সাঝের_প্রণয়ডোর #সাদিয়া_সুলতানা_মনি #পর্ব_১৪

0
25

#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_১৪

হানিয়া মেয়ের খবর নিতে তার রুমে এসেছিলো। কিন্তু রুমে প্রবেশের পূর্বেই সে সব কথা শুনতে পেয়ে যায়। হানিয়ার মাতৃ মন সন্তানের কান্নায় অস্থির হয়ে পড়ে। আশিয়ানের সাথে বিয়ে হওয়ার পর থেকে হায়া’র পরিবর্তন লক্ষ করেছিলো সে। মেয়েটা আগের মতো স্বাভাবিক, চঞ্চল হয়ে উঠছিলো। হঠাৎই আবার নতুন ঝড় এলো মেয়েটার জীবনে।

হায়া ওয়াশরুমের ঢুকে যাওয়ার পর হানিয়া তাদের রুমের দরজায় নক করে। আশিয়ান চকিত দৃষ্টিতে সেদিকে তাকালে তার মাম্মামকে দেখে খানিকটা ঘাবড়ে যায়। তার ভয় হয়, হায়া’র কান্না শুনে যদি তার মাম্মাম আর বাবাই তাকে ভুল বুঝে পুতুল বউটাকে নিয়ে যায় তার কাছ থেকে?

আশিয়ান নিজের ঘাবড়ে যাওয়াটা লুকিয়ে স্বাভাবিক হয়ে বলে–

—মাম্মাম আসো ভেতরে।

হানিয়া গুটিগুটি পায়ে রুমের ভেতরে প্রবেশ করে। রুমে প্রবেশের শুরুতেই তার নজরে আসে ফ্লোরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকা খাবারের দিকে। বুক চিঁড়ে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে তার।

আশিয়ান খাবার পড়ে যাওয়ার বিষয়টা ধামাচাপা দিতে বলে–

—আসলে মাম্মাম, আমার হাত থেকে পড়ে গিয়েছে খাবারটা এক্সিডেন্টলি। তুমি বসো, হায়া তো ওয়াশরুমের গিয়েছে আমি আরেক প্লেট খাবার নিয়ে আসছি।

কথাটা বলে আশিয়ান তড়িঘড়ি করে বের হতে নিবে তখনই হানিয়া তাকে থামিয়ে দেয়। সে আশিয়ানের হাত ধরে তাঁকে বেলকনিতে নিয়ে যায়। তারপর বলে–

—আমি বুঝতে পারছি তোমাদের মধ্যে সমস্যা হয়েছে কোন বিষয়ে।

—না মাম্মাম তেমন….

আশিয়ানকে থামিয়ে দিয়ে হানিয়া বলে–

—আমায় আগে শেষ করতে দাও। আমি জানতে চাই না তোমাদের স্বামী-স্ত্রী’র মধ্যকার ঘটনা। কিন্তু বাবা তোমার কাছে আমার একটাই অনুরোধ, আমার মেয়েটাকে আর কষ্ট দিও না। একবার ওর হৃদয় ভেঙেছিলো, একেবারে চূর্ণ হয়ে গিয়েছিলো… আমরা জানি, কেমন করে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া মেয়েটাকে আবার জোড়া লাগিয়েছি। আর এই সমাজ কথা তো তুমি জানোই। ওদের কাজই তো মেয়েদের দগ্ধানো, ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দেওয়া।

আমার মেয়েটা ছোটবেলা থেকে প্রাণোচ্ছল ছিল, উচ্ছল বাতাসের মতো দৌড়ে বেড়াতো। এখন? কেউ কিছু বলবে ভেবে হাসতেও ভয় পায়। দুষ্টুমি করতে ভুলে গেছে, কারণ সমাজ তাতেও দোষ খুঁজবে। ওর চোখের তারায় যে আলো ছিল, সেটা নিভে গেছে। আমার মেয়ে বাঁচতে ভুলে গেছে…।

কথাগুলো বলতে বলতে হানিয়ার চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরে। আশিয়ান ভেতরে অপরাধবোধ’টা আরো প্রখর হয়ে উঠে। ছোট বেলার একটা জেদকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে সে একটা হাসিখুশি ফ্যামিলিকে বিষাদের সাগরে ডুবিয়ে চলে গিয়েছিলো নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে। যে মাম্মাম-বাবাই তাকে নিজেদের সন্তানের মতো ভালোবাসতো তাদেরও অপমানিত হতে হয়েছে শুধু মাত্র তার একটি ভুল সিদ্ধান্তের জন্য। এই অপরাধবোধ জাগ্রত হয়েছে তার কয়েক বছর আগেই। সেই থেকে এই পর্যন্ত সে ভেতরে কুঁড়ে কুড়ে মরছে অপরাধবোধে।

আশিয়ান হানিয়া’র চোখের পানি মুছে দেয়। তারপর নিজের হাতের মুখে থাকা হানিয়া’র হাতটায় একটা চুম্বন করে বলে–

—আমি জানি আমার করা ভুলের ক্ষমা হয় না। কিন্তু আমি এটাও জানি আমার মাম্মাম-বাবাই আমাকে তাদের সন্তানের মতো ভালোবাসে। আর সন্তান’রা ভুল করলে বাবা-মায়েরা তো তাদের হালকা বকাঝকা করে ক্ষমা করে দেয়, সেক্ষেত্রে আমায়ও ক্ষমা করে দিও তোমরা। আর হায়া? তাকে তো আমি এ জীবনে আর ছাড়ছি না। আমি তোমায় কথা দিলাম মাম্মাম তাকে যতটা কষ্ট দিয়েছি তার চেয়েও দ্বিগুণ ভালোবাসা দিয়ে তার অতীতের সব কষ্ট ভুলিয়ে দিবো। একদিন সে নিজে তোমাদের বলবে সে আমার সাথে কতটা সুখে আছে। মিলিয়ে নিও আমার কথাটা তুমি।

হানিয়া’র মনে চলতে থাকা ঝড়টা যেন নিমিষেই শান্ত হয়ে যায়। সে আশিয়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে তার অগোছালো চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে বলে–

—দোয়া করি বাবা তোমরা সুখী হও। সন্তানরা সুখে থাকলেই বাবা-মায়েদের কোন কষ্ট থাকে না আর। নিজেদের মাঝের ভুল বুঝাবুঝি হলে সেটা সাথে সাথে আলোচনা করে মিটিয়ে নিবে। নাহয় এই ছোট ভুল বুঝাবুঝি একসময় তোমাদের বিচ্ছেদের কারণ হয়ে উঠবে। সম্পর্কে কখনো তৃতীয় ব্যক্তিকে প্রবেশ করতে দিবে না ভুলেও, তাহলে তোমাদের সুন্দর সম্পর্কটায় জাহান্নামের আগুন লেগে যাে। দু’জনই চেষ্টা করবে পার্টনারের মনের অবস্থা বুঝার।

—আচ্ছা মাম্মাম আমি চেষ্টা করবো তোমার পরামর্শগুলো মেনে চলার।

তাদের কথাবার্তার মাঝেই হায়া ফ্রেশ হয়ে বের হয় ওয়াশরুম থেকে। হানিয়া আর আশিয়ান রুমে চলে এসে দেখে হায়া নিচে পরে থাকা খাবারগুলো উঠাচ্ছে। আশিয়ান হায়া’কে নিচ থেকে দাড় করিয়ে বেডে বসিয়ে দেয়। তারপর গম্ভীর গলায় বলে–

—সার্ভেন্ট আছে আমাদের বাড়িতে। তারা করতে পারবে কাজটা। তোমায় আধভাঙা পা নিয়ে কষ্ট করে এসব উঠাতে কেউ বলেনি।

—ফেলেছি আমি তাই আমিই উঠাবো।

আশিয়ান চোখ গরম করে বলে–

—মুখে মুখে কথা বললে আধভাঙা পা’টা পুরো ভেঙে বসিয়ে রাখবো। চুপচাপ বসে থাকবে এখানে, আমি খাবার এনে দিলে মাম্মামের হাতে ভদ্র মেয়ের মতো খেয়ে নিবে। আমার আবার ভার্সিটিতে যেতে হবে।

হায়া’র এমনিতেই ভালো লাগছিলো না তাই আশিয়ানের কথার উপর কোন কথা বলে না। হায়া’কে চুপ করে থাকতে দেখে আশিয়ান বুঝে নেয় তার জবাব কি। সেও রুম থেকে বের হয়ে নিচে এসে আরেক প্লেট খাবার নিয়ে হানিয়াকে দেয়। হায়া হানিয়া’র হাতে চুপচাপ খাচ্ছে দেখে আশিয়ান বের হয়ে ভার্সিটির উদ্দেশ্য রওনা হয়।

গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে তার মনে পড়ে যায় কিছু অজানা অতীত যেটা কেবল সে এবং আফিফ ব্যতীত আর কেউ জানে না।

________________

অতীত~

মাস্টার্স শেষ করেই পিএইচডি করার জন্য বিদেশের এক নামকরা ভার্সিটিতে আবেদন করেছিলো সকলকে গোপন করে। সে মূলত সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলো তার পরিবারকে। কিছুদিন পর তার আবেদন গ্রহণ করে তাকে সেই ভার্সিটি থেকে ডাকা হয়। সে এই কথাটা জানানোর আগেই তার দাদু অর্থাৎ মি.মির্জা তার আর হায়া’র বিয়ের কথা উঠায়। সকলে তাকে জোর করে তার অপছন্দের মেয়েটির সাথে বিয়ে দিতে চাওয়ায় আশিয়ানের জেদ চেপে বসে। সে তার বিদেশে যাওয়া সম্পর্কে কাউকে জানায় না। এবং গোপনে পাসপোর্ট, ভিসা রেডি করতে দেয়।

সবশেষে যেদিন তাদের বিয়ে ছিলো সেই একই দিনে তার লন্ডনের যাওয়ার ফ্লাইট ছিলো। সে হায়া বা তার পরিবারের কথা না ভেবেই কাউকে না জানিয়েই চলে যায় লন্ডন। তার এসব কথা জানতো আশিয়ানের বেস্টফ্রেন্ড আফিফ। সে আশিয়ানকে নানান ভাবে বুঝায় এমনটা না করতে কিন্তু আশিয়ান তার অন্ধ জেদের বশবর্তী হয়ে কোন চিন্তা ভাবনা ছাড়াই কাজটা করে ফেলে। আফিফ তার লন্ডনে যাওয়ার কথা পরিবারের সকলকে বলে দিতে চাইলেও আশিয়ান তাদের বন্ধুত্বের কসম দিয়ে কথাটা চেপে রাখে।

আশিয়ান যখন লন্ডন ফ্লাইটে রওনা হয়েছে স্বপ্ন পূরণের উদ্দেশ্য তখন মির্জা বাড়িতে তাকে খুঁজতে খুঁজতে সবার পাগল হয়ে যাওয়ার উপক্রম। সকলে আফিফকে চেপে ধরলে আফিফ আমতা আমতা করে আশিয়ানের লন্ডনে যাওয়ার কথা বলে দেয়।

মি.মির্জা আশিয়ানের এহেন কাণ্ডে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী পড়ে। তালুকদার বাড়িতে তখন আরেক ঝড় চলছে। পরিবারের এমন ভয়াবহ অবস্থা দেখে আবরার কঠোর মনে সিদ্ধান্ত নেয় যে সে আশিয়ানকে ত্যাজ্য করবে।

আশিয়ান বিদেশে গিয়ে প্রথম কয়েকদিন পরিবারের উপর জেদ করে ভালো থাকার চেষ্টা করে ঠিকই কিন্তু কয়েকদিন পর সে বুঝতে পেরে যায় পরিবার ছাড়া কেউ কখনো ভালো থাকতে পারে না।

সে আফিফের মাধ্যমে পরিবারের খবর জানতে পারলে সে আরো বিচলিত হয়ে পড়ে। সেখানে যাওয়ার ছয়মাস পর সে বাড়িতে ফোন করে। স্পর্শ মা হয়েও প্রথম প্রথম কথা বলে নি, আশিয়ানের কণ্ঠ শুনলেই ফোন কেটে দিতো। তারপর একটা সময় আর মুখ ফিরিয়ে রাখতে পারে না সন্তানের থেকে। একটা মাত্র সন্তান হওয়ায় সে তার মায়ের বেশিই প্রিয় ছিলো। কিন্তু আবরার তার জেদে অটল ছিলো। সে প্রায় দুই বছর আশিয়ানের সাথে কোন কথা বলেনি।

আশিয়ান জাভিয়ান-হানিয়াকেও ফোন করে তাদের থেকে মাফ চায় এমন কাজ করার জন্য। হায়া’র সাথে কথা বলতে চাইলে জাভিয়ান তাকে নিষেধ করে এবিষয়ে তার সাথে কথা বলার জন্য। আশিয়ান আফিফের মাধ্যমে ইতিমধ্যে জানতে পেরেছিলো হায়া’র কথা।

কেটে যায় দু’টো বছর। একদিন একটা ফ্যামিলি গেট-টুগেদারের ছবিতে সকলের সাথে হাস্যোজ্জ্বল হায়া’কে দেখে আশিয়ান প্রথমবারের মতো থমকে যায়। হায়া’র মলিন মুখে জোড়া তালির হাসিটা আশিয়ানের মন কেড়ে নেয়। এর আগে সে হায়া’র জন্য কিছু ফিল না করলেও সেদিন থেকে ফিল করা শুরু করে।

সেই পোস্টটা ছিলো আদিবার। সে আদিবার কাছ থেকে হায়া’র আইডিটা নেয়। দোনামোনা করতে করতে একসময় রিকুয়েষ্ট পাঠালেও হায়া তার রিকুয়েষ্ট এক্সেপ্ট করে না। মেসেজ দিলে রিপ্লাই তো করেই না বরংচ আশিয়ানকে ব্লক করে দেয়। আশিয়ানের জেদ চেপে বসে হায়া’র সাথে কথা বলার। সে একটা ফেইক আইডি খুলে মেয়ের নাম দিয়ে। সেই আইডি দিয়ে রিকুয়েষ্ট পাঠালে হায়া এক্সেপ্ট করে।

এরপর থেকে সেই আগ বাড়িয়ে হায়া’র সাথে প্রায়ই কথা বলতো। হায়া তাকে মেয়ে ভেবে কথা বলতো। অনেক কিছুই শেয়ার করতো। একদিন আশিয়ান সাহস করে হায়া’কে জিজ্ঞেস করে–

—তুমি কি কাউকে ভালোবাসো বা পছন্দ করো হায়া?

প্রশ্ন শুনে হায়া কিছু সময়ের জন্য থমকে গিয়েছিলো। ভালো তো বেসে ছিলো একজনকে, নিজের কিশোরী বয়সের আবেগকে ভালোবাসা ভেবে বলেও দিয়েছিলে মনের কথা। তারপর কি হলো? সে তাকে বিশ্রী ভাবে প্রত্যাখ্যান করে, ভরা বিয়ের আসরে ফেলে চলে গিয়েছিলো তাকে ছেড়ে।

হায়া একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলে –

—না আমি কাউকে ভালোবাসি না আর না-ই বা পছন্দ করি। আমার সকল ভালোবাসা, ভালোলাগা আমার স্বামীর জন্য হবে। যে আমাকে আমার পাপার পর আমার সব সখ, আহ্লাদ, রাগ, জেদ সহ্য করবে।

কথাটা শুনে আশিয়ানের মিশ্র অনুভূতি হয়। সে কথাটা আরেকটু বাড়াতে চাইলে হায়া কথা কাটিয়ে দিয়ে অন্য কথায় চলে যায়।

এভাবে আরো একটা বছর চলে যায়। ইতিমধ্যে আশিয়ান হায়া’র প্রেমে পড়ে গিয়েছে। সে তার পরিবারকে জানাতে চায় সে হায়া’কে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু তার আগেই উপরওয়ালা তার ভুলের শাস্তি দিয়ে দেয়।

একদিন ল্যাব থেকে বাসায় ফিরে এসে ফোনটা হাতে নিয়ে ফেসবুকে ঢুকলে হায়া’র একটা স্ট্যাটাস দেখতে পায়। যেটা দেখে আশিয়ান হতভম্ব হয়ে যায়। হায়া তার ফেসবুকের রিলেশনশিপ স্ট্যাটাসে এনগেজড দিয়েছে আর তার ও ফারাবির এনগেজমেন্টের ছবি আপলোড করেছে।

~চলবে?

[অতীত নিয়ে আরেকটু বাকি আছে। আশা করছি কালকের পর্বেই শেষ হয়ে যাবে।

ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স 🤍]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here