#প্রেম_অপ্রেম_অধ্যায় |৬|
#আফরিন_সুলতানা.
–
বুকের ভিতরে আকাশসম অভিমান পুষে ১৮টা বছর পার করে দিয়েছে মৌনি। মা থাকতে এই অভিমানের পাল্লাটা বোধহয় এতোটা ভারি ছিল না। মা মারা যাওয়ার পর থেকে রেলগাড়ীর মতো এই অভিমানের পারদটা বাড়ছে। মৌনি জানেনা ঠিক কার প্রতি তার এই অভিমান। তাকে তো ভালোবাসার কোনো লোক নেই। আর মানুষ তো ভালোবাসার মানুষের কাছেই তার অভিমানগুলো নিঃশব্দ বার্তায় তুলে ধরতে পারে অবলীলায়। আজ থেকে বছর তিনেক আগে মৌনির একটা ভালোবাসার মানুষ ছিল। মৌনি তার কাছে বুকে জমা আদুরে অভিমান, অভিযোগগুলো তুলে ধরতে পারত অনায়াসেই। সেজন্য বোধহয় তখন অভিমানের পাল্লাটা ওতোটা ভারি ছিল না। কিন্তু এখন আদুরে অভিমানগুলো শোনার মতো মানুষ নেই তার। সেজন্য অভিমাননের পাল্লাটা ভারি হয়ে এসেছে তার। এতোটাই ভারী যে বুকের মধ্যে সবসময় অদ্ভুত এক চিনচিনে ব্যথা অনুভব হয়। কেউ যখন সেই ব্যথায় নতুন করে ব্যথা দেয় দেয় তখন শুরু হয় অসহনীয়, অসহ্য যন্ত্রণা। যন্ত্রণা চোখ হতে নিঃশব্দে নিঃসৃত অশ্রু হয়ে গড়ায়। যে অশ্রুর সাক্ষি হয় সে নিজে, উপর আল্লাহ তায়ালা, ড্রয়িংরুমের নিকট কালো আধারেরা আর তার গাঢ় সবুজ ওয়ারে মোড়া মাথার নিচের বালিশটা।
সম্ভবত পৃথিবীর প্রতি তার এই অভিমান। কারণ এই পৃথিবী তার আশেপাশের মানুষদের ঠিক যতোটা দিয়েছে মৌনিকে তার তিন ভাগের এক ভাগও দেয়নি। যদি সেই ক্ষুদ্রতম এক ভাগ পৃথিবী তাকে দান করত তাহলে তার জীবনটা আজ হয় তো অন্যরকম হতো। সেখানে এতো হাহাকার থাকত না। থাকত না সীমাহীন শূন্যতা, অজস্য না পাওয়ার গল্প।
মৌনির এই অভিমানগুলো প্রকাশের জন্য একটা মানুষ লাগত। নিতান্তই ব্যক্তিগত। মা মারা যাওয়ার আগে এই মানুষটার ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছিলেন। যার সাথে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে হোক তবুও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল। মা তাকে বলেছে সে আমায় কথা দিয়েছে সে ফিরে আসবে। দেখিস একদিন সে নিশ্চয়ই ফিরে আসবে৷ সেদিন মৌনির কিশোরী মনও মায়ের কথা মেনে নিয়েছিল। তিন বছর ধরে অপেক্ষা করেছে তার জন্য। এখানে আসার পর সেই চাওয়ার প্রখরতা বেড়েছে। এখানে তার দম বন্ধ লাগে। দেহ থেকেই মনে হয় প্রাণ নেই। সে তো এভাবে বাচতে চায় না। সে ভালো থাকতে। এই অসুস্থ পরিবেশ থেকে বের হতে চায়। মৌনির স্বপ্ন ছিল সে এসে তাকে এই অসুস্থ পরিবেশ থেকে বের করে নিয়ে যাক।
তবে মৌনির সেই অপেক্ষা, সেই স্বপ্ন সেদিন টুপ করে ভেঙে পড়ল সেদিন যেদিন তাকে অন্য নারীর সাথে দেখেছিল। মৌনি তাকে ঠিক কতোটা ভালো ভেসেছিল জানেনা কিংবা আদৌও কখনো ভালোবেসেছিল কিনা এটাও জানেনা। শুধু এই যে একরোখা, বেপরোয়া অভিমানগুলো কখনো শেষ হবে না সেটা ভেবেই সেদিন কান্না করেছিল সে। তবে আজ সে আফসোসটা যেন কার্পুরের ন্যায় উবে গিয়েছে। এই মূহুর্তে মৌনি উপলব্ধি করতে পারছে তার প্রতি বোধহয় ভালোবাসাটা ছিল না। তাকে ঘিরে মৌনির যা ছিল সেটা শুধুই স্বপ্ন। আর এখন তার প্রতি যা আছে সেটা শুধুই ঘৃণা। গা গুলানো ঘৃণা হচ্ছে তার প্রতি। একটা মানুষ এতোটা বিকৃত মস্তিষ্কের হয় কীভাবে সেটা ভেবেই মাথার মধ্যে দপদপ করে আগুন জ্ব/লছে তার। সেজন্য বোধহয় অসহনীয় টনটনে য/ন্ত্রণা ছড়িয়ে যাচ্ছে মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর জায়গায়। একদিকে ব্রক্ষ্মতালু য/ন্ত্রণায় ফেটে পড়ছে অন্যদিকে হাত পা থরথর করে কাপছে৷ সকাল থেকে কিছু না খাওয়ার জন্য হয়তো দূর্বল শরীরে এই কম্পনটুকু ভারীই পড়ছে। মৌনি ঝাপসা চোখে এদিকওদিক তাকায়। রাস্তায় লাইন দিয়ে গাড়ি চলছে। গাড়ির ঘনত্ব যেন একটু বেশিই। রাস্তার ওপাশে যেতে হবে। তবে মৌনির সাহস হচ্ছে না ওপাশে যাওয়ার। মনে হচ্ছে এক্ষুণি রাস্তায় মাথা ঘুরে পড়ে যাবে।
যদি গাড়ির মাঝেই মাথা ঘুরে পড়ে যাই তাহলে আর আস্ত থাকব না আমি। না থাক, এখুনি পার হওয়ার দরকার নেই। একটু গাড়ির ঘনত্ব কমুক তারপর না হয় ওপাশে যাবো। এসব ভেবে মৌনি রাস্তার ধারে ঠাই দাঁড়িয়ে থাকে। তবে হাত পা কাপছিল বলে রাস্তার পাশে একটা বন্ধ দোকানের সামনে কাঠের তৈরি পাটার উপরে গিয়ে বসে পড়ে। ব্যাগটা বুকে জড়িয়ে একটা পাশে থাকা পিলারে মাথা ঠেকিয়ে হেলান দিয়ে বসে। সে রাস্তার ব্যস্ত মানুষের, ব্যস্ত যাত্রা দেখছে। কখন যে চোখটা লেগে এসেছিল বুঝতেই পারেনা। রাস্তার ধারে একটা পাটায় বসে পিলারে হেলান দিয়ে দূর্বল মেয়েটা মূহুর্তেই ঘুমের দেশে পাড়ি দেয়।
__
“ আপা, আপা! উঠেন, আর কতোক্ষণ ঘুমায় থাকবেন৷ সইন্ধ্যা হয়া গেল তো। আপা! ”
মৌনি ঘুমঘুম চোখ মেলে দেখতে পায় ছোট একটা বাচ্চা মেয়ে তার গায়ে হাত দিয়ে ধাক্কা দিচ্ছে। তার ঠোঁট নড়ছে। সে কিছু একটা বলছে, মৌনির কানে আওয়াজ আসছে। তবে আওয়াজটা স্পষ্ট না৷ সেজন্য ব্যাপারটা বুঝতে তার সময় লাগে।
“ এই যে আপা! ভালো করে চোখ খোলেন। রাইত হয়া গেল তো। বাসায় ফিরবেন না? ”
মুখে পানির ছিটা পড়তেই মৌনি ধড়ফড় করে সোজা হয়ে বসে।
“ এই তো আপা উঠছে। বাপরে, কি যে ঘুম আপনার, ডাকলেও ভাঙেনা। ”
বাচ্চাটার কথা শুনে আর এদিকওদিক তাকিয়ে মৌনি অবাক হয়ে যায়। সে তো এখনো রাস্তায়। আর এই মেয়ে বলে কি, সে কি রাস্তায় বসেই ঘুমিয়ে পড়েছিল নাকি। মৌনি বিহ্বল কন্ঠে শুধায়,
“ আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম নাকি? ”
“ হ্যাঁ তো। পুরো ৪ ঘন্টা ঘুমাইলেন। ”
“ কিহ! এই রাস্তায় বসে আমি ৪ ঘন্টা ঘুমিয়েছি? ”
“ হ।”
মৌনির মাথায় বাজ পড়ার মতো অবস্থা হয়। রাস্তায় বসে বসে ৪ ঘন্টা ঘুমিয়ে কাটিয়েছে ভাবতেই গলা শুকিয়ে আসে। তার বাড়ি ফিরে রান্না করার কথা ছিল, কতো কতো কাজ, বিকাল ৪টা থেকে আর একটা টিউশনি সব গেল। যদিও বাচ্চাটির কথা মতো সন্ধ্যা এখনো হয়নি, তবে বেলা যে অনেক গড়িয়েছে সেটা পরিবেশ দেখেই বোঝা যাচ্ছে৷ এখন বাড়ি ফিরলে না জানি কি উত্তম-মধ্যম অপেক্ষা করছে তার জন্য। নিজের মাথায়-ই এখন নিজের মারতে মন চাচ্ছে। উফ! তোর কি আক্কেল জ্ঞান নেই মৌনি?রাস্তায় বসে কেউ ঘুমায়! ঘুমাতে গেলি কেন তুই? এবার তোর কি হবে? মৌনি মনে নিজেকে শ-খানেক গালিগালাজ করে ব্যাগটা আর মোটা ফিলোসোফির বইটা নিয়ে ঝটপট উঠে দাঁড়ায়। বাচ্চাটাকে কৃতজ্ঞ স্বরে বলে,
“ তোমাকে অনেক ধন্যবাদ বাবু। তুমি না ডাকলে তো সন্ধ্যার পরেও মনে হয় বাড়ি ফিরতে পারতাম না। আমার না অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমি এখন যাই হ্যাঁ..
হড়বড় করে কথাগুলো বলে মৌনি পিছু ফিরতেই মাথাটা আবারো ঘুরে উঠে। বাম হাতে কপালের কাছটা চেপে ধরে৷ উফ! এখনো এই মাথা ব্যথা ছাড়ায়নি৷
“ আপনি এখনো মানসিকভাবে স্ট্যাবল নয় ম্যাডাম। এভাবে গেলে নিজের বিপদ বাড়বে বৈ কমবে না। তার থেকে বরং একটু বসুন, জিরিয়ে নিন, তারপর গন্তব্যে ফিরবেন। এটাই আপনার জন্য ভালো হবে। ”
পুরুষালি কন্ঠস্বরটা কানে পৌছাতেই মৌনি চমকে পিছু ফিরে তাকায়। সে যে পাটায় বসে ছিল তার অপর মাথায় বই হাতে একটা ছেলে বসে আছে। ছেলেটার দৃষ্টি নিবদ্ধ বইতেই৷ তবে কথাগুলো যে তাকেই বলেছে সেটা বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হয় না মৌনির। ছেলেটার কথাবার্তা শুনে মনে হলো সে মৌনিকে বহুক্ষণ ধরে পর্জবেক্ষণ করছে যার জন্য সে বুঝে ফেলেছে যে মৌনির মানসিক অবস্থা স্ট্যাবল নয়৷ কথাটা ভেবেই মৌনি চমকায়। এই ছেলে এতোক্ষণ এখানে বসে তাকে দেখছিল নাকি?
মৌনি এবার তার পাশে দাঁড়ানো মেয়েটার দিকে ভালো করে তাকায়। রুক্ষ্ম চেহারা রুগ্ন দেহের একটা মেয়ে। বয়স খুব বেশি হলে ৮/৯ বছর হবে। গায়ে ময়লা জামাকাপড়, মাথা ভর্তি এলোমেলো কোকড়া চুল। হাতের কিসের একটা ঠোঙা৷
মেয়েটা একটা পথশিশু! হয়তো এই মেয়েটা লক্ষ্য করেছে ছেলেটা তার দিকে খারাপ ভাবে তাকিয়ে আছে তাই এভাবে ডেকে তুলেছে। মৌনির মাথায় খারাপ ভাবনাটায় আগে উঁকি দেয়৷ সে মেয়েটার হাত টেনে কাছে এনে একটু নিচু হয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করে,
“ আমি যখন ঘুমিয়ে ছিলাম এই ছেলেটা কি আমায় দেখছিল? ”
“ আমার ব্যাপারে যখন জিজ্ঞেস করছেনই তখন আমাকে-ই জিজ্ঞেস করুন। ওকে কেন জিজ্ঞেস করছেন ম্যাডাম? ”
মৌনি আবারো ছেলেটার দিকে তাকায়। সে এখনো বইয়ের পাতায় মুখ গুজে বসে আছে। মৌনি বিরক্ত হয়। সে সোজাসুজি ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করে,
“ কে আপনি? আর আপনি এখামে বসেছেন কখন? ”
“ আপনার ঘুমানোর একটু পর। ”
“ কিহ! ”
“ এমন রিয়্যাকশন দিচ্ছেন কেন ম্যাডাম। আপনি এমন ভাবে রিয়্যাকশন দিচ্ছেন যে মনে হচ্ছে এখানে বসে আমি কোনো পাপ করে ফেলেছি। ”
এবার ছেলেটি সরাসরি মৌনির দিকে তাকালো৷ যেখানে পড়ছিল সেটানে আঙুল রেখে বন্ধ করেছে। মৌনির দিকে তাকিয়ে ঠাট্টার সুরে বলল,
“ কি ম্যাডাম, কোনো পাপ করে ফেলেছি নাকি? ”
“ আপনি তো ভারী নির্লজ্জ। একটা মেয়ের পাশে এতোক্ষণ বসে থেকে এখন জিজ্ঞেস করছেন পাপ করেছেন কিনা। ”
“ আপনার থেকে ৫ হাত দূরে বসে, বই পড়ে আমি পাপ করেছি! ”
“ বই পড়েছে কি আমাকে দেখেছে আল্লাহ জানে! ”
কথাটা মৌনি নিজের সাথেই বিরবির করে বলল। তবে এবারেও ছেলেটি কীভাবে যেন শুনতে পেল তার কথা৷ সে হেসে উঠল। বলল,
“ আপনার কি মনে হয় ম্যাডাম৷ আমি এতোক্ষণ বসে বসে আপনাকে দেখেছি৷ হাউ রিডিকিউলাস! এই যে বাবু এদিকে আসো তো। তোমার আপাকে বলে দেও তো আমি এখানে কখন এসেছি আর এসে কি করেছি। ”
বাচ্চাটা কলের পুতুলের ন্যায় ছেলেটার পাশে গিয়ে বসল। মৌনির দিকে চেয়ে হাসি-হাসি মুখ করে বলল,
“ তুমি ভাইজানে উপর হুদাই রাগতেছ। ভাইজান তোমারে মিছা কথা কইছে৷ ভাইজান তো মাত্র আইসা বসল এখানে, আর আইসা বসার থেকে বই পড়তাছে। এখন শুধু আমারে ডেকে কইলো তুমি মনে হয় ঘুমায় গিয়েছ, আমি যেন তোমায় ডেকে দিই। নয়তো রাইত বয়ে গেলে এভাবে থাকলে তোমার বিপদ হইতে পারে। বাজারে তো আর খারাপ লোকের অভাব নাই৷ তাইতো আমি তোমারে ডাকলাম। তুমি ভাইজানের উপর হুদাই ক্ষ্যাপতাছ। ”
মেয়েটার কথা শুনে মৌনি যারপরানাই অবাক। এই লোক এতোক্ষণ তাকে মিথ্যে বলল কেন?
“ আমি মাইন্ড রিডার বইটা পড়ছিলাম, সেখানে একটা ইন্টারেস্টিং চ্যাপ্টার ছিল। আপনাকে মিথ্যে বলে সেটার একটা লাইভ প্রুভ দেখলাম আর কি। ”
মৌনি মুখে না বললেও তার মনে উদিত হওয়া প্রশ্নটির উত্তর দিয়ে দিল অবলীলায়। বলেই সে নিঃশব্দে হাসতে লাগল। মৌনির বিরক্ত লাগছে বেজায় ছেলেটার উপর। বিশেষ করে তার হাসি দেখে। এর সাথে এখানে দাঁড়িয়ে বকবক করার থেকে ভালো এখান থেকে চলে যাওয়া। মৌনি চলে যাওয়ার জন্য পিছু ঘুরল। তখনই একটা ছোট হাত তার হাতটা টেনে ধরল৷ বাচ্চাটি তার দিকে গোলগোল চোখে চেয়ে আছে। মৌনি নরম কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“ কি হয়েছে বাবু? ”
মেয়েটি তার হাতে থাকা ঠোঙা দুটো মৌনির দিকে এগিয়ে দিল মৌনি ভ্রু উচিয়ে শুধায়, “ এটা কি? ”
“ খুলে দেখো। ”
মৌনি ঠোঙাটা নিয়ে খুলে দেখে একটা ঠোঙার মধ্যে পেয়ারা মাখা আর আমড়া মাখা।
“ এগুলো আমি কি করব? ”
“ তুমি খাবা। ”
“ এমা কেন? তুমি খাও সোনা। আমি এসব খাইনা। ”
“ বললেই হলো নাকি। পেয়ারা মাখা তো সবাই পছন্দ করে। আর তোমার তো খিদে পেয়েছে নাকি? তাহলে খাবা না কেন? ”
“ তোমায় কে বললো আমার খিদে পেয়েছে? ”
” ওইতো ডাক..
“ কে কইবে আবার? তোমায় দেখেই তো বোঝা তোনার খিদে পেয়েছে। চোখমুখ কেমন শুকিয়ে গিয়েছে।”
” একদম চোখমুখ শুকিয়ে..
“ এই যে ম্যাডাম, এতো বাহানা করছেন কেন? ও কি ওগুলো আপনাকে এমনি এমনি দিচ্ছে নাকি যে এতো বাহানা বানাচ্ছেন। ও ওগুলো বিক্রি করছে আপনার কাছে। আর এগুলো ওর কাছে লাস্ট প্যাক। এগুলো বিক্রি করেই ও বাড়ি চলে যাবে। ”
মৌনি নিজের বোকামিতে নিজেই অবাক হয়ে গেল৷ সত্যিই তো, এমন একটা পথশিশু তাকে এতগুলো খাবার এমনি এমনি দিতে যাবে কেন৷ কিন্তু মেয়েটা এমন ভাবে বলছিল যেন…
“ এগুলো নেও না আপা। সব কয়টা প্যাকেট বিক্রি করতে না পারলে মালিক বকবে খুব। পারিশ্রমিক ও কাইটা নিবে। ”
মৌনি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার নিজের কাছেই তো এতো টাকা নেই। সে জিজ্ঞেস করল,
“ এগুলোর দাম কত বাবু?”
“ প্যাকেট প্রতি ৫ টাকা৷ ”
“ কিন্তু এগুলো তো অনেক। দাম তো ত্রিশ-চল্লিশ টাকার উপরে হবে৷ ”
“ তুমি কখনো মাখা কিনোনি নাকি। এগুলোর দাম দশ-টাকাই। ”
“ এতগুলো পেয়ারা আর আমড়া মাখার দাম দশ টাকা! ”
“ হু। ”
“ তাও এতগুল..
“ আমি তো ওর থেকে পাঁচ টাকা দিয়ে একটা কিং সাইজের প্যাক কিনেছি। এই যে দেখুন… তবুও পাঁচ টাকার জন্য এতো বাহানা করেনি। ”
মৌনি কটমট করে ছেলেটার দিকে তাকালো। কিন্তু কিছু বলল না৷ সে ব্যাগ হাতড়ে ৫ টাকার নোট দুটো বাচ্চাটির হাতে দিয়ে ঠোঙা দুটো নিল৷ ঠোঙাটা মৌনির হাতে দিয়ে বাচ্চাটা মৌনির হাত টেনে আগে মৌনি যেখানে বসেছিল সেখানে বসালো।
“ এগুলো এখন এখানে বসে খাবা তুমি। শেষে মাখাগুলো আমি বানাইছি। সেজন্য তো বিক্রিই হচ্ছিল না। খেয়ে বলোতো টেস্ট কি খুব খারাপ হয়েছে নাকি?”
মৌনি আর থাকতে চাচ্ছিল না। শুধু বাচ্চাটার মন রক্ষার্থে আমড়া মাখার ঠোঙাটা খেয়ে শেষ করল। বাকিটা পথে খেয়ে নেবে বলে ওর থেকে বিদায় নিল। মৌনি হাটতে হাটতেই পিছু ফিরে তাকালো৷ সে যেখানে বসে ছিল বাচ্চাটা সেখানে বাবু হয়ে বসে টাকা গুনছে। মেয়েটার সুন্দর চেহারাটা ঢাকা পড়েছে গায়ের ওই ময়লা জামা, তেল ছাড়া রুক্ষ্ম-জট পাকানো চুল আর চামড়ায় লেগে থাকা ময়লার আস্তরণে৷ বাচ্চাটিকে এর আগে দেখেনি মৌনি, তবুও বাচ্চাটার জন্য মনটা কেঁদে ওঠে মৌনির। সেই সাথে যে অভিমানে একটু আগে তার হৃদয় বিষিয়ে আসছিল এখন সেই অভিমান যেন কার্পূরের ন্যায় উবে যাচ্ছে। এটা ভেবেই সেই অভিমান ধূলিসাৎ হচ্ছে যে ওইটুকু একটা বাচ্চা মেয়ে জীবনধারণের জন্য কীভাবে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে জীবনযাপন করছে। আল্লাহ তাকে তো অন্তত এর চেয়ে ভালো রেখেছে। তাকে তো এখনো রাস্তায় নামতে হয়নি।
___
পশ্চিম আকাশে সূর্যটা আস্তে আস্তে হেলে পড়ছে। বেলা প্রায় ডোবার পথে। হয়তো সন্ধ্যে হতে আর ১০/১৫ মিনিট বাকি। এতোটা সময় পেরিয়ে গিয়েছে তবে মৌনির মাথার যন্ত্রণাটা এখনো কমছে না। এখন অবশ্য যন্ত্রণাটা নেই , ঘুমানোর ফলে এখন মাথাটা ভার ভার লাগছে। একবার মাথা যন্ত্রণা শুরু হলে এমন অসহ্যকর যন্ত্রণা হয় কেন কে জানে!
‘তবে এই যন্ত্রণার জন্য আর বসে থাকলে চলবে না। অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে আজ। বাড়িতে নিশ্চয়ই আমার জন্য শনি অপেক্ষা করছে। গাড়ির ভীর কমার জন্য অপেক্ষা নাভকরে আগেই চলে যাওয়া উচিত ছিল৷ আমিতো ভুলেই গিয়েছিলাম এ রাস্তায় গাড়ি কখনো কমে না। রাস্তাটা চার লেনের হলে চারদিক থেকে চারটে রাস্তার সংযোযোগ স্থল হওয়ায় এখানে গাড়ির ভীর একটু বেশিই থাকে। এই যেমন দুপুরেও যেমন ছিল এখন বিকালেও তেমন ভীর৷ কিন্তু এখন শত মাথা ঘুরলেও বসে থাকলে তো চলবে না ’ – এসব ভাবতে ভাবতে মৌনি তাড়াহুড়ো করে রাস্তা পার হতে গিয়ে একটা বিপত্তি ঘটিয়ে বসে। মাঝরাস্তায় গিয়েই হাতে থাকা বইটা মাঝরাস্তাতেই পড়ে যায়। মৌনি সেটা খেয়াল না করেই কয়েক কদম এগিয়ে গিয়েছিল। হাতের দিকে তাকাতেই খেয়াল হয় বইটা নেয়। সে এদিকওদিক তাকিয়ে দেখে সেটা মাঝরাস্তাতেই পড়ে গিয়েছে। এক্ষুণি একটা মোটরসাইকেল তার বইয়ের উপর দিয়ে চলে গেল। এই বইটা সে দুদিন আগে লাইব্রেরি থেকে নিয়েছিল। কালকের মধ্যে আবার সহি সালামাত ফিরিয়েও দিতে হবে৷ তাই এখন বইটার এমন দশা দেখে আঁতকে উঠে সে। দৌড়ে গিয়ে বইটা তুলে নিয়ে বুকের সামনে চেপে ধরে।
তখনই দুইদিক থেকে গাড়ির হর্নের আওয়াজে পিলে চমকে ওঠে মৌনির। নিজের অবস্থান খেয়াল হতেই আরো চমকায়৷ মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে সে। আগে-পরে, সামনে-পেছনে সব গাড়ি। মাঝখানে একটু ফাঁকা জায়গা আছে সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে সে। তবে এই জায়গাটা বেশিক্ষণ ফাঁকা থাকবে বলে মনে হয় না৷ দুইদিক থেকে দুটো গাড়ি তীব্র গতিতে এগিয়ে আসছে এদিকে৷ দুই গাড়ির থেকে মৌনির দূরত্বও বেশি নয়। আকস্মিক ঘটনায় মৌনির মাথায় কাজ করা বন্ধ করে দেয়। মাথাটা স্প্রিংয়ের ন্যায় এদিকওদিক ঘুরিয়ে দেখে এখান থেকে বেরোনোর জায়গা নেই। এতো ভীর তো ছিল না, হুট করেই গাড়ির এতো ভীর হয়ে গেল কীভাবে!
—চলবে.
📌কার্টেসি ছাড়া কপি নিষিদ্ধ 📌
[ এই পর্বটা দিতে অনেক দেরি করেছি তাই না? তার জন্য আমি সত্যিই ভীষণ দুঃখিত৷ আদতে এই পর্ব আমার পরশুদিন লেখা শেষ হয়েছে। তবে আমার পছন্দ হচ্ছিল না সেটা, লিখে সব কেটে দিলাম৷ তারপর এভাবে তিনদিনে চারটা পর্ব লিখেছি। কিন্তু একটাও মনঃপুত হয়নি। এভাবে লিখেছি আর মুছেছি। যথারিতি কাক রাতেও তাই হয়েছে। রাতে দেব বলে সব ঠিকঠাক করে রেখেছি যখন দেওয়ার সময় আসলে আবার এডিট করেছি৷ আসলে আমার অসুস্থতার জন্য লেখায় ঠিকঠাক লেখায় কনসেনট্রেট করতে পারছিনা। যা লিখি সব ভুলভাল। সেজন্য এরকমটা হচ্ছে। তবে অবশেষে একটা মনপুত পর্ব লিখতে পারলাম৷ আগের গুলোর থেকে এটা বেটার। তবুও ভুল ত্রুটি থাকলে একটু ধরিয়ে দেবেন, আমি ঠিক করার চেষ্টা করব৷ আর পরবর্তী পর্ব তাড়াতাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করব। সম্ভবত কাল সাহরির পর। দোয়া করবেন আমার জন্য৷ ও পর্বটাও যেন এমন না হয়, আর যেন লেখালেখিতে একটু কনসেন্ট্রেট করতে পারি। ধন্যবাদ ও ভালোবাসা সকলকে। ❤️ ]

