#আমরন_চেয়েছি_তোমায়
#লেখায়_সুরাইয়া_নওশিন
১৬
শুক্রবারের দিনটা খান বাড়ির সবাই নিজেদের কর্ম কাজে একটু কম ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করেন। রায়হান খান আদেশে দুপুর ১২ টা থেকে বিকেল পর্যন্ত বাসায় থাকে সবাই। শরীরের বিশ্রাম, কর্মবিরতির প্রয়োজন রয়েছে। জুম্মার নামায পরে দুপুরের খাবার খেয়ে একটু হাটাহাটি করে ঘুমিয়ে পরেছিলো সানি। আছরের নামায আদায় করে ঘরে কিছু সময় বসে থেকে নিচে চলে আসে। রান্নাঘরে আওয়াজ পেয়ে সোজা চলে যায় রান্নাঘরে। শায়লা বেগম,শাহানা বেগম, নূরজাহান বেগম, বিকেলের নাস্তা তৈরি করছিলেন। সানি পেছন থেকে শায়লা বেগম কে জড়িয়ে ধরলো। যতটুকু সময় পায় মাকে সময় দেওয়ার সম্পূর্ণ চেষ্টা করে সানি।
তার জীবনে তার মা, তার ভালোবাসা, তার পরিবার এসব ক্ষেত্রে বিন্দু মাত্র অবহেলা নেই তার। সারার এক কোনে রান্নাঘরে কেবিনেট এ বসে আলুর বড়া খাচ্ছিলো সেদিকে খেয়াল করে নি সানি।
নিজের ছেলের স্পর্শ পেয়ে মুখে হাঁসি ফুটে উঠলো শায়লা বেগম এর। হাঁসি মুখে বলে উঠলেন,,
” কি বাবা ”
সানির এমন ছোট মানুষি দেখে শাহানা বেগম মুখে হাঁসি এনে বলেন,,
” ডাক্তার সাহেব বাবা শুধু মায়ের প্রতি ভালোবাসা দেখালে চলবে, আমরা কি মা না নাকি। আপু আপনার ছেলে কিন্তু পর করে দিয়েছে। ”
সানি হাঁসি মুখে বলে উঠে,,
” এটা বড় মামি মিথ্যে অপবাদ। আমার সব মা এক, আলাদা করি নি আমি। মার মাথা ব্যাথা ছিলো সকালে, আর অসুস্থ পেশেন্ট দের বড় ঔষধ হলো কাছের মানুষ এর সঙ্গ। এর থেকে বড় ঔষধ আর হতেই পারে না। আর আমি আমার মায়ের সকল অসুখ এর মেডিসিন।এই জন্য আপনাদের কম ভালোবাসা দেখালাম, সেক্রিফাইজ করুন একটু।”
নূরজাহান বেগম হাঁসতে হাঁসতে বলেন,,
” দেখুন আপু আপনার ডাক্তার ছেলের কথা শুনুন। কিভাবে কথার মার প্যাঁচ দেয়, বাহানা শুনেছেন। বিদেশ থেকে এসে এই মায়েদের কথা ভুলে গিয়েছে। সব ভালোবাসা এক দিকে। ”
সানি পেছনে ঘুরে নজর পরলো সারার দিকে। ছোট বাচ্চাদের মতো বসে পা ঝুলিয়ে খাবার খাচ্ছে। আর ঠোঁটের আশেপাশে তেল দিয়ে মাখিয়ে ফেলেছে। সানি মনে মনে নিশব্দে হাঁসলো, বাড়ির সবাই আদরে আদরে আর বড় হতে দিলো না মেয়েটাকে। এই রকম ভাবে চললে তার আর বউয়ের সেবা পেতে হবে না। দুজনের চোখাচোখি হতেই সানি চোখ সরিয়ে নিয়ে শাহানা বেগম আর নূরজাহান বেগমকে এক সঙ্গে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলে,,
” আর হিংসে করবেন না দয়া করে, এই ভাবে আমাকে ভাগাভাগি করবেন না। ”
শায়লা বেগম হাল্কা মৃদু স্বরে আওয়াজ করে হাঁসলেন। দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আয়াদ বলে উঠে,,
” আমি এই জন্য বলি সাফি ভাই কেন বিয়ে করে না। ”
শাহানা বেগম পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে আয়াদকে উদ্দেশ্য করে বলেন,,
” কেন করে না?”
” আপনারা নিজেদের মধ্যে যেভাবে হিংসে করেন, বউয়ের সাথে কি করবেন তাই ভেবে করে না। ”
পেছন থেকে সাফি সজোরে গাট্টা মারে আয়াদ এর মাথায়। দৈনিক কোনো না কোনো কথায় সাফির হাতে গাট্টা খেতেই হবে আর এখন সাথে যোগ হয়েছে সানি। সে তো আর সাধে মার খায় না সানি আর সাফির হাতে। তার কর্মকান্ডের জন্য খায় সে। সাফি গাট্টা মারতে মারতে বলে,,
” হিটলারির কথা না বললে তোর চলে না। সব সময় উল্টো পালটা কথা। ”
আয়াদ মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে,,
” উফ, বড় মা, আপনার ছেলে সব সময় মারে। ”
নূর জাহান বেগম হাঁসতে হাঁসতে বলেন,,
” তোকে মারবে না তো কি করবে। উল্টো পালটা কথা বলে বড় ভাইদের পেছনে লেগে থাকিস। ”
” মা আপনি তো সাফি ভাইয়ের সাপোর্ট নিবেন। আদরের ছেলে আপনার। বড় মা আপনি কিছু বলবেন না।”
শাহানা বেগম বলে উঠেন,,
” সাফি ছোট ভাইয়ের সাথে এই রকম করে কেউ।”
শায়লা বেগম হাঁসতে হাঁসতে বলেন,,
” ভাই ভাই ছাড়া বাঁচে না, আবার লেগেই থাকে একে অপরের সাথে। যা তোদের রান্না ঘরে আর বিচার শালিস করতে হবে না। ডায়নিং গিয়ে বস, নাস্তা দিচ্ছি যা। ”
সাফি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে,,
” এতো কিসের কাজ আপনাদের, চলুন তো বসে গল্প করি। একদিন বাসায় থাকি, গল্প করবো, রান্নাঘরে পরে থাকেন আপনারা। ”
নূর জাহান বেগম হাঁসি মুখে বলে,,
” এই জন্য বলি মাস্টার মশাই বিয়ে করুন, আমাদের কাজের চাপ কমুক। ”
সাফি চলে যেতে যেতে বলে,,
” রান্না করুন, আমি যাচ্ছি।”
সাফির চলে যাওয়া দেখে এক সঙ্গে সবাই হেঁসে দিলেন। শাহানা বেগম সারাকে উদ্দেশ্য করে বলে,,
” সারা আজ আরহি বুড়ি এলো না। ওকে ফোন করে আসতে বল, মেয়েটা তোর ছোট মার হাতে আলুর বড়া, পাকোড়া পছন্দ করে অনেক। আসতে বল এখনি। ”
সারা একটা আলুর বড়া হাতে নিয়ে বলে,,
” ওর তো আসার কথা এখন। যাই গিয়ে ফোন করি। ”
সারা একটু তাড়াহুড়ো করে নেমে গিয়ে হাঁটতে গিয়ে পানিতে পিছলে পরতে নিলে সানি চটজলদি সারা কনুই ধরে ফেলে। সারার হাত থেকে পরে যায় আলুর বড়া। সারা ভয় পেয়ে আরেক হাতে চেপে ধরে সানির হাত। সানি সারার দিকে তাকিয়ে বলে,,
” আস্তে, একটু সাবধানে দেখে চলাফেরা কর। কোমড় ভাঙ্গার শখ রয়েছে নাকি। ”
কথাটি বলে সানি সারার হাত ছেড়ে দেয়। সারাও সানির হাত ছেড়ে দেয়। শায়লা বেগম সারার দিকে তাকিয়ে বলে,,
” লাগে নি মা ”
সারা না সূচক মাথা নাড়িয়ে বলে,,
” না মামুনি। ”
সারা আলুর বড়ার দিকে আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠে,,
” কিন্তু আমার বড়া ”
সানি এবার বিরক্ত হলো। পরে যাওয়ার চিন্তা নেই,তার চিন্তা আলুর বড়া। সানি বিরক্ত হয়ে বলে,,
” একে দিয়ে কাজ করাতে পারেন না আপনারা। ঠিক ভাবে হাঁটতে পারে না, কি করবে এ ”
শাহানা বেগম বলে উঠেন,,
” সবার আদরে আদরে কি বলবো তোকে বাবা। ”
নূর জাহান বেগম বলে উঠলেন,,
” সময় হলে সব পারবে। এখন এমন ছুটোছুটি থাকবেই। ”
শায়লা বেগম বলে উঠলেন,,
” মেয়েটাকে শুধু শুধু শাসন করবি না। ”
শাহানা বেগম আবারও বলে উঠলেন,,
” দেখেছিস বাবা, এক সাথে আক্রমণ। ”
সানি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,,
” দান আহ্লাদী আরও। ”
সানি রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে মনে মনে আওড়ালো,,
” কি যে রয়েছে আমার কপালে। ”
সারা সানির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকালো। মনে মনে আওড়ালো,,
” বিয়ের পর পুঁড়ে যাওয়া বেগুন ভাজি খাওয়াবো। ”
★★★★
করিডরে সোফায় বসে রয়েছে সানি আর সানির গাঁয়ে হেলান দিয়ে বসে রয়েছে আয়রা, এর পাশে সাফি। অন্য সোফায় আয়াদ আর সারা এক সঙ্গে বসে রয়েছে। এমন সময় আরহি তার মতো হেঁটে প্রবেশ করে খান বাড়িতে। আরহিকে দেখে আয়াদ চেঁচিয়ে বলে উঠে,,
” আরহি আপু, এখানে আমরা ”
সাফি এক বার পেছনে ঘুরে তাকিয়ে আবারও সামনে তাকায়। তবে আরহি সেদিকে খেয়াল করলো না। হাঁসি মুখে এগিয়ে এসে আয়াদ এর পাশে দাঁড়াতেই আয়াদ সরে গিয়ে বসে আরহিকে জায়গা করে দেয়। আরহি জায়গা পেতেই বসে পরে সেখানে। নূর জাহান বেগম বেগম বড়া ভাজি নিয়ে আসে করিডরের দিকে। আরহিকে দেখে বলে উঠলেন,,
” তুই এসেছিস, মাত্রই তোর বড় কাকি তোর কথা বললেন। নে বড়া ভাজি খাঁ। ”
আরহি হাঁসি মুখে বলে উঠে,,
” শুক্রবারে আপনার হাতে বড়া ভাজি না খেলে জমে না ”
নূর জাহান বেগম হাঁসি মুখে বলেন,,
” খাওয়া শুরু কর আমি পানি আনি। ”
” আমি আনছি, কষ্ট করতে হবে না আপনার। ”
আয়াদ একবার সাফির দিকে তাকায়। সাফি চুপচাপ তাকিয়ে আছে মেঝের দিকে। আয়াদ এরপর আরহির দিকে তাকিয়ে বলে,,
” সাহায্য করো আরহি আপু। তুমি সাহায্য করলে সাফি ভাই একটু কম কথা শুনবে। ”
সাফি চমকে উঠে আয়াদ এর দিকে চোখ বড় বড় করে তাকায়। এই ছেলে কি থেকে কি বলে ফেলে কোনো বিশ্বাস নেই। আরহি আয়াদের দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে বলে,,
” কেন? ”
” আমার মায়েরা কাজ করতে করতে ক্লান্ত। এই জন্য সাফি ভাইকে বিয়ে করাতে চায়। কিন্তু আমার বড় ভাই লাজুক কি না। তাই লজ্জা পায়, বিয়ের কথা শুনতে। তুমি যদি কাজে সাহায্য করো আমার মায়েদের কাজের চাপ ও কমলো আর আমার ভাইয়ের কথাও কম শুনতে হলো। ”
সাফি আয়াদের দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে,,
” আয়াদ ”
শাহানা বেগম পানি আনতে আনতে বলে,,
” এর কথা বাদ দে আয়াদ, শুধু শুধু রাগ দেখাবে তোকে। সানির বিয়ে দেই এই লজ্জায় যদি এই ছেলে করে। ”
সানির বিয়ের কথা শুনতে বড়সড় বিষম খেলো সারা। তবে নিজেকে সামলে নিলো পর মুহুর্তে। অপেক্ষায় রইলো সানির উত্তরের আশায়। সানি বিরক্ত ভরা কন্ঠে বলে,,
” বড় মামি এসব প্রসঙ্গ বাদ দেন তো। ”
শায়লা বেগম পেছন থেকে বলে উঠলেন,,
” কাকে কি বলেন বড় ভাবি, এই দুই ভাই এক। ”
আয়াদ আড়মোড়া দিতে দিতে বলে,,
” এর থেকে আমাকে বিয়ে দিন, আমার বিয়ে দেখে দুই বড় ভাই লজ্জা পেয়ে যাবে। এক ঢিলে দুই পাখি নয়, তিন পাখি মারা হয়ে যাবে। ”
আয়াদের কথায় সানি আর সাফি এক সঙ্গে কুশন ছুড়ে মারে আয়াদের দিকে। নূর জাহান বেগম হাঁসতে হাঁসতে বলেন,,
” এমনি মার খাশ তুই। ”
আরহিও ফিক করে হেঁসে দেয়। আরহি তার সামনে শব্দ করে কখনও হাঁসে নি। আরহির হাঁসির ঝংকার কানে পৌঁছাতে থমকে যায় সাফি,শীতল দৃষ্টি রাখে আরহির হাস্যজ্বল মুখটায়। আরহির হাঁসির ঝংকার সাফির কানে মাতাল করা সুর মনে হলো। হৃদয়ে আক্রমন করলো প্রবল ঝড়। এ যেন মাদকতার ঝড়।
আরহি সবার কথার মাঝে সব কিছু ভুলে গিয়ে, কথার ফাঁকে হাঁসতে হাঁসতে বলে,,
” আসলে আমাদের স্যারের বিয়ের দাওয়াত আর খেতে হবে না। এ জন্মে স্যারের বিয়ে হচ্ছে না। এর থেকে ভালো আয়াদকে বিয়ে দেওয়া উচিত। ”
সাফি আরহির সরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। হুট করে সাফির কথা মনে পরে আরহির। কিন্তু সে যা বলার তা বলেই দিয়েছে। এখন তো আর কথা ঘুরিয়ে নিতে পারবে না। সারা হা হয়ে একবার সাফির দিকে আর একবার আরহির দিকে তাকাচ্ছে। সানি আর আয়াদ মিটিমিটি হাঁসছে ঠোঁট চেপে। শাহানা বেগম সাফিকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন,,
” দেখ সাফি, তোর ছাত্রীও তোকে বলছে। এবার অনন্ত বিয়ের কথা ভাব, সবাই তোর বিয়ের দাওয়াত খাওয়ার জন্য বসে রয়েছে। ”
সাফি আরহির দিকে সরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে,,
” তাই দেখছি, খাওয়াচ্ছি বিয়ের দাওয়াত। ”
আরহি চোখ পিটপিট করে সাফির দিকে তাকায়। দুজনের চোখেচোখ পরতেই আরহি চোখ নামিয়ে নেয়। সাফি এখনও তাকিয়ে রয়েছে আরহির দিকে। ভয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে আরহি কয়েকবার। নিজের উপর ভীষণ রাগ হচ্ছে তার। নিজ ইচ্ছেয় কুয়ো খুড়ছে সেখানে ঝাঁপ দেওয়ার জন্য। আয়াদ আরহির দিকে তাকিয়ে বলে,,
” আরহি আপু তুমি দাওয়াত খেতে চেয়েছো এখন সাফি ভাই বিয়ে করবে, ছাত্রীর আবদার ফেলে দেওয়া যায় না। ”
সাফি অন্য দিকে ঘুরে জিহবা ঠোঁট ভিজিয়ে মনে মনে নিশব্দে হাঁসলো। সানি সাফির কাঁধে হাত রেখে বলে,,
” তাহলে ভাই ইচ্ছে পূরন করবে না ছাত্রীর। ”
সাফি সানির দিকে তাকায় এরপর আরহির দিকে তাকিয়ে জবাব দেয়,,
” অবশ্যই কেন নয়? আরহি,, ”
সাফির ডাকে পুরো শরীর ভয়ে কেঁপে উঠে আরহির। কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠে,,
” জ্বি স্যার ”
আরহির দিকে ভ্রু বাঁকিয়ে বলে,,
” তাহলে প্রস্তুতি নাও বিয়ের, সব কিছুর তো প্ল্যান থাকে। প্ল্যান করে রাখো কি করবে বিয়েতে। ”
সবাই সাফির কথা ধরতে না পারলেও সানি আর আয়াদ সাফির কথার উদ্দেশ্য ঠিক বুঝতে পেরেছে। সানি আর আয়াদ মিটিমিটি হাঁসছে সাফির কথায়। আরহি শুধু মাথা নাড়িয়ে বলে,,
” ঠিক আছে স্যার। ”
সানি নিজের হাঁসি সংযত করতে না পেরে এদিক ওদিক তাকিয়ে রইলো। সকলের মাঝে গল্প চললো কিছু সময়। কিছু সময় পর সানি বলে উঠে,,
” আমি আসি, কাজ রয়েছে। সন্ধ্যায় হসপিটালে যেতে হবে। ছোট মামি পারলে আমার জন্য এক কাপ কফি পাঠিয়ে দিয়েন উপরে।”
নূর জাহান বেগম হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে বলে,,
” ঠিক আছে বাবা। ”
সাফিও উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে,,
” আমিও ঘরে যাই, আড্ডা দাও তোমরা।”
সাফি সারা আর আরহিকে উদ্দেশ্য করে বলে,,
” সন্ধ্যায় দুজন আমার রুমে এসো। আজ ফ্রি আছি, যার যার ম্যাথের সমস্যা আছে বুঝিয়ে দিবো। ক্লাস টেস্ট খারাপ হলে দুজনকেই বলেছি তো কি করবো। ”
কথাটি বলে সেখান থেকে চলে যায় সাফি। সারা আর আরহি সাফির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে এক সঙ্গে মুখ বাঁকায়। আরহি মনে মনে বলে,,
” এই মানুষটার ফ্রি কেন হতে হবে। ২৪ ঘন্টা ব্যস্ত থাকতে পারে না। ”
শায়লা বেগম রান্নাঘরে দিকে যেতে যেতে বললেন,,
” আমি বরং সানির কফি বানিয়ে দেই। ”
কিভেবে সারা উঠে দাঁড়ালো। শায়লা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলে,,
” থাক মামুনি আপনি বসেন। আমি দিয়ে আসছি, আপনার ছেলে আমাকে এমনি অপবাদ দিয়েছে আমি কাজ পারি না, বসে খাই। আমিও কাজ পারি দেখুক।”
শাহানা বেগম হাঁসলেন,,
” এদের ভাই বোনের লেগেই থাকে সবাই। যা দিয়ে আয়। সানির কথায় যদি তোর সুবুদ্ধি হয়। ”
সারা শাহানা বেগম এর দিকে তাকিয়ে চোখ মুখ কুচকে রান্না ঘরে চলে গেলো। কয়েক মিনিট এর ভেতর কফি বানিয়ে সানির ঘরের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো সে। সারার মতো অলস মেয়েকে আগ বাড়িয়ে কাজ করতে দেখে আরহির মনে খানিকটা খটকা লাগলো। কোনো কাজ বলার আগেই না জবাব দেওয়া যে মেয়ের কাজ, সেই মেয়ে আজ বারিয়ে কাজ করলে খটকা তো লাগবেই।
★★★★
সারা সানির ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নক করলো,,
” সানি ভাই ”
সানি বিছানায় বালিশে হেলান দিয়ে শুয়ে আরামে ফাইল দেখছিলো, সারার গলার আওয়াজ পেয়ে সানি ফাইলটা বিছানার পাশে রাখতে রাখতে বলে,,
” হুম ভেতরে আয়। ”
সারা সানির ঘরে প্রবেশ করে বিছানা ঘেষে দাঁড়িয়ে কফি কাপ সানির দিকে বাড়িয়ে ধরে। সানি কফির কাপের দিকে এক নজর তাকিয়ে সারার দিকে তাকায়,,
” তুই আনলি যে।”
সারা কপাল কুচকে, মনমরা হয়ে বলে,,,
” আপনি তো বললেন কাজ করাতে, তাই কাজ করছি, আমি সব কাজই পারি। ”
সানি মনে মনে নিশব্দে হাঁসলো, এরপর সারার দিকে তাকিয়ে বলে,,
” কি কি রান্না পারিস। ”
সারা এবার বিপাকে পরে গেলো, আগ বাড়িয়ে বেশি বলে ফেলেছে সে। কাজে কর্মে অষ্টরম্ভা সে, এসবে একদম মনোযোগ নেই তার। তার তো বসে থেকে খাওয়ার কাজ, কেউ তো কাজই করতে দেয় না। সারা কি করবে তাই মিনমিনে গলায় মাথা নিচু করে বলে,,
” চা, কফি আর ডিম ভাজি। ”
সারা জবাবে সানির হাঁসা উচিত না কাঁদা উচিত ভেবে পাচ্ছে না। সানি নিজের হাঁসি আটকিয়ে বলে,,
” বিয়ের পর তিনবেলা বরকে এই গুলো খেয়ে রাখিস। কংকাল হতে এক মাসও লাগবে না৷ ”
সারা এক বার সানির দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে ফেলে। যদি জীবন সঙ্গী সে হয়, তাহলে সব কাজ শিখে নিবে সে। নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াবে তাকে৷ নিজের মনে মনে হাজারো স্বপ্ন সাজালো সারা,স্বপ্ন বরাবরই রঙিন হয়,কারন এটা কাল্পনিক, মানুষের মন মতো সাজানো। সারা এরপর আবারও মিনমিনে গলায় বলে,,
” শিখে নিবো সব। ”
সানি মুচকি হেঁসে ভালো ভাবে বসে নিলো সে। এরপর সারার হাত ধরে নিজের পাশে বসালো। সারা চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে রইলো। প্রতিবারের ন্যায় সানি এবারও সারার হাত থেকে কফি খেতে লাগলো । মুহুর্তে এক রাশ লজ্জা ঘিরে ধরলো সারাকে। লজ্জা রাঙা লাল রক্তিম অপরুপ রুপ নিয়ে খাইয়ে দিতে লাগলো কফি। সানি কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে বলে,,
” খাটিয়ে নিচ্ছে দেখে রাগ করিস না, তোর হাতের কফির টেস্ট রয়েছে। আর তোর হাত থাকতে আমার হাতের কি পরিশ্রম করতে হবে সামান্য কফি থেকে। ”
সারা গাল যেন আর লাল রক্তিম বর্ন ধারণ করলো। সানির ঠোঁটে অদ্ভুত এক হাঁসি। চোখের চাহনি অন্যরকম, সারা এক নজর তাকিয়ে চোখ নামিয়ে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো। সানি মুচকি হাঁসলো সারার জবাবে। রান্নাঘরে থাকায় কপালে, আর নাকে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে রয়েছে। সানি খেয়াল করেছে বরাবরই সারার নাকটা একটু বেশি ঘামে। বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে থাকে সব সময়। এই সামান্য বিষয়টাও সানির কাছে কোনো কারন ছাড়াই ভালো লাগে। বরাবরই ইচ্ছে করে নিজের হাতে ঘাম টুকু মুছে দিতে। এতোদিন নিজেকে সংযত রাখলেও আজ ভীষণ ইচ্ছে করছে নিজের হাতে ঘাম টুকু মুছে দিতে। নিজেকে সংযত রাখলো পারলো সানি। কফির কাপে চুমুক দিয়ে মাথা তুললো সানি। এরপর ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে স্পর্শ করলো নাকে। সারা একটু চমকে গিয়ে সানির দিকে তাকালো। সানি বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে ঘাম টুকু মুছে দিতে দিতে বলে,,
” তোর নাকটা ভীষণ ঘামে সারা। ”
সারার পুরো শরীর অসম্ভব ভাবে কাঁপুনি দিয়ে উঠলো। সানির স্পর্শে ছিলো না কোনো গভীরতা, না কামুকতা, যেটা ছিলো সেটা শুধুই যত্ন। ঘাম মুছে সানির নিজের হাত সরিয়ে নেয় তৎক্ষনাৎ। সারা লজ্জায় এদিক ওদিক তাকাতে লাগলো। সানির দিকে দৃষ্টি রাখতে পারছে না সে। ছোট খাটো বিষয় নিয়েও ভীষণ ভাবে লজ্জা পায় সারা। সানির সন্ধিক্ষণে যেন এক রাশ লজ্জা ঘিরে ধরে তাকে। সানির সারার লজ্জা রাঙানো মুখ এর দিকে তাকিয়ে নিশব্দে মুচকি হেঁসে সারার মাথায় রেখে বলে,,
” এই ভাবে কষ্ট করে, ঘেমে আমার জন্য কফি বানিয়ে আনার জন্য ধন্যবাদ ম্যাম। দোয়া করি ১০-১২ বাচ্চার সন্তানের জননী হোন আপনি। ”
সারা বিস্মিত দৃষ্টিতে সানির দিকে তাকিয়ে বলে,,
” ১০-১২ বাচ্চা ”
সানি তার মোটা ভ্রু যুগল কুচকে বলে,,
” হুম ১০-১২ বাচ্চা। কেন দোয়া পছন্দ হয় নি। আরও বাড়িয়ে বলবো। ”
সারা আৎকে উঠে বলে,,
” না না আর না। ”
সানি অন্য দিকে ঘুরে জিহবা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিলো, সারার এমন মুখ দেখে নিজের হাঁসি আটকানো কঠিন হয়ে পরেছে। মেয়েটাকে বিম ভ্রান্তিতে ফেলা ইদানীং তার ভীষণ লোভ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারার বোকা বোকা কথা গুলো যেন তার দৈনন্দিন জীবনে ভালো থাকার ঔষধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সানি ঠোঁট চেপে হেঁসে বলে,,
” যাক দোয়া তাহলে পছন্দ হয়েছে। ”
সারা সানির দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বলে,,
” আপনারা ডাক্তাররাই তো বলেন দুটি সন্তানের বেশি নয় একটি হলে ভালো হয়। ”
সানি বাম হাত দিয়ে নিজের নাক কচলে নেয়, মূলত হাঁসি লুকোতে চাইলো সে। মেয়েটার সাথে সাথে সে যে নিজেও অবুঝের মতো আচরণ করতে শুরু করেছে এটা তার বুঝতে বাকি নেই। সানি একটু গম্ভীর কন্ঠে বলে,,
” সেটা বলতে হয় যারা মধ্যবিত্ত, গরিব তাদের জন্য। বাচ্চাদের লালন পালন করতে অর্থেরও প্রয়োজন রয়েছে, সঠিক শিক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। আমার মনে হয় না তোর স্বামীর অর্থের কমতি থাকবে, শিক্ষার অভাব থাকবে। ১০-১২ টা বাচ্চা লালন পালন করতে পারবে। ”
সারা আর এ প্রসঙ্গে কথা বাড়ালো না। মাথা ঘুরপাক খাচ্ছে তার। মাঝে মাঝে লোকটা অবিশ্বাস্য কথা বলে ফেলে। সারা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে,,
” আমি যাই ”
সানি মাথা নাড়িয়ে বলে,,
” ঠিক আছে যা। এভাবে দৈনিক কফি করে খাওয়াবি, দৈনিক একটা একটা করে দোয়া দিবো তোকে। ”
সারা মনে মনে আওড়ালো,,
” এমন ভয়ানক দোয়ার প্রয়োজন নেই আমার।”
তবে মুখ ফুঁটে বলতে পারলো না। জোর পূর্বক মুখে হাঁসি এনে বলে,,
” দোয়ার দরকার নেই সানি ভাই। আমি কফি করে খাওয়াবো। ”
” শুধু শুধু খাঁটবি দোয়া নিবি না। তোর মনটা ভীষণ উদার রে সারা। ”
” ধন্যবাদ। ”
সারা দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে, সানি সারার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাঁসলো। মনে মনে আওড়ালো,,,
” আমার মার কাছে আমার চরিত্রে কালো দাগ লাগিয়েছো আমার শীতলিকা। আমার পেছনে লাগতে আসা তাই না। আফসোস প্রিয়তমা তুমি তোমার প্রিয়তমকে চিনলে না। ”
★★★★
সন্ধ্যায় বিরক্ত হয়ে নিজের ঘর থেকে বই খাতা নিয়ে বেরিয়ে পরে আরহি। আরহিকে যেতে দেখে রাজেয়া বেগম বলেন,,
” কোথায় যাচ্ছিস আবার ”
আরহি বিরক্ত ভরা কন্ঠে বলে,,
” সারার বাসায়। আজ স্যারের নাকি সময় রয়েছে,তাই ম্যাথ বুঝিয়ে দিবে, এই জন্য যাচ্ছি। ”
রাজেয়া বেগম খুশি হয়ে বলে উঠলেন,,
” ছেলেটা অনেক ভালো, সব সময় ভালো চায় তোদের ভাই বোনদের। কত সহযোগিতা করে তোদের পড়াশোনায়। আগে লাবিবকে করেছে, এখন তোকে করছে। ”
আরহির কাছে সাফির প্রশংসা একদম সহ্য হলো না,কাঁটার মতো বিঁধলো গাঁয়ে। বিরক্ত তার দ্বিগুণ বেড়ে গেলো। বিরক্ত ভরা কন্ঠে বলে,,
” ভালো না কচু। থাকেন পড়ে আসি আমি, দেরি হলে বকবে আবার। অসহ্যকর মানুষ একটা।
” দুনিয়াতে ভালো মানুষের কেউ কদর করতে জানে না, তার বড় উদাহরণ তুই। ”
” হয়েছে আপনার সাথে তর্ক করতে পারবো না আমি। যাই এখন আমি। ”
” দাঁড়া গলিটুকু পাড় করে দেই আমি। আর আসার সময় ফোন দিশ না হয় সাফিকে বলিস পৌঁছে দিবে। একা আসিস না, অন্ধকার গলি কেউ থাকে না আমার ভয় করে।”
” ঠিক আছে চলেন ”
রাজেয়া বেগম দাঁড়িয়ে থাকলেন, আরহি খান বাড়ির প্রবেশ গেটে ঢুকতেই চলে এলেন তিনি। গলির বাম দিকে চায়ের দোকানে ছেলেরা গান বাজাচ্ছিলো। সন্ধ্যায় আসর বসে আড্ডার এই চায়ের দোকানে। সব গুলো বখাটে স্বভাবের ছেলে, এই জন্য রাজেয়া বেগম এর ভয়। সন্ধ্যায় একা ছাড়েন না মেয়েকে। মেয়ে বড় হলে বাবা মার যেন দুশ্চিন্তা শেষ থাকে না।
চায়ের দোকানে বাজানো গান আরহির কান অবধি ভালোভাবে পৌঁছায়। গানের সাউন্ড অন্য দিনের তুলুনায় আজ বেশি ছিলো একটু। পুরনো দিনের বাংলা গান। গানটা বেশ মজার লাগলো আরহির কাছে, তাই মস্তিষ্কে খুব সহজে গেঁথে গেলো। আরহি তখন থেকে গুনগুন করতে শুরু করেছে। খান বাড়ির সবাই যে যার ঘরে। আরহির উদ্দেশ্য আগে সারার ঘরে যাবে, দুজন মিলে এক সাথে সাফির ঘরে যাবে। সিংহের গুহায় একা গিয়ে ফাঁসতে চায় না। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ, কোনো লোকের আওয়াজ নেই। আরহির গুন গুন আওয়াজ স্পষ্ট শুনা যাচ্ছিলো, বেচারা গান গাইতে এতো বিভর ছিলো তার মস্তিষ্ক থেকে বেরিয়ে গেলো সাফির ঘর পেরিয়ে সারার ঘরে যেতে হয়। সে তার মনে গুন গুন করে গাইতে গাইতে সারার ঘরের উদ্দেশ্যে যাচ্ছে,,
” তোমাকে চাই আমি আরো কাছে
তোমাকে বলার আরো কথা আছে
আমি বলতে পারিনা মুখে তওবা তওবা ”
সাফি সোফায় বসে পানি টুকু মুখে নিয়েছিলো তৃষ্ণা নিবারনের জন্য। কিন্তু তার আর তৃষ্ণা নিবারণ হলো না। কানে এমন গান ভেসে আসতেই পানি আটকে গেলো গলায়। বড়সড় বিষম খেলো সে। কন্ঠ শুনে বুঝতে বাকি নেই এটা কার আওয়াজ। সাফি অবাক হয়ে বলে,,,
” হোয়াট, এই মেয়ের বুদ্ধি কি হাঁটুর উপর উঠবে না আল্লাহ। কেউ যদি শুনে ফেলে, শেষ মান সম্মান শেষ। ”
সাফি জোরে শ্বাস নিয়ে আওয়াজ করে বলে,,
” ঘড়ের ভেতরেই রয়েছে আমি। ”
আরহি প্রায় সাফির ঘর পেরিয়ে গিয়েছিল, তবে এই মুহুর্তে সাফির গলা শুনে পা আটকে গেলো তার। শুকনো ঢোক গিলে পাশ ফিরে তাকালো। নিজের উপর অসম্ভব রাগ হচ্ছে তার। এমনটা বোকামো করে কত দিন আর ফাঁসবে মানুষটির কাছে। পা জোড়া শক্ত হয়ে আসে তার, মনে মনে বলে,,
” আল্লাহ রক্ষা করো আমারে। ”
চলবে____
প্লিজ আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক অথবা ফলো দিয়ে আমাদের সাহায্য করুন।
https://www.facebook.com/share/1AYhCCqwqL/
https://www.facebook.com/share/g/1AufQdkZf8/
Follow ✓
আপনাদের কমেন্টের লাইক দেওয়ার মানে হল এই গল্পের পরবর্তী পর্বটি আসছে ,
তাই প্লিজ আপনাদের মন্তব্য জানান…
Comment…

