চূর্ণচূড়ায়_চাঁদের_পাহাড় লেখনিতে— #সৈয়দ_মারিয়াহ্_হামিদ ১৬.

0
29

#চূর্ণচূড়ায়_চাঁদের_পাহাড়
লেখনিতে— #সৈয়দ_মারিয়াহ্_হামিদ

১৬.
মন খারাপ নিয়ে উঠে পরলো তুলি। সাইরও দেরি না করে ওঠে দাঁড়ালো। তুলি রান্নাঘরের দিকে গেলো। সাইরও তার পিছু পিছু যাবে তখনই জমিদার ডাক দিল„ —“সাইর এদিকে আসো। তোমার সাথে জরুরি কিছু কথা আছে।”

সাইর দাঁড়াল। উল্টো ঘুরে তার বাবা জমিদারের দিকে ফিরে এলো। তাকে নিয়ে জমিদার নিজের ঘরের দিকে গেলো। তুলি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে জমিদার বাড়ির উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালো।

খাবার শেষে সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। জমিদার বাড়ির উঠোনে বড় বড় গাছের ফাঁক পেরিয়ে তখন রোদের নরম আলো এসে পড়ছে। আমগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো মাটিতে টিপটিপ গোল গোল দাগ এঁকে দিচ্ছে। কয়েকটা মুরগি ও তাদের ছানারা উঠোনে খাবার কুড়োচ্ছে। তুলব বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখছে সেগুলো। মাথা তুলে তাকাতেই দেখলো দূরে গরুর দড়ি ধরে গরুকে গোয়ালে নিয়ে যাচ্ছে মধুরী।

দ্রুত উঠে এগিয়ে গেলো মায়ের কাছে। হাত থেকে গরুর দড়িটা কেরে নিয়ে বলল„ —“মা এসব কি করছো তুমি? কে করতে বলেছে এসব তোমায়?”

মাধুরী আমতা আমতা করল„ —“মাইয়ারে শ্বশুড় বাড়িতে পাঠাইছি। মাইয়ার লগে আমরা বাপ-মাও আইছি। এসব কাম করলে কিছু হয় না মা। তুই ভেতরে যা।”

তুলি কর্কশ গলায় বলল„ —“মেয়েকে বিয়ে দিয়ে যদি মেয়ের শ্বশুড় বাড়িতে কামলা হতে হয়। তাহলে বিয়ে কেন দিলে তোমরা? তার চেয়ে ভালো গলায় দড়ি দিয়ে মরে যেতাম।”

গাল বেয়ে দুফোটা পানি গড়িয়ে পরলো তুলির। মাধুরী নিজের আঁচল দিয়ে মেয়ের চোখের পানি মুছে দিলো। তুলির হাত থেকে দড়িটা নিয়ে বলল„ —“তুই ঘরে যা মা। এসব আমি করে নেবো। তুই জামাইয়ের সাথে সুখে থাক।”

তুলি আরও রেগে গেলো„ —“না আমি এখান থেকে নড়ব আর না তোমাকে নড়তে দিবো। দেখি কে এখানে এসে তোমাকে কাজ করায়।”

পেছন থেকে গম্ভীর গলা ভেসে এলো„ —“আমি।”

তুলি পেছনে ফিরলো। জমিদার দাঁড়িয়ে আছে। সাদা পাঞ্জাবি‚ ঢিলেঢালা পাজামা আর ডান কাঁধে ঝোলানো সাহেবী গামছা। ডান হাতে তামাক নিয়ে বুকে হাত গুঁজিয়ে রেআেছে আর বামে হাতে শক্ত একটা লাঠি। যেটায় ওনি ভর করে আছেন।

জমিদার গম্ভীর গলায় বলল„ —“আমি এসেছি তোমার মাকে কাজ করাতে। তুমি আটকাবে আমায়?”

তুলি মাথা নত করলো। আর যাই হোক বড়দের সামনে তর্কা করার শিক্ষা দেয় নি তারেক। বাবার নীতি আদর্শ মেনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো জমিদারের সামনে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে কোনো কয়েদ থেকে পালানো বড়সড় আসামী।

হঠাৎই কোথা থেকে সাইর এলো। তুলিকে অবাক করে দিয়ে মাধুরীর হাত থেকে গরুর দড়িটা নিলো। জমিদার সন্মুখে দাঁড়িয়ে বলল„ —“মেয়ের দেনমোহর নিয়ে আপনি চিন্তিত হলেও আমি নই। কেননা আপনি মোহর পরিশোধ না করেই ছেলের বউকে বাড়ি এনেছেন। যদি আপনি তাদের পাওনা মোহর পরিশোধ করেন তাহলে এতদিনে ওনার আপনার থেকেও ধ্বনি হয়ে যেতো। শুধু শরীরে পোশাক আর আচার-আচরণ ধ্বনির মতো হলেই হয় না। ধ্বনি হতে গেলো বড় একটা মন লাগে। আপনার তো পিঁপড়ার মন। লোকের মর্ম বুঝবেন না আপনি।”

জমিদার স্তব্ধ হয়ে গেলো। সাইর সামান্য একটা গরীব ভিক্ষারির জন্য তাকে এভাবে কথা শুনালো। ব্যাপারটা হজম করতে পারলো না জমিদার। পেছনে ফিরে পায়ের গটগট শব্দ তুলে বাড়ির দিকে চলে গেলো। সাইর গরুটাকে টেনে গোয়াল ঘরে রেখে দিলো। মাধুরী আর তুলি শুধু হতবাক হয়ে সবকিছু দেখতে লাগলো। সাইর পুনরায় তাদের কাছে ফিরে এসে তুলির পাশে দাঁড়ালো। হাত কচলে বলল„ —“কিছু মনে করবেন না আম্মা। আমার আব্বা তরফ থেকে আমি মাফ চাইছি। পরবর্তী আপনি আর এসব কোনো কাজ করবেন না।”

মাধুরী সাইরের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল„ —“আমার মেয়ের ভাগ্যটা বেশ ভালো বাবা। ও যে তোমার মতো বর পেয়েছে এটাই অনেক।”

সাইর মাধুরীর পা ছুঁইয়ে সালাম করলো। তুলি এতক্ষণ তাকিয়ে ছিল সাইরের দিকে। সাইর বাড়ির ভেতরে যেতেই সে বিরবির করে বলল„ —“এটা কি ওনিই নাকি কোনো মায়াবী মোমের পুতুল। মানুষ এত অভিনয় কিভাবে করতে পারে?”

দুপুর গড়িয়ে গেছে। তুলি চুপচাপ বসে আছে বারান্দার এক কোণে। হাতে বাঁধা কাপড়টার দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে সে। হাতের ক্ষতের চেয়েও মনের ক্ষতটা খুব গভীর ভাবে এঁকেছে তার মনে।দ্বিধাদ্বন্দে পরে গেলো সাইরকে নিয়ে। লোকটা কি সত্যি অভিনয় করছে নাকি তাকে পেয়ে ভালো হওয়ার চেষ্টা করছে। হঠাৎই কান্না মিশ্রিত একটা কন্ঠ শুনতে পেলো তুলি„ —“বাঁচাও আমাকে। আমি ম’রি নি। দয়া করে বাঁচাও আমাকে।”

কান্নার শব্দটা দৃঢ় হতেই উঠে দাঁড়ালো। দুই হাতে শাড়ি খাচমে দৌড় দিতে নিলেই রান্নাঘর থেকে সহিনী বের হয়ে তুলিকে ডাকতে লাগলো। থেমে গেলো তুলি। অদৃশ্য আওয়াজ শুনে কোথায় যাচ্ছিল সে? সহিনী তার দিকেই আসছে। শাড়ি ছেড়ে মাথায় কাপড় দিলো তুলি। ধীরে ধীরে সহিনী এসে তার পাশে দাঁড়ালো। কাঁধে হাত রেখে বলল„ —“বোন‚ কোথায় যাচ্ছো তুমি? দুপুরে তো কিছু খাওনি খাবে এসো?”

তুলি মাথা নিচু করে বলল„ —“কিছু খাবো না।”

সহিনী মৃদু হেসে বলল„ —“এভাবে মন খারাপ করে নিজের ক্ষতি করে কি করবে বলো? নিজেকে পরিবর্তন করো। সাইর খুব ভালো ছেলে তেমন না। আবার খুব খারাপ ছেলে তেমনও না। একটা মানুষের মাঝে খারাপ‚ ভালো দুটো গুণই থাকা উচিত। তোমাদের মাঝে কি হয়েছে তা আমি জানি না। তবে তোমার উচিত সাইরের সাথে নিজের নতুন সংসারটা শুরু করার।’

তুলি মাথা তুললো„ —“সবাই কি এমন সংসার চায় ভাবি?”

সহিনী আশ্বাস দিয়ে বলল„ —“সংসার কখনো নিজের মতো হয় না বোন। কিন্তু মানুষ চাইলে সংসারটাকে নিজের মতো বানাতে পারে।”

তুলি কোনো উত্তর দিলো না। তার কাছে কোনো উত্তরই নেই দেবার মতো। পেছন থেকে পায়ের শব্দ পেতেই সতর্ক হলো তুলি। এই বুঝি জমিদার এসে নিজের রাগের খায়েস মিটাবে তুলির ওপরে। জোরে জোরে বলবে„ —“নতুন বউ হয়েও তোমার জ্ঞান বুদ্ধি হলো না দেখি। দুপুরের খাবার না খেয়ে বাড়ির উঠোনে এসে গায়ের লোকদের দেখাচ্ছো যে জমিদার তার ছেলের বউকে খেতে দেয় না?”

কথাগুলো আওড়াতেই কেঁপে উঠলো তুলি। সহিনী চলে গেলো পেছন থেকে। তুলি পেছনে ফিরতে যাবে তখনই কেউ একজন তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। তুলি নিজেকে ছাড়াতে পেছনে ফিরলো। সাইরকে দেখে স্বস্তি পেলো যেনো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল„ —“কি চাই?”

সাইর তুলিকে নিজের দিকে ফেরালো। গম্ভীর গলায় বলল„ —“আমার বউয়ের কাছে আমাকে প্রয়োজন মতো আসতে হবে নাকি?”

তুলি সরে দাঁড়ালো„ —“প্রয়োজনের জন্যই তো এনেছেন। যখন প্রয়োজন শেষ হবে তখন বলী দেবেন।”

সাইরের প্রচন্ড রাগ হলো। তুলির হাত চেপে দ্রুত হাঁটতে লাগলো বাড়ির পেছন দিকে। তুলি এক ঝটকায় নিজের হাত ছারিয়ে নিলো সাইরের থেকে। অকপটে প্রশ্ন করল„ —“কি করছেন কি?”

—“যা একজন স্বামীর করা উচিত। চলো আমার সাথে।”

তুলি আমতা আমতা করল„ —“কোথায়।”

—“বললে না প্রয়োজন শেষে। তোমাকে বলী দিবো। তাহলে চলো?”

তুলি অনিচ্ছায় হাটা ধরলো। সাইর হাঁটতে শুরু করলো বাড়ির পেছনের দিকের পথে। তুলি একটু দূরত্ব রেখে তার পেছনে পেছনে হাঁটছে। জমিদার বাড়ির পেছনে বিশাল একটা বাগান। আম, কাঁঠাল, জাম আর শিউলি গাছে ভরা বাগান। বাগানের মাঝখানে একটা পুরনো পুকুর। পুকুরের নোংড়া জলে চারপাশে কচুরিপানা ভাসছে।

সাইর গিয়ে দাঁড়ালো পুকুরের ঘাটে।রতুলি একটু দূরে দাঁড়ালো। বলল„ —“এখানে কেন এনেছেন আমাকে?”

সাইর তুলির দিকে ফিরলো„ —“তুমি কি আমাকে খুব বেশি ঘৃণা করো?”

—“হ্যাঁ একটু বেশিই ঘৃণা করি আপনাকে।”

সাইর ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো তুলির দিকে। তুলি একটু পিছিয়ে গেল।

সাইর স্মিত হেসে অন্যদিকে তাকালো। বলল„ —“ভয় পাচ্ছ?”

—“না।”

—“তাহলে পিছাচ্ছো কেন?”

তুলি কোনো উত্তর দিলো না। সাইর মুচকি হাসলো। বলল„ —“তুমি জানো, ছোটবেলায় আমি প্রায়ই এই পুকুরে এসে লুকিয়ে বসে থাকতাম।”

তুলি অন্যদিকে ফিরলো। সাইরের সাথে কথা বলার কোনো ইচ্ছায় তার নেই। সাইর সেটা বুঝতে পেরে নিজে নিজে বলতে শুরু করলো„ —“কারণ তখন আমার মনে হতো পৃথিবীতে কেউ আমাকে বোঝে না।”

সাইর একটু আকাশের দিকে তাকালো„ —“এখনও মাঝে মাঝে তাই মনে হয়। মন বলে সবকিছু ছেড়ে চলে যাই অন্যগ্রহে। এখানে আমি থাকলে সবার বিপদ। আমি নিজেই একটা হিংস্র পশু।”

তুলি সাইরের দিকে তাকাতেই সাইর চুপ করে রইলো। কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এলো দুজনের সাঝে। পুকুরের জলে মৃদু বাতাসের ঢেউ উঠেছে। কুচরিপানা গুলো এদিকে-ওদিকে ভেসে বেড়াচ্ছে।

নিরবতা ভেঙে তুলি বলল„ —“আমাকে এখানে কেন এনেছেন?”

সাইর উত্তর দিলো„ —“কারণ আমি চাই তুমি আমাকে একটু বোঝার চেষ্টা করো।”

তুলি তাচ্ছিল্য করলো„ —“আমি তো আপনাকে বুঝতে চাইনি কখনো।”

সাইর মাথা নেড়ে বলল„ —“জানি। তবুও আমি তোমার স্বামী। তোমার উচিত আমার ব্যাপারে সবকিছু জানার। কেননা তুমি এখন আমার স্ত্রী।”

—“জানি।”

—“তাহলে? তোমার কি উচিত নয় আমার সম্মন্ধে জানবার?”

সৈয়দ মারিয়াহ্ হামিদ 🕊️

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here