসল মৌনির উপর। মৌনির উপর শারিরীক আর মানসিক অত্যাচার যেন চক্রাবৃদ্ধি আকারে বাড়লো ক্রমশই। মৌনি আস্তে আস্তে উপলদ্ধি করতে পেরেছিল তার মা ছিল বাবা জীবনে দ্বিতীয় নারী, অথচ মা নিজেও জানত না যে সে বাবার জীবনে দ্বিতীয় নারী ছিল। মা বাবাকে ভালোবাসে মরেছিল আর বাবা তাকে নিখুঁত ভাবে ঠকিয়েছিল। অন্য নারীর সাথে অন্য জায়গায় বেশ ভালোই ছিল। মাঝখান থেকে কোনো কিছু না করেও সব কিছুর ভুক্তভোগী মৌনি।
এসব কথা মনে করতেই মৌনির ছোট্ট হৃদয়টা কেপে উঠল। হুট করেই সে উপলব্ধি করল সে-ও হয়তো নিষাদের জীবনে দ্বিতীয় নারী। বাবা যেভাবে মাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, নিষাদ সেভাবে মৌনিকে আশা দেখিয়েছিল। ভাগ্য তাকে চোখে আঙুল দিয়ে যেন দেখিয়ে দিল নিষাদের জীবনে যদি সে কোনোভাবে এখন ঢুকেও পড়েও তার অবস্থাও হবে মায়ের মতো। মৃত্যুই হবে তার পরিণতি!
—চলবে.
📌 কার্টেসি ছাড়া কপি নিষিদ্ধ 📌
[ পরবর্তী পর্ব থেকে গল্পের গতিপ্রবাহ বাড়বে। হ্যাপি রিডিং সকলকে ❤️ ]

