লুকোচুরি_রোদ্দুর_ও_তুমি (৭) লেখনীতে : #অহনা_রহমান

0
148

গল্প : #লুকোচুরি_রোদ্দুর_ও_তুমি (৭)
লেখনীতে : #অহনা_রহমান

❌কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ❌

আজ রুহি ও রাজের ফিরানি দিন। অর্থাৎ রাজ বিয়ের পর প্রথমবার রুহির বাড়িতে যাবে। সকালেই তুবার বাবা (তোফায়েল আহমেদ) ও রুহির মামা (আমির হোসেন) এসেছিলো ওদের নিতে। সবকিছু গোছগাছ করে রাজ ও রুহি, মামা-চাচা সমেত বেরিয়েছে একটু আগে। কিন্তু হিয়া ও তুবা এখনও যেতে পারেনি।
ফিরানিতে ছেলের বাড়ির সদস্য ও যায় সাথে। কিন্তু নাফি বাদে রাজের পরিবারে আর যাওয়ার মতো কোনো সদস্য নেই। রাজের মা একলা মানুষ। একটা কলেজে শিক্ষাকতা করেন তিনি। আর রাজের বাবা তো নেই-ই! আত্মীয়-সজনদের সবারই কোন না কোন সমস্যা শুরু হয়েছে। আপাতত আর কেউ যাওয়ার নেই রাজের সাথে। এইজন্য ইচ্ছে না থাকা স্বত্বেও, ছোট ভাইয়ের শশুরবাড়িতে নাফির যেতে হচ্ছে।

ড্রয়িংরুমে মুখে হাত দিয়ে বসে আছে হিয়া। তুবা পায়চারি করছে। মূলত নাফির জন্য অপেক্ষা করছে তারা। ওরা দুজন নাফির সাথে যাবে। কিন্তু সেই লোকের দেখা মিললে তো? না হলেও আধাঘন্টা যাবত অপেক্ষা করছে ওরা। হিয়া বিরক্ত হয়ে ‘চ’ সূচক শব্দ করলো। তুবাকে বলল,

“তুই শুনেছিস, ছেলেদের রেডি হতে এতো সময় লাগে? আশ্চর্য! আমি মেয়ে মানুষ আমার সাজতে লাগেই সর্বচ্চ বিশ মিনিট। ওই লোক কি এমন করছে বলতো?”

তুবা পায়চারি থামিয়ে দিয়ে হিয়ার কাছে এলো। কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,

“তুই যেখানে আছিস, আমিও সেখানে আছি। তাহলে কীভাবে বলবো??”

এরপর হিয়ার কানের কাছে এসে বলল,

“কিন্তু দুলাভাইয়ের ভাই টা কিন্তু জোস আছে বল? দেখলেই কেমন ভালোলাগে! যেমন চেহারা তেমন ব্যক্তিত্ব। আসার পরে দেখেছিস, একবারও আমাদের সাথে হাসি-ঠাট্টা করেছে?”

হিয়া মুখ বাঁকিয়ে তাকালো তুবার দিকে।

“হাসি-ঠাট্টা করেনি দেখে সে ব্যক্তিত্ববান? এটা কেমন লজিক?”

নাফির কথা বলতে বলতে হিয়ার মনে পরলো রাজের কথা। হিয়া তাচ্ছিল্যের সাথে বলল,

“আর শোন এগুলোকে দেখে গলে যাস না। এরা হচ্ছে ভালো মানুষের মুখোশ পরা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একেকটা জা নো য়া র!”

তুবা ঠিক বুঝলো না হিয়া এমন কেন বললো। সে তো এই বাড়ির কাউকেই তেমন অসুবিধার দেখেনি। সবাই কত ভালো। বিশেষ করে নাসিমা। মানুষটার সাথে কথা বললেই মন ভালো হয়ে যায়৷ তুবা বলল,

“এসব কোন ধরনের কথা হিয়া? আমি তো খারাপ কিছুই দেখিনি এদের ভেতরে। কিন্তু তুই কি এমন দেখেছিস যে এমন একটা কথা বললি?”

হিয়া মনে মনে নিজেকেই দুই চারটা গালি দিলো। উত্তেজিত হয়ে তুবার সামনে, এটা কি বলে ফেললো সে? হিয়া তৎক্ষনাৎ কথা ঘুরিয়ে বলল,

“আরে আমি এনাদের কথা বলিনি। কিছু শয়তান ছেলে আছে না, যারা শুধুশুধু মেয়েদেরকে ঠকায়? আমি তাদের কথা বলেছি। আচ্ছা বাদ দে, তুই কি বলছিলি বল।”

তুবা সত্যিই বিশ্বাস করে নিলো হিয়ার কথা। সে ঝটপট প্রসঙ্গ পাল্টে, উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,

“আরে দুলাভাইয়ের বড় ভাইয়ের কথা বলছিলাম। কেমন স্বল্পভাষী, গুরুগম্ভীর ছেলেটা। ভালোই লাগে বল?”

“এই দাঁড়া তুই? তুই না তাসরিকের সাথে ইন্টুপিন্টু করছিলি?”

তুবা কিছু বলার আগেই ওর চোখ গেল সিঁড়ির দিকে। অফ হোয়াইট রংয়ের শার্ট ও কালো প্যান্ট পরিহিত এক সুদর্শন যুবক নামছে শিড়ি বেয়ে। গালে খোঁচা খোঁচা চাপদাড়িতে যুবকের সৌন্দর্য যেন বহুগুণে বেড়ে গেছে। তুবা হিয়াকে ইশারায় বলল সিঁড়ির দিকে তাকাতে। হিয়া তাকালোও সেদিকে। তবে তারমধ্যে খুব একটা পরিবর্তন দেখা গেল না। যদিও সে অস্বীকার করতে পারবে না, নাফি সুন্দর নয়, সুদর্শন নয়। কিন্তু হিয়ার এসবে কিছু যায় আসে না। সে একবার তাকিয়েই অন্যদিকে ঘুরে গেল। সেদিন ছাঁদে শেষবার কথা হয়েছে নাফির সঙ্গে। এরপর অনেকবার দেখা হলেও কথা হয়নি। আর নাফি এমনিতেই ইন্ট্রোভার্ট টাইপের। তেমন কথা-টথা বলে না কারো সাথে।

নাফি নিচে নেমে হিয়ার সামনাসামনি সোফায় গিয়ে বসলো। হিয়ার দিকে আঁড়চোখে তাকাতে ভুললো না সে। এটা হিয়া খেয়াল করেছে অনেকবার! নাফির সাথে তার কথা না হলেও, নাফি কেমন করে যেন তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। কিন্তু এইবার আর হিয়া ছাড় দিলো না। নাফি যেই না ওর দিকে তাকিয়েছে, হিয়া ভেংচি কাটলো নাফির দিকে তাকিয়ে। নাফি কেশে উঠলো এতে। যা দেখে বাঁকা হাসলো হিয়া।

“বড়ছেলে? এই বড়ছেলে? তোর হয়েছে?”

নাসিমা ছিলেন রান্নাঘরে। ও বাড়িতে কিছু খাবার দাবার পাঠিয়ে দিবেন, সেসবই গোছাচ্ছিলেন তিনি। তিনি হাতের কাজ শেষ করে নাফিকে ডাকতে ডাকতে এলেন। নাফিকে তিনি বড়ছেলে আর রাজকে ছোটছেলে বলে ডাকেন।

মায়ের ডাকে নাফি ঘুরে তাকালো পেছনের দিকে। হিয়া ও তুবা ও তাকালো। নাসিমার দুইহাতে দুইটা হাঁড়ি। দেখে বোঝাই যাচ্ছে ওগুলো অনেক ভারি। নাফি উঠতেই যাচ্ছিলো কিন্তু তার আগেই হিয়া উঠে দৌড়ে গেল নাসিমার কাছে। নাসিমার হাত থেকে হাঁড়ি দুইটা নিলো। হেঁসে বলল,

“আমাদের ডাকতে পারতেন।”

সকাল থেকেই নাসিমার সাথে ভিষন ভাব হয়েছে হিয়ার। নাসিমা হেঁসে হিয়ার গাল টেনে বলল,

“মিষ্টি মেয়েটা!”

নাফি দেখলো মায়ের মুখের হাঁসিটা। সে ততক্ষণে উঠে গিয়ে, হিয়ার হাত থেকে হাঁড়ি দুইটা নিলো। গম্ভীর স্বরে বলল,

“আর কিছু আছে?”

মায়ের সাথে নাফি একটু রেগে আছে। সে যেতে চাইছিলো না ওই বাড়িতে কিন্তু মায়ের ইমোশনাল ব্লাকমেইলের কারনে তাকে যেতে হচ্ছে। তাছাড়া বিয়ের জন্য প্রেশার তো আছেই। বাবা নেই নাফির, নাসিমা কলেজে পড়িয়ে দুই ভাইকে মানুষ করেছে। আর তাছাড়া মাকে অনেক ভালোও বাসে সে। এজন্য তেমন কিছুই বলতে পারে না নাসিমাকে।

ওদিকে নাসিমাও অভিমান করে আছে ছেলের উপর। শুধুমাত্র মেহমানের সামনে তিনি টু শব্দটি করছেন না। তিনি অন্যদিকে ঘুরে বললেন,

“ওগুলো গাড়িতে রেখে আয়, আরও কিছু আছে।”

নাফি আর কোনও কথা ব্যায় করলো না। সে হাঁড়ি দুইটা নিয়ে চলে গেলো। এভাবে নাসিমা আরও কিছু হাঁড়ি ও মিষ্টির প্যাকেট ধরিয়ে দিলেন ওদের কাছে। অবশেষে ওরা হিয়া ও তুবা নাসিমার থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠলো। নাফি মায়ের দিকে একবার তাকিয়ে ছোট করে বলল,

“আসছি, সাবধানে থেকো।”

এরপর নাফি গিয়ে চুপচাপ ড্রাইভিং সিটে বসলো। কিন্তু সে গাড়ি স্টার্ট করলো না। এতে অবাক হলো হিয়ারা। কিছুক্ষণ পর হিয়া বলল,

“আপনি গাড়ি স্টার্ট দিচ্ছেন না কেন?”

নাফি পিছনে ঘুরে ওদের দিকে তাকালো। বলল,

“যে কেউ সামনে এসো, আমি তোমাদের ড্রাইভার নই।”

হিয়া ও তুবা তাজ্জব বনে গেল। এটা কেমন কথা? এহ! শখ কত! সামনে এসো! হিয়া মনে মনে ভেংচি কাটলো। হিয়া বলল,

“এটা কেমন কথা? গাড়ি স্টার্ট দিন দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

“বললাম তো আমি ড্রাইভার নই।”

তুবা যেতে চাইলো না সামনে। আর হিয়া তো যাবেই না। তুবা অন্যদিকে ঘুরে বসলো। যেন সে কিছু দেখতেও পাচ্ছে না আর শুনতেও পাচ্ছে না। ওদিকে নাফিও নাছোড়বান্দা, সে চুপচাপ স্টিয়ারিংয়ে হাত দিয়ে বসে রইলো। বিরক্ত হয়ে হিয়া নেমে গেল গাড়ি থেকে। তেজ করে সে গিয়ে বসলো নাফির পাশের সিটে। রাগে সুন্দর মুখটা লাল হয়ে গেছে। হিয়া বসার সাথে সাথে নাফি গাড়ি স্টার্ট করলো।

ওদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে নাসিমা তপ্ত শ্বাস ফেললেন। এরপর আনমনেই হেঁসে উঠলেন। তিনি তো ইচ্ছে করেই নাফিকে পাঠিয়েছেন। নাহলে তো তার আরও লোক আছে রাজের সাথে যাওয়ার জন্য। তিনি নাফিকে পাঠিয়েছেন, যাতে হিয়ার সাথে আরও পরিচিত হতে পারে। যদিও কাল সকালেই চলে আসবে নাফি

——

তখন রাত! বড় ড্রয়িংরুমে বসে সকলে গল্প করছে। তাদের কেন্দ্রবিন্দু রুহি ও রাজ। হৈ-হুল্লোড়ে বাড়ি গমগম করছে। নাফি বড়ভাই রাজের। তাই এসব হৈহল্লাতে সে নেই। নাফি ছাঁদে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে আর মোবাইল স্ক্রল করছে।

ওদিকে হিয়ারও ভালো লাগছে না এখানে। সে রাজদের দেখে জ্বলছে না, বিরক্ত লাগছে। সব কাজিনরা বসে আছে তারমধ্যে, রাজ রুহির চুল ঠিক করে দিচ্ছে। তো কখনো বাতাস করছে। আবার মাঝেমাঝে জিজ্ঞেস করছে,

“বসে থাকতে কষ্ট হচ্ছে সোনা? মশা কামড়াচ্ছে সোনা? গরম লাগছে সোনা? বাতাস করবো?”

সবার এসব দেখে ভালো লাগলেও হিয়ার বিরক্ত লাগছে। ওদের ভেতরে কতটুকু ভালোবাসা আছে জানে না হিয়া। তবে সে এটুকু বোঝে রাজ তার সামনে এসব দেখাচ্ছে। আর রুহি তো আরও বেশি। রাজ যখনই তার কাছে এসব জিজ্ঞেস করছে, রুহি ততবারই গদগদ হয়ে বলছে,

“না জানু আমার খারাপ লাগছে না। তুমি একটু শান্ত হয়ে বসো।”

আবার হিয়াদের বলছে,

“তোদের দুলাভাই ও না, এতো পাগল আমার জন্য।”

সবে সংসার করেছে তিনদিন কিন্তু প্রসংশা করছে যেন তিনবছর সংসার ওদের। আবার হিয়াকে পিঞ্চ মেরে বলল,

” হিয়া তুই দেখেছিস না, তোর দুলাভাই এ-ই দুইদিন আমাকে কতটা যত্ন করেছে।”

হিয়ার এসব দেখে আর ভালোই লাগছে না। সে ফোনের অজুহাতে উঠে গেলো ওখান থেকে। এখন ঘরের দিকে যাওয়া যাবে না। গেলে হেলেনা নিশ্চয়ই প্রশ্ন করবে, সে এখন এখানে কেন? ওখানে সবাই আড্ডা দিচ্ছে। তাই হিয়া সোজা ছাঁদে গেলো। নাফি তখন অন্যদিকে ছাঁদের। তাই ও দেখলো না ছাঁদে কেউ আছে।

হিয়ার গিয়ে দাঁড়ালো ছাঁদের রেলিং ধরে। কোথাও না কোথাও তার খারাপই লাগছে। তাদের কত সৃতি রয়েছে। কত রাত জেগে তারা কথা বলতো! কত ক্লাস ফাঁকি দিয়ে তারা দেখা করতো! হিয়া কখনো ঘুনাক্ষরে ও বুঝতে পারেনি, রাজ এমন করবে। অথচ,
কথা ছিলো হিয়ার অনার্স টা শেষ হলেই বিয়ে করবে ওরা। কত স্বপ্ন সে দেখেছিলো একবছরে। এসব ভাবতে ভাবতে হিয়ার আঁখিদ্বয় ভিজে গেল। আচমকাই সে কেঁদে উঠলো হুহু করে। মানুষ এভাবে ঠকায় কেন? আর সবাই মিলে তাকেই ঠকালো কেন? রুহি, রাজ ওর ফ্রেন্ডরা! কেন ঠকালো ওকে। কেন করলো এই বিশ্বাসঘাতকা। হিয়া শব্দ করেই কাঁদছিলো। পরক্ষণেই সে নিজেকে শান্ত করে চোখ মুছে নিলো। জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে সে স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করলো। নিজেকে নিজেই বলল,

“হিয়া তুই ঠিক ছিলি, কোথাও একফোঁটা দোষ নেই তোর। অন্যায় ওরা করেছে তুই কেন কাঁদবি? কাঁদবে তো ওরা। দেখিস রাজ একদিন ঠিকই এর শাস্তি পাবে। তোর ভেঙে পরলে চলবে না। ওদের সাথে শক্ত হয়ে মোকাবিলা করতে হবে তো।”

হিয়া এবারেও দেখলো না, কেউ একজন তার সম্পুর্ন কার্যকলাপ দেখে নিয়েছে।

চলবে?

ভুলত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন 💖

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here