মায়ার_যাতনা #পর্ব_২২ #অরুনিতা_আঁখি

0
223

#মায়ার_যাতনা
#পর্ব_২২
#অরুনিতা_আঁখি

ঘরে ঢুকেই রুদ্রের অদ্ভুত ভাবে দমে থাকা ক্রোধ ফের জেগে উঠলো।
বিছানার উপর তার দেওয়া শাড়ি গয়না মোবাইলসহ অন্যান্য সকল গিফট পড়ে আছে —মায়ার রেখে যাওয়া এক নীরব ব্যঙ্গ যেন!
তার দৃষ্টি মুহূর্তেই ঝড়ের মতো তীব্র হয়ে উঠলো।

হুংকার ছেড়ে হাতের নাগালে যা পেল—সবই তার রোষে ভেঙে চুরমার হলো।
দেয়ালের ফ্রেম, কাঁচের শো-পিস, টেবিলের ল্যাম্প—সবই রুদ্রের ক্রোধের বলি।
কয়েক মিনিটেই সাজানো ঘরটা অর্ধ ধ্বংসস্তূপে রূপ নিলো।

কিন্তু হঠাৎই তার চোখ পড়ে বিছানায় রাখা ফোন আর সেই উপহারগুলোর দিকে।
সেগুলো ভাঙার জন্য হাত উঠলো ঠিকই, অথচ থেমে গেল মাঝপথেই।
চোখ জ্বলে উঠলো আগুনের শিখায়, ঠোঁট থেকে বের হলো বিষধর শব্দ—

“ঐ নারী কী করে সাহস পায় আমার উপহারকে উপেক্ষা করার!
এটার মাশুল তাকে দিতেই হবে।
রুদ্র কায়নাথ মির্জা যা চায়—তা করেই ছাড়ে।
দেখবো আমি, সে আর কতদূর উড়তে পারে।
আফটার অল , অতিরিক্ত গজানো ডানা ছেঁটে ফেলার কৌশল আমি খুব ভালোভাবেই জানি।”
~~~~~~
সেই দিনের পর মাঝে আরো দুই দিন কেটে গেছে,,এরমধ্যে রুদ্রের দেখা পাওয়া যায়নি, এতে অবশ্য মায়া ভীষণ খুশি হয়েছে। তবে সেই দিনের ঘটনা মায়ার মস্তিষ্ককে গ্রাস করলেও, বর্তমানে তার দিন কাটছে অন্য চিন্তায়—মাস শেষ হলেও দুইজন স্টুডেন্ট এর কেউই এখনো টাকা দেয়নি। আর টাকা দিলেও, সেই টাকার পুরোটা তো মায়া রাখতে পারবে না। এর কারণ,মায়া কেবল শেষের দশ দিন পড়িয়েছে, বাকি দিনগুলো তো মারিয়ায় পরিয়েছে ওদেরকে! তাই বেতনের দুই-তৃতীয়াংশ মারিয়ার প্রাপ্য…।
এদিকে কোচিংয়ে ভর্তি হওয়ার সময়সীমা’ও শেষের দিকে। মায়ার হাতে এখন একটা টাকাও নেই খরচা করার মতো –তাই ভর্তির ফি হাজার বিশেক হলেও, এটা মায়ার কাছে লাখ টাকার সমান!
মায়ার চারদিক এখন অন্ধকার হয়ে আছে।টাকা কিভাবে জোগাড় করবে তার চিন্তায় চিন্তায় নাওয়া খাওয়া যেন হারাম হয়ে গেছে তার জন্য!
………..

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিষ্পৃহ চোখে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করছে মায়া।গলায় একটা সোনার চিকন চেইন,আর কানে একজোড়া সোনার দুল! এগুলো তার মা ভালোবেসে কিনে পরিয়ে দিয়েছিল ছোট্ট মায়াকে। আয়নার দিকে তাকিয়ে থেকেই মায়া আলতো করে কানের দুল জোড়াকে ছুঁয়ে দিল –আর তখনই হুট করে ছল ছল করা আঁখিদ্বয় থেকে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পরলো গাল বেয়ে!
কিন্তু মায়া আগের মতই নিষ্পৃহ রইলো।

হঠাৎই কি মনে করে যেন, মায়া ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বের করলো ছবি তোলার জন্য। বারান্দায় গিয়ে নিজেই নিজের কয়েকটা ছবি তুললো। কিন্তু পরে ছবিগুলোকে দেখে মায়ার মনে হলো সুন্দর হয়নি ছবিগুলো। এগুলো তো সারা জীবন তার কাছে স্মৃতি করে রাখবে –তাকে এমন মরা মরা লাগলে তো চলবে না!
পুনরায় ফিরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখে হালকা একটু পাউডার আর ঠোঁটে লিপস্টিক মেখে আবার বারান্দায় চলে গেল।

মায়া একটু হাসিমুখে ছবি তোলার চেষ্টা করছে।যদিও তার হাসি পাচ্ছে না –তবুও জোরপূর্বক মুখে হাসির রেখা টেনে ছবি তুলল আরো কয়েকটা।
ছবি তোলা শেষ হলে, শক্তিহীন কাঁপা হাতে দুল গুলো খুলে হাতে নিল সে। নির্জীব চোখে তাকিয়ে থাকলো কতক্ষণ –তারপর শেষবারের মতো দুল গুলোতে ঠোঁটের স্পর্শ বুলিয়ে রাখল, আঁখি জোড়া বেয়ে আবারো অশ্রু ধারার ঢল নামলো…!

“ মা..! বাবা..!তোমাদের অযোগ্য মেয়েটাকে মাফ করে দিও তোমরা!আমাকে ভালোবেসে তোমাদের দেওয়া চিহ্নগুলো ধীরে ধীরে আমি বিক্রি করে দিচ্ছি –আমার স্বপ্ন পূরণের জন্য! ”
মায়া থামলো…।পরে ভাঙা গলায় কেমন বুঝানোর স্বরে আওড়ালো ,,
“ কিন্তু তোমরা চিন্তা করো না –এগুলো তো তোমরা আমার জন্যই রেখেছো,, তাই আমি আমার প্রয়োজনে এগুলো ব্যবহার করছি!
কিন্তু…কিন্তু তোমাদের ব্যবহার করা প্রতিটা জিনিস, তোমাদের প্রতিটা চিহ্ন আমি অতি সযত্নে সংরক্ষণ করে রাখবো।দরকার পড়লে কালকুঠুরিতে বন্দী করে রাখবো।আমি মরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তোমাদের সেই চিহ্ন, তোমাদেরকে আমার কাছে সযত্নে লুকিয়ে রাখবো।কোথাও হারিয়ে যেতে দেব না…।”
~~~~~~

সন্ধ্যা ছয়টা বাজে,, রুদ্র অফিস থেকে বাড়ি ফিরে এসেছে। কিন্তু ম্যানশন এর দরজা বাইরে থেকে লকড্ দেখে কপালে কিঞ্চিৎ ভাঁজ পরলো তার,,
“মেয়েটা বাসায় আসেনি এখনো? ”,,রুদ্র চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঘরে প্রবেশ করলো, ভাবলো, “মেয়েটা বাসায় ফেরতে প্রায় সাড়ে ছয়টা বেজে যায়…এসেই যাবে আর কিছুক্ষণ পর। ”

ঘরে গিয়ে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িং রুমে চলে আসলো।
টিভি চালিয়ে সোফায় বসে অপেক্ষা করতে থাকলো।
কিছুক্ষণ পর বিরক্ত হয়ে হাত ঘড়িতে সময় দেখল আবার, “সাড়ে ছয়টা তো বেজে গেছে! এখনো আসছে না কেন? ”

এমনিতেই ব্যবসার কাজে দুই দিন রুদ্রকে বাইরে থাকতে হয়েছে। বাসার প্রতি কোনদিনই এত টান অনুভব হয়নি রুদ্রের..!কিন্তু হঠাৎ’ই কেন যেন বাসায় ফিরতে না পারায় এই দুইদিন যেন রুদ্রের কাছে দুই যুগ মনে হয়েছে..।
আর কি আশ্চর্য! অথচ এখন কিনা বাসায় ফিরে’ও রুদ্রের প্রতীক্ষা শেষ হচ্ছে না!
রুদ্র আবারও সময় দেখলো–6:40 বাজে এখন।রুদ্রের এবার রাগ লাগছে! টিভি বন্ধ করে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো সে। অস্থির চিত্তে পুরো ড্রয়িং রুম জুড়ে পায়চারি করতে লাগলো।

“উফফ…! একটুও ভালো লাগছে না। আর এক মিনিটও অপেক্ষা করা যাচ্ছে না!
পাঁজি মেয়েটা এখনো বাসায় ফিরছে না কেন? ”
রুদ্রের এবার রাগের সাথে সাথে প্রচন্ড চিন্তা’ও হচ্ছে। মনটা কেমন অদ্ভুত চিন্তায় আঁনচান করছে…। তাই সে আর অপেক্ষা করলো না। পরনের ঢোলাঢালা সাদা ব্যাগি টি-শার্ট আর হাঁটু সমান শর্ট জিন্স পড়া ছিলো..রুদ্র সেভাবেই দ্রুত গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লো।
মায়া কোথায় কখন কোন সময়ে টিউশন পড়াতে যায়, সেটা রুদ্রের জানার বাইরে নয়। মূলত মায়া সংক্রান্ত কোনোকিছু বের করা রুদ্রের জন্য কোন ব্যাপারই না। তাই আগে থেকে জানা থাকায়, রুদ্র গাড়ি নিয়ে সেই গতিপথেই যাচ্ছে..!…

~~~~~
মায়া~ আঙ্কেল! দেখুন তো এটা কততে বিক্রি করা যাবে?
জুয়েলারি শপে অবস্থানরত অর্ধ বয়স্ক দোকানদার লোকটি মায়ার হাতে থাকা দুলটি নিয়ে কিছুক্ষণ ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলো।তারপর মায়াকে তা ফিরিয়ে দিয়ে ভারী গম্ভীর কণ্ঠে বললো,,
“ জোড়া আশি হাজার পড়বে…। ”

লোকটার জবাব শুনে মায়া ৫ সেকেন্ডের মতো শান্তভাবে ভেবে, পরে জানালো
“আঙ্কেল জোড়া নেই..। আমি একটাই বিক্রি করবো…আপনি ৪০ হাজার দিয়েন। ”

“মা, জোড়া আর সিঙ্গেলের হিসাব আলাদা! একটা বিক্রি করলে তোমাকে আমি ত্রিশ দিতে পারব..। ”

মায়া অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,“ কেন আঙ্কেল? দুটো মিলে যদি আশি হয়,তাহলে একটা চল্লিশ হওয়ার কথা না?”

“তোমাকে তো বলেছি মা, এগুলোর হিসাব আলাদা আলাদা হয়। ”

লোকটার ধূর্ত কথাবার্তা কেন যেন মায়া বিশ্বাস করতে পারছেনা,,“লোকটা তাকে কম বয়সী মনে করে,আবার বোকা বানাতে চাইছে না তো?
ইসস্ বড্ড ভুল করে ফেলেছে সে, হাতে সময় নেই। তার উপর রাত হয়ে গিয়েছে। কাছে পিঠে শুধুমাত্র এই জুয়েলারি দোকান টাই আছে।না হলে আরো কয়েকটা দোকান ঘুরে দেখা যেত,,এমনিতেই সে এসব বিষয়ে অপরিপক্ক।

“ আচ্ছা সমস্যা নেই আঙ্কেল.. তাহলে আমি অন্য দোকানে দেখছি৷ ”,শান্তভাবে কথাটি বলেই মায়া চলে যেতে নিল।

“ শোনো, দাড়াও মা।”

মায়া থেমে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “জ্বী, আঙ্কেল! কিছু বলবেন? ”

“ চলো পয়ত্রিশ দিবো তোমাকে..। ”

“ নাহহ..আঙ্কেল। ”

“ আচ্ছা.. সাইত্রিশ? ”

“ নাহহ!”

“আচ্ছা, তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে বিপদে পড়েছো হয়তো… তোমার জন্য না হয় চল্লিশ ই রাখলাম। ”..
….
মায়া তার কানের দুল বিক্রি করে জুয়েলারি শপ থেকে বেরিয়ে আসলো। বুকটা জ্বলে যাচ্ছে তার,, প্রতিবার গহনা বিক্রির সময় তার কলিজাটা যেন ফেটে যায়..!
~~~~

ম্যানশন এ প্রবেশের সাথে সাথেই মায়াকে রুদ্রের মুখোমুখি হতে হলো। রুদ্র আগে থেকেই দরজা খুলে দরজা থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল,যেন সে ওর জন্যই অপেক্ষা করছিল এতক্ষণ!

মায়া খানিক চমকালো, সেই সাথে এক বস্তা বিরক্তি এসে জমা হলো তার মুখে,“ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই কেন এই লোকটাকে চোখের সামনে পড়তে হবে!
দুদিন ছিল না, একটু শান্তিতে ছিলাম আমি। ”

মায়ার ভাবনার মাঝেই রুদ্র মায়ার সামনে এগিয়ে এসে থমথমে গলায় জিজ্ঞাসা করলো,
“ বাসায় ফিরতে এতো রাত হলো কেন? ”,রুদ্রের গলা অত্যন্ত ভারী আর কঠোর শোনালো।

মায়া জুতো খুলে ‘শো কাবার্ডে’ রাখতে রাখতে শান্তভাবে জবাব দিলো,
“ জরুরী কাজ ছিল, তাই আসতে লেট হয়ে গিয়েছে! ”
মায়ার জবাব শুনেও যেন রুদ্র সন্তুষ্ট হতে পারল না, সে রুষ্ট কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলো,
“কী কাজ ছিল?”

মায়া এবার তাকালো রুদ্রের দিকে–
“আমি ক্লান্ত!দয়া করে আমাকে যেতে দিন এখন… আমাকে ফ্রেশ হতে হবে। পরে না হয় জবাবদিহিতা করবেন? ”
মায়ার কণ্ঠ বড্ড ভঙ্গুর শোনালো! বোঝাই যাচ্ছে মেয়েটা সত্যিই ক্লান্ত।

রুদ্র কিছু বলতে গিয়েও বললো না মায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে, মেয়েটার মুখ খানা এতো মলিন লাগছে কেন!
রুদ্রের শক্ত কণ্ঠস্বর নরম হয়ে এলো, কোমল কণ্ঠে বললো,
“আচ্ছা যাও এখন। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে এখানে চলে আসবে –আমি অপেক্ষা করেছি!
আর কান দিয়ে শুনে কথাটা ভালো করে মাথায় ঢুকিয়ে নাও,, “যতই ইম্পরট্যান্ট কাজ থাকুক না কেন, এরপর থেকে কখনোই রাত করে বাসায় আসতে পারবেনা। আর মোস্ট ইম্পরট্যান্ট যেটা,তোমার জন্য আলাদা গাড়ি রাখা হবে। যেখানে যাবে,গাড়িতে করে যাবে। ”

রুদ্রের কথা মায়া মাথায় ঢুকানো তো দূর,, ভালো করে কানেই নেয় নি। সে রুদ্রের কথাকে এক প্রকার হেলায় ফেলে নিজের ঘরে গিয়ে ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দিলো।

রুদ্র সেদিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চাপলো…।

~~~~~
মায়া বাসায় ফিরেছিল রাত আট’টার দিকে, আর এখন ন’টা বাজে! পুরো একঘন্টা হয়েছে দরজা বন্ধ করে ঘরে ঢুকেছে সে!
আর এই এক ঘন্টা রুদ্র’ও নিজের ঘরে যায়নি , এখানেই বসে চোখ মুখ শক্ত করে অপেক্ষা করছিল মায়ার জন্য।
কিন্তু এবার তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল,, দরজার সামনে গিয়ে হাত দিয়ে জোরে জোরে আঘাত করে মায়াকে ডাকা শুরু করলো।পাক্কা ৫ মিনিট চিল্লানোর পর মায়া দরজা খুললো–
“ কি সমস্যা? দরজা ভেঙে ফেলবেন নাকি! ”

রুদ্রের মুখে শব্দ এসেও আটকে গেল মায়ার লাল ও ফুলে ওঠা চোখ মুখ দেখে!
অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
“ কেঁদেছো কেন তুমি? ”

…..চলবে??

https://www.facebook.com/share/1AYhCCqwqL/
https://www.facebook.com/share/g/1AufQdkZf8/
এই গল্পের নেক্সট পার্ট এর হাইলাইট নোটিফিকেশন পেতে অবশ্যই কমেন্ট অথবা follow ফলো করে রাখুন..!
#গল্প_ঘর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here