আমার উপমা তুমি (১৪) আফরোজা আঁখি

0
31

আমার উপমা তুমি (১৪)
আফরোজা আঁখি

“ওয়েলকাম টু আওয়ার নিউ হোম, মিসেস ইয়াশ রায়হান।”

চোখ রাঙিয়ে তাকাল কাশফিয়া, ধারালো কণ্ঠে বলল,—- “হু ইজ ইয়াশ রায়হান? এই নামের কাউকে আমি চিনিনা, আর না তো আমি কারোর মিসেস।”

বাঁকা হাসল ইয়াশ। কাশফিয়ার চোখে চোখ রেখে বলল,

“অথচ তোমার মনের অলিন্দে আমার নামটাই প্রতিধ্বনিত হয় নিঃশব্দে। আমার অস্তিত্ব মুছে ফেলার সাহস তোমার কোনো কালেই হবে না, উপমা। তুমি যে আস্ত আমিটাকেই ধারণ করছ নিজের আত্মার গভীরতম স্তরে, নিঃশ্বাসের প্রতিটি কম্পনে।”

ইয়াশের কণ্ঠস্বর প্রতিটি কথা কানে বাজছে কাশফিয়ার। সব রেখে ও এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে ইয়াশের মুখপানে। ইয়াশের ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা হাসি দেখে রাগ হলো কাশফিয়ার, মানুষটা তো ভালোই আছে ওকে ছাড়া। কাশফিয়া তো বোকা, যে ওকে ছেড়ে এসেছে, তার জন্যই হায় হুতাশ করে ম’রেছে এতোদিন। না, কাশফিয়া ভুল করেছে। ইয়াশ নামক পাষাণ মানুষটাকে নিয়ে আর ভাববে না সে। আর ভালোবাসবে না নিজের সবটুকু দিয়ে।

কাশফিয়া এগিয়ে এলো ইয়াশের কাছে, ওর হাতে থাকা মমীকে নিতে চাইলে আসল না মমী। কেমন ঘাপটি মেরে বসে আছে ইয়াশের কোলে, মনে হচ্ছে আগে থেকেই চেনে ওকে। অবাক হলো কাশফিয়া। বিড়ালটা কি তবে ইয়াশের? হয়তো ইয়াশেরই! ওর ফ্ল্যাটের সামনেই তো পেয়েছিল মমীকে। নিশ্চিত হবে বলে জিজ্ঞেস করল কাশফিয়া,

“বিড়ালটা কি আপনার?”

ইয়াশ তাকিয়েই ছিল কাশফিয়ার দিকে। ও তাকাতেই চোখাচোখি হয়ে গেল দুজনের। কী যেন ভেবে কাশফিয়া চোখ সরিয়ে নিল অন্যদিকে। মুচকি হেসে বলল ইয়াশ,

“আমাদের।”

“তার মানে আপনার?”

“উঁহু, আমার মানেই তো তোমার! তোমার মানেই আমার! সুতরাং আমাদের।”

“আপনার মানেই আমার,এটা কে বলেছে? আপনি আর আমি আলাদা। আপনার কিছুই আপনার নয়, আর না তো আমার কিছু আপনার।”

“পুরো তুমিটাই তো আমার, উপমা।”

ইয়াশের মন ভোলানো কথায় তেমন পাত্তা দিল না কাশফিয়া। নিজের বলা কথাটা শেষ হতেই চলে যাচ্ছিল সে। ইয়াশের কণ্ঠস্বর কানে আসল আবার,

“মমীকে নিবে না?”

পা জোড়া থেমে গেল কাশফিয়ার। এই বিড়ালটার নাম যে ও মমী দিয়েছে, ইয়াশ জানল কী করে? অদ্ভুত সব প্রশ্ন জাগছে কাশফিয়ার মনে। মমী কি কথা বলতে পারে? কোনোভাবে কি বলেছে কথাটা ইয়াশকে? পরক্ষণেই আবার নিজের মাথায় নিজে গাট্টা মেরে বলছে কাশফিয়া, —-“ধুর, আমি কী সব ভাবছি! বিড়াল কি করে কথা বলবে? ইয়াশ কি তবে কালো জাদু জানে? নাহলে শুনল কোথা থেকে কাশফিয়া বিড়ালটার নাম দিয়েছে মমী!” মনের প্রশ্নগুলো সব মনেই রেখে দিল কাশফিয়া। ইয়াশের সাথে এতো কথা বলতে চায় না সে। কাশফিয়া ঘুরে তাকাল, মেজাজ দেখিয়ে বলল ইয়াশকে,

“আপনি যেমন, আপনার বিড়ালটাও তেমনই হবে। রাখুন ওকে নিজের কাছেই। জেনেশুনে আমি সাপ পালব না।”

“কিন্তু মমী তো সাপ নয়, উপমা। ও আমার আদুরে বিড়ালছানা যতোটা আদুরে তুমি।”

কাশফিয়ার কানে যায়নি ইয়াশের কথা। সে তো এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে ইয়াশের কোলে থাকা মমীর দিকে। মনে মনে ভাবছে, যেমন বেঈমান স্বার্থপর মালিক, তেমন তার বিড়াল। কতো যত্ন করল এই কয়টা দিন, সুন্দর একটা নাম দিল, আর এখানে এসে যেই না নিজের মালিককে পেলো, চলে গেল তাকে ছেড়ে! কাশফিয়ার রাগ হলো মনে মনে। ভেবে নিল, মমী আর মমীর মালিক কাউকেই ভালোবাসবে না আর সে।

———-

রাত প্রায় ১টার কাছাকাছি। বিছানায় পড়ে ছটফট করছে কাশফিয়া, ঘুম নেই ওর দুচোখের পাতায়। চোখ বন্ধ করলেই কেন বারবার দেখছে ইয়াশকে? ওর গায়ের পরিচিত পারফিউমের ঘ্রাণ পাচ্ছে বারবার। চেনা পরিচিত ডাকনামটা কানে বাজছে ওর। কেন হচ্ছে এমন? কেন নিজের মন থেকে চেয়েও মুছতে পারছে না ইয়াশের অস্তিত্ব? মাঝেমধ্যে এটা ভাবলে অবাক লাগে কাশফিয়ার,লোকটা পুরোপুরি দখল করে নিয়েছে ওর মন-মস্তিষ্ক। তাইতো যেদিকে তাকায়, সেদিকেই দেখতে পায় ইয়াশকে। অনেক ভাবনা চিন্তা করল কাশফিয়া। বড় একটা শ্বাস ছেড়ে চোখ দুটো বন্ধ করল আবারও, যাই হয়ে যাক, ঘুমোবে এবার, আর ভাববে না ইয়াশকে নিয়ে। এই হলো কাশফিয়ার উদ্দেশ্য।নিজের ভাবনায় কাশফিয়া সফল হলো বটে। অনেক চেষ্টার পর ঘুম এল ওর দুচোখের পাতায়।

বেঘোরে ঘুমাচ্ছে কাশফিয়া, মনে হচ্ছে কেউ এসে বসেছে ওর পাশে। নিজের ঠোঁটের উষ্ণ স্পর্শ এঁকে দিচ্ছে ওর পুরো মুখে। লোকটার হাতের অবাধ্য বিচরণ চলছে পুরো শরীর জুড়ে। ।বার বার মনে হচ্ছে এই স্পর্শের সাথে পরিচিত সে। আচমকাই চোখ খুলে তাকালো কাশফিয়া, দরজার দিকে তাকিয়ে দেখল আগের মতোই বন্ধ আছে দরজাটা। শুকনো ঢোক গিলে উঠে বসল সে। যেই না পাশ ফিরে তাকালো, নজরে আসল পরিচিত মুখ।

মাথায় হাত ঠেকিয়ে কাশফিয়ার ঠিক পাশেই শুয়ে আছে ইয়াশ। ঠোঁট কামড়ে হাসছে সে। নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কাশফিয়ার দিকে। ভড়কালো কাশফিয়া, এতো রাতে ইয়াশ ওর রুমে কীভাবে আসল? কিই-বা করছে? চিৎকার দিতে চাইল কাশফিয়া, কিন্তু তার আগেই ইয়াশ নিজের হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল ওর। কিছুক্ষণ না যেতেই কাশফিয়ার মুখের উপর থেকে নিজের হাতটা সরাল ইয়াশ। আবারও কিছু বলবে কাশফিয়া, তখন ইয়াশ আঁকড়ে ধরল ওর ঠোঁটজোড়া। শক্ত করে কাশফিয়ার কোমর চেপে ধরে নিয়ে এল নিজের কাছে। কাশফিয়ার হাত দুটো আপনা আপনি চলে গেল ইয়াশের বুকে। শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে ওর। আর কিছুক্ষণ এভাবেই থাকলে মরেই যাবে সে। এই ভেবে সজোরে ধাক্কা দিল ইয়াশের বুকে, কিন্তু লাভ হলো না কিছুই,টলাতে পারল না ইয়াশকে। কিছুক্ষণ পর ইয়াশ ছেড়ে দিল কাশফিয়াকে। সাথে সাথেই ওর বুকে ধাক্কা দিল কাশফিয়া, জোড়ে জোড়ে শ্বাস ফেলে বলল,

“মানে কী এসবের! কেন এসেছেন এখানে?”

ঠোঁট কামড়ে হাসছে ইয়াশ। উত্তর দিল কাশফিয়ার কথার,

“তোমাকে আদর দিতে এসেছি, বউ। কতোদিন হলো আদর দিই না তোমাকে। আমার আদরের অভাবে অনেকটা শুকিয়ে গেছো তুমি।”

ইয়াশের কথায় কাশফিয়ার রাগ হচ্ছে অনেক, মুখ ভেংচি কেটে বলছে ওকে, —-“একদমই না।”

“তাহলে নিশ্চয়ই আমার চিন্তায় শুকিয়েছ তুমি? আমারই তো উচিত দিনে তিন বেলা আদর দিয়ে তোমাকে সুস্থ করে তোলা। যতোই হোক আমার একমাত্র বউ তুমি!”

ভ্রু কুঁচকালো কাশফিয়া, রেগে বলল ইয়াশকে,

“আপনি কি ভেবেছিলেন, আপনার বিরহে মরে যাব আমি? দেখুন, আমি দিব্যি বেঁচে আছি। হাঁটাচলা করছি। আপনার চলে যাওয়া আমার কোনো ক্ষতি করেনি, হবেও না। এসব মন ভোলানো কথা বাদ দিয়ে চলে যান এখান থেকে।”

কথাগুলো বলেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল কাশফিয়া, মুখ সরিয়ে নিল অন্যদিকে। বিছানা থেকে উঠল চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। পা বাড়াতেই টান পড়ল ওর হাতে। ঘুরে তাকাতেই ইয়াশ একটানে ওকে বসাল নিজের কোনে মিশিয়ে নিল নিজের বুকের সাথে।মুচকি হেসে বলল কাশফিয়াকে,

“আমাকে ভুলে গেছ উপমা?”

ইয়াশের মুখপানে তাকাল কাশফিয়া, অভিমানী স্বরে বলল,

“হ্যাঁ, ভুলে গেছি। আমি বেঈমানদের মনে রাখিনা। যে আমাকে ভুলে গিয়ে ভালো থাকতে পারে, তাকে আমি মনে রাখব,কেন?”

আরও কত কথা বলতে চেয়েছিল কাশফিয়া, কিন্তু বাধা দিল ইয়াশ। হঠাৎ করেই নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল কাশফিয়ার ঠোঁটে। কাশফিয়ার কী যেন হলো, বাধা দিল না ইয়াশকে। খামচে ধরল ওর মাথার এলোমেলো চুলগুলো। কিছুক্ষণ পর ইয়াশ ছেড়ে দিল ওকে। ছলছল চোখজোড়া নিয়ে কাশফিয়া তাকিয়ে রইল ইয়াশের মুখপানে। ইয়াশ ওর কোলে বসে থাকা কাশফিয়ার হাতটা টেনে এনে রাখল নিজের বুকের বাম পাশে। ঘাড় কাত করে কাশফিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

“ভুলিনি উপমা, তুমি তো আমার এখানটায় ছিলে সর্বক্ষণ। কখনো কখনো হৃদপিণ্ডের অসহ্য ব্যথা হয়ে অনুভব করাতে তোমার শূন্যতা।”

প্রিয় মানুষটার এমন কথায় অভিমানীর অভিমান ভাঙলো কিনা কে জানে, কিন্তু সে যে ভিতরে ভিতরে কষ্ট পাচ্ছে, ইচ্ছা করছে ইয়াশকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে। পরক্ষণেই আবার জেদ হচ্ছে, মনে পড়ে যাচ্ছে, ইয়াশ ওকে কষ্ট দিয়েছে এতোদিন। সেও এতো তাড়াতাড়ি ধরা দেবে না ইয়াশের কাছে। কারো পদধ্বন্নি ভেসে আসল কাশফিয়ার কানে। হকচকিয়ে উঠল সে, কৌশিক বা ইনায়া কেউ যদি এতোরাতে ইয়াশকে এখানে দেখে, কীভাবে নিবে ব্যাপারটা? হয়তো খারাপ ভাববে ওর সম্পর্কে। অসহায় মুখ করে ইয়াশকে বলল কাশফিয়া,

“আ…আপনি চলে যান এখান থেকে।”

“উঁহু, আমি চলে গেলে তোমাকে আদর দিবে কে?”

“বাঁদড়ামো না করে যান বলছি।”

“ঠিক আছে, তাহলে চুমু দাও।”

“না দিলে কি করবেন?”

ঠোঁট কামড়ে হাসছে ইয়াশ, একটু একটু করে এগিয়ে আসছে কাশফিয়ার দিকে। কাশফিয়া হয়তো বুঝল কি হতে চলেছে, ধাক্কা দিতে চাইল ইয়াশকে, কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল,

“ঠি…ঠিক আছে।”

“চুমু দিবে?”

চোখ-মুখে রাগের আভাস কাশফিয়ার, তবুও উপর-নিচ মাথা নাড়িয়ে জবাব দিল ইয়াশের কথায়। হাসল ইয়াশ, এগিয়ে আসল কাশফিয়ার দিকে। কাশফিয়া গলা আঁকড়ে ধরল ইয়াশের, আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ালো ওর ঠোঁটে।

কাশফিয়ার রুমের সামনে দিয়েই যাচ্ছিলো ইনায়া। ভাবল দেখে যাবে কাশফিয়া ঘুমিয়ে পড়েছে কিনা। রুমের দরজাটা খোলাই ছিলো, ইয়াশ এখানে এসেছে এটাও ইনায়ার অজানা নয়। তবে ভেবেছিল, এতো সময়ে নিশ্চয়ই চলে গেছে ইয়াশ। দরজাটা ঠেলে দিতেই ভিতরের এমন দৃশ্য দেখে চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেলো ওর। লজ্জায় চলে যেতে চাইল সে, আবারও তাকাল ওদের দিকে। গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

“মান অভিমান কমেছে তবে? আমি কিছুই দেখিনি,চালিয়ে যাও তোমরা।”

ইনায়ার কথা শুনে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো কাশফিয়া। এদিকে ইয়াশের ভাবভঙ্গির পরিবর্তন হয়নি একটুও, এখনও সে বসে আছে আগের মতোই, তাকিয়ে আছে কাশফিয়ার সুন্দর মুখটির দিকে। কাশফিয়া পড়েছে ভারী লজ্জায়, ইচ্ছে করছে এক্ষুনি পালিয়ে যেতে এখান থেকে। ইয়াশ দেখছে ওর লজ্জাবতীর লাজে রাঙা মুখমণ্ডল। কি যেন ভেবে হুট করেই জড়িয়ে ধরল কাশফিয়াকে। ওর মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরে ইনায়ার উদ্দেশ্যে বলল,

“আমার উপমা লজ্জা পাচ্ছে ইনায়া, তুই এখান থেকে যা। আমার বউ লজ্জায় জ্ঞান হারালে তোকে হাজতবাস করাব কিন্তু!”

মুখ টিপে হাসল ইনায়া, বেরিয়ে গেল কাশফিয়ার রুম থেকে।তবে দুজনের মধ্যে বনিবনা হয়ে গেছে দেখে ভালোই লাগছে ওর।

———

মাত্রই হসপিটাল থেকে বেরুলো রোহি, পাশেই উজ্জ্বল। মুখটা কেমন বেজার করে রেখেছে উজ্জ্বল, হাতে কতগুলো রিপোর্ট ওর। রোহি তাকাল উজ্জ্বলের দিকে, মুচকি হেসে বলল ওকে,

“আমি চলে যাব তাই কষ্ট পাচ্ছো ভাইয়া?”

বোনের এমন কথায় বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল উজ্জ্বলের। হাতের মেডিকেল রিপোর্টগুলো পড়ে গেল মাটিতে। চোখ গড়িয়ে দু’ফোঁটা পানিও গড়িয়ে পড়ল ওর, কিন্তু বুঝতে দিল না রোহিকে। মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বলল,

“তোর কিছুই হবে না রোহি, আমি আছি তো! আমি তোকে বাইরের দেশে নিয়ে যাব, বড় বড় ডাক্তারদের ট্রিটমেন্টে তুই ভালো হয়ে যাবি।”

“তুমি মিছে মিছে আমাকে সান্ত্বনা দিতে আর নিজের মনকে বোঝাতেই এভাবে বলছো ভাইয়া। আমি ঠিক হব না, এটা তুমি নিজেও জানো। মরণব্যাধি শরীরে বাসা বাঁধলে মানুষ ভালো হয় বুঝি?”

উজ্জ্বলের কান্না পাচ্ছে। একমাত্র বোনটার এই অবস্থা সহ্য হচ্ছে না ওর। কিছু না ভেবে রাস্তার মাঝখানেই জড়িয়ে ধরল রোহিকে। বুকের ভিতরটায় কষ্ট হচ্ছে ওর। আল্লাহ কি সব মন্দ ওদের ভাগ্যেই লিখেছেন? বোনকে জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দে কাঁদলো উজ্জ্বল। অনেকদিন ধরেই অসুখে ভুগছে রোহি, বার বার বললেও হসপিটালে আসতে রাজি হয়নি সে। হয়তো আন্দাজ করতে পেরেছিল মারাত্মক কোনো রোগ হয়েছে ওর শরীরে। উজ্জ্বল এক এক করে মাটিতে পড়ে থাকা মেডিকেল রিপোর্টগুলো সব হাতে তুলে নিল, তারপর রোহিকে বলল,

“চল, বাড়ি ফিরি।”

“তুমি চলে যাও ভাইয়া, আমি একটু হাঁটাহাঁটি করব।প্রকৃতির সাথে কথা বলব।”

উজ্জ্বল শুনল বোনের কথা, ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে চলে গেল। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসতে বলল রোহিকে। চারিদিকে হালকা বাতাস বইছে, প্রকৃতিও খুব শান্ত। এই পরিবেশে হাঁটলে যে কারোর মন খারাপ উড়ে যাবে নিমিষেই। রোহি হেঁটে যাচ্ছে শুনশান নিরিবিলি রাস্তাটা দিয়ে। হঠাৎই ওর কানে আসল অতিপরিচিত সেই নামটা। হ্যাঁ, ইয়াশের নাম কানে এসেছে রোহির। দ্রুত গতিতে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল রোহি, বুঝল ওর ভুল হয়েছে। এক নামে তো অনেক মানুষই থাকে পৃথিবীতে, অন্য কাউকে হয়তো ইয়াশ নামে ডেকেছে কেউ। তারই বোঝার ভুল হয়েছে। আবারও হাঁটতে শুরু করল রোহি। রাস্তার দুই পাশেই সারিবদ্ধ অনেক গাছপালা। একটা জায়গায় সুন্দর করে বেঞ্চ পাতানো দেখে রোহি গিয়ে বসল তাতে। কী যেন ভেবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল রোহি, আকাশপানে তাকিয়ে বলল আফসোসের স্বরে,

“একটাই তো জীবন খোদা, আমার এক জীবনে এত অপূর্ণতা কেন দিলে তুমি?”

চোখ বন্ধ করে শ্বাস ছাড়ল রোহি। বেঞ্চের সাথে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে কী যেন ভাবতে শুরু করল সে।

————-

বিষন্ন মন নিয়ে গালে হাত দিয়ে সোফায় বসে আছে কাশফিয়া, তাকিয়ে আছে জানালার দিকে। ইনায়া এখন হসপিটালে, কৌশিক নিজের রুমেই আছে। ওর মাথাটায় প্রচণ্ড ব্যথা হয় মাঝেমধ্যে। তাই কাশফিয়াই বলেছে শুয়ে থাকতে। কৌশিকের সাথে কি কি হয়েছে ভাবলেই অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে ওর। ইনায়ার থেকেই শুনেছে সবটাই। কৌশিক লন্ডনের এক নামী ল ফার্মে কর্পোরেট লইয়ার হিসেবে কাজ করে। শেষবার যে কোম্পানির কেস লড়ছিল, সেই কোম্পানি একটা বড় চুক্তিতে প্রতারণা করছে এসব ঘটনা না জেনেই তাদের সাপোর্ট করেছিল কৌশিক। কিন্তু পরে যখন বুঝল সে ভুল করেছে, ওই কোম্পানির বিরুদ্ধে চলে যায় সে। যা পছন্দ হয়নি কোম্পানির মালিকের। উনারা সবাই ঝামেলা বাধিয়েছিলেন কৌশিকের সাথে। নানা ঝামেলায় কৌশিকের জব টাও চলে যেতে বসেছিল। ইয়াশ আর কৌশিক দুজনে বেস্ট ফ্রেন্ড,ইনায়ার সাথে কৌশিকের পরিচয়টাও ইয়াশের মাধ্যমেই। সবটা শুনে ইয়াশ কোনোভাবে জড়িয়ে পড়েছিল এসবের সাথে। কৌশিকের প্রতি এমন অন্যায় মেনে নিতে পারেনি সে। ওই কোম্পানিটা ইয়াশের স্টুডেন্ট মেহেকের আব্বুর। ইয়াশের বাড়াবাড়ি দেখে কৌশিকের রাগটা উনি মেটাতে চাইছিলেন ইয়াশের প্রতি। ইয়াশ ক্লাস নিচ্ছিল সেদিন। তখনই কেউ কল দিল,কৌশিকের বিপদ হয়েছে। মাথায় কাজ করছিল না ইয়াশের, ভাবল ঘটনা সত্যিই, ছুটে যাচ্ছিল ওদের দেওয়া লোকেশনে। তখনই দ্রুত গতিতে কোথা থেকে একটা গাড়ি আসল। উদ্দেশ্য হয়তো ইয়াশকে মা’রা। কিন্তু কৌশিক বাঁচিয়ে নিল ইয়াশকে। ধাক্কা দিয়ে ওকে সরিয়ে দিল রাস্তা থেকে। গাড়িটা এসে ইয়াশের বদলে কৌশিককেই ধাক্কা দিল। কৌশিক গিয়ে ছিটকে পড়ল কিছু দূরে। পাকা রাস্তায় এভাবে পড়ায় মাথাটায় ব্যথা পেল অনেক। তখনও কেউ বুঝেনি এতো কিছু কেন হলো। সব ভুলে ইয়াশের মাথায় আসল যে করেই হোক কৌশিককে বাঁচাতে হবে। হসপিটালে যখন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিল কৌশিক, ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বার বার বলছিল ইয়াশের হাত ধরে, ওর কিছু হয়ে গেলে, কাশফিয়াকে যেন দেখে রাখে ইয়াশ। ওর কাছে যেন পৌঁছে দেয় কৌশিকের মৃ’ত্যুর খবর। কথাগুলো ভাবনায় আসলেই কেমন ভয় লাগে কাশফিয়ার। ওর অজান্তে কত কিছু হয়ে গেছে কৌশিকের সাথে, নিজেও জানেনা সে। দরজার টুংটাং আওয়াজে ধ্যান ভাঙলো ওর,নিজেকে স্বাভাবিক করল কাশফিয়া, উঠে গিয়ে খুলে দিল দরজাটা।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে মনে হয় খুব একটা খুশি হলো না কাশফিয়া। ইয়াশ দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে, ওর কোলে ঘাপটি মেরে বসে আছে মমী। ইয়াশ কিছু বলবে, তার আগেই চোখ মুখ শক্ত করে বলল কাশফিয়া,

“কি চাই?”

“যদি বলি তোমাকে চাই?”

“তাহলে বলব ফিরে যান।”

ইয়াশ হাসল কেবল, কাশফিয়ার পাশ কাটিয়ে ঢুকল ভেতরে। কৌশিক আর ইনায়া নিচেই ছিল। ইয়াশকে দেখে ওর কাছে এসে হাত মেলাল কৌশিক। ইনায়া চলে গেল কিচেনে ওদের জন্য খাবার বানাতে। বেশ কিছুক্ষণ গল্পগুজব করল ইয়াশ আর কৌশিক। পুরোটা সময় ইয়াশ আড়চোখে দেখে যাচ্ছিল কাশফিয়াকে। কাশফিয়ার কেমন অস্বস্তি হতে লাগল।এক জায়গাতে বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত লাগছে ওর, উঠে চলে যাবে তখন শুনল ইয়াশের কথা,

“কৌশিক, আমার জন্য বিয়ে উপযোগী সুন্দর একটা মেয়ে খুঁজে দে তো, মনটা আমার বিয়ে বিয়ে করছে।”

কৌশিক জানে ইয়াশ মজা করছে তাই তেমন পাত্তা দিল না ওর কথায়। ইনায়াও তখন আসল ওদের জন্য কফি নিয়ে। কাশফিয়া রেগে তাকিয়ে আছে ইয়াশের দিকে। সামনে জলজ্যান্ত বউ দাঁড়িয়ে আছে ওর, আবার বলছে বিয়ে করবে! কাশফিয়ার রাগ হচ্ছে প্রচন্ড ইচ্ছে করছে ইয়াশের মাথার চুল গুলো সব ছিঁড়ে ফেলতে। কিছুক্ষণ ওভাবে দাঁড়িয়ে থেকে গটগট করে হেঁটে গেল কৌশিকের কাছে, বলল ওকে,

“ভাইয়া, আমি বিয়ে করব। আমার জন্য ছেলে দেখো।”

কৌশিক হাঁ করে তাকিয়ে আছে কাশফিয়ার দিকে। ওকে কাছে টেনে গালে কপালে হাত দিয়ে দেখল জ্বর এসেছে কিনা। না, সবই তো ঠিক আছে। তাহলে কাশফিয়া হুট করে বিয়ের কথা বলছে কেন? যে মেয়ে বিয়ের নাম শুনলে মামীর সাথে ঝগড়া বাধাতো, সে নিজ মুখে বলছে বিয়ে করবে? কৌশিক অবাকের সহিত জিজ্ঞেস করল কাশফিয়াকে,

“তুই ঠিক আছিস?”

“ঠিক থাকব না কেন? তুমি এমন হাবভাব করছ, মনে হচ্ছে আমি আকাশের চাঁদ এনে দিতে বলেছি! বলেছি ভালো দেখে একটা বর এনে দিতে, এমন অবাক হওয়ার কি আছে?”

কৌশিক নিজেকে স্বাভাবিক করল। একবার কাশফিয়ার দিকে তাকিয়ে পরে আবার ইনায়ার দিকে তাকাল, ঠাট্টার স্বরে বলল,

“তা তো দিবোই। চলো ইনায়া, আমাদেরকে কাশফিয়ার জন্য পেট মোটা, টাকলা, স্বাস্থ্যবান বর খুঁজে বের করতে হবে।”

কাশফিয়া হয়তো বুঝল ভাই ঠাট্টা করছে ওর সাথে, রাগ দেখিয়ে চলে গেল নিজের রুমে। ইয়াশ বসে আছে আগের মতোই। কাশফিয়ার যাওয়ার পানে তাকিয়ে কি যেন ভেবে বাঁকা হাসল সে।

#চলবে…….

মাথায় শব্দ আসেনা,কি লিখেছি নিজেও জানিনা, ভুল ত্রুটি ক্ষমা করবেন। ভুল পেলে ধরিয়ে দিবেন।

পড়ুন রোমান্টিক ই-বই “রাগে অনুরাগে সিক্ত কাব্য”
https://link.boitoi.com.bd/GQcM

গল্প রিলেটেড সব আপডেট পেতে গ্রুপে জয়েন হোন।
https://facebook.com/groups/569604222322147

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here