#প্রেম_অপ্রেম_অধ্যায় |৭|
#আফরিন_সুলতানা
_
-‘ রাস্তার মাঝে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে গাড়ি এসে আপনাকে পিষে দিতে সময় নিবেনা ম্যাডাম। সময় মতো মস্তিষ্কের ব্যবহার করতে শিখুন,নয়তো নিজেকে হারাতে হবে। ’
মৌনির কানে কথাটা ঢুকলো কিনা বোঝা গেল না। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তার হাত ধরে টেনে নিয়ে যাওয়া যুবকের দিকে। সে শুধু তাকিয়েই আছে। তার মস্তিষ্ক অন্য জায়গায়। মাথা একপ্রকার কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। শরীরের কাপুনিটা আবার ফিরে এসেছে। শরীরের থেকে বুকের মধ্যে কাপছে বেশি। একটু আগে কি হতে যাচ্ছিল! এই ছেলেটা যদি তার হাত টেনে না নিত তাহলে সে তো ওই গাড়ির নিচে চাপা পড়ত। এই যে নিশ্বাস ফেলছে এই নিশ্বাসটাও হয়তো বন্ধ হয়ে যেত এতোক্ষণে।
“ এই যে ম্যাডাম, আপনি এখন নিরাপদ জায়গায় আছেন, আটকে রাখা নিশ্বাসটা ছাড়ুন এবার। নয়তো দম আটকে যাবে। ”
নিস্প্রাণ চোখে মৌনি ছেলেটার দিকে তাকায়। আটকে রাখা নিশ্বাসটা ছাড়ে। পিছু ফিরে সেই জায়গাটা দেখে যেখানে একটু আগে সে দাঁড়িয়ে ছিল৷ বেরোনোর কোনো জায়গা খুজে পাচ্ছিল না সে। শুধু দেখতে পাচ্ছিল চারিদিক থেকে গাড়ির ভীর তাকে চেপে ধরেছে৷ আর দুটো বড় বড় গাড়ি তার দিকে এগিয়ে আসছে। দুটো গাড়ির মধ্যে একটা তাকে পিষে দেবে অল্পক্ষণের মধ্যে। তখন কি হয়েছিল কে জানে, মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল৷ যদি না এই ছেলেটা তাকে ওখান থেকে বের করে না আনত সে হয়তো বেঁচে থাকতো না এতোক্ষণ। এটা সেই ছেলেটাই যার সাথে একটু আগে রাগারাগি করে চলে এলো। আর এখন ছেলেটা তাকে এতোবড় বিপদের হাত থেকে রক্ষা করল! মৌনি একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে। ফের ফর্সা চেহারার লম্বাটে গড়নের ছেলেটার দিকে তাকায়। ছেলেটা তার থেকে অনেক লম্বা। মাথা উঁচু করে তার দিকে তাকাতে হচ্ছে। মৌনি মাথা উঁচু করে ওর দিকে তাকায়। সে তাকাতেই ছেলেটা বলল,
“ ঠিক আছেন আপনি? ”
মৌনি উপর নিচ মাথা নাড়ে।
“ ওভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন কেন? আরেকটু হলেই তো বড় কোনো দূর্ঘটনা ঘটে যেত। ”
“ আমার চারপাশে গাড়ির ভীর ছিল। বেড়িয়ে আসতাম কীভাবে? ”
“ বেরিয়ে আসার মতো যথেষ্ট পথ ছিল। এই যে আমি আপনাকে নিয়ে আসলাম। ”
“ কি জানি। ” পরপরই নিস্পন্দ কন্ঠে ছোট্ট করে বলে,
“ ধন্যবাদ। ”
“ শুধু ধন্যবাদ? আমি আপনার জীবন বাঁচালাম, তার বদলে শুধু ধন্যবাদ দিচ্ছেন? ”
মৌনি কিছু না বলে মাথাটা নিচু করল। নজর পড়ল হাতের দিকে৷ ছেলেটা এখনো তার হাত ধরে রেখেছে খেয়াল হতেই ছাড়িয়ে নিল হাতটা। আগের ন্যায় বলল,
“ ধন্যবাদ দেওয়া ছাড়া আর কিছু দেওয়ার নেই আমার। আমার জীবন বাঁচানোর জন্য আমি ঋণী থাকব আপনার কাছে। যদি কোনোদিন সামর্থ্য হয় তাহলে ঋণটাও শোধ করে দেব। ”
“ তাহলে আপনি বলছেন আপনি আমার কাছে ঋণী? আর সামর্থ্য থাকলে ঋণটাও শোধ করে দেবেন তাইতো? ”
“ আপনার ঋণ শোধ করার মতো সময়, সুজোগ, সামর্থ্য থাকলে অবশ্যই শোধ করব। ”
ছেলেটা ভ্রু কুচকে ক্ষণিক তাকিয়ে থাকল। কি যেন ভেবে বলল,
“ আমি দেখতে পাচ্ছি এখন আপনার ঋণ শোধ করার মতো সময়, সুজোগ, সামর্থ্য তিনটেই আছে। তাহলে ঋণটা ফিউচারের জন্য তুলে রেখে কি লাভ, প্রেজেন্টে-ই না হয় শোধ করুন। ”
মৌনি ছোট ছোট চোখে ওর দিকে তাকালো। ছেলেটা কি বলছে বুঝতে পারছেনা। মৌনিকে তাকাতে দেখে সে ভ্রু উঁচিয়ে শুধালো, “ কি, ঋণটা এখন শোধ করতে কোনো সমস্যা আছে নাকি? ”
“ কীভাবে শোধ করতে হবে? ”
“ আপনি এই এলাকার মানুষ? ”
” হুম। ”
ছেলেটা মৌনির হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে বলল,
“ আমি এই ঠিকানার বাড়িটা খুজছি। গুগল ম্যাপ আমাকে এই অব্দিই নিয়ে এসেছে। আপনাকে আমাকে এই ঠিকানায় নিয়ে যেতে হবে? আপনি ঠিকানাটা চেনেন কি? ”
মৌনি ইষৎ বিস্ময় নিয়ে ছেলেটার দিকে তাকায়।
“ আপনি এই ঠিকানাটা খুজছেন কেন? ”
“ আপনি চিনেন কিনা আগে বলুন। নয়তো কেন খুজছি বলা যাবে না। ”
“ চিনি। এটা আমাদের বাড়ির ঠিকানা। ”
“ ওহ হো! তাহলে তো ভালোই হলো। বাড়ি খুজতে গিয়ে বাড়ির মালিককেই খুজে পেলাম…
” আমি বাড়ির মালিক নই। আমরা ভাড়া থাকি ওখানে। ”
“ যাই হোক। আপনি বাড়ির বাসিন্দা তো নাকি। আমাকে এবার ওখানে নিয়ে চলুন। ”
“ কেন? ”
“ উহু। আপনার দায়িত্ব আমাকে সাহায্য করে ঋণ শোধ করা, প্রশ্ন করা নয়। কি বুঝেছেন? ”
“ হু। ঠিক আছে চলুন। ”
“ এক মিনিট ওয়েট করুন। আমি আমার বাইকটা নিয়ে আসি৷ ”
কথাটা বলেই ছেলেটা চোখের পলকেই গাড়ির ফাঁক গলিয়ে রাস্তার ওপাশে চলে গেল। তারা যেখানে বসে ছিল ওই পাটার তার পাশেই দাঁড় করানো কালো রঙের রয়্যাল এনফিল্ড বাইকটা নিয়ে এলো। যদিও মৌনি নাম জানেনা বাইকের। তার কাছে মনে হলো বিলুর বাইকটাও এমন। সে মৌনির সামনে বাইকটা দাঁড় করিয়ে বলল, “ উঠুন তাড়াতাড়ি। ”
“ আমি হেঁটে যাচ্ছি। আপনি আমাকে ফলো করুন। ”
“ আর ইউ ক্রাজি। আপনি হেটে যাবেন আর আমি আপনাকে ফলো করব। তাহলে তো আমার বাইককেও হাটাতে হবে৷ ”
মৌনি চুপ থাকল। ছেলেটি ফের বলল,
“ দেখুন ম্যাডাম আমি আমার বাইককে হাটাতে পারব না। আপনি বাইকে উঠুন জলদি। এমনিতেই আমার অনেক লেইট হয়ে গিয়েছে, আমার মনে হয় আপনারও লেইট হয়েছে। আপনার বাড়ির লোক হয়তো চিন্তা করছে। তার থেকে আপনি বাইকে উঠুন, আমারও সময় বাঁচবে আর আপনারও।”
“ আমি আপনার বাইকে উঠতে পারব না। ”
“ কেন? আমার বাইকে কি সমস্যা? ”
“ কিছু না। আমি উঠতে পারব না। ”
ছেলেটি ভ্রু কুচকে মৌনির দিকে তাকিয়ে রইল ক্ষণিক। মেয়েটা ব্যাগের ফিতে ধরে মোচড়ামুচড়ি করছে।
“ আপনি কি আমার বাইকে উঠতে ইরিটেড ফিল করছেন? ”
“ ইরিটেড ফিল করার ই কথা। যতো’ই হোক আমি আপনাকে চিনিনা। এই স্বল্প পরিচয়ে আমি আপনার সাথে একা বাইকে উঠতে পারব না। ”
“ ঠিক আছে। রিকশায় উঠতে সমস্যা নেই তো? কারণ বাইক নিয়ে আমি হাটতে পারব না। বাইক আমি এখানেই রেখে যাব। কি রিকশায় যাবেন? ”
মৌনিকে ভাবতে দেখে সে ফের বলল,
“ দেখুন ম্যাডাম, রিকশায় কিন্তু আপনাকে আমার সাথে একা যেতে হবে না, রিকশাওয়ালাও থাকবে। ”
মৌনি মৃদু স্বরে বলে, “ আমার কাছে টাকা নেই। ”
“ তো আপনার কাছে টাকা চেয়েছে কে? ”
“ আমি আপনার টাকায় যাবো না। ”
“ আপনি তো বাড়ি ফিরছেন নাকি? বাড়ি ফিরে দিয়ে দিয়েন৷ এখন চলুন প্লিজ। অনেক লেট হচ্ছে
আমার। ”
“ ঠিক আছে, রিকশা ডাকুন। ”
মৌনির অনুমতি পেয়ে ছেলেটি বাইকটা সাইড করে রেখে একটা রিকশা ডেকে আনল। সে রিকশায় বসেই এসেছিল। মৌনিকে উঠতে বলল। মৌনি উঠে এমনভাবে বসল যেন দুজনের গায়ে টাচ না লাগে। ছেলেটিকে নিজেদের মধ্যেকার বসার দূরত্ব দেখে অন্যদিকে ফিরে আলগোছে হাসল। মৌনি মাথা নিচু করে বসে। পড়ে যাওয়া বইটা উল্টেপাল্টে দেখেছে ঠিক আছে কিনা। ছেলেটি ওর অগোচরেই খানিকক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল। মৃদু কন্ঠে বলল, “ আপনার নামটা জানা হলো না ম্যাডাম। ”
“ মৌনি। ”
বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে উত্তর দেয় মৌনি।
“ শুধু মৌনি? ”
“ হু। ”
“ আমার নাম জানতে চাইবেন না? ”
“ বলুন। ”
“ কল্প..
মৌনি বিস্ময় নিয়ে তার দিকে তাকালো।
“ কল্পনা! আপনাকে মেয়েদের নাম রাখলো কে? ”
“ কল্পনা নয় কল্প। ”
“ আচ্ছা, আমি ভাবলাম কল্পনা। ”
মৌনি আর কিছু বলল না। তারপরে সারা রাস্তায়-ই তাদের মধ্যে আর কথা হলো না। বাসায় এসে মৌনি তাকে বাড়িওয়ালার ঘর দেখিয়ে নিজের বাড়িতে চলে এলো।
___
বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। রাস্তা থেকে আজান দিয়ে দিয়েছিল। রিকশায় আসতে একটু সময় লেগেছে। এখনো সে ঘরের বাইরে কলিংবেল টিপে দাঁড়িয়ে আছে৷ এই ধরে চারবার কলিংবেল টিপল সে। তবে কেউ দরজা খুলছে না৷ মৌনির ভয়টা এবার আরো বাড়ে৷ কেউ পীপহোল দিয়ে কি দেখে নিয়েছে মৌনি এসেছে তার জন্য দরজা খুলছে না। আজ কি কেউ আর দরজা খুলবে না?
মৌনির কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে থাকে। ভয়ে কলিজা লাফাচ্ছে। না জানি আজ কি অপেক্ষা করছে তার কপালে৷ মৌনি পঞ্চমবার কলিংবেল টেপার জন্য হাত উঠালো। তখনই দরজাটা খুলে গেল। মাঝপথেই মৌনির হাত থেমে যায়। রুহান ভাইয়ের মেয়ে রুবি দরজা খুলেছে। মেয়েটি দরজা খুলেই সরে গেল। নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে উচ্চস্বরে আওয়াজ দিল,
“ মা, দাদিমা দেখো দ্যা প্রিন্সেস মৌনি খানম বাড়ি ফিরেছে। দ্যা প্রিন্সেস আগমনের মাধ্যমে অবশেষে তোমাদের অপেক্ষার দ্যা ইন্ড ঘটলো। ”
রুবির কথা শুনে মৌনির শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। মৌনি খুব ভালো করেই জানে কেউ চিন্তা করে তার জন্য অপেক্ষা করবেনা। তবে কিসের জন্য অপেক্ষা করছিল? তার দেড়িতে বাড়ি ফেরার কারণে শাস্তি দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল মনি। মৌনি সদর দরজা লাগিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে যায় ড্রয়িংরুমের দিকে। ড্রয়িংরুমে পা রাখতে না রাখতেই কোথা থেকে একটা ভারি জিনিস এসে লাগে তার মাথায়। জিনিসটা মৌনির মাথায় লেগে পড়ে গেল মাটিতে। ঝনঝন শব্দে ভেঙে গেল কাচের শোপিচটা। নিচে ভেঙে যাওয়া কাচগুলোর দিকে তাকিয়ে মৌনি বুঝল তার মাথায় কিসের বাড়ি লেগেছে। সেই সাথে এটাও বুঝতে পারল তার কপাল বেয়ে র/ক্ত ঝড়ছে। মুখ নিচু করে থাকার কারণে কপাল বেয়ে র/ক্তটুকু চুইয়ে চুইয়ে টুপ করে পড়ে সাদা রঙের টাইলসের ফ্লোরে। দু ফোটা র/ক্ত পড়তেই পিঠে তীব্র ব্যথার অনুভব করে। মৌনি মুখ দিয়ে ব্যথাসূচক মৃদু আওয়াজ করে। তারপর আর আওয়াজটুকু করারও সুজোগ পেল না। শুধু মনির বিশ্রী গালির আওয়াজ পেল আর নিজের বিভিন্ন অঙ্গে তীব্র ব্যথার অনূভুত হলো। মনি একহাতে চুলের মুঠি ধরে রেখেছে অন্যহাতে তিন আঙুল চওড়া মোটা বেতটা দিতে প্রহার করছে। মনি মারতে মারতেই দাতে দাত চেপে বলে চলেছে,
“ খান** বেটি, এতোক্ষণ কোথায় ছিলি শুনি? ন্যাং নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল? এখন বাড়ি ফিরলি কেন? রাতেও থাকতি তোর ওই ন্যাংয়ের সাথে। এতোক্ষণ যখন তোর দেহ ভোগ করেছে রাতে ভোগ করার সুজোগ হতে বঞ্চিত করলি কেন? বেজন্মার বাচ্চা, মায়ের চরিত্রের তো ঠিক ছিল না, এখন দেখিয়ে তুইও দেখিয়ে দিলি তোর চরিত্রের ঠিক নেই। তোর মা তো ওই দেহ দিয়েই তোর বাপকে হাত করেছিল, এখন তুইও দেহ দিয়েও পয়সাওয়ালা ছেলের গলায় ঝুলে পড়লি? এতো দেহের তেজ আর টাকার লোভ থাকলে ভালো মানুষের পাড়ায় থাকিস কেন? বেশ্যা পাড়ায় গিয়ে দেহ বিলালেই তো পারিস। দেহর তেজও কমবে আর টাকাও কামাতে পারবি…
এতোক্ষণ শরীরে যা আঘাত লাগছিল তার থেকে শতগুনে এই কথাগুলো তার মনে আঘাত করে। কান ঝা ঝা করে ওঠে। অপমানে গা রি রি করে ওঠে। মৌনি বহু কষ্টে ধস্তাধস্তি করে লাঠিটা ধরে ধরা গলায় বলে,
“ তুমি আমাকে নিয়ে যা ইচ্ছা বলো মনি, কিন্তু আমার মাকে নিয়ে কিছু বলবে না তুমি! আর এসব তুমি কি বলছ ? কি বলছ জেনেশুনে বলছ তো? আমি রাস্তায় বসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তাই আসতে দেরি হলো, আর তুমি আমার চরিত্রের উপর আঙুল তুললে! ”
মৌনির লাঠি ধরায় আর তার সাথে উঁচু গলায় কথা বলায় আগের থেকে দ্বিগুন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন তাসলিমা। বিশ্রী কয়েকটা গালি দিয়ে বলেন,
“ কেন? তোর মাকে নিয়ে কিছু বলব না কেন? তোর মা কি ধোয়া তুলসি পাতা? ওই মা* আমার স্বামীকে শরীরের লোভ দেখিয়ে আমার সংসারটা ভেঙেছে। ফুসলিয়ে আমার স্বামীকে বিয়ে করে লাখ লাখ টাকা হাত করে নিয়েছে। আর এখন তুইও তোর মার পথে হাটছিস। আমি বললেই দোষ? হ্যাঁ, আমি বললেই দোষ? ”
মৌনির হাতের মুঠো থেকে লাঠি ছিনিয়ে নিয়ে আবার মারতে শুরু করেন। মৌনি নিশব্দে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে কান্নাভেজা গলায় ফরিয়াদ করে উঠল,
“ আল্লাহর দোহাই লাগে আমার মরা মা’কে নিয়ে এভাবে কিছু বলো না। আমায় যতো ইচ্ছা মারো, তবুও আমার মা’কে কিছু বলো না। আর একবার শুনো তো আমার আসতে কেন দেরি হলো? আমার কথা বিশ্বাস করো মনি, আমি রাস্তার ধারে একটা পাটায় বসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সেজন্য আসতে দেরি হলো। মনি..আমার কথাটা শোনো…
“ মা একটু থামো তো, ও ভাবছে তুমি ওকে এসব এমনি এমনি বলছ, ওকে দেখিয়ে দিই ওর চরিত্রের দোষটা কোথায়। ”
লিজা ভাবির গলার আওয়াজ শোনা গেল। তার কথা শুনে থেমে গেলেন মনি। মৌনিকে মারতে মারতে তিনি হাপিয়ে উঠেছে। বড় বড় শ্বাস ফেলতে ফেলতে বলেন,
“ লিজা, ছবিটা দেখাও ওই বে”শ্যাটাকে। রাস্তা ঘাটে বে”শ্যাগিরি করে বেড়ায় , আবার বলতে গেলে বলে আমি কিছু করেনি। ”
কথাটুকু বলে তিনি ডাইনিং এ গিয়ে ধকধক করে পানি খেতে লাগলেন। লিজা ভাবি অনাকাঙ্ক্ষিত ছবিটা দেখালো তাকে। কল্প যখন ওর হাত টেনে রাস্তা পার করিয়ে দিয়েছিল রাস্তার এপাশে এসে মিনিটখানেক বেখেয়ালে তার হাত ধরে রেখেছিল। কল্পর মুখটা না দেখা গেলেও মৌনির মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কল্প শুধু মৌনির হাতটাই ধরে রেখেছে আর মৌনি তার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছে, এর বেশি আর কিছু নয়। এর জন্য তার চরিত্র নিয়ে কথা উঠল! শুধুমাত্র এই কারণে এমন অশ্লীল কথাগুলো তাকে জড়িয়ে বলা হলো!
মৌনি ব্যাপারটা তাদের বোঝানোর চেষ্টা করল। তবে কেউ বোঝার চেষ্টাটুকুও করল না। তাসলিমা পানি খেয়ে মনে ইচ্ছামতো মারতে থাকে মৌনিকে। সে যখন মৌনিকে মারে এরকম ভাবেই মারে। য তোক্ষণ না তার মনের খোয়াইশ না মেটে ততোক্ষণ মারে। যখন নিতান্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েন তখনই থামেন। আজও তার ব্যতিক্রম নয়। একটানা বিশ মিনিটের মতো লাগাতার প্রহার করে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়েন তখনই হাপাতে হাপাতে টেবিলের কাছে গিয়ে দ্বিতীয় পানির গ্লাসটা শেষ করেন। মৌনির তখন আর বসে থাকার মতো অবস্থা নেই। মাটিতে ঠিক কাচের ওই ভাঙা শোপিচটার মতো পড়ে আছে। কপালে গড়িয়ে অহর্নিশ র/ক্ত ঝড়ছে। সেই র/ক্তের সাথে চোখের পানিগুলো মিলেছে একাকার হয়ে যাচ্ছে। ফুল স্লিভস সালোয়ার-কামিজ গায়ে থাকার কারণে ভেতরের ক্ষতগুলো দেখা গেল না তবে স্কাই রঙের জামাটা জায়গায় জায়গায় র/ক্তে লাল হয়ে গিয়েছে। যে কারণেই ভেতরের ক্ষতটুকু সহজেই অনুমান করা যায়।
তবে আজ মৌনিকে শুধু মেরেই ক্ষ্যান্ত হলেন না তাসলিমা। যেহেতু একটা ছেলের সাথে সারাদিন সময় কাটিয়েছে সে এর জন্য চূড়ান্ত শাস্তি পেতে হবে ওই বে”শ্যাটাকে। তিনি লিজাকে বললেন ও যেন মৌনির চুলের মুঠি ধরে বাইরে বের করে দিয়ে আসে। সারারাত ঘরের বাইরে থাকবে এটাই ওর শাস্তি। লিজা বাধ্য বউমার মতো শ্বাশুড়ির কথা শুনলো। মৌনিকে টেনে নিয়ে ঘরের বাইরের দিকে নিয়ে যেতে থাকল। মৌনি ঝাপসা চোখে দেখতে লাগল মনি ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসে পানি খাচ্ছে আর রুবি তার ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে বুকে হাত গুজে মিটিমিটি হাসছে। মৌনিকে ধরে লিজা ভাবি ঘরের বাইরে ফেলে দরজাটা আটকে দিল। মৌনি ঝাপসা চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে থেকে ঘাড় বাকিয়ে সিড়ির দিকে তাকালো৷ এর পরে সিড়ি। আচ্ছা এই সিড়িতে গড়িয়ে পড়লে সে কি মরে যাবে? এই যন্ত্রণা যে আর সহ্য হয়না। অসহনীয় যন্ত্রণা হলেও আত্মহত্যা করার সা্ মৌনির নেই। তাই সে ঝাপসা চোখে সিড়িগুলোর দিকে শুধু তাকিয়েই থাকল। চোখ বুজে আসছে, দেহ আর পারছেনা। মনে হচ্ছে এখুনি জ্ঞান হারাবে। মৌনির জ্ঞান হারাতে সময় লাগে না। তবে জ্ঞান হারাবার পূর্বে দেখে সিড়ি বেয়ে দুটো পা তার দিকেই এগিয়ে আসছে। তার সন্নিকটেই এসে থামে পা দুটো। কালো জুতো পড়া পুরুষালি দুটো পা। মৌনি চোখ মেলে উপরে তাকিয়ে দেখল টুকটুকে ফর্সা চেহারার একটা মুখ। মুখটাকে চেনা চেনা লাগছে। কোথায় যেন ব্যক্তিটিকে এর আগেও দেখেছে সে। কিন্তু কোথায় দেখেছে? মনে পড়ছে না কেন? বহুক্ষণ পর মৌনির মুখটা খেয়ালে এলো। ছেলেটার নাম কল্প না কল্পনা কি যেন?
— চলবে.
[ আমি অস্পষ্ট কিছু বাক্যের মধ্যে ইতিমধ্যেই অনেককিছু ক্লিয়ার করে দিয়েছি। এর পরের পর্বটা পড়লে আরো একটু ভালো ভাবে বুঝতে পারবেন। আর আমি এমন ভাবেই অর্ধেক ধোয়াশা ক্লিয়ার করে ফেলবো। বাকি অর্ধেক কারো মুখ থেকে। বাঁদরের মতো লাফ দিয়ে দিয়ে সবকিছু ক্লিয়ার করতে পারবো না। নায়ক এমন কেন, গল্পের আগামাথা নেই, কিচ্ছু বুঝতে পারছিনা, এমন মন্তব্য না করে ধৈর্য্য ধরুণ, পাশে থাকুন। আশা করি সব বুঝে যাবেন আস্তে আস্তে। আমার কথা খারাপ ভাবে নিবেন না। আপনাদের না বুঝাতে পারলে আমারও খারাপ লাগে। আর খারাপ লাগলে আর লিখতে ইচ্ছে হয় না। তাই একটু ধৈর্য্য ধরে পাশে থাকার জন্য অনুরোধ করলাম আরকি। ধন্যবাদ। ]

