গল্প : #লুকোচুরি_রোদ্দুর_ও_তুমি (১১)
লেখনীতে : #অহনা_রহমান
হিয়া আর নাঈম সবে ক্যাম্পাসে ঢুকেছে। ওরা দেখতে পেল, খানিকটা সামনেই নাফিজ ও মারজিয়া দাঁড়িয়ে আছে। শুধুমাত্র ওরা নয়, রাজ ও তার বন্ধুরাও আছে। গোল হয়ে কিছু একটা আলোচনা করছে মনেহয়। দুর থেকে সেরকমই মনে হচ্ছে। হিয়া ও নাঈম স্কিপ করলো এসব। ওদের দেখে হিয়ার কোনও কাজ নেই। হিয়া ও নাঈম নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে হাঁটতে লাগলো। কথার এক পর্যায়ে নাঈম বলল,
“তো কি ভাবলি? কি করবি ওদের সাথে?”
“কি যে করি সেটাই ভাবছি। ওদেরকে তো আমি দেখে নেবো। তারজন্য আমাকে যা করতে হয় করবো। আর আমার বোন? হিংসা করে না আমাকে? ওকে বোঝাবো হিংসার ফল কি হয়। আমিও দেখবো ও কতটা হিংসা করতে পারে।”
“আচ্ছা! ওটা ছাড়া কি আর কোন উপায় নেই?”
নাঈমের কথা শুনে হিয়া তাকালো ওর দিকে। বলল,
“আপাতত আর কোনও উপায় চোখে পরছে না। আমাকে এটাই করতে হবে। ভাবছি কালকে দেখা করবো ওনার সাথে।”
“কিন্তু হিয়া এটা তোর সারাজীবনের প্রশ্ন। এইভাবে হুট করে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে…..।”
“হুট করে কই? তিনবছর ধরে রাজের সাথে আমার রিলেশন। বিয়ের স্বপ্ন দেখেছি। ওদের বাড়িতে বউ হয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছি। সংসার করার স্বপ্ন দেখেছি। সবই ঠিক আছে, এখন শুধুমাত্র বর হিসেবে রাজ নয় নাফি থাকবে।”
“তবুও হিয়া আরেকবার ভেবে দেখতি।”
হিয়া নাঈমের পিঠে হালকা করে একটা চাপড় মারলো। বলল,
“ব্যাটা তুই আরও আমাকে সাহস দিবি। তা না করে তুই ভয় দেখাচ্ছিস আমাকে?”
নাঈম কিছুক্ষন চুপ থাকলো। ওরা ততক্ষণে ক্লাসরুমের সামনে পৌঁছে গেছে। ক্লাসে ঢোকার আগ মুহুর্তে নাঈম বলল,
“হিয়া, আমি সব মানছি। কিন্তু বিয়েটা তো ছেলেখেলা নয়। তুই প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে এমন বিয়ের মতো এমন একটা কাজ করবি?”
হিয়া নাঈমের দিকে তাকিয়ে, শক্ত কন্ঠে বলল,
“হ্যাঁ করবো। করতে আমাকে হবেই। তুই দেখিসনি ওরা আমাকে কিভাবে ঠকিয়েছে? তুই দেখিসনি আমার বিশ্বাস কিভাবে ভেঙেছে? তুই দেখিসনি আমার আপন বোনের মতো কাজিন আমার সাথে কেমন ছলচাতুরী করছে? তুই দেখিসনি আমার বেস্ট ফ্রেন্ডরা আমার সাথে কিভাবে প্রতারণা করেছে? এখন বল, আমি ওদের শুধুশুধু ছেড়ে দেবো? বসে বসে দেখবো, ওরা কিভাবে সুখে সংসার করছে? আর কি উপায় আছে ওদেরকে জ্বালানোর বল আমাকে?”
নাঈম হিয়ার কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে হাতজোর করে বলল,
“ক্ষমা দে মা, ক্লাসে চল।”
নাঈম জানে হিয়ার বলা প্রতিটি কথা সত্য। ওরা ইচ্ছেকৃত ভাবে হিয়াকে কষ্ট দিয়েছে। যেটা কোনক্রমেই ক্ষমা করা যায় না। তাই বলে যে, বিয়ের মতো একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে এমনও নয়। নাফি যদি হিয়ার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে? হিয়াকে যদি ভালো না বাসে? তখন তো হিয়ার আম ও যাবে সালা ও যাবে। শুধু পরে থাকবে আঁটি। যা দিয়ে কোনও কাজই হবে না হিয়ার। উল্টো রাজ তখন ছোট করবে হিয়াকে। আর ওর কালনাগিনী বোন রুহি তো আছেই। নাঈম মূলত এইসব ভাবনা থেকেই হিয়াকে বারন করেছিলো৷ কিন্তু হিয়া কথা শুনলে তো! সে চায় ওদের সামনে থেকে ওদেরকে শিক্ষা দিতে।
নাঈম হিয়ার পিছুপিছু ক্লাসে ঢুকলো। ওরা নিজেদের সিটে বসতেই দেখতে পেল, ক্লাসের সবাই হিয়ার দিকে কেমন অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছে। ব্যাপারটা প্রথমে হিয়া এভয়েড করলেও পরে দেখলো সবাই হাসাহাসি করছে। নাঈমের চোখেও এড়ালো না বিষয়টা। নাঈম কিছু বলতে উদ্যত হয়েছে, এমন সময় দরজা দিয়ে ঢুকলো নাফিজ ও মারজিয়া। হিয়া ও নাঈম একবার আসতে দেখে, ফিরেও তাকালো না ওদের দিকে।
ওদিকে ওরা ক্লাসে ঢুকে বোর্ডের সামনে দাঁড়ালো। টিচার্স যেখানে দাঁড়িয়ে লেকচার দেয় আরকি! নাফিজ জোরে বলে উঠলো,
“সো গাইস! এখানে যে একজন হার্টব্রোকেন মানুষ আছে____ আপনারা সেটা খেয়াল করেছেন?? এমা আপনারা তার দুঃখে এখনো কাঁদেননি? আর স্যাড সং কই?”
হাফিজের কথার প্রতিত্তোরে মারজিয়া বলে উঠলো,
“গান শুনবি তোরা? আগে বলবি তো। আমি একটা হৃদয় ভাঙার_যে গান শুনে কেঁদেছে লক্ষ কোটি মানুষ। এরকম একটা কষ্টের গান শোনাচ্ছি শোন।”
এরপর মারজিয়া নিজের হাত মুঠো করে, মুখের সামনে ধরে গলা ছেড়ে গাইতে লাগলো,
“হাইরেএএএহ কলিজাতে দাঁগ লাগাইয়া বন্ধু…….!”
মারজিয়ার কন্ঠ আগে থেকেই তেমন ভালো না। তারউপর গলা ছেড়ে এমন গান গাওয়া। নেহাৎই ফালতু ছাড়া আর কিছুই নয়। ক্লাসের সবাই-ই এইবারে হিয়াকে প্রশ্ন করতে লাগলো।
“কিরে হিয়া শুনলাম তোর বয়ফ্রেন্ড নাকি, তোকে ধোঁকা দিয়ে তোর চাচাতো বোনকে বিয়ে করেছে?”
সবার এমন প্রশ্নে হিয়া বিব্রতবোধ করলো। সবাই জানে হিয়ার এখানে দোষ নেই্ তবুও একবেলা ট্রিট এর আশায় মেয়েটাকে হেনস্তা করতে চাইছে। তাছাড়া সবাই-ই জানে ভার্সিটিতে রাজের পাওয়ার কতখানি। অনেক রাজনৈতিক নেতার সাথে ওর ভালো সম্পর্ক। রাজ ঠিক ওর নামের মতোই রাজত্ব করে ভার্সিটিতে। ওর কথা শুনবে এমন কে আছে এখানে?
নাঈম কিছু বলতে গিয়েও বলল না। ও শান্তিপ্রিয় মানুষ। কোনও ঝামেলা চায় না। তাই নাঈম সরাসরি হিয়ার হাত ধরে ক্লাসরুম থেকে বাইরে বেড়িয়ে গেল। যাওয়ার আগে সকলের উদ্দেশ্যে বলে গেল,
“হ্যাঁ ওর বয়ফ্রেন্ড ওকে ঠকিয়েছে। ও তো আর কিছু করেনি। তোরা ওকে এসব বলছিস কেন?”
হিয়া এতক্ষণ চুপচাপ থাকলেও, যখন চলেই যেতে হচ্ছে দুইটা কথা শুনিয়ে তবেই গেল। ও বলল,
“আরে জানিস না? লোভি গুলো খাওয়ার জন্য এমন করছে। জীবনে খেয়েছে নাকি কিছু? তোদের আমি বদদোয়া দিলাম, দুপুরে খাবি আর রাতে হাগতে হাগতে মরবি।”
ওরা দুজন বেরিয়ে গেল। হিয়া নিজের রাগ কিছুতেই সংবরণ করতে পারছে না। ওদের ব্যবস্থা না করলে হচ্ছে না। সমস্যা গোড়া থেকেই নির্মুল করতে হবে। কেননা নাফিজ অথবা মারজিয়া কারোরই অত ক্ষমতা নেই হিয়ার সাথে এমন ব্যবহার করবে। এটা নিশ্চিত যে রাজের জন্যই ওরা এতটা সাহস পেয়েছে বা পাচ্ছে। তাই আগে রাজকে শায়েস্তা করতে হবে। আর রাজকে জব্দ একমাত্র ওর ভাই-ই করতে পারবে।
হিয়া রেগেমেগে ভার্সিটি ছাড়লো। নাঈমকে বিদায় দিয়ে, ফিরে গেল নিজের বাড়িতে। বাসায় গিয়ে কারো সাথে কোনও কথা বললো না। নিজের রুমে গিয়ে ধপাস করে দরজা আটকালো। হেলেনা এতবার করে ডাকলেন কিন্তু জেদি মেয়েটি কিছুতেই খুললো না দরজা।
—–
“কিছু বলবে? এভাবে ডাকার কারন কি?”
পরদিন বিকেলের কথা। হিয়া আর নাফি মুখোমুখি বসে আছে একটা ক্যাফেতে। হিয়া-ই মুলত নাফিকে ডেকেছে। ডেকেছে তো কতকিছু বলার জন্য। কিন্তু ওই মানুষটার সামনে এসেই তো হিয়ার সব গুলিয়ে যাচ্ছে। কিভাবে বলবে সেটাই তো ভাবার বিষয়। হিয়া মাথা নিচু করে ভাবছিলো এসব। হঠাৎ নাফির ডাকে সম্বিত ফিরল মেয়েটার। ও বোকা হাসলো নাফির দিকে তাকিয়ে। নাফি ওর হাসি দেখে মনে মনে খুব হাসলেও বাহিরে তা প্রকাশ করলো না। নিজের ভাবমূর্তি গম্ভীর রেখে আবারও বলল,
“এই যে কিছু বলবে তুমি?”
হিয়া এদিক ওদিক তাকালো। সারাজীবন শুনে এসেছে, ছেলেরা মেয়েদের প্রপোজ করে। আর এখন ও কি’না একটা ছেলেকে ভালোবাসার কথা বলবে? ছিহ হিয়া ছিহ! এই দিন দেখার ছিলো? হিয়ার ঘর্মাক্ত মুখটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে বেচারি কতটা নার্ভাস। হিয়া ঘেমে ঘেমে একাকার। লাল রংয়ের জরজেটের ওরনা দিয়ে মুখের ঘাম মুছে নিলো। নাফি বুকে হাত বেঁধে দেখে গেল সবটা। ও আপাতত হিয়ার মতিগতি বোঝার চেষ্টা করছে।
হিয়া ঘাম-টাম মুছে সামনের টেবিল থেকে একগ্লাস পানি খেয়ে নিলো। এইবার একটু ভালো লাগছে। হিয়া নাফির দিকে তাকালো। নিজের মনে সাহস সঞ্চার করলো মেয়েটা। এরপর দুরুদুরু বুকে বলল,
“একটা কথা বলার জন্য আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছি।”
নাফি ভুরু কুঁচকে বলল,
“কি কথা?”
এইবার হিয়ার শুধু বুক না সমস্ত শরীর কাঁপছে থরথর করে। কিভাবে বলবে ও? নাফি বুঝলো হিয়ার ব্যাপারটা। তাই ও একটু হেঁসে বলল,
“সমস্যা নেই বলো তুমি। এতটা নার্ভাস হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। যা বলার বলতে পারো।”
নাফির হাসিতে হিয়া একটু হলেও শান্তি পেয়েছে। সে নিজেকে ধাতস্থ করে_চোখমুখ খিঁচে বলল,
“আপনাকে প্রথম যেদিন দেখেছি, সেদিনই ভালোবেসেছি৷ তারপর থেকে আপনাকে কিছুতেই ভুলতে পারছি না। খেতে, শুতে, উঠতে, বসতে, সবজায়গায় শুধু আপনাকে দেখছি। আর আপনার কথায় ভাবছি। আমি আপনাকে ভিষন ভালোবেসে ফেলেছি। আপনি আমাকে বিয়ে করবেন নাফি?”
একদমে এতোগুলো কথা বলে হিয়া আর চোখ তুলে তাকাতেই পারলো না নাফির দিকে। এমনকি ওখানে বসতেই পারলো না। কথাটা বলা শেষ হলেই সে উঠে দাঁড়ালো। নাফিকে আর কিছু বলতে না দিয়েই সে দৌড়ে পালালো। শেষে শুধু বলে গেল,
“আপনার উত্তর আমাকে মেসেজে জানায়েন। আপনি যদি আমার ভালোবাসা মেনে না নেন তবুও সমস্যা নেই। আমি আপনার পিছনে ঘুরতেই থাকবো।”
হিয়া চলে যেতেই নাফি হেঁসে উঠলো শব্দ করে। আর হাসতেই থাকলো। ও ভেবেছিলো হিয়া হয়তো, রাজের ব্যাপারে কিছু বলবে। কিন্তু ডিরেক্ট ওকেই প্রপোজ? এটা অপ্রত্যাশিত ছিলো। কিছুক পর নাফি হাসি থামিয়ে, হিয়ার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এটার কোন প্রয়োজন ছিলো না রোদ্দুরি। যা করার আমিই করতাম। আমার ভাইকে শায়েস্তা করার দায়িত্ব না-হয় আমিই নিতাম।”
চলবে?
আপনাদের অপেক্ষায় রাখতে ইচ্ছে করছিলো না তাই অসুস্থ অবস্থায় লিখেছি। ভুলত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন আশা করছি। আর সবাই রেসপন্স করবেন। খাপছাড়া হলেও জানাবেন। সবশেষে সবাইকে অগ্রিম শুভেচ্ছা নতুন বছরের। ভালো থাকবেন আপনারা। আমার জন্য দোয়া করবেন।💖

