প্রেম_অপ্রেম_অধ্যায় |৩| #আফরিন_সুলতানা.

0
412

#প্রেম_অপ্রেম_অধ্যায় |৩|
#আফরিন_সুলতানা.

_
যে মেয়েটা কাল মৌনির হাত টেনে নিষাদদের সামনে নিয়ে গিয়েছিল সেই মেয়েটাকে এখন এখানে এভাবে দেখে অবাক হলো মৌনি। মেয়েটা হেলমেট খুলে হাসি মুখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে৷ এর সাজগোজ একদম ছেলেদের মতো। কাল মেয়েটাকে ভালো করে দেখেনি। আজ দেখল। বিদেশিদের মতো চেহারা। ফকফকা ফর্সা গায়ের রঙ। মাথায় লাল চুল। আবার অর্ধেক কালো। ঠিক কালো নয়। সেগুলোও ঈষৎ লাল। মনে হয় ওটাই ওর চুলের আসল রঙ। নিচের অর্ধেক কৃত্রিম। বাম গালে বড় একটা তিল। ফর্সা মুখে একটুখানি কালোর ছোয়া। গায়ে ছেলেদের মতো জামাকাপড়। হেলমেট না খুললে মৌনি তো বুঝতেই পার‍ত না যে এটা একটা মেয়ে।

“ হেই এভাবে কি দেখছ? ”
মেয়েটার ডাকে ধ্যান কাটলো মৌনির। সে ইতস্তত করে বলল,
“ তোমাকে? এখানে কি করছ? ”

“ এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, তোমাকে দেখে থেমে গেলাম। ”

“ ওহ! ”

“ আমাকে দেখে অবাক হয়েছ? ”

“ তা হয়েছি একটু। এদিকে তো তোমায় কোনোদিন দেখেনি। ”

মেয়েটা দারুণ করে হাসলো। বলল,
“ দেখবে কীভাবে? এদিকে কখনো এসেছি নাকি? আজ একটা দরকারে আসলাম। আচ্ছা কোথায় যাচ্ছে তুমি? ”

“ আমি নিউ মার্কেটের আগে যে ছোট বাজার টা আছে ওখানে যাচ্ছি। ”

“ ওহ হো। আমিও তো ওখানে যাবো। তুমি তাহলে বাইকে বসো। গন্তব্য যখন এক তাহলে একসাথেই যাওয়া যাক। ”

“ না না ঠিক আছে। তুমি যাও আমি চলে যেতে পারবো। ”

“ এখন তো রাস্তাঘাট ফাঁকা। গাড়ি পাবে না। হেটে হেটে যেতে হবে। এতদূর হেটে যাওয়াও সম্ভব নয়। তার থেকে আমার বাইকে উঠো। ”

“ সমস্যা নেই। হেটে যেতে পারবো। ”

“ এতদূর হাটবে! ”

“ অভ্যাস আছে আমার। ”

“ আরে ওঠো তো তুমি। এমন করছো কেন? মনে হচ্ছে আমি তোমাকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যাবো। আমি.. ওহ তোমায় আমার নামটাই বলা হয়নি। আমি বিলু। ”

“ বিলু! ”
মৌনির কন্ঠে ইষত বিস্ময়। এমন সে কোনোদিন শুনেনি।

“ হ্যাঁ, আমার মায়ের নাম নীলু আর আমার নাম বিলু৷ হুমায়ুন আহমেদের লেখা দুটো চরিত্র ছিল নীলু আর বিলু৷ ওরা বোন ছিল। আর আমরা মা মেয়ে। ”
মেয়েটা এবার একটু জোরেই হেসে ফেললো। মৌনি অবাক হয়ে তাকে দেখছে। এই মেয়েটাকে সে চেনেনা। অথচ মেয়েটা তার সাথে কি সাবলীল ভাবে কথা বলছে। মনে হচ্ছে কতোদিনের পরিচিত তারা। কিছু মানুষ খুব সহজেই অপরিচিত মানুষের সাথে মিশে যেতে পারে। সবার মধ্যে এই গুনটা থাকে না। মৌনির তো নেই-ই। মৌনির অচেনা মানুষের সাথে দূরে থাক চেনা মানুষগুলোর সাথেও বোধহয় মেশার গুন নেই। সেজন্যই বোধহয় এতগুলো বছরেও বোধহয় এক বাড়িতে থেকেও বাড়ির মানুষগুলোর সাথে মিশতে পারেনি। মেয়েটা হাসি থামিয়ে মৌনির নাম জেনে নিল৷ তারপর মৌনিকে তার সাথে যাওয়ার জন্য জোড়াজুড়ি করল। মৌনির না কিছুতেই শুনলো না। অগত্যা দ্বিধা নিয়েই মৌনি বাইকে উঠল।

____________

মৌনির সাথে সাথে বিলুও মার্কেটে ঢুকলো। তার সাথে গল্প করতে থাকল। গল্প কর‍তে করতে গল্পের এক পর্যায়ে জিজ্ঞেস করলো,

“ আচ্ছা, তখন ওভাবে কাদঁছিলে কেন? আবার রুবাব আপিকে ধাক্কা মেরে চলে আসলা? ”

কথাটা জিজ্ঞেস করে সে ভ্রু উচালো। মৌনির বিদ্যুৎ চমকের ন্যায় কথাটা মনে পড়তেই চোখ বন্ধ করে নিল। তারপর দীর্ঘশ্বাস চেপে স্বাভাবিকভাবেই বলল,
“ এমনি। ”

“ এমনি এমনি আবার কেউ কাঁদে নাকি? ”

মৌনি মৃদু হেসে বলল,
“ মাইগ্রেনের ব্যথা উঠছিল তখন। মাইগ্রেনের ব্যথা উঠলে আমি কান্না করে ফেলি। তারপর তখন এতো হুল্লোড় হচ্ছিল সেখানে যে ব্যথা আরো বেড়ে গিয়েছিল। তাই কান্না করে ফেলছিলাম। ”

কথাটা বলেই মৌনি মনে মনে তওবা পড়ল। মিথ্যা বলা ছাড়া আর কি বলবে সে? বলবে যে ওই ছেলেটা তার বর ছিল বলে ওভাবে কাঁদছিল? সেটা তো বলা সম্ভব নয়। মৌনি মনে মনে লম্বা সমীরণ ত্যাগ করে বলল,
“ আচ্ছা তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে ওদের খুব ভালো করেই চেনো তুমি। ”

“ চিনবো না আবার। আমি কেন ভার্সিটির সকলেই চেনে৷ নিষাদ ভাই তো আমাদের ভার্সিটির হার্থট্রব। ”

“ ওহ আচ্ছা। ”

“ আমাদের ভার্সিটতে তিনজন হার্টথ্রব বুঝলা। একজন নিষাদ ভাই, দ্বিতীয় বাংলা বিভাগের ফ্যাকাল্টি অভ্রনীল স্যার আর একজন হলো…

“ আজ একজন কে? ”

“ তাকে নিয়ে না-ই বলি। ”

“ কেন? ”

“ তাকে তুমি নিজেই দেখে নিও। আচ্ছা তুমি ফ্রেশার্স তাই না? ”

“ হুম। তুমি? ”

“ আমি ফ্রেশার্স নয় তবে ফার্স্ট ইয়ারেই বুঝলা। গত তিন বছর ধরে এক ক্লাসেই আছি। ”

“ কেন? ”

“ ফেল করি। ফেল না করলে থার্ড ইয়ারে উঠে যেতাম। টাকা মেরে ক্লাস টপকানোর একটা সিস্টেম আছে। তবে আমি সেটা এপ্লাই করিনা। আমার ভাই ওতো টাকা নেই। আমি পুরাই ফাকা। তার থেকে এক ক্লাসে থাকাই ভালো বাবা। ”

“ পড়াশোনা করোনা বুঝি? ”

“ একদমই না। ”

” কি অদ্ভুত তুমি। ”

“ তা বটে। আজ ভার্সিটিতে তো তোমায় দেখলাম
না। ”

“ বাড়ি একটু কাজ ছিল তাই..

“ ওহ! ”

“আচ্ছা শুনো? আর একটা কথা জিজ্ঞেস করি? ”

“ অফকোর্স, যা জিজ্ঞেস করার আছে করো। আবার অনুমতি চাচ্ছ কেন? ”

“ আচ্ছা ওরা ভার্সিটিতে ওভাবে কিস করছিল স্যার ম্যামরা ওদের কিছু বলে না? ”

“ কি বলবে, ভার্সিটির ওনারও নিষাদ-রুবাবের বাপ-দাদারা। ওরা এজন্য সবসময় এক্সট্রা ফ্যাসালিট পায়। তাছাড়া কাল বাংলা নববর্ষ ছিল আবার ভ্যালেন্টাইন্স ডে। ভ্যালেন্টাইন্স ডেটেতে এসব একটু আকটু হয়। যাদের শাস্তির ভ/য় নাই তারা সম্মুখে করে আর যাদের ভ/য় পাছে তারা পিছে। বুঝেছ? ”

মৌনি মুখ বাকালো। নিষ্প্রভ কন্ঠে বলল,
“ হু। ”

“ শোনো মেয়ে, একটা কথা বলি..
কথাটুকু বলেই মেয়েটা একটু এগিয়ে এলো মৌনির দিকে৷ নিচু কন্ঠে বলে,
“ মাইগ্রেণের ব্যথা উঠুক বা যার ব্যথাই উঠুক না কেন, নিষাদ ব্রোর দিকে আর ওভাবে তাকিয়ে কান্না করোনা। জাস্ট মারা পড়বে। ”

“ কেন? ”

মেয়েটা তারপর আর কিছুই বলিনি। তার ফোনে একটা কল আসতেই ব্যস্ততা দেখিয়ে চলে গেল। যাওয়ার আগে বলল, যা বললাম মাথায় রেখো আর বাকি কথা ভার্সিটিতে গিয়ে হবে।

মৌনিকে দ্বিধায় ফেলে চলে গেল সে৷ মেয়েটা ওভাবে বলল কেন? সে কিছু বুঝে ফেলল নাকি যে সে নিষাদের দিকে তাকিয়ে কেন কাঁদছিল। আর মারা পড়ার কথাটাই বা বলল কেন?

একরাশ দ্বিধা দ্বন্দ নিয়ে মৌনি খাবার নিয়ে বাসায় ফিরল। এবার সে হেটেই হেটেই ফিরল। গাড়ির চলাচল থাকলেও তার কাছে ভাড়ার টাকা নেই। ৫০টাকা সে কোনোমতেই গাড়ি ভাড়ার জন্য ভাঙাবে না!

_____________

সূর্য আস্তে আস্তে হেলে পড়তে শুরু করেছে। তবুও রৌদ্দুরের প্রখরতা কিছুমাত্র কমেনি। সূর্য প্রখর উত্তাপ ছড়াচ্ছে। মাথার তালু জ্বা/লা করছে, ছাদে পা ফেলা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে গরম তাওয়ায় পা ফেলেছে সে। পায়ের তলা জ্বা/লা করছে। সে অবস্থায় ছাদের উপর থেকে শুকানো জামাকাপড় গুলো তুলছে মৌনি। জামাকাপড় তো তুলছে না মনে হচ্ছে শপিং তুলছে। কতোক্ষণ ধরে তুলছে তবে শেষ হওয়ার নামই নিচ্ছে না। এক ছাদ ভর্তি হয়ে গেছে জামাকাপড়ে৷ এগুলো পরিষ্কার করতে বসেছিল সেই সকালে খাওয়ার আগে। জামাকাপড় পরিষ্কার করে, ধুয়ে, শুকাতে দিতে ৩/৪ ঘন্টার মতো লেগে গিয়েছে। এর জন্য আজ ভার্সিটিতেও যেতে পারেনি। দুই ভাবির আর তাদের ছেলেমেয়ের এতো জামাকাপড় যে মাঝে মাঝে মৌনি হা হয়ে শুধু চেয়ে থাকে। কি সুন্দর সুন্দর জামা সব। ইশ! এমন একসেট জামা যদি আমার হতো তাহলে নতুন ভার্সিটিতে পড়ে যেতে পারত।

এসব ভাবনায় ছেদ ঘটল যখন পেটটা গুড়গুড় করে ডেকে উঠল। মৌনির হাত পেটে চলে গেল। সকাল থেকে পেটে এখনো পানি ছাড়া কিছুই পড়ে নি। সকালে খাওয়ার সময় জামাকাপড় ধুচ্ছিল ভেবেছিল পরে খেয়ে নিবে। তবে পরে গিয়ে দেখল হাড়িতে আর ভাত নেই। দুপুরে তো বাড়িতে রান্নাই হলো না। খিচুড়ি যা এনেছিল ওদের জন্য। ওরা এখন সেটাই খাচ্ছে। মৌনি ওদের খেতে দিয়ে জামাকাপড় তুলতে এসেছে। ভেবেছিল পাউরুটি দুটো খেয়ে আসবে। কিন্তু বড় ভাবি সে সময় আর দেয়-ই নি। ধুর, ভুল হয়ে গেছে, এখানে পাউরুটি দুটো আনতে পারলে কাজের ফাকে খেয়ে ফেলা যেত। উফ! এতো খিদে পাচ্ছে কেন? এবার তো আমার মাথা ঘুরাচ্ছে।

মৌনি এসব ভাবতে ভাবতে যতদ্রুত সম্ভব হাত চালাচ্ছে। নিচে গিয়ে খাবে তাড়াতাড়ি। তখনই লিজা ভাবি ছুটতে ছুটতে মৌনির কাছে এলো। তার হাতের শুকনো কাপড়গুলো বালতির মধ্যে ফেলে ওর হাত ধরে বলল,
“ এই, তাড়াতাড়ি নিচে চলো। এসব পড়ে তুলো। ”

লিজা ভাবির তাড়াহুড়ো দেখে মনে মনে ভ/য় হলো মৌনির। সে জিজ্ঞেস করল, “ কি হয়েছে ভাবি? এতো ঝটপট করছেন কেন? ”

“ রুহানের অফিসের একজন কলিগ এসেছে উনার ছেলের জন্য তোমাকে দেখতে। ওনার দেখে পছন্দ হলে কাল স্বপরিবারে আসবেন। এখন তাড়াতাড়ি চলো, উনার পছন্দ হলেই দেখি ভালো। ”

মৌনি মনে মনে ঠিক এই ভয়টাই পাচ্ছিল। তাকে দেখতে আসলেই লিজা ভাবি এমন হম্বিতম্বি করে৷ যেন পাত্রপক্ষের মৌনিকে পছন্দ হলে’ই সে বেঁচে যায়। মৌনি অবাক হয় এদের তাকে বাড়ি থেকে বের করার তাড়া দেখে। ২ দিন পরপর পাত্রপক্ষ তাকে দেখতে আসে। গায়ের রঙটা চাপা বলে আর অনাথ বলে প্রতিবার-ই সবাই না করে দেন। মৌনি এই বাড়ির আশ্রিতা৷ তার মা-বাবা কেউ নেই। অথচ অধিকাংশ পাত্রপক্ষের একটাই কথা বিয়ের পর চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে, নতুন ব্যবসা শুরু করার জন্য, বা জিনিসপত্র কেনার ক্ষেত্রে যেন তাদের ছেলের পিছনে একটা সাপোর্টিং হ্যান্ড থাকে। অবশ্যই সেটা মেয়ের বাবা বা ভাই-ই হবে। অথচ মৌনির কেউই নেই। একজন আশ্রিতার জন্য এতো খরচ করবে কে। তবে সবাই অনাথ বলে না বরং মৌনির গায়ের রঙ চাপা বল্রি রিজেক্ট করে। মৌনি খুব ভালো করেই জানে তার গায়ের রঙটা তাকে রিজেক্ট করার মূল কারণ নয়। মৌনি গায়ের শ্যাম-ফর্সা। ফর্সা ভাগটা কম, শ্যামলা ভাবটা বেশি। তবে মানানসই। তাকে রিজেক্ট করার মূল কারণ হলো সে অনাথ। তার কেউ নেই। গায়ের রঙটা তো অজুহাত মাত্র। এসব কিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে কিছু সহৃদয়বান ব্যক্তিও যদি বলে যে তাদের কিছুই লাগবে না তাদের শুধু মেয়েটা ভালো লাগবে। একবার অনেক দূরে শ্যামনগরের ওদিক থেকে একটা সমন্ধ এসেছিল। সেটাই বোধহয় সোনায় সোহাগা ছিল। ছেলে সরকারি চাকরি করে, তাদের কিছুই চাই না। শুধু একটা সচ্চরিত্রের মিষ্টভাষী একটা সুপাত্রী চাই। গায়ের রঙ চাপা, হলেও মৌনিকে তারা ভীষণ পছন্দ করেছিল৷ তবে মৌনি নিজ দায়িত্বে সে বিয়ে ভেঙেছে। এর জন্য মৌনিকে কম মার খেতে হয়নি। পুরো দুইদিন তাকে অনাহারে রাখা হয়েছিল। তবে মৌনি কি-ই বা করবে। সে যে অন্য কারো সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আছে। তার জন্য যে সেই পুরুষটা ছাড়া বাকি সব পুরুষ হারাম। সে চাইলেও কোনোদিন আর অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারবে। ইসলামে ছেলেদের চারটে বিবাহ করা জায়েজ হলেও নারীদের জন্য সে রকম নিয়ম নেই। তারা এক পুরুষের সাথে বিবাহে আবদ্ধ থাকা অবস্থায় আর অন্য কারো সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না যদি না তালাক না হয়।এজন্য মৌনিকে যারাই পছন্দ করত মৌনি নিজ দায়িত্বে সে বিয়ে ভাঙত।

মৌনির ১৫ বছর বয়সে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে একটা ছেলের সাথে বিয়ে হয়েছিল। সেই দিনটা এখনো মৌনির চোখের সামনে স্পষ্ট ভাসে। কি ভয়ংকর ছিল সে দিনটা।

মৌনির মা দীর্ঘদিন ধরে বিছানায় শয্যাশায়ী ছিলেন। মৌনির কাছের মানুষ বলতে একমাত্র তিনিই ছিলেন। মাকে ছাড়া মৌনি কিছুই বুঝতো না। বাবা থেকেও ছিল না। তাই মৌনির দুনিয়াটা মাকে ঘিরেই আবদ্ধ ছিল। সেদিন আষাঢ় মাসের কোনো একটা দিন ছিল। তীব্র বর্ষণের রাত। বৃষ্টির প্রতাপে বাইরে বেরোনো দায়। সাথে ঝড়ো হাওয়া আর আকাশে বিদ্যুৎ চমক তো আছেই। ওইদিনেই মৌনির মায়ের অসুস্থতা বাড়ে। জ্বোরে জ্বোরে শ্বাস টানতে থাকে। মৌনি মায়ের সাথে একা বাড়িতে থাকত। মায়ের হঠাৎ করেই এমন শ্বাস কষ্ট হচ্ছে দেখে মৌনি ঘাবড়ে যায়। দিশেহারা মৌনি বুঝতে পারে না কি করবে। মৌনিরা মূলত মামার বাড়িতেই থাকত। তবে মামাদের নিবাস থেকে আলাদা একটা কুড়েঘরে। মৌনিদের বাড়ি থেকে হাক পাড়লেই মামার বাড়ি থেকে শোনা যায়। মৌনি দিশেহারা হয়ে তাদের ডাকল, তবে সেদিন কারো আর সাড়া পেল না। পাবেই বা কি করে। তারা তো কেউ বাড়িতে ছিল না। বড় মামার মেয়ের শ্বশুড় বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল সবাই। রাত্রিও যাপন করল সেদিন মেয়ের শ্বশুড় বাড়িতে। মৌনি ছুটতে ছুটতে তাদের বাড়ি থেকে ত্রিশ কদম দূরে প্রতিবেশিদের ডেকে আনলো। মৌনির মা মৌমিতার তখন গাল দিয়ে ফ্যানা বেরোচ্ছে চিকন ধারায়। তবে তারা মৌমিতাকে দেখেও খুব একটা গুরুত্ব দিলেন না। এরকম টা মাঝে মাঝেই হয়। কিছুক্ষণেই আবার ঠিক হয়ে যায়। মৌমিতার উপর জ্বিনের আছড় আছে বলে মনে করেন তারা। জ্বিন যখন ঘাড়ে ভর করে বা রেগে যায় তখন মৌমিতার এরকমটা হয়। গ্রামের হুজুর সাহেব এমনটাই বলেছিলেন আর সবাই এমনটাই জানত। মৌমিতার তো আর কোনোদিন চিকিৎসা হয়নি যে সবাই জানবে তার শরীরে আসলে কতো বড় রোগ বাসা বেধেছে। কত বড় একটা রোগ তিনি বয়ে বেড়াচ্ছে বছরের পর বছর। সবাই এটাকে জ্বিনের আছড় বলেই ধরে নেয়। হুজুর সাহেবকে ডেকে দোয়া দুরুদ পড়ে তার গায়ে ফু দিয়ে, পানিপড়া খাইয়ে, হাতে একটা তাবিজ বেধে দিয়ে তার চিকিৎসা সম্পন্ন করেন। তবে মৌমিতা তখনো ছটফট কমলো না দেখে মৌনির চিত্ত আরো চঞ্চল হলো। সে হুজুরের সাহেবের কাছে সে কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি মৌনিকে আশ্বস্ত করে বলেন শরীর থেকে এবার জ্বিন গুলো বের হচ্ছিল তাই এরকম করছে। তারা মৌমিতাকে তারা কষ্ট দিচ্ছে৷ আরো এক দুই তিনঘন্টা এরকম করতে পারে৷ তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে। মৌনির মা ঘুমিয়ে পড়বে৷ সবাই এই বলে মৌনিদের বাসা থেকে চলে গেল।

মৌনি ছোট মানুষ৷ ওতো বোঝে না। তখন তাদের কথাতে শান্ত থাকলেক ক্রমশ যখন মৌমিতার অসুস্থতা বাড়ছিল মৌনির ভ/য় বাড়লো। সবসময় আর এখনকার পরিস্থিতি এক নয়৷ পরিস্থিতিটা এখন বাড়াবাড়ির পর্জায়ে চলে যাচ্ছে৷ মৌমিতাই তাকে অস্ফুটস্বরে বলল সে যেন ওদের না ডেকে একটা ডাক্তার ডাকে। মৌনি করলও তাই। গ্রামে ডাক্তার বলতে দুজন হাতুড়ে ডাক্তারই আছেন। দুজন সম্পর্কে বাপ-ছেলে। হাসপাতাল নেই। শুধু একটা কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। মৌনি মাকে অপেক্ষা করতে বলে ডাক্তারকে ডাকতে গেল। ডাক্তারের বাড়ি মৌনিদের বাড়ি থেকে বেশ দূরে, মৌনি বৃষ্টি ভিজে ভিজে সকল ভয় উপেক্ষা করে ডাক্তারের বাড়িতে গিয়ে পৌছায়। তবে এতো রাতে বৃষ্টির মাঝে ডাক্তার আসতে রাজি হচ্ছিল না। শেষে মৌনি অনেক হাত পায়ে ধরে, ডাক্তারের পারিশ্রমিক হিসেবে তাদের একমাত্র সম্বল তার কানের রিং দুলদুটো দিল। তারপর ডাক্তার আসতে রাজি হলো। ডাক্তার আর উনার স্ত্রী সাথে আসেন। তবে ডাক্তার মৌমিতাকে দেখে বললেন উনার প্যানিক এট্যাক হয়েছে। এখনই হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। আপাতত প্রাথমিক চিকিৎসা উনি করতে হবে। তবে সেটা উনার থেকে উনার ছেলেই ভালো পারবে৷ ওর ছেলে এখন ক্লাব ঘরে আছে। তিনি ফোন আনতে ভুলে গিয়েছেন তাই মৌনি গিয়ে তাকে যেন ডেকে নিয়ে আসে। আর যেন একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে। মৌনির ওতো রাতে একা একা ক্লাব ঘরে যেতে ভ/য় লাগছিল। ক্লাব ঘরে সবসময় একগাদা ছেলে থাকে। তার উপর এতো ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে অন্ধকারের মাঝে সেখান অব্দি যাওয়াটাও ভয়ের। মৌনি তবুও গেল। কারণ মা’কে নিয়ে তার ভয় ছিল। মার যদি উল্টাপাল্টা কিছু হয়ে যায় তাহলে সে তো মরেই যাবে। মা ছাড়া তার দুনিয়ায় সবাই থেকেও কেউ নেই।

তবে ক্লাব ঘরে গিয়েই সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনাটা ঘটলো। সে ক্লাব ঘরে গিয়ে তাদের পাড়ার পরিচিত কাউকে পেল না। পেল একদল অপরিচিত ছেলেকে। তারা মৌনিকে কিছুক্ষণ পর্জবেক্ষণ করে কোনো কথাবার্তা ছাড়াই প্রথমেই তারা মৌনির হাত টেনে ক্লাব ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল। ঘরের মধ্যে ঘুটঘুটে অন্ধকার। মৌনি এতো চিৎকার করল তবুও তারা দরজাটা খুললো না। এমনকি তাদের আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। এদিকে কেউ তীব্র বেগে এসে মৌনির গলা টিপে ধরল। মৌনি ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে করতেই জ্ঞান হারালো। তারপর? তারপরের ঘটনা মৌনির আর মনে নেই।

তার যখন জ্ঞান ফিরল দেখল গ্রামের লোকজন সব তাকে ঘিরে রয়েছে। তার পাশে আরো একটা ছেলে বসা। তাদের দুজনকেই পিঠমোড়া দিয়ে হাত বেধে বসিয়ে রাখা হয়েছে। গ্রামের মোড়ল থেকে শুরু করে একটা বাচ্চা-কাচ্চাও বোধহয় বাদ ছিল সেখানে উপস্থিত হতে। মৌনি প্রথমে কিছু না বুঝলেও আস্তে আস্তে যখন এই পরিবেশের অর্থ বুঝতে পারল মৌনির মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তার চরিত্রের উপর আঙুল তোলা হচ্ছিল। তাকে আর সেই ছেলেটিকে নিয়ে বিচার বসানো হয়েছিল। তারা নাকি ক্লাব ঘরের মধ্যে অনৈতিক কাজে লিপ্ত ছিল। এমনকি সেদিন এই মিথ্যা অপবাদের জন্য মৌনিকে মারধরও করা হয়েছিল। ছেলেটার গায়েও জখম ছিল। হয়তো তাকে আগেই মারধর করা হয়েছিল সেজন্য রক্তা/ক্ত ছিল তার শরীর। মূহুর্তেই মৌনির ছোট্ট শরীরটাও র/ক্তাক্ত হয়ে যায়। তার আহাজারি কেউ শোনেনি, তার কথা কেউ বিশ্বাস করেনি। তাকে সবাই দুঃশ্চরিত্রা প্রমাণ করে তাকে সেই ছেলেটার সাথে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরিবেশ তখন এতোটাই উত্তপ্ত ছিল মৌনি আটকাতে পারেনি সেই বিয়ে। তখন সমস্ত রাগ গিয়ে বর্তেয়েছিল সেই ছেলেটার উপর। তবে সেই রাগটা বেশিক্ষণ মৌনি ধরে রাখতে পারেনি। প্রথমত সে-ও ছিলো মৌনির মতোই ভুক্তভোগী ছিল এসবকিছুর
। দ্বিতীয়ত বা সবথেকে বড় কারণ হলো সেদিন ওই লোকটার জন্যই মা বেঁচে গিয়েছিল। উনি প্রাথমিক চিকিৎসা মাকে বাড়ি থেকেই করেন। তারপর নিজ দায়িত্বে মা’কে নিয়ে সেই রাতেই সদরে হাসপাতালে ছোটেন। মৌনির উপর সে টু শব্দটিও করেনি। নিজের মতোই কাজ করে যাচ্ছিল। মা’কে হাসপাতালে ভর্তি করানো, টাকা জমা দেওয়া এমনকি যখন ওতো রাতে ভালো ডাক্তার পাওয়া যাচ্ছিল না উনি কোনোভাবে হাসপাতাল কতৃপক্ষের সাথে জোগাজোগ করে মায়ের চিকিৎসাটাও তিনিই করেন । পেশায় নাকি তিনি ডাক্তার ছিলেন.. পেশায় তিনি একজন ডাক্তাত ছিলেন..তিনি একজন ডাক্তার!

মৌনি আর আগে কিছুই ভাবতে পারল না। সে মনে মনে বারবার একই কথা আওড়াতে থাকে। এখানেই এসে তার ভাবনা যেন থমকে যায়, সেই সাথে তার পা জোড়াও। লোকটা একজন ডাক্তার ছিল এতোবড় কথাটা এতোক্ষণ মৌনির মাথায় আসেনি কেন? আর সে যদি একজন ডাক্তার’ই হয় তাহলে ওই ভার্সিটতে সে কি করছিল? সে তো ওই ভার্সিটির-ই একজন স্টুডেন্ট। মেয়েটার কাছে কথায় কথায় শুনেছিল যে সে অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ইংরেজি বিভাগের একজন স্টুডেন্ট। সে তখন একজন ডাক্তার ছিল তাহলে এখন সে অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ইংরেজি বিভাগের একজন শিক্ষার্থী হয় কীভাবে!

—চলবে.

📌 কার্টেসি ছাড়া কপি নিষিদ্ধ 📌

[ কাল দিইনি বলে আজ বড় করে দিলাম। এবার থেকে নিয়মিত দেওয়ার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ। ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here