আমার উপমা তুমি (১৫)
আফরোজা আঁখি
গাল ফুলিয়ে বিছানায় বসে আছে কাশফিয়া, কেন যেন রাগ হচ্ছে ইয়াশের উপর। বিয়ে করবে মানে! কাশফিয়া তো এখনও বেঁচে আছে, বউ রেখে আবার বিয়ে করে কেউ! এসব ভাবছে আর রাগে ফুসছে কাশফিয়া। মনে হলো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কেউ, উঠে দেখতে যাবে, তখনই কোথা থেকে দৌড়ে আসল মমী। কাশফিয়া রেগে বলল মমীকে,
“এখানে এসেছিস কেন মমী? তোর মালিকের কাছে যা।”
ওভাবেই বসে রইল মমী। ড্যাবড্যাব করে তাকাল কাশফিয়ার দিকে। কিছুক্ষণ পরে আবার গিয়ে বসল পায়ের কাছে। এমন আদুরে বিড়ালটার উপর কাশফিয়া রাগ করে থাকবে কীভাবে? মুচকি হেসে হাঁটু গেড়ে বসল মেঝেতে, মমীকে কোলে তুলে নিয়ে বলল সে,
“তুই ওই তিত করলা লোকটার সাথে কীভাবে থাকিস রে মমী?”
“যেভাবে তুমি থাকতে।”
পরিচিত কণ্ঠস্বর কানে আসতেই দরজার দিকে তাকাল কাশফিয়া। বুকে দুই হাত ভাঁজ করে দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইয়াশ। কাশফিয়া ওর চোখ সরিয়ে নিল অন্যদিকে। ইয়াশ দরজাটা আটকে দিয়ে একটু একটু করে এগিয়ে আসল ওর দিকে। অভিমানীর অভিমান ভাঙেনি, ভালোই বুঝতে পারছে সে। কিন্তু ইয়াশও যে ঠিক করে নিয়েছে, আজকে তার উপমার মনে থাকা সব রাগ-অভিমান সরিয়ে দেবে নিজের ভালোবাসা দিয়ে।
“এত অভিমান কেন করছ উপমা? দূরত্ব না বাড়ালে কি ভালোবাসায় গুরুত্ব বাড়ে বলো?”
কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল ইয়াশ—-“একটা প্রশ্নের উত্তর দেবে?” ইয়াশের কথায় মন গলেনি কাশফিয়ার। অভিমানী স্বরে বলল, অন্যদিকে তাকিয়েই,
“কি প্রশ্ন?”
“তুমি কখন বুঝতে পেরেছ তুমি আমাকে ভালোবাসো?”
ফটাফট উত্তর দিল কাশফিয়া,—-“কে বলল আমি আপনাকে ভালোবাসি? আমি তো আপনাকে ভালোবাসি না!”
“ঠিক আছে, তবে বিয়ে করে নিই? তোমাকে ভুলতে আমারও সময় লাগবে না।”
রেগে তাকাল কাশফিয়া, মমীকে কোল থেকে নামিয়ে ইয়াশের কাছে এগিয়ে গেল, ওর বুকের মধ্যে ঘুষি মেরে বলল রাগত্ব স্বরে,
“জলজ্যান্ত আমি দাঁড়িয়ে আছি আপনার সামনে। আর আপনি বারবার বিয়ের কথা বলছেন! লজ্জা লাগে না? কষ্ট হয় না?”
হাসল ইয়াশ। কাশফিয়ার হাতটা ধরে ওর বুকের বাম পাশে রেখেই বলল,
“উঁহু, উপমা কি আমার জন্য কষ্ট পায়? আমি পাব কেন?”
এক ঝটকায় ইয়াশের থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল কাশফিয়া। গটগট করে হেঁটে বিছানায় গিয়ে বসল সে, বলল আবারও,
“একদম ঢং করবেন না। আপনার চিন্তায় আমি কত রাত ঘুমাইনি জানেন? আমাকে ছেড়ে এসে তো ভালোই আছেন আপনি? আমি বোকার মতো ভেবে গেছি আপনার জন্য!”
কথাগুলো বলেই জিভ কাটল কাশফিয়া, আবেগী হয়ে কি সব বলে দিয়েছে, খেয়ালও করেনি এতক্ষণ। ইয়াশ হাসছে কাশফিয়ার মুখের ভাবভঙ্গি দেখে। এগিয়ে গেল ওর কাছে, পাশে বসে কাশফিয়াকে ঘুরিয়ে নিল নিজের দিকে, ওর মাথার এলোমেলো চুলগুলো সব ঠিক করে দিয়ে চুমু দিল কপালে। মুচকি হেসে বলল কাশফিয়াকে,
“তুমি আমাকে ভালোবাসো উপমা। মুখে না বললেও ভালোবাসো।”
কাশফিয়ার কি যেন হলো। ছলছল চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ইয়াশের মুখপানে। হুট করেই জাপ্টে ধরল ইয়াশকে, বুকে মাথা রেখে বলল সে,
“বাসি তো, আমি আপনাকে ভালোবাসি। পাগলের মতো ভালোবাসি। আমার একদিকে আপনি, অন্যদিকে পুরো পৃথিবী। আপনাকে ছাড়া যে আমার অন্ধকার লাগে সবকিছু…”
ইয়াশ পুরো কথাটা বলতে দিল না কাশফিয়াকে। থুতনিতে হাত রেখে ওকে চাওয়ালো নিজের দিকে, টুপ করে ঠোঁটে একটা চুমু দিয়ে বলল,
“তুমি কবে আমার জন্য এতটা পাগল হলে উপমা? কবে থেকে বুঝলে আমাকে ভালোবাসো? আমি চলে আসার পরেই তো?”
উপর-নিচ মাথা নাড়াল কাশফিয়া, যার উত্তর হ্যাঁ। ইয়াশ ওকে জড়িয়ে ধরল আবারও। কাশফিয়ার মাথাটা চেপে ধরল নিজের বুকে, বলল মুচকি হেসে,
“দেখলে তো, দূরত্ব বাড়লে ভালোবাসা বাড়ে। তোমার জীবনে আমার প্রয়োজনীয়তা বোঝানোর জন্যই আমাকে এত কিছু করতে হলো।”
———–
ড্রয়িং রুমে বসে ছিলেন সুফিয়া বেগম, একটু আগেই কথা বললেন কাশফিয়ার সাথে। ছেলে বউমার বনিবনা হয়নি দেখে খারাপ লাগছে উনার। ঈশানের ঘটনাটাও কানে এসেছে উজ্জ্বলের উছিলায়। প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেন নি তিনি।তবে দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে খুব একটা সময় লাগেনি। ঈশান যেমন উশৃংখল, মদ খেয়ে মাতলামো করে, হয়তো করেছিল এমন! পর পর দুইবার একই ঘটনা তো পুরোটা মিথ্যা হতে পারেনা! সবটা শুনে ঈশানের প্রতি উনার মায়া লাগছে কম ঘৃণা হচ্ছে বেশি। এই ছেলেকেই কিনা এতোদিন খাইয়ে পড়িয়ে মানুষ করলেন! সবকিছু ভেবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন সুফিয়া বেগম। স্বামীর ডাক পেয়ে চলে যাচ্ছিলেন সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমে। দরজার ঠকঠক আওয়াজ কানে আসতেই ফিরে তাকালেন সুফিয়া বেগম। আফিয়া,উজ্জ্বল, সিমি সবাই মাত্রই আসল, রোহি নিজের রুমেই আছে ইদানীং রুম থেকে বের হয় না সে। সুফিয়া বেগম আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়ে খুলে দিলেন দরজাটা।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ঈশানকে দেখে ভ্রু কুঁচকালেন তিনি। ঈশানের একটা হাতে পুরোপুরি ব্যান্ডেজ করা, অন্য হাতটাও ঠিকঠাক নাড়াতে পারছে না। এতদিন ছিল হসপিটালেই। সুফিয়া বেগম মাঝেমধ্যেই গিয়ে দেখা করতেন ওর সাথে। তাও বাড়ির সবাইকে লুকিয়ে, ঈশানও বুঝতো না উনি লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে আসতেন ওকে। মায়ের মন তো! তাই ছেলে এতো ভুল করেছে জেনেও অসুস্থতার খবর পেয়ে দেখতে গিয়েছিলেন ওকে। তবে এই প্রথমবার ঈশানের এমন অবস্থা দেখে মায়া হচ্ছিল না উনাত। এত বড় ভুল করেছে, জানার পর মায়া হবেই বা কী করে? কটমট কণ্ঠে বললেন সুফিয়া বেগম,
“কি চাই? কেন এসেছ এখানে?”
অসহায় ভঙ্গিতে মায়ের মুখপানে তাকাল ঈশান, বলল উনাকে,
“আমি আর কোথায় যাব আম্মু?”
“তোমার ওই মুখে আমাকে আম্মু ডাকবে না ঈশান। তোমার নামটা নিজের মুখে উচ্চারণ করতেও লজ্জা লাগে আমার।”
ঈশানের রাগ হচ্ছে মনে মনে, কিন্তু ওকে তো আপাতত থাকতে হবে এখানে। ইয়াশ আর ওর উপমাকে শাস্তি না দিলে শান্তি পাবে না সে। ঈশান কি যেন ভেবে হুট করেই বসে পড়ল মেঝেতে। সুফিয়া বেগমের পায়ে পড়ে বলল বারবার,
“আমার ভুল হয়েছে আম্মু। ড্রিংক করে আমার মাথা ঠিক ছিল না, কী করতে কী করেছি আমি নিজেও জানি না। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও আম্মু। আমি কথা দিচ্ছি আর এমন করব না। আমার দ্বারা আর কখনোই কোনো ভুল হবে না।”
উজ্জ্বলের রাগ হলো ঈশানের কথায়, তবুও কিছু বলল না সে। ভালো করেই জানে, ওর শাশুড়ি এখন নিশ্চয়ই গলে যাবেন ছেলের মন ভোলানো কথায়! সত্যি হলো উজ্জ্বলের ভাবনা। ঈশানের আকুতি-মিনতি আর বারবার ক্ষমা চাওয়ায় মন গলল সুফিয়া বেগমের। যতই হোক, কোলেপিঠে করে বড় করেছেন ওকে। আফিয়া আর ইয়াশ যখন ছিলো না তখন তো এই ঈশানকেই আঁকড়ে ধরে বেঁচে ছিলেন তিনি। তাই ঈশানের প্রতি মায়া উনার একটু বেশিই। উজ্জ্বল বাঁকা হাসল, বলল সুফিয়া বেগমের উদ্দেশ্যে,
“দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পালার স্বভাবটা আপনার কখনোই যাবে না চাচি। পরের বার যখন মস্ত বড় কোনো বিপদ ঘটবে এই ছেলের জন্য, তখনই আপনার আর এই বাড়ির সবার শিক্ষা হবে।”
প্রতিউত্তর করলেন না সুফিয়া বেগম, বাকিরাও চুপ রইল। ঈশানকে নিজের রুমে যেতে বলে চলে গেলেন সুফিয়া বেগমও।উজ্জ্বল রেগে বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে।
———-
অন্ধকার রুমে বসে আছে রোহি। গান বাজছে বিছানায় ফেলে রাখা ওর ফোনটাতে,
যাও পাখি যারে উড়ে,
তারে কইও আমার হয়ে,
চোখ জ্বলে যায় দেখবো তারে,
মন চলে যায় অদূর দূরে,
যাও পাখি বলো তারে,
সে যেন ভোলে না মোরে,
সুখে থেকো ভালো থেকো,
মনে রেখো এই আমারে।
ফোনের গানটা বন্ধ হয়ে গেল, রিংটোন বেজে ওঠার শব্দ আসল রোহির কানে। কিন্তু কে কল দিয়েছে, ফোনটা হাতে নিয়েও দেখল না সে। রোহির মনজুড়ে যে বিষণ্ণতা, প্রিয় মানুষকে না-পাওয়ার আক্ষেপ! এত অপূর্ণতা নিয়ে মরে যেতে হবে ভাবলেও নিজের ভাগ্যের উপর হাসি পায় ওর। আল্লাহ কি সব কষ্ট, সব না-পাওয়া ওর ভাগ্যেই লিখেছিলেন? বারবার রিংটোন বেজে কেটে যাচ্ছে। রোহির মনে হলো, এবার কলটা রিসিভ করা দরকার। ফোনটা হাতে নিতেই দেখল ইয়াশের নাম্বার। নিজেকে স্থির করে কল দিল ইয়াশের নাম্বারে। প্রথমবার রিংটোন বাজতেই ইয়াশ রিসিভ করে নিল কলটা। কথা বলল না রোহি, অপেক্ষা করল ইয়াশের কণ্ঠস্বর শুনবে বলে। সত্যি হলো ওর ভাবনা, রোহি কিছু বলার আগেই বলল ইয়াশ,
“কেমন আছো?”
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উচ্চারণ করল রোহি, —- “ভালো।”
“ঠিকমতো ঔষধ খাচ্ছো না কেন রোহি? তুমি তো কখনোই এতটা অবুঝ ছিলে না।”
রোহি বুঝল উজ্জ্বল হয়তো বলেছে ইয়াশকে, ওকে ফোন দিয়ে কথা বলতে। উজ্জ্বল কি ভাবল? ইয়াশের সাথে কথা বললে রোহির মন খারাপ চলে যাবে? উজ্জ্বল হয়তো জানে না রোহির মন খারাপের কারণ, নইলে কি আর বলত ইয়াশকে ওর মন ভালো করার দায়িত্ব নিতে! নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল রোহি,
“ঔষধ খেয়ে কি হবে ইয়াশ? সেই তো মা’রা যাবো।”
ইয়াশের কষ্ট হলো রোহির কথায়। রোহির এই প্রশ্নের উত্তর নেই ওর কাছে, তবুও বলল সান্ত্বনা দিয়ে,
“তোমার কিছুই হবে না রোহি। আমরা সবাই আছি তো!”
মেঝেতে বসে থেকেই, খাটের সাথে মাথাটা এলিয়ে দিল রোহি, বলল দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে,
“সবার দরকার ছিল না ইয়াশ, কেবল তুমি থাকলেই আমার হয়ে যেত। কিন্তু তুমি তো আমার হলে না। তোমাকে না-পাওয়ার আক্ষেপ যে আমার কোনোদিনও যাবে না।”
চোখ বন্ধ করে শ্বাস ছাড়ল ইয়াশ। কী বলে বুঝাবে রোহিকে? এতটা অবুঝ কেন রোহি? ইয়াশই বা কী করবে,ওর হৃদয়ের একমাত্র রানী যে উপমা।ইয়াশের সবটুকু ভালোবাসা কেবল উপমা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ,অন্য কাউকে কীভাবে ভালোবাসবে ইয়াশ? এ যে কোনো কালেই সম্ভব নয়। ইয়াশের নিরবতা দেখে রোহি মুচকি হাসল, বলল ইয়াশকে,
“তুমি আমাকে স্বার্থপর ভাবছো তো ইয়াশ? সত্যিই আমি স্বার্থপর। তোমার ব্যাপারে আমি বরাবরই স্বার্থপর। দেখছ, তোমাকে ভুলে যাবো বলেও আমার পাগল মন কেবল তোমাকে নিয়েই ভাবছে। মৃত্যুর দারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে আমার কী চাই, আমি তোমাকেই চাইব ইয়াশ। যেভাবে তুমি চাইবে উপমাকে!”
বিষ্মিত কন্ঠে বলল ইয়াশ,—-“রোহি!”
রোহি বুঝল ইয়াশ বিরক্ত হচ্ছে ওর কথায় বলল আবারও,
“রাখছি। তোমাকে চেয়ে আমি আর নিজের পাপ বাড়াতে চাই না। তুমি ভালো থেকো ইয়াশ। পৃথিবীর সব ভালো তোমার হোক। তোমার কপালেই সব ভালো জুটুক। আমাকে একটু মনে রেখো ভালোবাসায় না হোক, ঘৃণায়, তবুও প্লিজ মনে রেখো।”
কথাগুলো বলেই বড় বড় শ্বাস ফেলল রোহি। ওর আজকাল শ্বাস নিতেও খুব কষ্ট হয়। ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল রোহি। ইয়াশকে এতক্ষণ কী বলেছে ভেবেও রাগ লাগছে নিজের উপর। ইয়াশ হয়তো বুঝল রোহির অবস্থা কী হয়েছে।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল ইয়াশ, চিন্তিত কণ্ঠে উচ্চারণ করল কেবল,
“রোহি, তুমি অসুস্থ এত কথা বলো না।”
“কলটা কেটে দাও ইয়াশ। আর আমাকে কল দিও না তুমি।”
ইয়াশ শুনল রোহির কথা। কলটা কেটে দিল কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে। আজকে নিজেকে বড় স্বার্থপর লাগছে ইয়াশের কাছে।
রোহিকে যে সে নিজের বোন ভেবেই এসেছে চিরকাল। ওর পাগলামিতে সায় জানায়নি কখনোই। কিন্তু মেয়েটা যে এখনো ওকে পাগলের মতো ভালোবাসে, দেশে না গেলে বুঝতই না ইয়াশ। গিয়েছিল তো তার ভালোবাসাকে খুঁজতে।
কারোর মন ভাঙার কারণ হয়ে ফিরে আসতে হবে,জানা ছিল না ওর।
#চলবে…..

