প্রেমের ঘাটের মাঝি #পর্ব ১০ #লেখনিতে খুশবু আকতার

0
144

#প্রেমের ঘাটের মাঝি
#পর্ব ১০
#লেখনিতে খুশবু আকতার

মাঝরাত থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়েছে।বর্ষাকাল হওয়ায় গ্রামের নদীটাও ভরে উঠেছে।আর কয়েকদিন যদি এমন বৃষ্টি চলে তাহলে বন্যা হবে।
ঘুম থেকে ওঠার পর আজ আর ঘর থেকে বের হওয়া হয়নি জবার।সবার সকালের খাবার জুঁই আর মুক্তা মিলে যার যার ঘরে দিয়ে গেছে ফলে বের হওয়ার প্রয়োজনও পড়েনি।বাইরে তখনও প্রবল বেগে বৃষ্টি পড়ছে।জানালার ধারে জবা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের এই জায়গাটা জবার ভীষণ প্রিয়।নদীতে কি সুন্দর বৃষ্টির পানির ফোঁটা গুলো টপটপ করে পড়ছে।অপরুপ একটা দৃশ্যের সৃষ্টি হয়েছে।দেখলেই যেন মনটা ভালো হয়ে যায়।কি অপরূপ সৌন্দর্য এই প্রকৃতির অথচ এই প্রকৃতিতে বাস করা মানুষগুলোর মন কতটা নিকৃষ্ট।

বিছানার উপরে চুপচাপ বসে আছে মতিউর।এত শান্ত ভাবে বসে থাকার মতন ছেলে মতিউর কোন কালেই ছিল না।ছোটবেলা থেকে ভীষণ চঞ্চল।সমবয়সী ছেলেদের সাথে মা/রা/মা/রি করে তার বেড়ে ওঠা।বড় হওয়ার পর যখন বুঝতে পারলো যে মা/রামা/রি করাটা খুব একটা ভালো অভ্যাস নয় তখন আর নিজে মা/রামা/রিতে কখনো জড়ায়নি।বরং তার সুরক্ষার জন্য কয়েকজন লোকই রেখে দেওয়া হয়েছিল।গ্রামের নামকরা ব্যবসায়ীর ছেলে,নিজেও বড় ব্যবসায়ী।শহরে যাতায়াত লেগেই থাকে।এতোটুকু সুরক্ষার ব্যবস্থা না করলে তো চলে না।মতিউরের খুব ইচ্ছে করে জবার সাথে গল্প করতে।মন চায় সারাটা দিন বসে বসে জবার সাথে কথা বলতে,জবার মিষ্টি মুখের হাসি দেখতে।জবার নির্লিপ্ত চোখ দুটোতে একটু চঞ্চলতা দেখতে ইচ্ছে করে।কিন্তু সে সব আর হয়ে ওঠে না।জবা বোধহয় মতিউরের সাথে কথা বলতে বিন্দুমাত্র আগ্রহী না।আর এই বিষয়টা বরাবরই খুব কষ্ট দেয় মতিউর কে।যার সাথে কথা বলার জন্য মতিউরের মনটা আকুপাকু করে সেই যেন ওকে দেখে বিরক্ত,অগ্রাহ্য করে।মাঝে মাঝে মতিউর ভাবে যে জবা কি কোনদিন ওকে ভালোবাসতে পারবেনা?সারাটা জীবন কি ওর মনে সুজনের রাজত্বই চলবে?এত ভালোবাসার পরেও কি একটু ভালোবাসা যায় না মতিউর কে?খুব বেশি তো ভালোবাসা চাইছে না মতিউর।সুজনকে জবার মন থেকে বের করেও দিতে বলছেনা।শুধু বলছে যেন একটু জায়গা মতিউরকে দেয় সেখানে।

মতিউরের এসব ভাবনার মাঝে জবা বলে উঠল,

“আপনার বাড়ি ফিরব কবে আমরা?”

জবার নিজ থেকে কথা বলার বিষয়টা মতিউরকে বেশ অবাক করলো।তবুও নিজের বিস্ময় ভাবটা প্রকাশ করলো না।তবে জবার মুখে আপনার বাড়ি সম্বোধনটা শুনতে মতিউরের একদমই ভালো লাগলো না।বাড়িটা তো জবারও।

“আমার বাড়ি কেন বলছো?বাড়িটা তো তোমারও।”

“মেয়েদের কোন বাড়ি হয় না জানেন না?কখনো শুনেছেন মেয়েদের নিজস্ব কোন বাড়ি আছে?বিয়ের আগে তারা থাকে বাপের বাড়ি,বিয়ের পরে থাকে স্বামীর বাড়ি,শেষ বয়সে যদি স্ত্রীর আগে স্বামী মা/রা যায় তবে তখন থাকে ছেলের বাড়ি।”

“তাই নাকি?বেশ তবে আমি তোমাকে তোমার একটা নিজের বাড়ি বানিয়ে দেবো।তুমি গর্ব করে যেন বলতে পারো যে এটা তোমার বাড়ি।তাহলেই তো হয়ে গেল তাই না?”

বাইরে থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে জবা মতিউরের দিকে তাকালো।মানুষটা বড্ড অদ্ভুত।সে জানে যে জবা অন্য কাউকে ভালোবাসে তারপরও কত স্বাভাবিক ব্যবহার করে।এই নিয়ে জবার পরিবারের কাছেও কোন অভিযোগ করেনি।বরং বাকিদের কথার থেকে জবাকে আরো বাঁচিয়েছে।মতিউর কেন এমনটা করে আজ এই প্রশ্নের উত্তরটা জবার জানতে ভীষণ ইচ্ছে করলো।প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি এই ব্যাপারে আপনার এত নির্লিপ্ততা কেন?”

“তুমি কি চাইছো আমি রেগে মেগে গিয়ে তোমায় মা/রধর করি?”

জবা তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

“পুরুষ মানুষের থেকে তো এটাই আশা করা যায় তাই না?তাদের ক্ষমতা আছে,গায়ের জোর আছে,তারা যে এসব করবে এটাই তো স্বাভাবিক।আমরা মেয়ে জাতি হলাম অবলা।আমাদের না আছে গায়ের জোর,না আছে বাপের বাড়ির ক্ষমতা দেখানোর উপায় আর না আছে নিজস্ব উপার্জন স্থল।তাহলে আমরা আর কিসের গরম দেখাবো?”

“পুরুষ জাতির প্রতি বোধহয় তোমার বড্ড অবজ্ঞা তাইনা জবা?খুব ঘৃণা করো এদের?”

“সবাইকে না।তবে নির্দিষ্ট কিছু পুরুষ মানুষ আছে কিংবা নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কিছু পুরুষ মানুষ আছে যাদেরকে আমি ঘৃণা করি।”

“তাদের মাঝে কি আমি পড়ি?”

“এখনো অবধি আপনার মাঝে তেমন কোন বৈশিষ্ট্য আমি লক্ষ্য করিনি।যদি কখনো করি তবে অবশ্যই আপনিও আমার ঘৃণার পাত্রই হবেন।”

“ঘৃণা যেহেতু করো না তবে কি ভালোবাসো?”

মতিউর ভেবেছিল এই প্রশ্নে জবার মাঝে হয়তো একটু উৎকণ্ঠা দেখা দেবে কিংবা অস্বস্তি বোধ করবে বা হয়তো চমকাবে।কিন্তু না তেমন কিছুই হলো না।বরং জবার মুখ ভঙ্গি বেশ স্বাভাবিক।স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,

“ভালোবাসার মতন জটিল বস্তু এই পৃথিবীতে আর দুটো নেই।সেই জটিল বিষয়টা উপলব্ধি করা আরো জটিল।তার থেকেও বেশি জটিল একজনের প্রতি ভালোবাসা ভুলে গিয়ে অন্য জনকে ভালোবাসা।তাহলে ভাবুন তো আমি ঠিক কতটা জটিলতার মধ্যে আছি। এর মাঝে আপনি আশা করছেন কি করে যে আমি আপনাকে ভালোবাসি?”

“ভালোও বাসো না আবার ঘৃণাও করো না তাহলে আমার প্রতি তোমার মনোভাবটা ঠিক কি জবা?”

“তিন কবুল বলে বিয়ে যেহেতু করেছি সংসারটা তো করতে হবে আমাকে।”

“শুধুই বাধ্যবাধকতা?তোমার কোন ইচ্ছে নেই আমার সাথে সংসার করার?”

“থাকার তো কথা না।একটা কথা বলুন তো আমার সম্পর্কে এত কিছু জানার পরও কেন আপনি আমার সাথে সংসার করতে চান?আমাকে তো বাপের বাড়িতে ফেলে রেখে গেলেই পারেন।”

মতিউর স্মিত হেসে বলল,

“তাহলে যে তোমাকে অপমান করা হবে জবা।যাকে ভালোবেসেছি তাকে অপমান করি কি করে?”

এই বারে জবা চমকে উঠলো।দৃষ্টিতে তার হাজার একটা প্রশ্ন।

“আপনি আমায় কবে ভালোবাসলেন?”

“ভালোবাসায় কোনো নির্দিষ্ট সময় হয় না,কোন নির্দিষ্ট কারণের দরকার পড়ে না।ওই যে তুমি বলেছিলে না তুমি সুজনকে ভালোবেসেছিলে কারণ তুমি তোমার সুখটাকে চিরস্থায়ী করতে চেয়েছিলে,আমিও হয়তো সেই কারণেই তোমায় ভালোবেসেছি।”

জবা থামলো।এই নিয়ে আর কোন কথা বাড়ানোর সাহস কিংবা ইচ্ছে কোনটাই তার মাঝে দেখা গেল না। পুনরায় আবার বাইরে দৃষ্টিপাত করল।বেশ কিছুটা সময় নীরব থাকার পর মতিউর ফের বলে উঠল,

“আমাদের জীবনটা এমন না হলেও বোধহয় পারতো তাই না জবা?”

জবা ছোট্ট করে উত্তরে বলল,

“হয়তো।”

“কি এত ভাবছো?”

“জানেন আজকাল খুব গভীর ভাবে বুঝতে ইচ্ছে করে জীবন কি?কিন্তু এর কোনো সঙ্গা খুঁজে পাই না।তারপর হঠাৎ যখন কিছু অপূর্ণতার কথা মনে পড়ে যায় তখন ভাবি এটাই জীবন।একটু পরেই আবার কিছু সুখের স্মৃতি মনে করে হেসে উঠি।তখন মনে হয় এটাও জীবন।লড়াই,সংগ্রাম,প্রিয় মানুষদের হারানো,নতুন বন্ধুত্ব,কর্মে সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা,সুখ-দুঃখ এই সবকিছুই জীবনের অংশ।তবে সবশেষে যা আবিষ্কার করলাম তা হলো জীবন এক অমীমাংসিত দ্বন্দ।এই জটিল সমীকরণ মেলানো প্রায় অনেকের জন্য সম্ভব আবার অনেকের জন্য অসম্ভব।অংকে আবার আমি বরাবরই ভীষণ কাঁচা।তাই এই সমীকরণের সমাধান করাও হয়ত আমার পক্ষে সম্ভব হবে না কখনো।আমি বোধহয় সেই অসম্ভবের দলেই পড়বো।”

“এইসব স্মৃতির মাঝে কি আমার অস্তিত্ব কোথাও আছে?”

“আছে।আমার জীবনের এক বিশাল অপূর্ণতার নাম হলো সুজন।আর না চাইতেও আমার জীবনের একটা সুখের স্মৃতির অংশ হলেন আপনি।এই যে আমি না চাইতেও আপনার থেকে ভালোবাসা পেলাম এটাই বোধহয় আমার জীবনের পূর্ণতা।তবে দিনশেষে একটা অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব থেকেই গেল।আমার থেকে বিন্দুমাত্র ভালোবাসা না পেয়েও আপনি কেন আমায় এত ভালোবাসলেন?”

মতিউর যেন একটু শান্তি পেল।যাক তার জবার জীবনে তবে মতিউরের একটু হলেও ভূমিকা আছে।দুঃখের না সুখের স্মৃতি হতে পেরেছে জবার জীবনে।সন্তুষ্টি চিত্তে বলল,

“এই অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব তবে সারা জীবন থাকুক জবা।কেননা তোমায় আমি ঠিক কি কারণে ভালোবেসেছি সেটা তো আমি নিজেও জানিনা।শুধু জানি ভালোবেসেছি।”

_____
সময়টা তখন দুপুর। যোহরের আযান দিয়ে দিয়েছে অনেকক্ষণ আগে।বৃষ্টি এখন আর নেই তবে আকাশে এখনো কালো মেঘ জমে রয়েছে।যেকোনো সময় আবার বৃষ্টি নামতে পারে।ভেজা গায়ে জুঁইয়ের ঘরের প্রবেশ করলো রুমি।এই অসময়ে রুমিকে দেখে জুঁইয়ের মনে প্রশ্ন জাগলো যে কেন এসেছে।সেই সাথে আবার ভেজা গা।

“ভিজে গেলি কি করে?বৃষ্টি তো অনেক আগেই থেমে গেছে।”

“আরে বৃষ্টি থামার আগেই আমি ভিজেছি রে।তোর একটা শাড়ি দে তো।এই ভেজা শরীরে কি করে ফিরব?বাজারের মধ্যে তো কতগুলো শয়/তান আবার বসে আছে।”

জুঁই তাড়াহুড়ো করে কাঠের আলমারি থেকে একটা শাড়ি বের করে রুমিকে দিল।দরজা বন্ধ করে রুমি সেখানেই শাড়িটা বদলে নিল।

“এখন বলতো ভিজলি কি করে?”

জুঁই এর প্রশ্নে রুমি গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,

“আর বলিস না,আমার মামা কোন যেন মগার সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছে।আজকে নাকি তারা আবার দেখতেও আসবে কিন্তু আমি ওই মগা কে কোনমতেই বিয়ে করব না সেইজন্য বাড়ি থেকে পালিয়েছি।একদম পাত্র পক্ষ আসার আগ মুহূর্তেই পালিয়েছি যেন আমাকে আর ধরতে না পারে।এতক্ষণে বোধহয় চলেও গেছে।”

জুঁই শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“তুই পারিসও রুমি।কতদিন এভাবে পালিয়ে পালিয়ে থাকবি?আজ নাহয় কাল কিন্তু বিয়ে করতেই হবে।”

“আগে একটা ভালো ছেলে পেতে দে তাহলে আমি নিজেই বিয়ে করে নেব।তখন আর আমাকে জোর করে বিয়ে দিতে হবে না।আরে ভাই আমি হলাম বাংলা সিনেমার নায়িকাদের মতন আর আমার বর কি না খলনায়কদের মতন হবে এটা হয় তুই বল?”

“তাও ঠিক বলেছিস।”

ওদের কথাবার্তার মাঝে সেখানে জবা এলো।রুমিকে দেখে ওর মুখে হাসি ফুটে উঠলো।বিছানার পাশে গিয়ে বসে কিছুক্ষণ কথাবার্তা চলল তাদের।এক পর্যায়ে রুমি ঠোঁট টিপে হেসে বলল,

“কি গো জবা আপা বিয়ের পর তো দেখি তুমি আরো সুন্দর হয়েছো।দুলাভাই মনে হয় একটু বেশি ভালোবাসছে তাই না?”

জবা অস্বস্তিতে পড়লো।এই কথাটা বেশ অনেকেই জবা কে বলেছে যে বিয়ের পর নাকি ওর সৌন্দর্য আরো বেড়েছে।আর তার কারণ হিসেবে একটাই কথা দাঁড় করিয়েছে যে তার স্বামী তাকে একটু বেশি ভালোবাসছে।কিন্তু এই কথার কোন যৌক্তিকতা জবা খুঁজেই পায় না।জবা কে চুপ করে থাকতে দেখে রুমি পুনরায় বলে উঠলো,

“কিগো আপা আবার চুপ করে আছো কেন?তা কি কি করলে দুলাভাইয়ের সাথে একটু আমাদেরকেও বলো।আমরাও একটু শুনি।দুদিন পর তো আমার আর জুঁইয়েরও বিয়ে হবে তোমার থেকে একটু পরামর্শ নেব না।”

“সে আগে বিয়ে কর তারপর পরামর্শ দেব।বড় বোনকে এসব কথা জিজ্ঞেস করতে তোর লজ্জা করেনা?”

“তার মানে লজ্জা পাওয়ার মতন তুমি কিছু করেছো।তাইতো বলি এত সুন্দর লাগছে কেন তোমায় দেখতে। মনে হয় প্রতিদিনই দুলাভাই বেশি বেশি ভালোবাসছে তোমায়।তা খালা হচ্ছি কবে?”

“আমি যখন বাবা হব তুমিও তখন খালা হবে।”

ঘরে প্রবেশ করতে করতে মতিউর কথাটা বলল। মতিউরকে দেখে জবা আরও লজ্জায় গুটিয়ে গেল।

ঘরে এসে মতিউর জুঁই কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“জুঁই তোমার সুজন ভাই ডাকছে তোমায়।নদীতে নাকি জাল ফেলেছে সেটা তুলতে যাবে।তুমি নাকি নিয়ে যেতে বলেছিলে।”

জুঁই তাড়াহুড়ো করে বললে,

“হ্যাঁ হ্যাঁ আমি যাব দুলাভাই।আপনিও চলুন দেখবেন অনেক মজা হবে।সুজন ভাই অনেক মাছ ধরে জানেন।জাল ফেলায় একদম ওস্তাদ সুজন ভাই।”

“আমি এলেই বোধহয় তুমি তোমার সুজন ভাইয়ের একটু বেশিই প্রশংসা করো তাই না জুঁই?”

“আর আমি সুজন ভাইয়ের নামে সামান্য প্রশংসা করলেও সেটা আপনার সহ্য হয় না তাই না দুলাভাই?”

জুঁইয়ের কাছে হার মানলো মতিউর।এই মেয়ে কোনদিনও তাকে জিততে দেবে না।কথার জালে এমন ভাবে ফাঁসায় যে মতিউরের মতন মানুষও কি বলবে সে সব খুঁজে পায় না।মতিউর এবার রুমির ওপর মনোযোগ নিবদ্ধ করে বলল,

“এই যে শালিকা এবার তুমি বলো আমার বউকে জ্বালাচ্ছিলে কেন?”

“ও মা জ্বালাচ্ছিলাম কোথায়?আপনি আদৌ আমার আপাকে ভালোবাসছেন কিনা সেসব বিষয় নিয়ে তদন্ত করছিলাম।”

“তা আমি আমার বউকে ভালোবাসছি কিনা সেই বিষয়ে জেনে তোমার কি লাভ হু?”

“খাঁটি সোনা ছেড়ে হিরে পেল নাকি কয়লা পেল সেটা দেখতে হবে না?”

মতিউর মুচকি হেসে বলল,

“খাঁটি সোনা না হয় নাই হতে পারলাম তাই বলে কয়লাও না।অন্তত কয়লা হলে তোমার আপার রূপ এতদিনে বাড়তো না,কমতো তাইনা জবা?”

জুঁই আর এসব কথা বাড়াতে চাইলো না।তাড়াহুড়োর কন্ঠে বলল,

“এখন এসব কথা থাক।দুলাভাই চলুন।আপা তুমিও চলো।আর রুমি তুই গেলে আয়।”

কথাটা বলে জুঁই জবার হাত ধরে আগে আগে ওকে টেনে নিয়ে গেল।এদিকে রুমি ভ্রুঁ কুঁচকে তাকিয়ে আছে মতিউরের দিকে।সেই দৃষ্টির প্রশ্ন উপেক্ষা করে যেতে পারলো না মতিউর।ইচ্ছে করলো রুমির মনে আসলে চলছে কি সে সব জানতে।প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“কিছু বলবে মনে হচ্ছে আমায়?নাকি কিছু শুনতে চাও?”

“একটা সত্যি কথা বলি দুলাভাই?”

“বলো।”

“আপনি মানুষটা বড্ড জা*****রা।”

রুমির মুখ থেকে এমন শব্দ শুনে মতিউর চোখ বড় বড় করে ওর দিকে তাকালো।বলার মতন কোন ভাষা খুঁজে পেল না।রুমি সেসব দিকে পাত্তা না দিয়ে চুপচাপ চলে গেল আর পিছনে তব্দা খেয়ে মতিউর বসে রইল।

______
“কি গো সুজন মিয়া দিনকাল কেমন কাটে?”

সারা শরীর কাদামাটি দিয়ে মেখে গেছে সুজনের।নদী থেকে জাল তোলা শেষে এইমাত্র ফিরলো।কল পাড়ে এসে হাত মুখ ধোঁয়ার মাঝে পিছন থেকে কোন মেয়েলি কণ্ঠস্বরের আওয়াজ পেতে সেদিকে তাকালো।রুমিকে দেখতে পেয়ে চোখ মুখে তার বিরক্তিভাব ফুটে উঠলো।

“আমার যেমনই দিনকাল কাটুক তাতে তোমার কি?”

“আহা!সুজন মিয়া তোমার মুখ থেকে এই তুমি সম্বোধনটা শুনলে মন প্রাণটা একদম জুড়িয়ে যায়।”

“এখান থেকে যাও রুমি।তোমার এসব মসকরা শোনার মতন মন মানসিকতা আমার নেই।”

“প্রেমিকার বিরহে বুঝি এখনো কাতর?তা তোমার প্রেমিকার যে বিয়ে হয়ে গিয়েছে সে খবর কি রাখো না নাকি?নাকি দেখেও না দেখার ভান ধরো?”

“সেটা আমার ব্যাপার আমি বুঝব,তোমায় কথা বলতে বলিনি।”

“আবার রেগে যাচ্ছ কেন?তা বলছিলাম যে বহুদিন হলো একটু নৌকায় ওঠা হয় না।আজ তো বৈঠা হাতে নিয়ে বেশ ভালোই নৌকা চালালে।তা আমাকে নিয়ে কি একবার নৌকা ভ্রমণে বেরোবে নাকি?”

সুজন চমকে রুমির দিকে তাকিয়ে বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

“তোমাকে নিয়ে আমি কেন নৌকা ভ্রমণে বেড়োতে যাব?মাথা ঠিক আছে?”

রুমি একটু লজ্জা লজ্জা ভাব নিয়ে বলল,

“তোমাকে দেখেই তো আমার মাথাটা ঠিক রাখতে পারি না গো সুজন মিয়া।কি জাদু করলে তুমি বলতো?”

“আচ্ছা জ্বালায় পড়লাম তো।এই মেয়ে তুমি যাবে না জুঁই কে ডাকবো?”

“এর থেকে ভালো কাজী ডেকে আনো,একবারে বিয়ে করে নেই।”

“বাড়াবাড়ি হচ্ছে কিন্তু এবারে।সব সত্যিটা জানার পরেও এসব কোন ধরনের কথাবার্তা হচ্ছে?তুমি জানো না আমি জবাকে ভালোবাসি?”

“জানি জন্যই তো এতদিন চুপ ছিলাম কিন্তু এখন তো আর আপাকে পাওয়ার কোন সম্ভাবনা তোমার নেই।আপার বিয়ে হয়ে গেছে,কিছুদিন পর তুমিও বিয়ে করবে।তা সেই বউটা যদি আমি হই তবে ক্ষতি কি?”

হাতমুখ ধোঁয়া শেষে সুজন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রুমির দিকে ফিরে তাকালো।চোখমুখে তার কাঠিন্য ভাব।তবে কণ্ঠ বেশ স্বাভাবিক।

“তুমি যেটা ভাবছো সেটা কখনোই সম্ভব না।এই জীবনে আমি শুধু জবা কেই ভালোবেসেছি আর কাউকে ভালোবাসতে পারব না।আমার জবার জায়গা আর কেউ নিতে পারবে না।আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম জানো তো আমার ঘরে আমার জবা আমার বউ হয়ে যাবে। সেই স্বপ্নটা হয়তো ভেঙে গেছে কিন্তু আমি আমার ঘরে আমার জবার জন্য যে জায়গাটা ঠিক করে রেখেছিলাম সেটা আর কেউ নিতে পারবে না।”

কথাটা বলে সুজন চলে যেতে নিলে পিছন থেকে রুমি তাচ্ছিল্য ভরা কন্ঠে বলে উঠলো,

“সিনেমার মতন কথা বাস্তবে চলে না গো সুজন মিয়া। আজ হয়তো তুমি তোমার জবার শোকে কাতর হয়ে পড়েছো কিন্তু দুদিন পর সেই শোক তুমি ভুলে যাবে।আমরা মানুষ সুজন মিয়া।আমাদের জীবনের অপূর্ণ জায়গা গুলো কেউ না কেউ ঠিক পূরণ করে দেয়। তখন আর সেই পুরনোর কদর থাকে না।তখন কদর বের হয় নতুনের।”

“কি বলতে চাইছো?”

“এটাই বলতে চাইছি যে আজ যেমন তুমি বললে যে তোমার জবার জায়গা কাউকে দিবেনা,একদিন ঠিক কাউকে না কাউকে দিতেই হবে তোমায়।বুকের যে ঘা টা আজ দগদগ করছে না সেটাও একদিন ঠিকই শুকিয়ে যাবে।আর সেদিনই সুযোগ বুঝে এই রুমি সেখানে ঢুকে পড়বে গো সুজন মিয়া।”

সুজন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেখান থেকে চলে গেল। এই মেয়েকে বোঝানো অসম্ভব।রুমিও আর সেখানে দাঁড়ালো না চলে গেল।আড়াল থেকে ওদের কথোপকথন জবা শূনলো।সোজা গেল নিজের ঘরে যেখানে মতিউর আছে।ঠাস করে দরজাটা বন্ধ করে দিল।দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ পেতেই মতিউর পিছন ফিরে তাকালো।জবার চোখ মুখে তখন দুশ্চিন্তার ছাপ ফুটে উঠেছে।সেই দুশ্চিন্তা দেখে মতিউরের ভেতরটা নড়েচড়ে উঠলো।তার হৃদয়টা যেন ব্যস্ত হয়ে পড়লো জানার জন্য যে কি এমন বিষয় যেটা তার জবা কে বিরক্ত করছে।জবা কিছু বলার আগেই মতিউর উৎকণ্ঠিত গলায় বলল,

“কি হয়েছে জবা?তোমায় এতো চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?”

জবার মাঝে একটু জড়তা কাজ করছে।একটু ইতস্ততবোধও কাজ করছে।বলবে কি বলবে না এই নিয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্বের মাঝে পড়েছে।জবা কে চুপ করে থাকতে দেখে মতিউর ওকে আশ্বস্ত করে ধীর গলায় বলে উঠলো,

“আমাকে নিঃসংকচে যে কোন কথা তুমি বলতে পারো জবা।ভালোবাসা নাহয় নাই হতে পারলাম কিন্তু একজন ভালো বন্ধু হওয়ার যোগ্যতা তো আমি রাখি তাই না?”

নিজের জড়তা কে এক পাশে রেখে জবা বলে উঠলো,

“সুজন কে নিয়ে আপনার সাথে কিছু কথা ছিল।”

মতিউরের ভেতরটা যেন আৎকে উঠলো।তবে কি জবা বলবে যে ও সুজনের সাথে পালিয়ে যেতে চায়?নিশ্চয়ই তাই বলবে।না হলে সুজন কে নিয়ে কিই বা কথা থাকতে পারে।মতিউরের কেন যেন নিজের উপরে রাগ হলো।কেন তখন ওদেরকে বলতে গিয়েছিলে যে ওরা পালাতে চাইলে মতিউর সাহায্য করবে?তখন তো মতিউরের বোঝা উচিত ছিল যে এই কয়টা দিনেই জবা ওর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।পারবে না থাকতে জবাকে ছাড়া।জবার ভাগ অন্য কাউকে দিতে পারবে না।তবে এখন যদি জবা সত্যি মতিউর কে এটা বলে যে ও সুজনের সাথে পালিয়ে যেতে চায় তবে মতিউর কি করবে?সত্যি কি পালাতে দেবে নাকি জোর করে হলেও নিজের বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখবে জবাকে?মতিউর কে চুপ করে থাকতে দেখে জবা বলে উঠলো,

“চিন্তা করবেন না।খুব বেশি অন্যায় আবদার করবো না।আপনার থেকে পালিয়ে সুজনের সাথে চলে যাওয়ার আবদারও করব না।”

মতিউর একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,

“তবে বলো কি চাও।”

“সবার আড়ালে একটু সুজনের সাথে কথা বলার ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন?”

“এটা তো খুব একটা কঠিন বিষয় না।জুঁই কে বললেই ব্যবস্থা করে দিতো কিংবা কাউকে না জানিয়েও তুমি খুব সহজভাবেই সুজনের সাথে কথা বলতে পারতে।”

“কিন্তু সেটা আমি চাইনা।যদি আমাদেরকে কেউ দেখে ফেলে তাহলে খুব সমস্যা হয়ে যাবে।হ্যাঁ জুঁই কে বললে ও ব্যবস্থা করে দিতে পারতো ঠিকই তবে আমি চাই আপনাকে জানিয়ে সবটা করতে।জানিনা তবে কেন এই বিষয়ে আপনাকে ঠকাতে মন চাইলো না।আপনি মানুষটা খুব ভালো।এমনিতেই তো কম অন্যায় করছিনা আপনার সাথে নতুন করে নাহয় আর নাই বা করলাম।পারবেন ব্যবস্থা করে দিতে একটু?”

“বেশ চেষ্টা করব।তবে কি কথা বলবে জানতে পারি কি?না মানে ওর সাথে পালিয়েও যেতে চাইছো না আবার ভালোবাসার স্বীকারোক্তি দেবে এমনটাও তো নয়।কেননা তাকে নিশ্চয়ই বহুবার নিজের ভালোবাসার স্বীকারোক্তি দিয়ে এসেছো।তাহলে?”

“সুজনকে নতুন করে জীবনটা শুরু করতে বলবো। আমি তো আর চাইলেও ওর জীবনে যেতে পারবো না।আগের মতন আর কোন কিছুই সম্ভব না।আমার জীবনটা তো বেশ চলছে।আপনাকে ভালোবাসি বা না বাসি তবুও তো আপনার সংসার করছি,আর সারা জীবন এইটাই করতে হবে।তবে আমার জন্য সুজন কেন কষ্ট পাবে?ওর জীবনটা কেন থেমে থাকবে বলুন তো?আমি সারা জীবন ওকে সুখে দেখতে চেয়েছি, এখনো তাই চাই।ওকে বলবো ও যেন ওর ঘরেতে লাল টুকটুকে সুন্দর বউ নিয়ে আসে যে ওর খেয়াল রাখবে, ওর খাওয়া-দাওয়া যত্ন নেবে,অসুস্থ হলে ওর সেবা করবে,নিয়মিত চোখে সুরমা পড়তে বলবে।”

মতিউর ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বলল,

“তুমি যে এতটা সাহসী তা তো জানতাম না?”

জবা প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“এখানে সাহসের কি দেখলেন?”

“বাহ্ রে তোমার সুজন মিয়াকে বিয়ে করতে বলবে,যে জায়গাটায় তুমি নিজে থাকার স্বপ্ন দেখেছিল সেটা অন্য কাউকে দিয়ে দিতে বলবে এতে কি সাহসের দরকার নেই?”

“সে সব স্বপ্ন ছিল।আমি এখন এটা বুঝতে শিখেছি যে স্বপ্ন স্বপ্নই হয়,স্বপ্ন কখনো সত্যি হয় না।সুজন আমার জন্য অনেক কষ্ট করেছে।আমি চাই না ও আমার জন্য আর কষ্ট করুক।”

“ঠিক আছে।আজ সারাদিন ও সময় পাবে না।জামশেদ বেরিয়েছে ওকে নিয়ে।আমি বরং কাল তোমার সাথে ওর কথা বলার ব্যবস্থা করে দেব কেমন?”

জবা মাথা নাড়িয়ে চুপচাপ সায় জানালো।ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে নিয়ে থেমে গেল।পিছন ফিরে তাকিয়ে প্রশ্নাত্মক গলায় মতিউরকে জিজ্ঞেস করল,

“যদি আমি আপনাকে বলতাম যে আমি সুজনের সাথে পালাতে চাই তাহলে কি করতেন?সাহায্য করতেন কি তখনো?”

জবার চোখে মুখে এই প্রশ্নের উত্তরটা জানার জন্য তীব্র আগ্রহ প্রকাশ পেল।সেই সাথে বিপদে পড়লো মতিউর। কি উত্তর দেবে হয়তো মতিউরের নিজেরই জানা নেই।
মতিউরকে চুপ করে থাকতে দেখে জবা বলে উঠল,

“নিজেকে এতটা মহান ভাববেন না মতিউর সাহেব।আপনার কথা মতো যদি ধরি আপনি আমায় ভালোবাসেন তবে নিজের ভালোবাসা বিসর্জন দেওয়ার ক্ষমতা সবার মাঝে থাকে না।আপনার চোখে আমি সেই অক্ষমতাটা বহু আগেই দেখে ফেলেছি।তাই দয়া করে আর কখনো এমন কথা বলবেন না।আপনার মুখে এই কথাগুলো বড্ড বেমানান লাগে শুনতে।”

চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here