লুকোচুরি_রোদ্দুর_ও_তুমি (৯) লেখনীতে : #অহনা_রহমান

0
149

গল্প : #লুকোচুরি_রোদ্দুর_ও_তুমি (৯)
লেখনীতে : #অহনা_রহমান

‘লালা লা লালা লালা লা লালা’

হিয়া একগাদা শপিংব্যাগ নিয়ে নাচতে নাচতে নিজের রুমে ঢুকছিলো। কিন্তু কারো কান্নার আওয়ার শুনে ওর পা জোড়া থেমে গেল। হিয়ার রুমের আগেই রুহির রুম। হিয়া রুহির রুম পেরোনোর সময় শুনতে পেল রুহি কাঁদছে। হিয়া রুহির রুমের সামনে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো রুহির কান্না। মনে মনে একটা পৈশাচিক আনন্দ পেলো সে।

হিয়া জানে রুহি কেন কাঁদছে। কারন রুহির জমানো টাকা আর কেউ নয় বরং হিয়া নিজেই নিয়েছে। নাঈমের সাহায্যে সেই তো কলকাঠিটা নেড়েছে।

রুহিকে এভাবে কাঁদতে দেখে হিয়ার ভিষন হাসি পেল। কিন্তু তা প্রকাশ করলো না হিয়া। শপিং ব্যাগ গুলো হাতে নিয়েই রুহির রুমে ঢুকলো সে। চোখেমুখে গাম্ভীর্যতা এনে রুহির পাশে দাঁড়ালো। খুবই উৎকন্ঠা নিয়ে বলল,

“একি তুমি কাঁদছো কেন আপা? তোমার সোয়ামি কোথায়?”

হিয়াকে দেখে রুহির মেজাজ খারাপ হলো। ও চিৎকার করে বলল,

“হিয়া আমার মনমেজাজ ভালো না। তুই এখান থেকে যা।”

হিয়া নাটকীয় কন্ঠে বলল,

“ইয়া আল্লাহ! রুহি আপু কাঁদছে অথচ তার প্রানের স্বামী এখানে নেই? হায় হায়! এটা কি দিন আসলো? হায় হায়!”

রুহি আগের তুলনায় দ্বিগুণ জোরে চেঁচালো।

“হিয়া তুই এখানে আর একমিনিট থাকলে কিন্তু মার খাবি। ভালোভাবে বলছি এখন এখান থেকে চলে যা। মনমেজাজ ভয়ংকর খারাপ কিন্তু।”

“সেকি কেন? দেখো তোমার জন্য রসগোল্লা নিয়ে এসেছি।”

হিয়ার কথা শুনে রুহি চোখের পানি মুছে নিলো। হিয়ার হাতের ব্যাগ গুলো এইবার সে খেয়াল করলো। রুহি ভ্রু কুঁচকে তাকালো হিয়ার দিকে। বলল,

“ব্যাগে কি তোর?”

“ব্যাগে? আর বলো না আজকে নাঈমের সাথে একটু বের হয়েছিলাম। একটা শপিংমলে গিয়ে দেখি ওখানে একটা কনটেস্ট চলছে। উপহার হিসেবে আছে বিশ হাজার টাকার শপিংয়ের সুযোগ।”

“কি কনটেস্ট?”

হিয়া প্রসঙ্গ বদলাতে চাইলো। কনটেস্ট না ছাঁই! ‘তোর টাকা দিয়ে এগুলো কিনেছি’ মনে মনে হিয়া বলল এসব। আর মুখে বলল,

“আরে ওসব বাদ দাও। তোমার জন্য মিষ্টি এনেছি। তোমার বিয়েতে আমার পোষা কুকুরটা ছাড়া তো আর কোনও গিফটই দিতে পারিনি। তাই ভাবলাম, তুমি আমার আপদ নিজের ঘাড়ে নিয়েছো সেই খুশিতে একটু মিষ্টি খাওয়া যাক৷”

রুহির বিয়েতে হিয়া তো কোন গিফটই দেইনি। তাহলে ও কুকুর পেল কোথায়? রুহি ভাবতে লাগলো হিয়ার কথা। তখন হিয়া মিষ্টির প্যাকেট থেকে একটা মিষ্টি বের করে রুহির সামনে ধরলো। আহ্লাদী হয়ে বলল,

“নাও নাও মিষ্টি খাও। আমার ফেলে দেওয়া খাবারের চেয়ে এটার টেস্ট ভালো।”

একেতো রুহি টাকার শোকে কাতর হয়ে গেছে। তারউপর হিয়ার এসব খোঁচা মারা কথা একটুও ভালো লাগছে না তার। আর এখন তো সে ঝগড়ার মুডেও নেই। হিয়া যখন দেখলো রুহি আর কিছু বলছে না। তাই হিয়া রুহির দিকে নেওয়া মিষ্টি টা নিজেই খেয়ে ফেললো। খেতে খেতে বলল,

“থাক তোমার খেতে হবে না।”

এ-ই বলে হিয়া ব্যাগ-ট্যাগ নিয়ে রুহির রুম থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে ছোট করে বলে গেল,

“কুকুরের পেটে কখনো ঘি সয় না। কেন ভুলে যাস হিয়া? তাছাড়া রুচির যে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে, তাতে পঁচা-বাসি খাবার ছাড়া মানুষের রোচে না মুখে। ইয়াক থু!”

হিয়া চলে যাওয়ার পর রুহি রাগে চিৎকার করতে লাগলো। কেননা ততক্ষনে রুহি বুঝতে পেরেছে, হিয়া কুকুর বলতে রাজকে বুঝিয়েছে। রুহি রাগের মাথায় টেবিলের উপরে থাকা একগাদা বই সব ছুঁড়ে ফেলে দিলো নিচে। মাথার চুলগুলো খামচে ধরলো সে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো, মনটা একটু ভালো হলে হিয়াকে না কাঁদিয়ে ছাড়বে না সে। অনেক পুরোনো হিসেব বাকি আছে। সবকিছু রুহি কড়ায়গণ্ডায় বুঝে নেবে। ছাড়বে না হিয়াকে। হিয়ার বয়ফ্রেন্ডকে কেড়ে নিয়ে একটুও লাভ হয়নি রুহির। হিয়া তো বিন্দাসই আছে। এখন আবার অন্য প্লান বানাতে হবে। হিয়াকে সবার সামনে ছোট করতে হবে। তাহলেই যদি একটু শান্তি মেলে তার।

হিয়া নিজের রুমে ঢুকে মিনি স্পিকারে গান ছাড়লো। যাতে সে রুহির চেঁচামেচি শুনতে না পারে। ও জানে রুহি এখন চেঁচাবে। হিয়া গানের তালে তালে নাচতে লাগলো। যা শুনে পাশের ঘর থেকে রুহি আরও বেশি ক্ষেপে গেল।

আজ সে ভিষন খুশি। কাল রাতেই তো হিয়াকে কাঁদতে দেখে রুহি হেসেছিলো। আজ নাহয় সে একটু হাসুক। যদিও রুহির এসব দুঃখ তো কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু হিয়াকে দেওয়া আঘাত? সেগুলো তো হিয়ার অন্তরে গেঁথে আছে। রুহিকে সে নিজের আত্মার শান্তির জন্য কাঁদালো। যদিও এটা ক্ষনস্থায়ী!

সন্ধার দিকে রাজ এলো। রুহি তখনও মন খারাপ করে নিজের রুমে বসে আছে। বলা যায় বেচারি আজকে সারাদিন বেরই হয়নি রুম থেকে। রুহির মা ও চাচিরা কতবার ডাকলো! কারোর কথা-ই শুনলো না সে। রাজ এসে দেখলো রুহির মন খারাপ। সে রুহির পাশে বসলো। রুহিকে বলল,

“কি হয়েছে? মন খারাপ কেন?”

রাজের কথা শুনে রুহি বেচারি কেঁদে ফেললো। এরপর সব ঘটনা খুলে বলল রাজকে। এতে রাজের চোখেমুখে বিন্দুমাত্র সহানুভূতি দেখা গেল না। বরং ও আরও রেগে গেল। রেগেমেগে বলল,

“তুমি কি বোকা রুহি? তুমি জানো না পিন কাউকে দিতে হয়না? কি আশ্চর্য!”

রুহি ভিষন কষ্ট পেল রাজের কথাতে। সে কেঁদে কেঁদে বলল,

“আমি কি ইচ্ছে করে করেছি?”

“না তুমি আমাকে বলো, লেখাপড়া এই শিখেছো তুমি? তুমি জানো না, পিনকোড কাউকে দিতে হয়না? বোকা নাকি তুমি?”

ওদের এসব কথার মাঝেই এলো তুবা ও হিয়া। রাজের কথা কেড়ে নিয়ে হিয়া বলল,

“সবচেয়ে বোকা কে জানেন দুলাভাই? যে নিজেকে বেশি চালাক মনে করে। আমাদের রুহি আপু সবসময়ই নিজেকে সর্বজান্তা মাসুদা মনে করেন। তাই আজ আর এই পরিনতি।”

হিয়ার কথা শুনে রাজ ও রুহি দুজনেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো। কিন্তু তুবার সামনে কিছুই বলতে পারলো না। হিয়া তুবাকে ইচ্ছে করেই ওর সাথে এনেছে। যাতে ওরা হিয়াকে কোনও কষ্টদায়ক কথা না বলতে পারে। রুহি কিছু বলতে নিচ্ছিলো তার আগে হিয়া বলল,

“কিন্তু দুলাভাই আপনি? সামান্য ত্রিশ হাজার টাকার জন্য আমার বোনকে এভাবে বকছেন? ছিঃ এই ভালোবাসেন আমার বোনটাকে? কোথায় ওকে নিয়ে হানিমুনে যাবেন তা না এমন করছেন? এটা আপনার ভালোবাসার নমুনা?”

হিয়া অনেক বেশি বাড়াবাড়ি করছে। ওকে এইবার কিছু না বললেই নয়। রুহি তুবাকে বলল,

“তোর দুলাভাই সারাদিন পর এসেছে। ওর জন্য একটু শরবত বানিয়ে নিয়ে আয় তো বোন।”

তুবা যাওয়ার জন্য পা বাড়ালে হিয়া বলল,

“এই তুবা দাঁড়া আমি যাচ্ছি। জানিস, আমার অনেক দিনের শখ_রুহি আপার বরকে আমার হাতের স্পেশাল শরবত খাওয়াবো। তুই এখানে থাক আমি যাই।”

রুহি কিছু বলার আগে হিয়া ওখান থেকে দৌড়ে চলে গেল। সে যেমন ইচ্ছে করে ওদের কাছে গিয়েছিলো। তেমন ইচ্ছে করেই আবার চলে এসেছে। হিয়া আর কোনো কটুকথা শুনবে না রুহির থেকে। এইবার শুধু কথা শোনাবে। যতদিন থাকবে ততদিন হিয়া এমনই করবে। আর তারপরের মাস্টারপ্লান তো আছেই। হিয়া ও দেখে নিবে, রুহি কতটা হিংসা ওকে করতে পারে। আর হিংসা করেই বা কি উন্নতি করতে পারে।

চলবে??

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here