#লুকোচুরি_রোদ্দুর_ও_তুমি (১০) লেখনীতে : #অহনা_রহমান

0
153

গল্প : #লুকোচুরি_রোদ্দুর_ও_তুমি (১০)
লেখনীতে : #অহনা_রহমান

কেটেছে কয়েকদিন। আজ প্রায় দুই সপ্তাহ পর হিয়া ভার্সিটিতে যাবে। সকাল থেকেই তোড়জোড় শুরু করেছে সে। আর হেলেনাকে জ্বালিয়ে মারছে। একবার এটা খুঁজে পাচ্ছে না তো আরেকবার ওটা খুঁজে পাচ্ছে না। আর বারবার হেলেনাকে ডাকছে। হিয়া চুল বাঁধবে কিন্তু তাড়াহুড়োর ঠেলায় চিরুনি টা পর্যন্ত খুঁজে পাচ্ছে না। ও গলা ছেড়ে আবারও ডাকলো হেলেনাকে।

“আম্মুউউউ…. চিরুনি খুঁজে পাই না। শিগগির এসো।”

হেলেনা রান্নাঘরে কাজ করছিলেন। হিয়ার ডাকে তিনি বেজায় বিরক্ত হলেন। তবুও ছুটে গেলেন ওর কাছে। হিয়া তখন চুল এলোমেলো করে বিছানায় বসে আছে। হেলেনা গিয়ে হিয়ার মাথায় একটা গাট্টা মারলেন প্রথমে। এরপর তিনি চিরুনীটা খুঁজতে লাগলেন। মিনিটের মধ্যে পেয়েও গেলেন সেটা। হেলেনা চোখ বড়বড় করে তাকালেন হিয়ার দিকে। হিয়া বেচারি মায়ের দিকে তাকিয়ে বোকা হাসলো। আসলেই চিরুনি টা সামনেই ছিলো। একটু দেখলেই পেয়ে যেতো।

হেলেনা মেয়ের হাসি দেখে আর কিছুই বললেন না। উল্টো তিনি সমস্ত কাজ ফেলে রেখে, হিয়ার চুল বাঁধতে বসলেন। নিজের সমস্ত ভালোবাসা ঢেলে দিয়ে তিনি হিয়ার লম্বা চুল গুলো বিনুনি গেঁথে দিলেন। আদুরে গলায় বললেন,

“আম্মু, এখন একটু নিজের যত্ন নেওয়া শিখতে হবে তো। নিজের জিনিস গুছিয়ে রাখতে হবে। নাহলে দুইদিন পর পরের বাড়িতে যাবে, তখনও কি আমি গিয়ে এসব গুছিয়ে দেবো?”

হিয়া ঘুরে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলো। আহ্লাদী হয়ে বলল,

“কে যাচ্ছে পরের বাড়ি? হুহ! আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না।”

হেলেনা হিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

“এটা হয় নাকি কখনো? আজ হোক বা কিছুদিন পর তোমার তো বিয়ে করতেই হবে মা। পরের ঘরে যেতে হবে। মেয়ে হয়ে জন্মেছো যে!”

হিয়ার ভিষন মন খারাপ লাগলো। আসলেই মেয়েদের জীবনটা কত অদ্ভুত! প্রিয় ঘর, সবচেয়ে আপন বাবা- মা, নিজের পছন্দের সবকিছুকে পেছনে ফেলে মেয়েদের যেতে হয় পরের বাড়ি। সেখানে অধিকাংশ মেয়েই নিজের মতো আর বাঁচতে পারেনা। পরের ঘরে মেয়েরা হয়ে যায় পুতুল। হেলেনা এসব ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাকালেন হিয়ার অন্ধকার মুখের দিকে। আবারও বললেন,

“আমার খুব চিন্তা হয় রে। আমার একমাত্র মেয়ে তুই। তোকে তো আমি যেখানে-সেখানে বিয়ে দিতে পারি না। আর আজকালকার যে অবস্থা মানুষের! আল্লাহ যেন আমার মেয়েটার জন্য একটা রাজপুত্র পাঠায়। আমি যেমন পুতুলের মতো বড় করেছি, সেও যেন তোকে দামী পুতুলের মতো যত্নে রাখে।”

হিয়া হালকা বিরক্তি নিয়ে বলল,

“মা এসব কেন বলছো? এসব বাদ দাও। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে, গেলাম।”

হিয়া আর একমুহূর্তও দাঁড়ালো না। ও জানে এরপরের ঘটনা। ও যদি এখন দাঁড়ায়, হেলেনা আবারও শুরু করবেন। এইবার শুধু কথা বলেই ক্ষ্যান্ত হবেন না। সাথে কান্নাকাটি করে, একদম একাকার করে ফেলবেন।

—-

সকাল এগারোটা বাজে। নাফি নিজের রুমে বসে ফোনে ফেসবুক স্ক্রল করছে। হঠাৎই ‘আর্শিয়া জাহান হিয়া’ নামে একটা আইডি সামনে এলো। নাফি চিনলো আইডির মালিক কে। কি মনে করে যেন নাফি, হিয়ার আইডির ভেতরে ঢুকলো। হিয়ার প্রোফাইল পিকচার টা সে খুব মন দিয়ে দেখতে লাগলো। সম্ভবত রাজের বউভাতের দিন তোলা এই ছবিটা। নাফি ভিষন ধৈর্য সহকারে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো সেই ছবিটা। লাইট ইয়োলো কালারের শাড়ি পরিহিত হিয়া। সূর্যের তাপ থেকে বাঁচতে, একহাত ললাটের উপরে দেওয়া। আর সেই মুহুর্তেই ছবিটা তোলা হয়েছে। ঠোঁটে মুচকি হাসি। নাফি জুম করে হাঁসিটা দেখতে লাগলো। কি মিষ্টি! কি মিষ্টি! হিয়ার ছবির দিকে তাকিয়ে নাফি অস্ফুটস্বরে বলল,

“রোদ্দুরী!”

পরক্ষণেই সে অবাক হলো। সে মানে নাফি! সে কি’না একটা মেয়ের প্রোফাইলে ঢুকে এসব করছে? ছিঃ নাফি ছিঃ! নাফি দ্রুত ফোনটা রেখে দিলো। ও বাড়ি থেকে আসার পর আর দেখা হয়নি হিয়ার সাথে। যদিও মেয়েটাকে মন থেকে সরাতে পারেনি সে। ওসব যাকগে! নাফি তাড়াহুড়ো করে রুম থেকে বের হলো। গন্তব্য মায়ের রুম।

এইকয়দিন নাসিমার সাথে তার তেমন কথাই হয়নি। শুধু খাওয়ার সময় দেখা হয়েছে। আর টুকটাক কথা হয়েছে। নাসিমা এখনোও জেদ ধরে বসে আছেন। সে নাফিকে বিয়ে দিয়েই ছাড়বেন এবার। তার তো মানসম্মান বলে কিছু আছে নাকি? ছোটছেলে বিয়ে করেছে অথচ বড় ছেলের বিয়ে করার নামগন্ধ নেই। সবাই তো প্রশ্ন করছে।

দরজা খোলা ছিলো। তাও নাফি নক করলো প্রথমে। রুমের ভেতর থেকে নাসিমা বললেন,

“কে? ভেতরে এসো।”

নাফি ধীরেধীরে ভেতরে ঢুকলো। মেয়ে মানুষের মতো কেন জানি তার লজ্জা লাগছে। আসলে অনেক দিন ধরেই তো নাসিমার সঙ্গে কথা হয় না। এখন নিজে থেকে কথা বলতে আসছে। ব্যাপারটা লজ্জাজনক! নাফি গিয়ে নাসিমার পাশে বসলো। নাসিমা এতে অবাক হলেন বৈকি! তবে সে অভিমানে নাফির দিকে তাকালেনও না।

ওদিকে নাফি কেশে উঠলো। সে চেষ্টা করলো মায়ের মনোযোগ নেওয়ার। কিন্তু সে ব্যর্থ হলো। নাসিমা নিজের মতো করে বই পড়ছেন। নাফি এদিক ওদিক তাকিয়ে হেঁসে বলল,

“কি আম্মু বই পড়ছো?”

নাসিমা বইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“না বই পড়ছি না ঘুমাচ্ছি। চোখদুটোও গেছে মনেহয়।”

নাফি জোরে জোরে শ্বাস নিলো। না জানি আরও কত কি শুনতে হয়। নাফি বলল,

“ইয়ে আম্মু শোনো না একটু কথা আছে।”

“যতদিন না বড়বউ আসছে ততদিন আমি কানে শুনবো না।”

নাফি ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল মায়ের কথা শুনে। এটা কোন ছেলেমানুষী? নাফি কিছুক্ষণ মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকলো। মনে মনে বলল,

“তবে তোমার ইচ্ছে পূরণ হোক রোদ্দুরী।”

নাসিমাকে হতবাক করে দিয়ে নাফি প্রথমবারের মতো স্বীকারোক্তি দিলো,

“আচ্ছা আম্মু আমি বিয়ে করবো। এইবার তো কথা শোনো।”

নাসিমা অবাক হয়ে চেয়ে থাকলেন নাফির দিকে। নিজের কানকে তিনি বিশ্বাস করতে পারলেন না। ঠিক কতদিন? কতদিন ধরে বলছেন বিয়ের কথা? আজ অবশেষে মত দিলো। নাসিমা ভেতরের উত্তেজনা চেপে রাখলেন আপাতত। গম্ভীর স্বরে বললেন,

“যদি এই কথা হয়, তাহলে আমি কানে শুনছি। যা বলার বলতে পারো।”

নাফি বলল,

“আম্মু রাজের নতুন বিয়ে হয়েছে। ওরা কোথাও থেকে ঘুরে আসুক? আমার অফিস থেকে এই শীতকালে ফ্যামিলি ট্রিপের জন্য একটা অফার দিয়েছে। আমি চাইছিলাম ওরা গিয়ে ঘুরে আসতো।”

“সেকি? তুই না বললি বিয়ে করবি? তাহলে ওরা গেলে কিভাবে হবে?”

নাফি কিছু একটা ভেবে বাঁকা হাসলো। বলল,

“তোমাকে একটা কথা বলছি আম্মু।”

“বল।”

“বিয়ে আমি করতে পারি এক শর্তে।”

নাসিমা ভ্রু কুঁচকে বলল,

“কি শর্ত?”

নাফি বলল,

“ওরা দুজন ট্রিপে গেলেই আমি বিয়ে করবো। নাহলে না। আর তুমিও আমার বিয়ের কথা কাউকে বলতে পারবে না। আপাতত এই বিষয়টা আমি সিক্রেট রাখবো।”

নাসিমা বুঝলেন না নাফি কেন এমন শর্ত দিলো। তিনি বেশ অবাক হলেন। নাফি এরকম চাচ্ছে কেন? নাফি হয়তো বুঝলো তার মা হয়তো অন্যকিছু ভাবছে। তাই সে বলল,

“আরে আম্মু মনে করো রাজ ও রুহিকে একটু সারপ্রাইজ দেবো। রাজ ও বহুবার মেয়ে ঠিক করেছে আমার জন্য। ওরা যখন দেখবে আমি বিয়ে করেছি ওরা চমকে যাবে। আর তাছাড়াও ওরা আসলেই তো বিয়েটা বড় করে হবে।”

নাসিমার মনে খচখচানি গেল না। তিনি বললেন,

“তোর কোনও পছন্দ আছে বড়ছেলে?”

নাফি কিছুক্ষণ ভাবলো। বলল,

“পছন্দ কি’না এখনো শিওর না।”

“কে সে?”

“সময় হলেই বলবো। আপাতত তুমি ওদেরকে পাঠানোর ব্যবস্থা করো। রাজকে বলো এটা আমার তরফ থেকে সামান্য উপহার।”

নাফি আবার মনে মনে বলল,

“এটা তো সামান্যই! আমার বিয়েটা হবে ওদের জীবনের সেরা উপহার।”

নাসিমা কিছু বলার আগেই কিছু একটা ভাঙার শব্দ হলো। নাফি ও নাসিমা দুজনেই ছুটে গেলেন হন্তদন্ত হয়ে।

রুহি রাজদের বাড়িতে এসেছে সপ্তাহে খানেক হয়েছে। নাসিমা মানুষ হিসেবে ভিষন ভালো। রুহিকে তিনি নিজের মেয়ের মতোই আপন করে নিয়েছেন। কখনো কোন কিছুই বলেন না। যদিও বিয়েটা হয়েছেই পনেরো দিন। তবুও তো মানুষ দেখলেই বোঝা যায়।

নাফি ও নাসিমা শব্দের উৎস খুঁজে এলেন রান্নাঘরে। ওখানে গিয়ে ওরা যা দেখলো তাতে দুজনই হতবাক হয়ে গেল। ওদের বাড়ির ত্রিশ বছর বয়সী কাজের বুয়া রাবেয়া অশ্রু টলমল চোখে রয়েছেন। আর রুহি রাগে গজগজ করছে। নাসিমা এগিয়ে গেলেন রাবেয়ার দিকে। ব্যস্ত কন্ঠে বললেন,

“কি হয়েছে এখানে? রাবেয়া কাদছো কেন?”

রাবেয়া মাথা নিচু করে রইলো। রুহি দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“আম্মু ইনি এতো বেয়াদব কেন? আমি এসে বললাম, আমাকে এককাপ কফি বানিয়ে দে। ওমা! ও আমাকে জ্ঞান দিচ্ছে। ওর কত বড় সাহস ও আমাকে বলছে, ছোটআপা আমি তো আপনের বয়সে বড়। একটু ভালোভাবে কইলে কি হয়? এখন বলুন তো আম্মু, আমি কি করবো না করবো ওকে বলে করতে হবে?”

নাসিমা নাফির দিকে তাকালেন। ঘাবরে গেলেন তিনি। ছেলের চেহারা দেখেই বুঝতে পারলেন সে রেগে গেছে। রাবেয়ার সাথে বাড়ির কেউই তুই-তোকারি করে কথা বলেনা। সেখানে রুহি দুইদিন এসে তিন দিনের দিন খারাপ ব্যবহার করছে? বাড়ির ভু যেহেতু নাসিমা কিছুই বলতে পারলেন না। তিনি রুহিকে বললেন,

“আচ্ছা ঠিক আছে তুমি রুমে যাও। কফির ব্যবস্থা আমি করছি।”

রুহি বেলাজের মতো ঢুলতে ঢুলতে ঘরে চলে গেল। ও চলে যেতেই নাসিমা রাবেয়ার গালে হাত বুলিয়ে দিলেন। নরম স্বরে বললেন,

“মন খারাপ করো না। ও নতুন তো বুঝতে পারেনি। আচ্ছা, এই গ্লাস ভাঙলো কিভাবে?”

নাফি মায়ের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। এতো ভালো একজন মানুষের গর্ভে কি’না রাজের মতো একটা নর্দমার কীট জন্ম নিলো? রাজ ও রুহির কাহিনি জানলে না জানি মানুষটা কত কষ্ট পাবেন। নাফি আর দাঁড়ালো না সেখানে। সে প্রস্থান করলো দ্রুত।

চলবে??

~শব্দসংখ্যা: ১৩০০+~

ভুলত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here