#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_১৫
একদিন ল্যাব থেকে বাসায় ফিরে এসে ফোনটা হাতে নিয়ে ফেসবুকে ঢুকলে হায়া’র একটা স্ট্যাটাস দেখতে পায়। যেটা দেখে আশিয়ান হতভম্ব হয়ে যায়। হায়া তার ফেসবুকের রিলেশনশিপ স্ট্যাটাসে এনগেজড দিয়েছে আর তার ও ফারাবির এনগেজমেন্টের ছবি আপলোড করেছে। ফারাবি’র হাতের উপর হায়া ছোট্ট হাতটা দেখে আশিয়ানের বুকে জ্বলন শুরু হয়। সে তার ফোনটা ছুড়ে ফেলে দূরে।
সে বিশ্বাসই করতে পারছে না হায়া আজ থেকে অন্য কারো বাগদত্তা। নিজেকে শান্ত করার জন্য সে ওয়াশরুমের গিয়ে শাওয়ার ছেড়ে ভিজতে থাকে। এমনিতেই লন্ডনের আবহাওয়া ঠান্ডা, সেই ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় আবার ঠাণ্ডা পানিতে শাওয়ার নিয়ে দুইদিন জ্বরেও ভুগেছিলো আশিয়ান।
আশিয়ান শাওয়ার শেষ করে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আফিফকে কল লাগায়। সে জানে আফিফই তাকে নির্ভুল সব তথ্য দিতে পারবে। আফিফের থেকে সে জানতে পারে হায়া’র এখন বিয়ে বা এনগেজমেন্ট করার কোন ইচ্ছে ছিলো না। মূলত ফারাবি’র পাগলামির কারণে তার বাবা-মা জাভিয়ান ও হানিয়া’কে অনেক জোর করায় তারা এখন এনগেজমেন্ট করে রাখছে। কিন্তু বিয়েটা হায়া’র ইচ্ছে মতো সময়ে হবে। যেহেতু হায়া তখনও বিবাহ ভীতি থেকে বের হতে পারে নি তাই ফারাবি ও তার পরিবার তাই মেনে নিয়েছিলো।
আশিয়ান এটা শুনে স্বস্তি পায় যে হায়া এই বিয়েতে রাজি না। কিন্তু তার মনে এই ভয়টাও থেকে যায় যে, হায়া যদি ফারাবি’র প্রেমে পরে যায়? তাহলে তো সে বিয়ে না করেই বউ হারা হয়ে যাবে।
এরপর থেকে সে তার রিসার্চে বেশি মনোযোগ দিতে থাকে, যাতে রিসার্চটা তাড়াতাড়ি সফল করে সে দেশে ব্যাক করতে পারে। এর আগে সে লন্ডনের একটা কলেজে লেকচারা হিসেবে জব করলেও পরবর্তীতে সেই জবটাও ছেড়ে দিয়ে নিজের পুরো ধ্যাণ জ্ঞানে রাখে শুধু তার রিসার্চকে। হায়া’র সাথে নিয়মিত কথা বলা ও নিজের রিসার্চ নিয়ে গবেষণা করতে করতে কবে যে আরো দেড়টা বছর চলে যায় আশিয়ান টেরও পায় না। তার রিসার্চ খুব ভালোভাবে সফল হয় এবং সে সকলের কাছে বেশ প্রশংসিত হয়। এবার পালা দেশে ফিরে তার না হওয়া বউকে বিয়ে করার।
আশিয়ান যেভাবে কাউকে না জানিয়েই চলে গিয়েছিলো দূর দেশে, সেভাবে সে না জানিয়ে পুনরায় ফিরে আসে। আশিয়ান আর হায়া’র বিয়ের ছয় মাস আগে সে দেশে ফিরে। হায়া কিন্তু তখনও আশিয়ানকে দেখে নি। আশিয়ান জানে সে যেই ভুলটা করেছে তার কোন ক্ষমা হয় না, কিন্তু সে আগের বিষয়টা নিয়ে মন থেকে অনুতপ্ত এবং এবার সে হায়া’কে মন থেকে নিজের বউ হিসেবে মেনে নিতে চায়।
সে হায়া’র কাছাকাছি থাকার জন্য হায়া’র ভার্সিটিতে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করে। প্রথমদিন আশিয়ানকে দেখে হায়া ভেতরে ভেতরে রাগে, ক্ষোভে ফেটে পরলেও তার বাহিরটা ছিলো বরাবরের মতো শান্ত। সে আশিয়ানকে শুধু তার শিক্ষক ব্যতীত আর কিছু মনে করত না। আশিয়ান দেশে আসার পর একটা দিনও হায়া মির্জা বাড়িতে যায় নি।
একদিন আশিয়ান ক্লাস শেষ করে টিচার্সরুমের দিকে যাচ্ছিল তখনই তার নজরে পড়ে ফারাবি কোন একটা বিষয় নিয়ে হায়া’র সাথে ঝামেলা করছে। এক পর্যায়ে ফারাবি হায়ার হাত ধরে টানাটানি শুরু করলে তার মেজাজ গরম হয়ে যায়। সে দ্রুত সেখানে তাদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে–
—এখানে কি হচ্ছে?
আশিয়ানের এমন অপ্রত্যাশিত আগমনে হায়া-ফারাবি দুইজনই অবাক হয়ে যায়। ফারাবি কিছু বলার আগেই হায়া শক্ত গলায় বলে–
—কিছু না স্যার। আমাদের পারসোনাল ম্যাটার তাই আপনাকে জানাতে চাচ্ছিলাম না।
হায়া’র কথাটা শুনে আশিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে। সে হায়া’কে প্রতিত্তোরে কিছু বলবে তার আগেই হায়া ফারাবি’র হাত টানতে টানতে তার সামনে থেকে চলে যায়। সেদিনই আশিয়ান ঠিক করে নেয় সে যেভাবেই হোক হায়া’কেই বিয়ে করবে।
তার কিছুদিন পরই শুনতে পায় হায়া আর ফারাবি’র বিয়ে। আশিয়ান এমন সংবাদ শুনে বিচলিত না হয়ে ঠাণ্ডা মাথায় আফিফের সাথে প্ল্যান করে কিভাবে ফারাবি’কে সরিয়ে আশিয়ান বর হবে। আফিফ তাকে এমন কাজে সাহায্য করতে চায় না। কিন্তু আশিয়ান যেনো তেনো ভাবে তাকে রাজি করিয়ে নেয়।
প্ল্যান অনুযায়ী বিয়ের দিন ফারাবি’র এসএসসি পড়ুয়া বোনকে তারা কিডন্যাপ করায়। আর ফারাবি ও তার পরিবারকে হুমকি দেয় তারা যাতে আজ বিয়েতে না যায়। ফারাবি’র পরিবার নিজেদের মেয়েকে বাঁচাতে বিয়ের দিন আসে না।
এদিকে দ্বিতীয় বার মেয়ের বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে দেখে জাভিয়ান না পেরে আশিয়ান দের কাছে হায়া’র বিয়ের প্রস্তাব রাখে। আশিয়ান এমন সুযোগ হাতে পেয়ে তা চটজলদি লুফে নেয়। হায়া এমন কথা শুনে বলেছিলো–
—আমি সারাজীবন কুমারী থাকবো কিন্তু তাও এই লোকের সাথে বিয়ে করবো না। তোমরা আমায় বারবার বিয়ে নিয়ে এমন চাপ দিতে পারো না।
কিন্তু সেদিন তার কথা কেউ শুনেনি। সবাই নানান ভাবে বুঝানোর পরও যখন হায়া রাজি হচ্ছিলো না তখন জাভিয়ানের হায়া’কে নিজের কসম দেয় বিয়েটা করার জন্য। জাভিয়ান যেমন মেয়ে অন্ত প্রাণ, হায়াও তেমন বাবা বলতে পাগল। সেদিন বাবার কসমের কারণেই হায়া বিয়েটা করেছিলো।
আশিয়ান তার ও হায়া’র বিয়ের দু’দিন পরই ফারাবি’র বোনকে ছেড়ে দিয়েছিলো। তার এসব অপকর্মে কথা আফিফ ব্যতীত আর কেউ জানে না।
_________________
বর্তমান~
আশিয়ান গাড়ি চালাতে চালাতে বিড়বিড়িয়ে বলে–
— ❝তোমায় পাবার তৃষ্ণায় যদি নিজেকে হারিয়ে ফেলতে হয়, তাও রাজি আমি,
পৃথিবী জ্বালিয়ে ছাই করে দিলেও, শেষ ছাইয়েও খুঁজে নেবো তোমায় আমি,
কারণ আমার সব শেষ, সব শুরু—তুমি, শুধুই তুমি।❞
________________
রাহাতের হাতে ঘড়িটা পরিয়ে দিয়ে মুনতাহা একটু পেছনে সরো দাঁড়ায়। রাহাত শেষবারের মতো চুলে চিরুনি চালিয়ে নিয়ে মুনতাহা’র মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে বলে–
—মেয়েরটার তো বয়স কম হলো না, ইদানীং ওর বিয়ে নিয়ে ভাবছি।
মুনতাহা স্বামীর এহেন কথা শুনে একটু অবাকই হন বটে। কারণ কয়েকমাস আগেও তিনি এবিষয়ে রাহাতকে বললে রাহাত জানায় সে এখনি মেয়ের বিয়ে দিবেন না। মেয়েকে সে অনেক দূর পর্যন্ত পড়াতে চান। কিন্তু সেই রাহাত আজ এমনটা বলছে শুনে তার অবাক হওয়া। তাও সে হাসি মুখে বলে–
—বেশ তো। আমি কি ঘটক ডাকবো? নাকি আপনার কোন ছেলেকে আমাদের মেয়ের জন্য পছন্দ হয়েছে?
রাহাত পকেটে ফোন ঢুকাতে ঢুকাতে বলে–
—মেয়ের মনে যে একজন আছে সেটা কি জানো?
মুনতাহা অবাক হয়ে বলে–
—না তো। রাহা তো আমায় এমন কিছু জানায় নি।
—তা জানবে কেনো। মেয়ের কোন খবরই তো জানো না। কিছুদিন আগে যে অসুস্থ হয়ে পরলো সেটাও এই কারণেই হয়েছিলো।
ভীষণ বিতৃষ্ণা নিয়ে কথাগুলো বলে রাহাত। মুনতাহা বিচলিত হয়ে বলে–
—তাহলে তো জল অনেক দূর গড়িয়ে পরেছে। তাড়াতাড়ি ওর একটা ব্যবস্থা করতে হবে। আচ্ছা, আপনাকে কি রাহা বলেছে ও কোন ছেলেকে পছন্দ করে?
—হুম। এবং সে আমাদের চেনাজানার মধ্যেই। এখন আসছি। বাকি কথা রাতে এসে বলবো।
রাহাত মুনতাহার মনে সাসপে ঢুকিয়ে দিয়ে চলে যায়। মুনতাহা তার পেছন ডাকতে নিয়েও ডাকে না। চিন্তায় পরে যায় সেই ছেলেটি কে যাকে তার মেয়ে মন দিয়ে বসে আছে?
____________________
এপ্রিলের খর রোদ যেন আগুন হয়ে ঝরে পড়ে আকাশ থেকে। গোটা প্রাণীকুলই হাঁসফাঁস করে এই অসহনীয় উত্তাপে। যতই বেলা বাড়ে, সূর্য ততই রুদ্ররূপ ধারণ করে—তার প্রখর তেজে যেন পুড়ে যায় ধরণী। বিকেলের দিকে সূর্য যখন পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ে, তখন তাপমাত্রা কিছুটা কমে বটে, কিন্তু আরাম মেলে না একটুও।
সূর্য অস্ত গেলেও বাতাসে জমে থাকে একধরনের ভ্যাপসা ক্লান্তি, শরীর-মনের উপর যেন চেপে বসে এক অদৃশ্য ভার। বিত্তবানদের জন্য হয়তো এই গ্রীষ্ম কেবলই একটি ঋতু, যাকে তারা এয়ার কন্ডিশনের ঠাণ্ডা পরশে উপেক্ষা করতে পারে। কিন্তু মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের কাছে এই গ্রীষ্ম এক ধরণের দুঃসহ পরীক্ষার নাম—ঘামে ভেজা বিছানা, নিঃস্ব প্রাচীর আর ক্লান্ত শরীরের দীর্ঘশ্বাসেই যেন মিশে থাকে তাদের গ্রীষ্মের দিনলিপি।
দুপুরের আহার্য সম্পাদন করার পর হায়া’র মাথা ব্যথা থাকায় সে হালকা ডোজের একটা ঘুমের ঔষধ নেয় যার কারণে সেই যে দুপুরে ঘুমিয়েছে, সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ার পরও হায়া’র ঘুম ভাঙে নি।
আশিয়ান বাসায় এসে তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় পায়। সে নিজের মতো ফ্রেশ হয়ে নিচে গিয়ে হালকা নাস্তা করে উপরে চলে আসে। হায়া জেগে থাকলে এতক্ষণে তাদের ঠুকনাঠুকনি শুরু হয়ে যেতো। হায়া যেহেতু ঘুমন্ত তাই আশিয়ানও নিজের জন্য ঘুমটা ফরজ করে নেয়। সে আস্তে আস্তে বেডে উঠে হায়া’র বুকের উপর শুয়ে তার কোমড় দুই হাতে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে নেয়।
আশিয়ানের কাঁধে এক পাহাড় সমান কাজ। ভার্সিটিতে টেস্ট এক্সাম চলছে সেগুলোর খাতা কাটা লাগবে। তার উপর বাবার কোম্পানিতে একটা নতুন প্রজেক্টে সেও হাত লাগাচ্ছে এবার সেটারও বহু কাজ বাকি। কিন্তু সে সব কাজ ফেলে বউয়ের বুকে মুখ গুঁজে একটা শান্তির ঘুম দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। শরীর ক্লান্ত থাকায় অল্প কিছু সময়ের ব্যবধানে আশিয়ান ঘুমিয়েও পড়ে। ঘুমন্ত হায়া নিজের অজান্তেই স্বামীকে আরো শক্ত করে নিজের সাথে আগলে নেয়।
~চলবে?
[ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স 😘]

