প্রেমের ঘাটের মাঝি #পর্ব ৫ #লেখনিতে খুশবু আকতার

0
128

#প্রেমের ঘাটের মাঝি
#পর্ব ৫
#লেখনিতে খুশবু আকতার

সুজনের চানাচুর জুঁই জবাকে দিয়েছিল তবে জবা কেন যেন সেটা নিতে চায়নি।হয়তো মায়া বাড়াবে না বলেই নিতে চায়নি।ফেরত দিয়ে দিয়েছে আবার।কিন্তু সে কথা জুঁই আর সুজন কে জানালো না।মানুষটা এমনিতেই অনেক কষ্ট পাচ্ছে তাকে আবার নতুন করে নাই বা আঘাত করলো।রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে সবাই যে যার ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।জবা বিছানাটা ঠিকঠাক করে দিয়ে মতিউরকে শুয়ে পড়তে বলল।মতিউর বিছানায় বসে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল জবাকে,

“তুমি ঘুমোবে না?”

“না ঘুমিয়ে তো আর কোন উপায় নেই,তাই ঘুমোতেই হবে।”

“কে বলেছে না ঘুমিয়ে উপায় নেই?তুমি চাইলে জেগে থাকতে পারো।এটাই তো না ঘুমানোর বিপরীত দিক।”

জবা চোখ ঘুরিয়ে একবার মতিউরের দিকে তাকালো।মতিউরের কথায় সে কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়েছে বটে তবে সেটা মতিউরকে বুঝতে দিল না।মতিউর বালিশটা ঠিকঠাক করে নিয়ে এক হাত মাথার নিচে দিয়ে শুয়ে পড়লো।টিনের চালের দিকে তাকিয়ে মনোযোগ সহকারে কি যেন একটা ভাবতে লাগলো।জবা তখন জানালার কাছে দাঁড়িয়ে।জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই নদী দেখতে পাওয়া যায়।চাঁদের আলো নদীর পানির উপর প্রতিফলিত হয়ে কি সুন্দর দৃশ্য তৈরি হয়েছে।জবার মন প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। সেই সাথে মানস্পটে ভেসে উঠলে পুরনো কিছু স্মৃতি।আজ পূর্ণিমা রাত।না জানি এমনই কত পূর্ণিমার রাতে সুজনের হাত ধরে নদীর পাড়ে বসে থেকেছে।মাঝে মাঝে জুঁই আর জহির কে নিয়ে গিয়ে মাঝরাত্তিরে নৌকায় চড়েও ঘুরে বেরিয়েছে চারজনে মিলে।হালকা বাতাসে যখন জবার চুল গুলো এলোমেলো হয়ে যেতো তখন সুজন সযত্নে সেগুলো ওর কানের পিঠে গুঁজে দিতো।জবা তখন নিজের লজ্জা রাঙা মুখটা সুজনের বুকের মাঝে লুকোতে চাইতো কিন্তু সুযোগ হয়ে উঠতো না ঠিক।মানুষটাকে একবার জড়িয়ে ধরেছিল জবা।সেটাও মতিউরের সাথে বিয়ের আগের দিন রাতে।কি যে শান্তি পেয়েছিলে জবা সেটা বলে বোঝাতে পারবে না।হয়তো ঐ শান্তিটুকুই জবার জীবনের শেষ শান্তি ছিল।ইচ্ছে তো করছিলো মুহূর্তটাকে ওখানেই আটকে দিতে।এক প্রেমিক প্রেমিকার বিচ্ছেদের করুন দৃশ্য কেউ দেখতে আসেনি সেদিন।কেউ ওদের চোখের জল মুছে দিয়ে সান্ত্বনা দিতে আসেনি।ওদের হৃদয়ের হাহাকার কারো মন গলাতে পারে নি।সেদিন যে কতগুলো মানুষ মিলে জীবন্ত দুটো মানুষকে মে/রে ফেললো,তা নিয়ে কারো মনে বিন্দুমাত্র কোন অপরাধবোধ নেই।সবাই দিব্যি নিজেদের জীবনে খুশি আছে অথচ ওই মানুষ দুটো আজ বেঁচে থেকেও যেন মৃত।
জবার এসব ভাবনার মাঝে মতিউরের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

“সুজনকে ভালোবাসতে কেন জবা?”

মতিউরের হঠাৎ এমন প্রশ্নে জবা কিঞ্চিত কেঁপে উঠলো।মেয়েটা একটুতেই ভয় পেয়ে যায়।অথচ এতটুকু সাহস নিয়ে গিয়েছিল প্রেম করতে।তখন তো আর সে বোঝে নি যে তার ভালোবাসা করুন পরিণতি পাবে।জবা কে চুপ থাকতে দেখে মতিউর পুনরায় বলে উঠলো,

“বলোনা কেন ভালোবাসতে সুজনকে?ও নিশ্চয়ই খুব ভালো ছিল তাই না?”

জবা এবারে যেন একটা ঘোরের মাঝে চলে গেল।ডুব দিলো সুজনের ভাবনার মাঝে।নিজের অজান্তেই তার ঠোঁটে ফুটে উঠলে হাসি।আনমনে বলল,

“হ্যাঁ,খুব ভালো ছিল।ওকে ভালোবাসার একটাই কারণ ছিল।আর সেটা হল ওর মুখটা দেখে কেন যেন আমি খুব শান্তি পেতাম।এটা ছাড়া তার দ্বিতীয় কোনো কারণ ছিল না।আমি শুধু আমার হৃদয়ের শান্তিটুকুকে সারা জীবন ধরে রাখতে চেয়েছিলাম।”

“কে আগে নিজের ভালোবাসার কথা জানিয়ে ছিলে?তুমি না সুজন?”

“সুজন জানাবে নিজের ভালোবাসার কথা? এটা অসম্ভব।ও তো আমায় দেখে ভীষণ ভয় পেত।আসলে আমি একটু শান্ত স্বভাবের তো, কারো সাথে তেমন একটা কথা বলি না।আর আমার এই শান্ত স্বভাবটার মানে ও ধরে নিয়েছিল যে আমি বোধ হয় ভীষণ গম্ভীর আর রাগী।জুঁই তো আবার খুবই চঞ্চল,সুজনের ওর সাথে বেশ ভাব জমে গিয়েছিলো।আমি ওকে আগে নিজের মনের কথাটা জানিয়েছিলাম।আসলে আমি ওকে আগে ভালোবেসে ছিলাম তারপরে আমার ভালোবাসা ওকে আমায় ভালোবাসতে বাধ্য করেছিল।”

“এত সাহসী একটা মেয়ে আবার আমার কণ্ঠে কেঁপে ওঠো?অদ্ভুত!”

জবা একবার মতিউরের দিকে তাকালো।এখন তার শোয়ার ভঙ্গির মাঝে পরিবর্তন এসেছে। মাথার নিচে রাখা হাতটা এখন চোখের উপর ঠেকিয়েছে।মনে হয় না যে জবাকে দেখছে বলে।তবে জবা তাকে তীক্ষ্ণ চোখে পর্যবেক্ষণ করলো।মানুষটা এত বেশি রহস্যজনক কেন?নিজের বউয়ের মুখে কোন স্বামী তার প্রাক্তন প্রেমিকের গল্প শুনতে পারে সেটা মতিউরকে না দেখলে জবার বিশ্বাসই হতো না।তাও নিজে যেচে গল্প শুনতে চাচ্ছে।জবাকে চুপ করে থাকতে দেখে মতিউর বলে উঠল,

“নিশ্চয়ই এখন ভাবছো যে আমি এত ভালো কি করে তাই না,যে নিজের বউয়ের মুখে তার প্রাক্তন প্রেমিকের গল্প শুনতে চাইছি?”

জবা বিষ্ময় ভরা কণ্ঠে বলল,

“আপনি কি করে বুঝলেন?”

মতিউর হো হো করে হেসে উঠে বলল,

“তোমার চোখ দুটো যে বইয়ের খোলা পাতার মতন জবা।আর সে পাতায় লেখা প্রত্যেকটা শব্দ আমি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তে পারি।”

জবার একটু অস্বস্তি হলো।সে আর কোন কথা না বলে আবারও বাইরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো।একটু চুপ থেকে মতিউর আবারো জবা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমায় তোমার এত অপছন্দের কারণটা কি জানতে পারি?”

জবা এবার একটুও চমকালো না।মতিউরের আচরণ দেখে মনে হয়েছিল কোনো না কোনো দিন এই প্রশ্নটা মতিউর ওকে করবে।হয়তো সেজন্য উত্তরটা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা ছিল যার ফলে চটপট উত্তর দিতে পারলো।

“আপনি চাইলে আমাদের বিয়েটা আটকাতে পারতেন।ততদিনে হয়তো আমি আর সুজন অন্য কোন একটা রাস্তা বের করে ফেলতে পারতাম।কিন্তু আপনি সেটা হতে দিলেন না।সবটা জানার পরেও,ভাবি অনুরোধ করার পরেও আপনি বিয়েটা করলেন।তাহলে আপনাকে অপছন্দ করাটা কি যুক্তিযুক্ত নয়?”

মতিউর চোখের উপর থেকে হাতটা নামিয়ে রেখে উঠে বসল।প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে জবার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কিসের বড় ভাবি আমাকে অনুরোধ করেছে?কি বলছ আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনা?”

জবা মতিউরের পানে সন্দেহি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,

“যেদিন আমাকে দেখতে এসেছিলেন সেই দিনই তো বড় ভাবি আপনাকে আমার আর সুজনের ব্যাপারে বলেছিল।সাথে এটাও অনুরোধ করেছিল যেন আপনি বিয়েটা ভেঙে দেন।ভুলে গেছেন?”

জবার বলা পুরো কথাটা মতিউরের মাথার উপর দিয়ে গেল।বিস্মিত কন্ঠে বলল,

“কি আজেবাজে কথা বলছো এসব?তোমার বড় ভাবির সাথে আমার তো কথাই হয় নি ঐদিন।আরে ঐদিন কেন কাল যখন বাড়ি ফিরলাম তারপর রাতে খেতে বসার সময় তোমার বড় ভাবির সাথে আমার প্রথম যা একটু কথা হয়েছে।”

মতিউরের বলা কথাটা জবার ঠিক বিশ্বাস হলো না।ওর বড় ভাবি তো নিজে ওকে বলেছিল যে সে নাকি মতিউরকে বলেছে জবা আর সুজনের কথাটা।তাহলে এখন মতিউরের অস্বীকার করার মানেটা কি?জবা ভাবলো নিশ্চয়ই মতিউর ওর কাছে ভালো সাজার চেষ্টা করছে।

“যদি বড় ভাবি আপনাকে কিছু নাই বলে থাকে তাহলে আপনি আমার আর সুজনের ব্যাপারটা জানলেন কি করে?”

“সেটা তো আমাকে তোমার ছোট ভাই মানে জাকির বলেছিল তাও আমাদের বিয়ের পর তোমার বিদায়ের সময়।মনে আছে তুমি নৌকায় ওঠার পর নৌকা ছাড়তে বেশ কিছুক্ষণ দেরি হয়েছিল কারণ আমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না?”

জবা একটু মনে করার চেষ্টা করে বলল,

“হ্যাঁ মনে আছে।”

“আমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না কারণ জাকির আমাকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে গিয়ে গোপনে তোমার আর সুজনের ব্যাপারটা বলেছিল।ও এই বিষয়টা নিয়ে ভয় পাচ্ছিল যে আমি যদি অন্য কোথাও থেকে কথাটা শুনি তাহলে যদি রেগে গিয়ে তোমার সাথে খারাপ আচরণ করি তাই ও আগে থেকে আমায় বলে দিয়েছিল।বিয়ের আগেই নাকি আমায় বলে দিতে চেয়েছিল কিন্তু তেমন কোন সুযোগ তৈরি হয় নি,আর না ওকে কেউ বলতে দিয়েছে।”

জবার অজান্তে চোখ দুটো ভিজে উঠল।অস্ফুট স্বরে আওড়ালো,

“তারমানে বড় ভাবি আমায় মিথ্যে বলল?”

জবা কিছুতেই হিসাব মেলাতে পারছে না।মতিউরও বুঝল যে জবা ওকে ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না।অবশ্য এটাই স্বাভাবিক।ওর বড় ভাবির সাথে তো কত বছরের আলাপ,আর মতিউরকে তো চিনলো এই কয়দিন হলো।তার মধ্যে আবার মতিউর জবার অপছন্দের তালিকায় আর বড় ভাবি প্রিয় মানুষদের তালিকায়।সেই মানুষটার কথা বিশ্বাস করাই স্বাভাবিক।

মতিউর বিছানা থেকে নিচে নেমে হাত ধরে জবাকে টেনে এনে বিছানায় তার পাশে বসালো।মতিউর যে জবার হাত ধরেছে এটা অবশ্য জবা ঠিক খেয়াল করে উঠতে পারে নি।কেননা এখন জবা নিজের মাঝে নেই।মতিউর পুনরায় বলে উঠল,

“আমায় একটু বিশ্বাস করো জবা।বিয়ের আগে আমি জানতাম না তোমার আর সুজনের ব্যাপারটা,আর না তোমার বড় ভাবির সাথে আমার এ বিষয়ে কোন কথা হয়েছে।”

জবা ছলছল দৃষ্টিতে মতিউরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,

“তাহলে বড় ভাবি আমাকে মিথ্যা কেন বলল?শুধু আমাকে না,সুজনকেও মিথ্যে বলেছে।”

“তোমার এই প্রশ্নের উত্তরটা তো আমার কাছে নেই জবা।এটার উত্তর তোমার বড় ভাবিই তোমাকে দিতে পারবে,তুমি বরং তাকেই জিজ্ঞেস করে নিও।তবে অনুরোধ রইল আমাকে অবিশ্বাস করো না।তুমি আমাকে যতটা খারাপ মানুষ ভাবো আমি ততটাও খারাপ না।”

“যদি আমাদের বিয়ের আগে এ কথাটা জানতেন তাহলে কি করতেন?”

জবার প্রশ্নে মতিউর হালকা হেসে বলল,

“তোমার এই প্রশ্নের উত্তরটা যদি আমি এখন দেই তবে তোমার আফসোস আরো বাড়বে জবা।আর এই আফসোস সারা জীবনেও মিটবে না।”

জবা মতিউরের হাত ধরে মিনতি করে বলল,

“অনুরোধ করছি বলুন না আপনার সিদ্ধান্ত তখন কি হতো?এমনিতেই তো আমার জীবনে আফসোসের শেষ নেই।”

মতিউর একবার জবার হাতের মধ্যে থাকা নিজের হাতটার দিকে তাকালো।মতিউর জানে জবা ভালোবেসে ওর হাতটা ধরেনি।ভালোবেসে ধরার তো কোন প্রশ্নই আসছে না।তবে এই প্রথম জবা কিছু আবদার করেছে সেটা তো রাখতেই হয়।তাই সেও জবার আফসোসটা বাড়াতে উত্তর দিল।

“তোমাকে প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলেছিলাম জবা।সেদিন তোমার চোখের জলের কারণটা আমি ঠিক ধরতে পারিনি। ভেবেছিলাম বিয়ের পর বাপের বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে সেই জন্য হয়তো কাঁদছো।ছোট মানুষ তো!কিন্তু তখন যদি আমি বুঝতাম যে তোমার চোখের জলের কারণ আমি তবে বিশ্বাস করো আমি তোমার সেই চোখের জল দূর করার ব্যবস্থা করে দিতাম।”

“কি করতেন?”

“এতদিনে নিশ্চয় বুঝে গিয়েছো তোমার ভাইয়েদের থেকে আমার ক্ষমতা বেশি?হয়তো তোমাকে আমার পাওয়া হতো না তবে তুমি যাকে চাও তাকে পাওয়ার ব্যবস্থা ঠিকই করে দিতে পারতাম।আমাদের বিয়েটা ভেঙে যে করেই হোক না কেন তোমার আর সুজন কে এক করার ব্যবস্থা করে দিতাম।আসলে কি বলোতো যাকে ভালোবেসেছি তার চোখের জলের কারণ হতে আমি পারতাম না।সারাটা জীবন তার জীবন নষ্টের দায় নিয়ে বাঁচতে পারতাম না।তার থেকে ভালো হতো তার জীবনটা গুছিয়ে দিয়ে তার মনে একটা সম্মানের জায়গা নিয়ে থাকতাম।”

জবার কান্নার বেগ বাড়লো।কান্নার তোপে তার নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে।একটা সুযোগ ছিল জবা আর সুজনের এক হওয়ার কিন্তু একটা মানুষের মিথ্যাচারে সবটা শেষ হয়ে গেল।জবা হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল,

“বড় ভাবি নিজের সংসার বাঁচাতে গিয়ে আমার স্বপ্নের সংসারটাই জোড়া লাগতে দিল না।আমার সাধের সংসারটা শুরু হওয়ার আগেই ভেঙে দিল।আমার বেঁচে থাকার কারণটা কেড়ে নিল বড় ভাবি।”

জবা বুঝতেও পারলো না আজ ও নিজের অজান্তে ওর কথাগুলো দিয়ে মতিউরকে ঠিক কতটা আহত করল।জবা নিজের সাধের সংসারের গল্প করছে অথচ এটা বুঝতে পারল না যে মতিউরের সাধ ছিল ওকে নিয়ে সংসার করার।স্বপ্নতো জবার একার ভাঙেনি, ভেঙেছে মতিউরেরও।অথচ জবা ভাবছে হৃদয়ের যন্ত্রণা বোধহয় তার একারই হচ্ছে।যন্ত্রণা তো দুটো হৃদয়েরই হচ্ছে,শুধু একটা হৃদয়ের যন্ত্রণার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে আর একটা হৃদয় তার যন্ত্রণা নিঃশব্দে প্রকাশ করছে।

_____
আজ সকালে ঘুম থেকে উঠতে জুঁইয়ের একটু দেরি হলো।গতকাল রাতে একটু দেরিতে ঘুমানোর কারণেই সকালে উঠতে দেরি হয়েছে।তাড়াহুড়ো করে কল পাড়ে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে নিল।উঠোনে পা রাখতেই দেখল চেয়ারে নাদিম বসে আছে।নাদিমের পাশে আরো তিনটে চেয়ারে জলিল তালুকদার আর তার মেজো এবং ছোট ছেলে বসে আছে।এত সকাল সকাল নাদিমকে এখানে দেখে জুঁই বেশ অবাক হলো।তার বাপ ভাইদের সাথে যে নাদিমের এত খাতির আছে সেটাও তার জানা ছিল না।বেশ হেসে হেসে কথা বলছে সবাই।ওদের মাঝে ঠিক কি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সেটা জুঁইয়ের খুব জানতে ইচ্ছে করলো।একটু এগিয়ে যেতেই তাদের আলোচনা জুঁইয়ের কান অব্দি পৌঁছালো।নাদিম নম্রকণ্ঠে জলিল তালুকদারকে উদ্দেশ্য করে বলছে,
“আপনি তো জানেনই চাচা আব্বার শারীরিক অবস্থা ভালো না।তবুও নিজে আসতে চেয়েছিল কিন্তু আজ সকালে আর শরীর সায় জানালো না।সে যেন বাধ্য হয়ে আমাকে একাই আসতে হলো।”
“সেটা তো জানি বাবা যে ওনার শরীরটা ভালো না।তুমি এত সকাল সকাল কোন বিশেষ দরকার ছিল বুঝি?”
“সামনের শুক্রবারে নাহারের বিয়ে চাচা।আপনাকে কিন্তু আপনার পুরো পরিবার নিয়ে আসতে হবে।সবার প্রথমে আপনাকে বিয়ের খবরটা জানালাম।”
“আলহামদুলিল্লাহ।ছেলে কি করে?”
“ছেলে আমার বন্ধু।আমরা একই সাথে পড়াশোনা করেছি।আপাতত পড়াশোনা শেষ করে পারিবারিক ব্যবসা দেখাশোনা করছে শহরে।বিয়ের পর নাহারকে নিয়ে শহরেই থাকবে।”
“ও আচ্ছা।তা দেনা পাওনার কথা সব ঠিকঠাক করে নিয়েছে তো?তুমি ছোট মানুষ এসব বিষয় তেমন একটা জ্ঞান বুদ্ধি নেই।এ ব্যাপারগুলো নিয়ে কিন্তু আগে আলোচনা করে নেওয়া ভালো না হলে পরে মেয়ের সংসারে অশান্তি হতে পারে।”
“ওদের কোন দাবি নেই চাচা।আমরা খুশি মনে মেয়েকে যা দেবো ততটুকুই।”
“তাহলে তো বেশ ভালো।আমরা নিশ্চয়ই যাবো।”
“সেটা তো আসতেই হবে।আপনি না করলে আমি শুনতাম না কি? জোর করে এসে আপনাকে নিয়ে যেতাম।”
“আচ্ছা ঠিক আছে তোমাকে আর জোর করতে হবে না।তা এসেছো যখন সকালের খাবার না খেয়ে কিন্তু যাবে না।”
“না চাচা এত সময় হবে না। আসলে আরো অনেক জায়গায় যেতে হবে। বুঝতেই পারছেন একা হাতে সবটা সামলাতে হবে।”
পাশে বসা জাফর বলে উঠলো,
“আরে একা কেন হতে যাবে? নাহার তো আমাদেরও বোন।তুমি চিন্তা করো না তোমার সাথে হাতে হাত মিলিয়ে আমরা সাহায্য করবো।”
নাদিম কৃতজ্ঞতা সূচক হাসলো।নাদিমকে নিয়ে সবাই একসাথে খাওয়ার ঘরের উদ্দেশ্যে পা বাড়ানো।জলিল তালুকদার আর তার দুই ছেলে আগে পা বাড়ালেও উঠোনের একপাশে জুঁইকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নাদিম তার হাঁটার গতি একটু কমালো।ধীর পায়ে জুঁইয়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলল,
“কেমন আছেন জুই?”
জুঁই ভদ্রতার খাতিরে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“ভালো আছি।আপনি কেমন আছেন?”
“এমনিতেই বেশ ভালোই ছিলাম।তবে
অপ্রত্যাশিতভাবে আপনার সাথে দেখা হওয়াতে আরো ভালো লাগছে এখন।এক সপ্তাহ বাদে নাহারের বিয়ে।যদিও চাচাকে বলেছি যে পুরো পরিবারকে নিয়ে আসতে তবুও আপনাকে আলাদা ভাবে বললাম।অবশ্যই আসবেন।”
“নিশ্চয়ই আসার চেষ্টা করব।”
“উহু চেষ্টা করব বললে তো হবে না।আমার নিমন্ত্রণ আপনাকে অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে।বলুন অবশ্যই আসব।”
“দেখুন কোন বিষয়েই এতটা নিশ্চয়তা দেওয়া ঠিক না।এক সপ্তাহ বাদে আমি ঠিক কোন পরিস্থিতিতে থাকবো আদৌ আমি বেঁচে থাকবো কিনা সেটাও তো একটা প্রশ্ন তাই না।সেজন্যই বললাম চেষ্টা করব। যদি সুস্থ থাকি, বেঁচে থাকি তাহলে আসবো।আর যদি পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকে তাহলে তাে আসতে পারবো না।সেজন্য আপনাকে অযথা আশাও দেখালাম না।”
“আসলেই বুদ্ধিমতি মেয়েদের সাথে কথায় পেড়ে ওঠা বেশ মুশকিল।তাও যদি আবার হয় আপনার মতন বুদ্ধিমতী।যাই হোক আল্লাহ তায়ালা আপনাকে সুস্থ রাখুন, বেঁচে রাখুন, নাহারের বিয়েতে আসার তৌফিক দান করুন।”
জুঁই হেসে উঠে বলল,
“আমিন।”

চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here