তোমার_আমার_প্রেম পর্ব – ২৪ লেখনীতে – #রুবাব_ফারহা

0
24

#তোমার_আমার_প্রেম
পর্ব – ২৪
লেখনীতে – #রুবাব_ফারহা
.
রাতের বাকি অংশ কাটলো ঈশানির ছটফটিয়ে।কিছুতেই সে শান্ত হতে পারলো না।রাতের আধার কেটে ভোরের সূর্য উদয় হলো ।ধরণী একটু একটু করে উজ্জ্বল আলোয় ছেয়ে গেলো।ঈশানি আর শুয়ে থাকতে পারলো না।উঠে পড়লো।ফজরের নামাজ পড়ে ছাদে গেলো হাটাহাটি করতে। ছাদে হাঁটতে গিয়ে ঈশানি থেমে গেলো।দূরে একটা মেয়েলি ছায়া।কিছুটা ভয় ও কপাল কুচকালো সে।ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো। বুঝতে পারলো অলিভিয়া দাঁড়িয়ে আছে।ঈশানি কিছু বলার আগেই অলিভিয়া সামনের দিকে তাকিয়েই বলে উঠলো –
“এতো সকালে ওঠা কি তোমার অভ্যাস?নাকি ঘুম আসছে না।”

ঈশানি একটু অবাক হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো –
“তুমি না তাকিয়েও কিভাবে জানলে আমি এসেছি?”

এতক্ষনে ঈশানি অলিভিয়ার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।অলিভিয়া নিরস কন্ঠে বললো –
“আইডিয়া করলাম।”
“এতো আত্মবিশ্বাসের সাথে?”
“তুমিও আমার মতো না ঘুমিয়ে রাত অতিবাহিত করবে আমার মন বলছিলো।”

ঈশানি কিছু বললো না।শুধু চেয়ে থাকলো।কিছুক্ষণ নিরবতা চললো।তারপর ঈশানি সামনে দিকে তাকিয়ে বলে –
“আঙ্কেলের কি হয়েছিলো।”
“স্ট্রোক করেছে।”– অলিভিয়ার শুষ্ক, নিষ্প্রাণ কন্ঠ

ঈশানির এখন এই মুহূর্তে ভীষন মায়া হলো।বাবা – মা হারানোর ব্যথা তো সে জানে।সে তো আরো ছোটবেলায় হারিয়েছে।ঈশানি যেনো কোথাও জুড়ে গেলো অলিভিয়ার দুঃখের সাথে।একটা তপ্ত নিশ্বাস ফেলে ঈশানি অলিভিয়ার হাতের উপর হাত রেখে বলে –
“ভেঙে পড় না আপু। মৃত্যু একটা চিরন্তন অপ্রিয় সত্যি।এটাকে আমাদের সকলের গ্রহণ করতে হবে।দুদিন আগে আর পড়ে।নিজেকে শক্ত করো আপু।ভেঙে পড় না।”

অলিভিয়া চাইলো ঈশানির দিকে।তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে সামনে তাকায়।তারপর বলে –
“এতিমদের ভেঙে পড়তে হয় না ,ঈশানি। এতিমরা ভেঙে পড়লে তাদের শান্তনা দেয়ার মতো কেউ থাকে না।তাই আমি ভেঙে পড়বো না…কারণ আমিও যে এতিম। ”

ঈশানির বুকটা হুহু করে উঠলো।যেনো নিজের প্রতিবিম্ব দেখছে।শরীরের প্রতিটি রন্ধ যেনো মিছিল করে বললো – তুইও তো এতিম।তুই ও নিষ্ঠুর দুনিয়ায় একা।এতিম!

অলিভিয়া চাইলো ঈশানির দিকে আবার।বললো –
“তোমাকে দেখে আজ আমার ভীষন হিংসে হচ্ছে,জানো।”

ঈশানি ধ্যান থেকে বেরোলো।একটু আশ্চর্য্য হয়ে চাইলো।চোখে তার প্রশ্ন।কিন্তু মুখে কিছু বললো না।ঈশানির চাহনি দেখে অলিভিয়া নিজেই আবার বললো –
“আমিও এতিম– তুমিও এতিম ।তবু তুমি পরিপূর্ণ অথচ আমি শূন্য।কেনো এতো তফাৎ বলো তো?”

ঈশানি এবার চুপ হয়ে গেলো।অলিভিয়া আবার বলে –
“তুমি ভীষন ভাগ্যবতী জানো ,ঈশানি।”

ঈশানি জিজ্ঞেস করলো –
“কেনো?মানে কিভাবে?”

অলিভিয়া ম্লান হেসে বললো –
“এই যে বাবা – মা না থেকেও তাদের মতো আশ্রয়,নিজের ঠিকানা না থাকা সত্ত্বেও তুমি পেয়েছো একটা নিরাপদ ঠিকানা।আবার কাউকে না চাইতেই পেয়ে গেছো– যাকে হাজারবার চেয়েও আমি পাইনি।তাহলে বলো তুমি ভাগ্যবতী কি না?

“এদিকে আমাকে দেখো ,যাকে গত ৮ বছর থেকে ভালবাসি, যার বিরহে আমার হৃদয়ে দহন হচ্ছে প্রতি মিনিটে–সেকেন্ডে ,যাকে পাগলের মতো চাইলাম তাকে পেলাম না।উপরন্তু একটা মাত্র শেষ অবলম্বন ছিলো সেটাও নিয়ে গেলো উপরওয়ালা।তাহলে বলো তুমি ভাগ্যবতী কিনা?”

ঈশানি তৃপ্তির হাসি হাসলো।তারপর যেনো বুক ফুলিয়ে বললো –
“হ্যাঁ,ঠিক বলেছো।আমি আসলেই ভাগ্যবতী। সেই ছোট্টবেলায় বাবা – মা হারিয়ে এ বাসায় এসেছিলাম।সেই ছোট্ট বেলায় ছোটমা আমাকে নিজের মেয়ে করে কাছে টেনেছে, চাচ্চু নিজের ছত্রছায়ায় রেখেছে।নাহলে আমি ঈশানি বোধ হয় সে ছোট্টবেলায় হারিয়ে যেতাম অন্ধকারে।”

“আর আরহানকে পেয়ে তুমি ভাগ্যবতী নও?”–অলিভিয়া চট করে প্রশ্নটা করে।

ঈশানির হাসি এবার বিস্তৃত হয়।গায়ের ওড়নাটা আরো আঁটসাঁট করে জড়িয়ে নেয়।তারপর বলে –
“অবশ্যই তাকে পেয়ে আমি পূর্ণ।ভাগ্যবতী। তার মতো একজন মানুষকে পেয়ে যেকোনো মেয়ে নিজেকে ভাগ্যবতী ভাববে।তবে আমি নিজেকে ভাগ্যবতীর থেকে পূর্ণ মনে করি।উনি আমার জীবনকে পূর্ণতা দান করেছে।আমার ভেতরের নিজ সত্তার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়েছে।তার আশেপাশে আমি আমার নিজেকে সবচেয়ে নিরাপদ মনে করি।উনি একজন আদর্শ ছেলে,দায়িত্বপরায়ন স্বামী,একজন পাগললাটে প্রেমিকপুরুষ,আমার পূর্ণতা সবশেষে আমার নিরাপদ আশ্রয়।এমনটা একটা মানুষকে পেয়ে আমি কিভাবে ভাগ্যবতী না হই বলো?
আমি হয়তো ওনাকে বিয়ের আগে হাজারবার চাইনি আপু।তবে বিয়ের পর প্রতি নিঃশ্বাসে আমি রবের কাছে প্রার্থনা করি আমার শেষ নিঃশ্বাস অব্দি যেনো এই মানুষটার ছায়াতলে আমি থাকতে পারি।”

ঈশানির চোখ পানিতে চিকচিক করছে।অলিভিয়া চেয়ে আছে।দুজনেই নিশ্চুপ।সকালের স্নিগ্ধ বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে দুজনকে।একটা শিরশিরে অনুভূতি হচ্ছে।নিস্তব্দ পরিবেশে হঠাৎ আওয়াজে এলো –
“তুমি এখানে কি করছো এতো ভোরে?”

দুজনে পিছনে ফিরলো। আরহান দাড়িয়ে আছে ঘুম ঘুম ফোলা ফোলা চোখ গুলো ডলছে। চুলগুলো এলোমেলো।ঈশানি এগিয়ে গেলো।তারপর বললো –
“আপনি উঠে এসেছেন কেনো?”
“তুমি উঠে এসেছো কেনো?চলো।”

ঈশানির হাত ধরে চলে যেতে নিয়ে আবার পিছু ফিরে চায়। অলিভিয়াকে বলে –
“ঘুমিয়ে পড় গিয়ে।শরীর ক্লান্ত তোর।”

আরহান ঈশানিকে নিয়ে চলে যায়।অলিভিয়া তাদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে –
“এ কি দহনে পুড়াচ্ছি আমি নিজেকে?এটায় কি তবে আমার ভবিতব্য?”
.
চৌধুরী বাড়ির পুরুষগণ চলে গেছে নিজ নিজ কর্মে।বাসায় আছে শুধু মহিলারা– মিনারা বেগম,ঈশানি,ময়না ও অলিভিয়া।অলিভিয়া প্রায় নিষ্প্রাণ হয়ে বসে আছে।পাশেই ছোটমা বসে আছে কাথা নিয়ে।ময়না রান্নাঘরে তরকারি কাটা বাঁচা করছে বোধ হয়।ঈশানি তৈরি হয়ে নেমেছে।কোচিংয়ে যাবে সে।ঈশানি নামতেই মিনারা বেগম চোখ রাঙালেন –
“ঈশু,খেয়ে যা।নাহলে মার খাবি।”

ঈশানি নাকেমুখে কিছু খেয়ে বেরিয়ে পড়লো।অলিভিয়া সেদিক পানে তাকিয়ে রইলো একমনে।
.
অলিভিয়া চৌধুরী বাড়িতে এসেছে তিনদিন আজ।তার বাবার কুলখানির আয়োজনে মিলাদ মাহফিল এবং এতিম বাচ্চাদের খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছিলো ।সেখানেই এসেছে আরহান এবং ঈশানি।ঈশানি এতিমখানার নিষ্পাপ বাচ্চাদের সাথে মিশে গেলো।অনাহারে অনাদরে বড় হওয়া বাচ্চাগুলো আদর যত্ন স্নেহ পেয়ে ঈশানিকে মৌমাছির মতো ঘিরে ধরলো ঈশানিকে।
সেও বাচ্চাদের সাথে মিশে বাচ্চা হয়ে গল্পগুজব ,খেলাধুলায় মগ্ন।

বুকে হাত বেঁধে সেই দৃশ্য দেখে যাচ্ছে আরহান।অলিভিয়া এসে পাশে দাড়ায়। আরহানের দৃষ্টি অবলম্বন করে তাকায় সামনের দিকে।তারপর উদাস গলায় জিজ্ঞেস করে –
“ঈশানিকে ভালোবাসলি কিভাবে?কবে?”

আরহান দৃষ্টি সরায় না।ঈশানির দিকে তাকিয়ে বলে –
” কোনো উত্তপ্ত দুপুরে বোধ হয়।”
“বোধহয়?”
“ভালোবাসা তো দিনকাল ক্ষণ দেখে হয়না।”–দৃষ্টি সরিয়ে অলিভিয়ার দিকে তাকায় একপলক
“আমাকে ভালবাসলি না কেনো তবে?”–খুবই করুণ শোনালো অলিভিয়ার কন্ঠস্বর
আরহান এপর্যায়ে পুরোপুরি দৃষ্টি নিপাত করে অলিভিয়ার দিকে ।তারপর গম্ভীর কন্ঠে বলে-
“তোকে ভালবাসতে কখনো মন সায় দেয়নি।কিন্তু ওকে নিয়ে আমার অবচেতন মন ভাবতো।কেনো ভাবতো জানতাম না,তবুও ভাবতো।কখনো সেই উত্তর খুঁজে দেখিনি।এরপর হঠাৎ করে পরিস্থিতির চাপে বিয়েটা হয়ে গেলো।আমিও ওকে দায়িত্ব হিসেবে মেনে নিলাম আপাতত দৃষ্টিতে কিন্তু সবকিছু পরিবর্তন হতে শুরু করে।আমার অজান্তেই,আমার অগচরেই।ঈশানির প্রতি আমার দৃষ্টি পাল্টে গিয়ে সেখানে স্থান পায় একরাশ মুগ্ধতা,মাদকতা। ওর ব্যথায় ভেজা মুখশ্রী আমার হৃদয়ে বয়ে আনে ছুরির মত তীক্ষ্ণ ক্ষত।তখন মনে হয় ওকে লুকিয়ে রাখি আমার বক্ষস্থলে।একদম অচৈতন্য মনে আমি হারিয়ে গেলাম মেয়েটার মাঝে।”

আরহান এপর্যায়ে চোখ বন্ধ করে ফেললো।যেনো কল্পনায় কিছু দেখে যাচ্ছে।
প্রতিটা কথা যেনো অলিভিয়ার হৃদয়ে ছুরির মতো বিদ্ধ হচ্ছিল।
অথচ সে চুপ। ভিতরে ভিতরে ভেঙে পড়লেও মুখে তবু একটা চাপা হাসি ধরে রাখে।

~চলবে

{ বড্ড অগোছালো আর ছোটো লাগছে কি?আমার লাগছে। নিজেরই শান্তি লাগছে না লিখে।কিন্তু সবটা মুছে লেখার মতো এনার্জি পাচ্ছি না।আজকে একটু মানিয়ে নিন প্লীজ}

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here