আমার উপমা তুমি (১২)
আফরোজা আঁখি
ইয়াশের ডুপ্লেক্স বাড়ির সামনে এসে থামল কালো রঙের মার্সিডিস কারটা। কারটা অবশ্যই ইয়াশেরই। ইনায়ার কাছে বাসার চাবি থেকে শুরু করে সবকিছুই রেখে গিয়েছিলো। গাড়িটা নিয়ে এতদিন ইচ্ছেমতো ঘুরেছে ইনায়া। আজকে যার জিনিস তাকেই ফিরিয়ে দিল সে। ইনায়া বাসায় ঢুকল না আর। ইয়াশের ফ্ল্যাট থেকে কিছু দূরে গেলেই ইনায়াদের ফ্ল্যাট। ইয়াশের ফ্ল্যাটের ছাদ থেকে স্পষ্ট দেখা যায় ওর রুমের বেলকনি। তাই আর গাড়ি নিল না ইনায়া, হেঁটেই চলে গেল নিজের ফ্ল্যাটে। ইয়াশ নামতেই ওর বাসা থেকে বেরিয়ে এলেন মধ্যবয়স্ক এক ভদ্রলোক। উনি শুরু থেকে আছেন এখানে, ইয়াশের অনেকটা সময় কাটে উনার সাথেই। ভদ্রলোককে দেখেই হাসল ইয়াশ। ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করলে সুন্দর মতোই উত্তর দিলেন তিনি। গাড়িতে রাখা ইয়াশের ব্যাগপত্র সব নামিয়ে নিয়ে গেলেন বাড়ির ভিতরে। ইয়াশ চলেই যাচ্ছিল, ওর থেকে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মেহেক বলে উঠল তখন,
“আমরা আসব স্যার?”
ইয়াশ তাকাল মাথাটা ঘুরিয়ে, দেখল সাইফান আর মেহেক দাঁড়িয়ে আছে ওর পিছনে। ইনায়ার সাথে ওরাও গিয়েছিল ইয়াশকে আনতে। তখন ফুলের তোড়া দিয়ে ওয়েলকাম করেছিল মেহেকই।মেহেক আফ সাইফান দুজনেই ইয়াশের স্টুডেন্ট। মেহেক মেয়েটা একা হলে কখনো ওর ডাকে সাড়া দিত না ইয়াশ, তবে সাইফান আছে তাই আসতে বলল ভিতরে। ঠোঁটের হাসি চওড়া হলো মেহেকের, মনে হলো ইয়াশের এই অনুমতির অপেক্ষাতেই ছিল সে। যদিও এখন থেকে ইয়াশের সাথে দেখা হবে প্রতিদিন, কিন্তু কাছ থেকে দেখার ফিলিংস তো আলাদা। এই ভেবে ছুটল ইয়াশের পিছু পিছুই, সাইফানও এল।
———
ভিতরে ঢুকেই কোনোদিকে না তাকিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল ইয়াশ। লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে ফিরে এল আবার। বিছানার পাশটাতেই দাঁড়িয়ে ছিল ইয়াশ, কি যেন ভাবতে ভাবতে দপ করে শুয়ে পড়ল। মাথার পিছনে দুই হাত দিয়ে চোখটা বন্ধ করল ঘুমাবে বলে। কিন্তু এ কী হলো? চোখের সামনে উপমা এসে ঘুরাঘুরি করছে কেন? কেন ওর হাসিমাখা মুখ, চঞ্চল হরিণীর মতো চোখ দুটোর চাহনি বার বার ভেসে উঠছে চোখের সামনে! আচ্ছা, ইয়াশের উপমা ভালো আছে তো? ইয়াশের চলে আসায় সে কি কষ্ট পেয়েছে? মেয়েটা যে বড্ড চঞ্চল, ভুল করে পদে পদে। ইয়াশ কি তাকে ছেড়ে চলে এসে ভুল করল? হুট করেই ইয়াশের মাথায় আসল ঈশানের কথা। পুরোনো আঘাতপ্রাপ্ত জায়গায় পরপর এতগুলো আঘাতে নিশ্চয়ই আধমরা হয়ে পড়ে আছে এখনও ওই পরিত্যক্ত বাড়িতে। ওর যা ইচ্ছে হোক, পচে মরুক ওখানেই, ইয়াশের যায় আসে না তাতে। কিন্তু কোনোভাবে সুস্থ হয়ে যদি আবারও উপমার দিকে হাত বাড়ায়? কথাটা ভাবনায় আসতেই কপালে ভাঁজ পড়ল ইয়াশের। উঠে বসে হাতে নিল ফোনটা, ভাবল কল দেবে উজ্জ্বলকে। পরক্ষণেই আবার কি যেন ভেবে হাসি ফুটল ঠোঁটের কোণে, বলল বিড়বিড় করে,
“ঈশান আমার উপমার দিকে হাত বাড়াবে কী করে? ওর হাত দুটো তো আমি যত্ন করে অকেজো করে দিয়েছি সারা জীবনের মতো। নিজের হাতে তুলে খাবার খেতে পারবে কিনা সন্দেহ, হাত বাড়ানো তো দূরের কথা! না, চিন্তার কারণ নেই, উপমা ভালোই থাকবে।”
ইয়াশ রেখে দিল ফোনটা। বিছানায় শুয়ে চোখটা বন্ধ করবে, তখনই কানে আসল ফোনের রিংটোনের আওয়াজ। ইচ্ছা করেই রিসিভ করল না কলটা, কে দিয়েছে সেটাও দেখল না।
———
দিনের আলো কেটে গিয়ে অন্ধকার নেমেছে চারিপাশে। প্রকৃতির তাণ্ডব কমেছে, কমেছে মানুষের হাঁটাচলা। ঝড়-বৃষ্টির দিনে কে-ই বা বের হয় বাড়ি থেকে! কিন্তু ইয়াশের উপমা যে বসে আছে এখনও পথ চেয়ে আছে ইয়াশের। ইয়াশ ওকে ছেড়ে চলে গেছে বিশ্বাসই হচ্ছে না কাশফিয়ার। বারবার মনে হচ্ছে ওর ভুলের শাস্তি দিতে মিছে মিছে হারিয়ে যাওয়ার অভিনয় করছে ইয়াশ।
খন্দকার মঞ্জিলে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। সবাই বসে আছেন ড্রয়িং রুমে, সকলের মুখেই চিন্তার চাপ। কেউ কেউ পাগলের মতো খুঁজে যাচ্ছেন কাশফিয়াকে।মেয়েটা কোথায় আর কার কাছে গেলো, মাথায় আসছে না কারোরই।
ভিজে কাপড়ে একটা ছোট্ট চায়ের দোকানের সামনে পাতানো বেঞ্চে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে কাশফিয়া। এই জায়গাটাতে কেন এল, সে নিজেও জানে না। ইয়াশের সাথে প্রথম দেখাটা তো কাশফিয়ার এখানেই হয়েছিল, তাই বুঝি এই জায়গাটা টেনে আনলো তাকে! আবারও যদি সেদিনের মতো দেখা পেতো ইয়াশের, মন্দ হতো কী তবে! কাশফিয়া যখনই বিপদে পড়ে, তখনই আগমন ঘটে ইয়াশের। আজকে কাশফিয়ার খুব করে চাইছে, ও বিপদে পড়ুক, ইয়াশ এসে বাঁচিয়ে নিক ওকে। ভাবনায় ছেদ পড়ল কাশফিয়ার। চায়ের দোকানের ভদ্রলোক এক কাপ গরম চা এনে ধরলেন ওর চোখের সামনে, বললেন আদুরে গলায়,
“খেয়ে নাও মা, তোমার চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে তুমি ক্ষুধার্ত।”
কাশফিয়া তাকাল উনার দিকে, ভদ্রলোকের কথার উত্তরে মুচকি হাসল কেবল। চায়ের কাপটা হাতে নিল সে। উনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন আবারও,
“কেন এই গরিব চাচার দরজায় আসলে? এর থেকে ভালো কিছু খাওয়াবো, তার সাধ্য যে নেই আমার।”
কাশফিয়া কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকাল উনার দিকে। ভদ্রলোকের ব্যবহারেই বরাবরই মুগ্ধ হয় সে। মাঝেমধ্যেই কলেজ থেকে আসার সময় এখানে বসত, গল্প করত উনার সাথে। সেদিনও তো উনার আকুতি মিনতি দেখেই ইয়াশ ছুটে এসেছিল ওকে বাঁচাতে। কাশফিয়া উঠতে নিলেই বলে উঠলেন ভদ্রলোক,
“জামাই কোথায় মা? ঝড়-তুফানের দিনে এভাবে একা এমা হাঁটছো যে? ঝগড়া হয়েছে দুজনের?”
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল কাশফিয়া, বলল উনাকে,
“উনি হারিয়ে গেছেন চাচা। আমার থেকে অনেক দূরে চলে গেছেন। ঝগড়া হবে কী করে? আমার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়েই বোধহয় উনি পালালেন।”
দোকানে বসে থাকা ভদ্রলোক তাকালেন কাশফিয়ার দিকে। মেয়েটার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে ক্রমাগত। মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। উনার কষ্ট হলো কাশফিয়ার অবস্থা দেখে।
এই ভর সন্ধ্যা বেলা মেয়েটা যাবেই বা কোথায়? একবার ভাবলেন নিজের বাড়িতেই নিয়ে যাবেন ওকে। কিন্তু এ মেয়ে যে ওমন ভাঙা-চোরা বাড়িতে থেকে অভ্যস্ত নয়, সেটা তো জানা উনার। তাই বললেন না কিছু আগ বাড়িয়ে, অপেক্ষা করলেন কেউ খুঁজতে আসে কিনা কাশফিয়াকে। কত কিছু বলে ওকে বসিয়ে রাখলেন ওখানেই। কাশফিয়াকে খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে পেল উজ্জ্বল। মনে হলো বুকের উপর থেকে পাথর নেমেছে ওর।
কাছে এসে বলল গম্ভীর কণ্ঠে,
“এসবের মানে কি কাশফিয়া?”
মাথা ঘুরিয়ে তাকাল কাশফিয়া। দেখল উজ্জ্বল আর সিমিকে।
সিমি এসে বসেছে কাশফিয়ার পাশে, মুখটা কেমন বেজার করে রেখেছে মেয়েটা। বাড়ির এই পরিস্থিতিতে হয়তো দম বন্ধ লাগছে তার। কাশফিয়া বুঝল সবটাই। কষ্ট করে মুখে হাসি টেনে বলল সে,
“কিসের মানে জানতে চাইছেন আপনি ভাইয়া?”
“এই ঝড় তুফানের মধ্যে কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে আসলে যে! বাড়ির সবাই চিন্তা করছেন তোমার জন্য। তাড়াতাড়ি এসো, আমাদের বাড়ি ফিরতে হবে।”
কাশফিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল উজ্জ্বলকে,
“যার হাত ধরে আপনাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম, সেই তো আমাকে একা রেখে চলে গেছে ভাইয়া। কার ভরসায় যাব আমি?”
চুপ রইলো উজ্জ্বল। কথা নেই ওর মুখে, কী-ই বা বলবে কাশফিয়ার কথার উত্তরে! সত্যিই তো, ইয়াশ এমন একটা কাজ কেন করল! পরক্ষণেই আবার ভাবছে উজ্জ্বল, ইয়াশ হয়তো ভালো কিছু ভেবেই এমনটা করেছে। কিন্তু কাশফিয়া যে ঠিক কতটা ভালোবাসে ইয়াশকে,বুঝতে বাকি নেই কারোরই।
——–
কেটে গেছে অনেকগুলো দিন, প্রায় এক মাসের মতো। সামনেই কাশফিয়ার এইচএসসি এক্সাম। সেদিন বাড়িতেই গিয়েছিল সিমি আর উজ্জ্বলের জোড়াজুড়িতে। দুই তিন না যেতেই কেমন লাগছিল কাশফিয়ার দম বন্ধ হয়ে আসছিল ওই বাড়িতে থাকতে। ইয়াশের ফেলে যাওয়া সব জিনিসপত্র বারবার চোখে পড়ছিল ওর। চলে গিয়েও যেন পুরো রুম জুড়ে নিজের অস্তিত্ব রেখে গেছে ইয়াশ। কাশফিয়া থাকবে কী করে ওই বাড়িতে, বারবার যে মনে পড়ছিল ইয়াশের কথা। কাছে যেতে ইচ্ছে করছিল ওর।
উজ্জ্বল আর বাড়ির বাকিরা হয়তো বুঝল কাশফিয়ার অবস্থা। এমনিতেও ইয়াশ বলে গেছে, ওকে হোস্টেলে রেখে আসতে। সেই দায়িত্বই পালন করল উজ্জ্বল কাশফিয়াকে ওর কলেজের পাশে থাকা হোস্টেলে রেখে এল। তারপর থেকে আর খন্দকার মঞ্জিলে পা রাখেনি কাশফিয়া। মাঝেমধ্যেই সিমি আসে স্কুল থেকে যাওয়ার পথে। কখনো আবার সুফিয়া বেগমও আসেন। মা না থাকার অভাবটা এখন বুঝতে পারে না কাশফিয়া সুফিয়া বেগম যথেষ্ট ভালোবাসেন ওকে। সবার এত যত্ন দেখলেই মনে পড়ে কাশফিয়ার, এগুলো তো ইয়াশের জন্যই পেয়েছে সে। সব পেলেও ইয়াশ যে নেই ওর সাথে, ওই মানুষটার শূন্যতা কাটাবে কী করে? এত মানুষের ভালোবাসার ভিড়ে যে ও কেবল ইয়াশের ভালোবাসাটাই চায়। কোথায় গেলে দেখা পাবে ইয়াশের? কী করলে আবার ফিরে আসবে ইয়াশ? মেঝেতে বসে হাঁটুর ওপর মুখ গুঁজে কান্না করছে আর কথাগুলো ভাবছে কাশফিয়া। দরজার ঠকঠক আওয়াজে ধ্যান ভাঙে ওর। উঠে গিয়ে দরজাটা খুলে দিল সে। পরিচিত মুখগুলো দেখে হাসি ফুটল ওর ঠোঁটের কোণে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে উজ্জ্বল আর সিমি। কাশফিয়া ভেতরে আসতে বলল দুজনকে। সিমি ওর হাতে থাকা শপিং ব্যাগটা কাশফিয়ার দিকে বাড়িয়ে বলল,
“এই নাও, নতুন মামী! আমার মামাই….”
পুরো কথাটা বলে শেষ করার আগেই আচমকা সিমির গালে থাপ্পড় দিল উজ্জ্বল। সিমি হতভম্ব হয়ে মাথাটা ঘুরিয়ে তাকাল ওর বাবার দিকে। দেখল উজ্জ্বল চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। এদিকে এই দুই বাবা মেয়ের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে কাশফিয়া। উজ্জ্বল লক্ষ্য করল সেটা, এক গাল হেসে বলল কাশফিয়াকে,
“সিমির গালে মশা বসেছিল বুঝলে। আমি মশাটাকে তাড়িয়ে দিতেই থাপ্পড় দেওয়ার ভান করলাম।”
উজ্জ্বলের কথায় হেসে ফেলল কাশফিয়া। সিমির হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে বলল,
“এগুলো আমার?”
সিমি চুপ রইল। উত্তর দিল উজ্জ্বল,
“হ্যাঁ, এগুলো আম্মু পাঠিয়েছেন তোমার জন্য।”
সিমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ওর বাবার দিকে। মনে মনে বলল,—-“মিনিটে মিনিটে ১০-১২টা মিথ্যা কথা বলা ওর বাবাকেই মানায়।”
বেশ কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে চলে গেল সিমি আর উজ্জ্বল। কাশফিয়া খুলে দেখল ব্যাগটা, একটা সুন্দর চকচকে নীল রঙের শাড়ি রাখা ব্যাগে, তার সাথে আবার সোনার জুয়েলারি সেট। এগুলো ওর শাশুড়ি পাঠিয়েছেন ভাবতেও অবাক লাগছে যেন!
কাশফিয়ার জন্য কিছু কিনলে উনি নিয়ে আসেন নিজেই, তাও আবার কালো বা খয়েরি রঙের। নীল তো ইয়াশের পছন্দের রঙ! তবে কি শাড়িটা ইয়াশই পাঠালো? কথাটা ভাবনাতে আসতেই মন খারাপ গুলো কোথায় যেন উড়ে গেল কাশফিয়ার। ভাবল, শাড়িটা পরে দেখবে এক্ষুণি। ইয়াশ না পাঠালেও, ইয়াশের পছন্দের রঙ যে এটা! দরজাটা বন্ধই ছিল। কষ্ট করে আর ওয়াশরুমে গেল না কাশফিয়া। পরনে থাকা থ্রি-পিসটা খুলে সুন্দর মতো পরে নিল শাড়িটা।
——–
ল্যাপটপ হাতে নিয়ে কাউচের উপরে বসে আছে ইয়াশ।মনোযোগ দিয়ে কী দেখছে আর ঠোঁট কামড়ে হাসছে সে। ইনায়া আর কৌশিক দুজনেই বসে আছে ওর সামনে, মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে দুজনের। ইয়াশের ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকা এই হাসির কারণ অজানা দুজনের কাছেই। কৌশিকের মনে কৌতূহল জাগল ইয়াশ কী বা কাকে দেখে এভাবে মুচকি হাসছে, জানবে সে। নিজের মনের কৌতূহল দমাতে না পেরে প্রশ্ন করল ইয়াশকে,
“কাকে দেখে হাসছিস ব্রো? নির্ঘাত প্রেমে পড়েছিস।”
ল্যাপটপের দিকে চোখ রেখেই কৌশিকের কথার উত্তর দিল ইয়াশ, —–“তা তো পড়েছিই।”
ইয়াশের বলতে দেরি, ইনায়া আর কৌশিকের পালটা প্রশ্ন করতে দেরি হয়নি। দুজনেই বলে উঠেছে একসাথে,
“কে সেই ভাগ্যবতী?”
ভাবলেশহীন ভাবেই বসে রইল ইয়াশ। মুচকি হেসে বিড়বিড় করে বলল কৌশিকের দিকে তাকিয়ে,—–“তোর সুন্দরী বোন ছাড়া কে হবে গর্ধব?”
ইয়াশের বলা কথা কানে আসল না কৌশিকের, আবারও কিছু বলতে যাবে, তখনই ইনায়া বাধা দিল ওকে। বলল ঔষধ খাওয়ার সময় হয়ে গেছে। কৌশিক চুপ করে গেল। ইনায়া ওকে রুমে রেখে আবারও আসল ইয়াশের কাছে। জিজ্ঞেস করল ওকে,
“মেয়েটা কে, প্রফেসর সাহেব?”
মুচকি হেসে সোজাসাপ্টা উত্তর দিল ইয়াশ, —”আমার উপমা।”
——–
গত হয়েছে আরও তিনটে দিন, সময়টা এখন বিকেল চারটা।নির্জন নিস্তব্ধ রাস্তাটা দিয়ে একা একা হেঁটে যাচ্ছে কাশফিয়া। এখন বর্ষাকাল চলছে, আকাশে মেঘ ডাকছে, হয়তো বৃষ্টি আসবে! হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার ওপর প্রান্তে চোখ পড়ল কাশফিয়ার প্রাপ্তবয়স্ক দুই ছেলে মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওখানে। মেয়েটার লম্বা কালো চুলে বেলিফুলের গাজরা পরিয়ে দিচ্ছে ছেলেটা। রাস্তার পাশের ছোট্ট দোকানটা থেকে চুড়ি কিনে মেয়েটার হাতে যত্ন করে পরিয়ে দিচ্ছে ছেলেটা। মেয়েটা মুচকি হাসলে ওর ধরে চুমু দিল পর পর কয়েকটা।
কাশফিয়া দাঁড়িয়ে রইল ওখানেই। দেখল ছেলেমেয়ে দুটোকে। মনে পড়ল সেদিনের কথা, ইয়াশ কত যত্ন করে মাথায় ফুল গেঁথে দিয়েছিল ওর, রাগ ভাঙাতে কিনে দিয়েছিল ওর পছন্দের চুড়িগুলো। ইয়াশের সাথে কাটানো মধুময় স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভাসছে কাশফিয়ার।চোখ বেয়ে দু’ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়তেই অন্য হাতের তালু দিয়ে মুছে নিল তা। মনে মনে ঠিক করল, ইয়াশ নামক পাষাণ মানুষটাকে নিয়ে আর ভাববে না সে। কীভাবে পারল মানুষটা কাশফিয়াকে একা রেখে চলে যেতে? একটা দিন খোঁজ নেওয়া যায় না ওর! কখনোই তো ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করল না ও কেমন আছে? এই রাগে তো কল দেয়নি কাশফিয়া নিজেও,কতোবার ইয়াশের নাম্বারটা বের করে কল দিবে বলে জেদ করে আর দেওয়া হয় না। ইয়াশের প্রতি এক আকাশ পরিমাণ অভিমান জমেছে কাশফিয়ার মনে।
হোস্টেলের উদ্দেশ্যেই যাচ্ছিল কাশফিয়া। মাঝপথেই শুরু হয়েছে বৃষ্টি। এখান থেকে দ্রুত হেঁটে গেলে হোস্টেলে পৌঁছে যাবে কয়েক মিনিটেই। কিন্তু ওর যে পা চলছে না। মাথাটা ভারী লাগছে, শরীরটাও কেমন করছে। বৃষ্টি শুরু হলো আচমকাই। কাশফিয়া কী যেন ভেবে দপ করে বসে পড়ল মাঝরাস্তায়। বৃষ্টির পানি আর ওর চোখের পানি এক হয়ে গেলো ততক্ষণে। কেউ জানলও না মেয়েটার মনের খবর। ভাববে না বলেও কেন ওই মানুষটাকে নিয়ে প্রতিনিয়ত ভেবে চলেছে কাশফিয়া! ওর যে মাঝেমধ্যে রাগ হয় নিজের উপরেই। চোখ বন্ধ করল কাশফিয়া, কী যেন ভাবতে লাগল সে। হঠাৎই মনে হলো কেউ মাথার উপর ছাতা ধরে রেখেছে ওর। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল মুহূর্তেই। সে যা ভাবছে, সেটাই কি তবে সত্যি? ইয়াশ ফিরে এসেছে! কাশফিয়ার মাথার উপরে ছাতা ধরে রাখা মানুষটা কি তবে ইয়াশ? এবার নিশ্চয়ই বৃষ্টিতে ভেজার জন্য ধমক দেবে ওকে। দিক, কাশফিয়াও আচ্ছা করে বকে দেবে ইয়াশকে,শাস্তি দিবে তাকে ছেড়ে যাওয়ার অপরাধে। কাশফিয়া মুখ তুলে তাকাল। দেখল পরিচিত মুখ। ঠোঁটের হাসি মিলিয়ে গেল ওর, আশাহত হলো আবারও। এই মানুষটার জন্যই তো অপেক্ষা করছিল সে। অবশেষে আসল কৌশিক! এতদিন পরে ভাইকে দেখে তো কাশফিয়ার আনন্দ হওয়ার কথা! আনন্দ হচ্ছে না কেন? কেন সব পেয়েও হারানোর হাহাকার ওর হৃদয়জুড়ে? কৌশিক টেনে তুলল বোনকে। বলল রাগত্ব স্বরে,
“সমস্যা কী কাশফি, এই মাঝরাস্তায় বসে আছিস যে? বৃষ্টিতে ভিজলে জ্বর হবে তো।”
কাশফিয়া শান্ত করল নিজেকে। ভাইকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিল সে। বলল অভিমানী কণ্ঠে,
“তুমি কোথায় ছিলে ভাইয়া? তুমি জানো আমি কত রাত ঘুমাইনি তোমার চিন্তায়। মামী সবসময় তোমাকে নিয়ে আজেবাজে কথা বলতো, আমি রাগ করে চলে যেতাম বাড়ি ছেড়ে…”
পুরো কথাটা বলার আগেই কৌশিক থামিয়ে দিল বোনকে। বলল ওকে,
“শান্ত হো কাশফি, আমি আছি তো,সব কথা শুনব তোর।”
চুপ করল কাশফিয়া। কৌশিক শক্ত করে ওর মাথাটা চেপে ধরল নিজের বুকে। কান্না পেল কৌশিকেরও। এত বড় এক্সিডেন্টের পরে সুস্থ হয়ে আবারও বোনের কাছে আসবে কল্পনাতেও ছিল না ওর। আল্লাহর ইচ্ছেতে আর ইয়াশ-ইনায়ার চেষ্টায় আবারও ভালো হয়েছে কৌশিক, ফিরে এসেছে তার বোনের কাছে।কৌশিক লক্ষ্য করল ঠান্ডায় জমে গেছে কাশফিয়ার শরীর, তরতর করে কাঁপছে মেয়েটা। দেরি করল না কৌশিক, কাশফিয়াকে নিয়ে বসাল গাড়িতে। ড্রাইভিং সিটে উঠে বসল কৌশিক। পাশে বসে থাকা ইনায়াকে চোখ দিয়ে ইশারা করলে, কথা না বাড়িয়ে ও চলে গেল পেছনের সিটে বসে থাকা কাশফিয়ার কাছে। কাশফিয়ার মাথাটা এনে রাখল নিজের ঘাড়ে। গালে, কপালে হাত দিয়ে বুঝল জ্বরে পুড়ছে মেয়েটা। গায়ে হয়তো আগে থেকেই জ্বর ছিল, তার ওপর এই ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে অবস্থা আরও খারাপ ওর। কৌশিককে বলল না কিছুই। বোনের প্রতি কৌশিক বরাবরই দুর্বল, জানে ইনায়া। চিন্তা হবে তাই আপাতত বলল না কথাটা। মাথা থেকে সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে ইনায়া তাকাল কাশফিয়ার মুখপানে। হাসি ফুটল ওর ঠোঁটের কোণে। মেয়েটা সুন্দর, ফর্সা গায়ের রঙ, লম্বা চুল, টানা টানা হরিণীর মতো চোখ। সব মিলিয়ে অপরূপ সুন্দর সে। ইয়াশের বলা বর্ণনার সাথে মিলে গেছে পুরোপুরি। মুচকি হেসে বিড়বিড় করে বলল ইনায়া,
“তুমিই তবে ইয়াশের উপমা!”
#চলবে…..
আজকের পর্বটা মিলাতে পারছিনা, নিজেরই ভালো লাগেনি, তবুও দিলাম। ভুল ত্রুটি ক্ষমা করবেন। হ্যাপি রিডিং। 🫶
নাইস,নেক্সট না বলে বড়সড় মন্তব্য করবেন।❤️
পড়ুন রোমান্টিক ই-বই “রাগে অনুরাগে সিক্ত কাব্য”
https://link.boitoi.com.bd/GQcM
গল্প রিলেটেড সব আপডেট পেতে গ্রুপে জয়েন হোন।
https://facebook.com/groups/569604222322147

