#প্রণয়ের_রূপকথা (৫৯)
“না বলে এসেছিস কেন?”
সহসাই প্রশ্নটি করল দীপ্র। কুহু কী বলবে বুঝল না। তাকিয়ে রইল। দীপ্রর গলার স্বরটা কঠিন হলো।
“বলে আসা উচিত ছিল না?”
“ছিল।”
“তবে বলিস নি কেন?”
কুহু এবারোও জবাব দিল না। দীপ্র প্রসঙ্গ বদলে বলল,”আমার ঘরে রেখে গিয়েছিলাম তোকে। তুই ঘর পরিবর্তন করলি কেন?”
কুহু শুকনো একটি ঢোক গিল। দীপ্র এবার খানিকটা এগিয়ে এল। ওকে দেখে নিয়ে বলল,”ভয় পাচ্ছিলি? ভেবেছিলি দীপ্র দেওয়ান নিজেকে সামলাতে পারবে না?”
কুহু ভাষাহীন হয়ে থাকলেও এবার বলল,”আমি এমনিই চলে এসেছি।”
“এমনি না। ভয় পেয়েছিলি এটাই সত্যি।”
কুহুর মনে হলো এই তর্কে যাওয়া অনুচিত। তাই প্রসঙ্গ বদলে ফেলল। বলল,”আপনি ওভাবে সবার সামনে বললেন কেন?”
“মিথ্যে তো বলিনি। উই আর ম্যারিড। দ্য হোল ওয়ার্ল্ড শুড নো ইট।”
কত সহজেই কথা খানা বলে ফেলল দীপ্র। উই আর ম্যারিড। এদিকে কুহুর ভেতরটা নিজেকে বিবাহিত মানতে পারছে না তখনো। ও ফোঁস করে দম ফেলতেই দীপ্র বলল,”আমি কী বলেছিলাম কুহু? তোকে সময় দেব। তোর মতন করে বোঝার জন্য তোকে সময় দেব। নিজেকেও তোর মনের মতন করে প্রেজেন্ট করব। কিন্তু তুই কেন দূরত্ব বাড়াচ্ছিস? কী চাইছিস? আমি, আমি মরে যাই?”
দীপ্রর শেষ বাক্যে কুহুর ভেতরটা নড়ে ওঠল। ও তাকাতে পারল না। দীপ্র বলল,”তাকা আমার দিকে।”
কুহু তখনো তাকাল না। দীপ্র নিজেই হাত বাড়িয়ে মেয়েটির থুতনি উঁচু করে ধরল। চোখে চোখ পড়ল। দীপ্রর দারুণ চোখের দৃষ্টিতে মোহ রয়েছে। কুহু নজর না ফিরিয়েই বলল,”আমার সবটা এলোমেলো লাগছে। আমি কী করব বলেন? আমি বুঝতে পারি না নিজেকে।”
“তোর কিচ্ছু করতে হবে না। বুঝতেও হবে না। তুই শুধু আমার সাথে থাক। পাশে থাক। বাকিটা আমি সামলে নেব। বুঝেছিস?”
কুহু মাথা নাড়াল। সে বুঝেছে। দীপ্র থুতনি ছেড়ে দিল।
একটু শ্বাস নিল। পুনরায় বলল,”আমি সরি।”
না বুঝে ওভাবেই চেয়ে রইল কুহু। দীপ্র বলল,”তোকে কথা শুনতে হয়েছে। আমার আরো কঠিন হওয়া উচিত ছিল। আমি সরি কুহু। প্রমিস করছি, তোকে আর কথা শুনতে দেব না।”
ঘটনা ওঠে আসায় ফের মন খারাপ হলো কুহুর। দীপ্র সেটা বেশ ভালোই বুঝল। বলল,”আচ্ছা, টপিকটা বাদ দিচ্ছি।”
“আমার একটু সময় দরকার। আমি আলাদাই থাকতে চাই।”
“আচ্ছা, থাকবি। তবে যেদিন মনে হবে, তুই আমাকে মিস করছিস। সেদিন কোনো দোটানা ছাড়াই চলে আসবি। ঠিক আছে?”
কুহু শুধুই মাথা দোলাল। খাবারও এসে গেল। দীপ্র সার্ভ করে দিয়ে বলল,”খাওয়া শুরু কর।”
বাড়ি ফিরে নতুন ঘটনার মুখোমুখি পড়তে হলো। কুহুরা যেহেতু দুই বোন। ভাই নেই। তাই স্বাভাবিক নিয়মেই কাদেরের সম্পত্তির কিছু অংশ তার ভাইদের কাছে চলে যাবে। আর সেটা এখনই দাবি করে বসেছে আনোয়ার। অথচ অতীতে তারা বলেছিল এই সম্পত্তি থেকে কোনো ভাগ নেবে না। বিষয়টি বলতেই আনোয়ার চোখ মুখ কঠোর করে বললেন,”অতীতের সব কিছু অতীতেই শেষ মা। অতীতে তো সম্পর্কও অন্য রকম ছিল। এখন তো সেটা নেই।”
বৃদ্ধা জানতেন তার এই ছেলে মানুষ হয়নি। তবে এত দ্রুত নিজের খোলস খুলে দেবে তা ধারণাও করতে পারেননি। তিনি ছি ছি করতেই আবিদা বললেন,”এখন ছি ছি করছেন। অথচ আপনার নাতি, নাতনি যে কাহিনী করল। আমার মেয়ের সাথে অন্যায় করল। তখন তো মুখ খুলেননি আম্মা। আপনিও আসলে সমান চোখে দেখেন না।”
বৃদ্ধা বিস্মিত হয়ে পড়লেন। রেগে ওঠলেন।
“মুখ সামলে কথা বলবা মেজো বউ।”
“মুখ সামলেই বলেছি আম্মা। আর আমরা তো আমাদের হকের দাবিই করেছি।”
আবিদার পর পর মুখের ওপর কথা দবীরকে নাড়িয়ে দিল। তিনি মুখ খুললেন।
“আনোয়ার, তোর বউকে বল মায়ের সাথে ঠিকঠাক কথা বলতে।”
আনোয়ার জবাব দিলেন,”আর কীভাবে কথা বলবে ভাইজান? আর আপনারা সবাই তো স্বার্থপর।”
দবীর অবাক হয়ে গেলেন। দুদিন আগেও আনোয়ার তাকে কতটা সম্মান দেখিয়েছে। আজই তার রূপ ভিন্ন!
“শুধু আমরাই কি স্বার্থপর আনোয়ার? তোমরাও তো কম নউ। নিজেদের রূপ তো দেখিয়ে দিলে।”
“ভাবি, এটা আমার আর ভাইয়ের বিষয়। আপনি কথা বলবেন না।”
“বাহ! তোমার বউ কথা বলবে আর আমি কথা বলতে পারব না?”
সব কথার মাঝে এবার মুখ খুললেন ববিতা। তিনি এত সময় চুপ ছিলেন। শুনছিলেন সব। এবার বললেন,”ঝগড়া ঝামেলা বাদ দিন সবাই। আমার স্বামীর সম্পত্তি থেকে কে কতটুকু পাবেন তার হিসেব করেন। আমি দিয়ে দেব।”
“ছোট বউ। তুমি…
“আম্মা এত অশান্তি আমার ভালো লাগে না। আপনি আর বাঁধা দিয়েন না।”
বৃদ্ধা মেজো ছেলে আর ছেলের বউয়ের দিকে তাকালেন। এতদিন পর তার মনে হলো এদের সবাইকে এক করার চিন্তাটাই ওনার ভুল ছিল।
কুহু ঘরে এসে বসেছিল। ভারী মন খারাপ তার। তার জন্যই আজ এই পরিস্থিতি। ঝড় যেন একটার পর একটা বয়েই চলেছে। ওদিকে দীপ্র এসে ঘটনা শুনল। বাবার সাথে আলোচনায় বসল। দবীর বললেন,”আনোয়ারের রাগ স্বাভাবিক।”
“স্বাভাবিক কেমন করে হয় বাবা?”
“তুমি ভেবে দেখো।”
“আমি ভেবেছি বাবা। চাচাকে সম্মান ও করেছি সর্বদা। এখন আর পারছি না।”
দীপ্র ওঠে যেতে নিচ্ছিল। সে সময়েই দবীর বললেন,”দীপ্র, বসে যাও।”
ও বসল। দবীর ছেলেকে ভালো মতন দেখে নিয়ে বললেন,”আমি বলিনি তখন কিছু। তবে কুহু যা করেছে তারপর ও..
দীপ্র চোখ দুটো মুদিত করল। গিলে নিল কথাটা। তারপর বলল,”আমি সবটা সয়ে নিয়েছি বাবা।”
“ও কি তোমায় ভালোবাসে? নাকি অন্য কোনো চিন্তা আছে।”
দীপ্র বিস্মিত হয়ে গেল। বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল,”বাবা, এটা কেমন কথা? কুহুকে কীসের সাথে তুলনা করছো তুমি? ওর কী চিন্তা থাকবে? ও তো বিয়েই করতে চায়নি শুরুতে। সেই জন্যই তো এত ঘটনা। তবে এ প্রশ্ন কেন আসছে?”
দবীর বুঝলেন ছেলের মাথা গরম। তার ও বোধহয় এভাবে বলা উচিত হয়নি। আসলে খানিক আগেই আনোয়ার এসে এই কথা গুলো বলে গিয়েছিলেন। কুহু হুট করে দীপ্রকে বিয়ে করতে রাজি হলো কেন সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তখনই সব তালগোল হয়ে গেল। দীপ্র আরো কিছু বলতেই নিচ্ছিল। ওমন সময় দরজায় একটা শব্দ হলো। ববিতা দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি এসেছিলেন কথা বলতে। মনে মনে মেয়ের ওপর রাগ থাকলেও তিনি তা হজম করে নিয়ে সবটা ঠিক করার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু এখানে এসে যা শুনলেন, তারপর ওনার মস্তিষ্ক খালি হয়ে এল। দীপ্রর ঠোঁট দুটো নড়ে উঠল।
“ছোট চাচি।”
ববিতার চোখ দুটো ঘোলাটে হয়ে আছে। জল নামতে চাইছে। দবীর চোখ মুখ শক্ত করলেন।
“ববিতা,ভেতরে আসো।”
ববিতা কক্ষে প্রবেশ করলেন। ওনার চোখ থেকে এক বিন্দু জল নেমে এল। দীপ্র আবারো ছোট চাচি বলে ডাকতে যেতেই ববিতা বললেন,”কুহুর বাবা বেঁচে থাকলে, আজ সবটা ভিন্ন হতো। কিন্তু বাবাহীন মেয়ে আমার, একটা ভুল করে বসায় আজ কী সব শুনতে হচ্ছে তাকে।”
“ববিতা তুমি..
“সমস্যা নেই ভাইজান। আমি এসেছিলাম কথা বলতে। যেহেতু বিয়েটা হয়েই গিয়েছে। তাই আমি এটা নিয়ে কোনো বাড়াবাড়ি করছি না। হয়তো আপনাদের মনে সন্দেহ হতে পারে আমার মেয়ে দীপ্রর সাফল্যের লোভে পড়েছে। তাই বিয়ে করেছে এখন। তাই আমি সেটা দূর করতে চাই। আমার মেয়ে দীপ্রর কোনো টাকা স্পর্শ করবে না। ও নিজের পায়ে দাঁড়াবে। নিজে রোজগার করবে।”
“চাচি, তুমি এটা কী বলছো। কুহু তো আমার….
আটকে দিলেন ববিতা। পুনরায় চোখের জল নেমে যাচ্ছে গাল বেয়ে। তিনি বললেন,”কুহু, শুধুই কুহু দীপ্র। ও অনাথ। বাবাহীন এক মেয়ে।”
দীপ্র দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল,”কুহু শুধু কুহু নয় চাচি। কুহু আমার স্ত্রী। আর আমার স্ত্রীর সমস্ত দায়িত্ব আমার। কে কি বলল তাতে আমি থেমে থাকব না। কুহুর মন যা চাইবে ও তা করবে। কিন্তু সেখানে আমার পুরো অধিকার থাকবে।”
এ কথা বলেই বেরিয়ে গেল দীপ্র। ববিতা দাঁড়িয়ে রইলেন। দবীরও হতাশার নিশ্বাস ফেললেন।
বাড়ির তপ্ততা যেন কমারই নয়। দুদিন পার হলেও সব কেমন হয়ে আছে। স্বাভাবিক কিছুই আর হচ্ছে না। এরই মধ্যে রাত্রি ফিরে এল। সালমার খুব রাগ হলো। তিনি মেয়েকে চড় বসালেন। জেবা এসে আটকালেন।
“কী করছো কী সালমা। এত বড়ো মেয়েকে এভাবে কেউ মারে?”
“ওকে তো মেরেই ফেলব ভাবি। মুখ পু ড়িয়ে এসেছে। কার সাথে গিয়েছিলি তুই?”
অরণ্যর চিন্তা হচ্ছিল। ও তাই রাত্রিকে কলে রাখতে বলেছিল। সালমার বলা কথা গুলো ওপাশ থেকে স্পষ্টই শুনল ও। আর নিজেকে আটকাতে পারল না। বাড়ির বাইরে থেকে ছুটে এল। অরণ্যকে দেখে কেউই খুব একটা অবাক হলো না। ও এসে বলল,”রাত্রি আমার সাথে ছিল।”
তখনই আগমন হলো আবিদার। তিনি হেসে বললেন,”বাহ, দীপ্র তো ভালোই খেলা খেলল। পরিবারের মান সম্মান একদম ডুবিয়ে দিয়েছে।”
সালমার রাগ আরো বাড়ল। তিনি মেয়েকে পুনরায় মা রতে এলেই অরণ্য এসে আটকাল।
“আন্টি প্লিজ। ওকে আঘাত করবেন না।”
রাত্রির দু চোখ বেয়ে জল নেমে যাচ্ছে। ও কথা বলতে পারছে না। অরণ্যই বলল,”আমরা ভুল করেছি। সেটা মানি। কিন্তু বিয়েটা হলে আরো বেশি ভুল হতো। রাত্রি সুখী হোতো না। এটা বুঝুন প্লিজ।”
অরণ্য একটার পর একটা কথা বলেই চলেছে। তবে কেউ কিছু বলছে না। রাত্রি এবার চোখের জল মুছল।
“আমাদের মাফ করো প্লিজ। আমি অরণ্যকে ভালোবাসি।”
সঙ্গে সঙ্গে হাততালি দিয়ে ওঠলেন আবিদা। তার মাথা যে পুরোপুরি গিয়েছে তা বোঝা যাচ্ছে। তিনি হাসতে হাসতে বললেন,”নাটক, পুরো বাড়িটাই এক একটা নাটক।”
আবিদার কথা গুলো অরণ্যর মনের ভেতর আগুন ধরিয়ে দিল। এই মহিলাকে সহ্য হচ্ছে না একদমই। ও ফোঁস ফোঁস করে ওঠল।
“আপনি কেন কথা বলছেন আমাদের মাঝে? আপনার কথা কেউ শুনতে চেয়েছে?”
“বাহ। চমৎকার তো। এ ছেলে তো দেখি বেশ বেয়াদব ও।”
অরণ্য আরো কিছু বলতে চাচ্ছিল। তবে রাত্রি ইশারা করায় থেমে গেল। এরই মধ্য উপস্থিত হলেন বৃদ্ধা। তাকে নিয়ে এসেছে কণা।
“রাত্রি, ঘরে গিয়ে বোস তুই। আর অরণ্য তুমিও যাও।”
বৃদ্ধার কথায় ওরা দুজনেই চলে গেল। সালমা কেঁদে ফেললেন শব্দ করে। দেওয়ান বাড়ির ওপর এ কেমন ঝড় বয়ে চলেছে?
“রাত্রিপু।”
কুহু এসে একদম জড়িয়ে ধরল রাত্রিকে। রাত্রি ওকে চেপে ধরে আরো বেশি কান্নায় ভেঙে পড়ল।
“রাত্রিপু। তুমি কান্নাকাটি করিও না প্লিজ। শোনো আমার আপু। একটু দেখো আমার দিকে।”
“আমার ভালো লাগছে না রে কুহু। জীবনে কোনো সিদ্ধান্ত ঠিক ঠাক নিতে পারিনি।”
কুহুর নিজেরও কি ভালো লাগছে? লাগছে না তো। ও নিজেও তো কত গুলো ভুল করেছে। আর এই ভুলের মাশুল ও চলছে। কুহু রাত্রির মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
“সব ঠিক হয়ে যাবে। দীপ্র ভাই আসছেন। ওনি এসে সব সামলে নেবেন। তুমি কেঁদো না আর। দেখো, সব ঠিক হবে।”
রাত্রি কান্না তবু চলতেই থাকল। কোনো ভাবেই থামল না।
কলটি রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে রাগীব বলল,”কণা, রাত্রি ফিরেছে?”
কণা কঠিন ভাবে বলল,”জানেনই তো ফিরেছে।”
“জানি। একটু কথা বলিয়ে দেবে?”
“সম্ভব না। বাড়িতে এমনিতেই ঝামেলা চলছে।”
“একটু চেষ্টা করো প্লিজ।”
“সরি। আমি পারব না।”
বলেই কলটি কাটল কণা। রাগীবের ভেতরটা হু হু করছে। আজই সেই দিন, যেই দিনটা ওদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। অথচ সবটা এলোমেলো। এদিকে কণার ভারী রাগ হলো। এই লোকটা বার বার ওকেই কল করে। ওকেই বিরক্ত করে। মন চায় ব্লক দিয়ে রাখতে। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য কারণেই ব্লক দিতে পারে না।
“আমরা জীবনে প্রত্যেকেই তো ভুল করি ফুপি। ভুল গুলো ধরে থাকলে জীবন কি চলে বলো? তাছাড়া, এই সব কিছুর মাঝে সব থেকে বেশি দায় যার সেই মানুষটি আমি। আমার জন্য এই পরিস্থিতি। ওরা তো দূরেই ছিল। তবে আমিই চেয়েছি ওরা এক হোক। কারণ পরে দুজনে আপসোস করবে। কষ্ট পাবে। সেই জন্য আমিই ওদেরকে এক করেছি।”
পুরোটা বলে থামল দীপ্র। গত কিছুদিনে দীপ্রর প্রতি সবারই নেগেটিভ একটা ধারণা এসে গেছে। ও সেটা জেনে বুঝেও আরো বেশি করে দোষ নিল। রমিজ উপস্থিত ছিলেন। তিনি মুখ খুললেন।
“যা হয়েছে তা কিন্তু ভালো হয়নি দীপ্র। তুমি, তোমরা গত কিছুদিনে আমাদের সবাইকে খুব কষ্ট দিয়ে ফেলেছ।”
“সেসবের জন্য আমি জানি না কীভাবে ক্ষমা চাইব। তবে ভুল করলে সেই ভুল গুলো ঠিক করেও তো নেয়া যায় তাই না? আমাদের একটা সুযোগ দাও। আমরা প্রমাণ করে দেব আমরা ঠিক।”
রমিজ লম্বা করে দম নিলেন। অরণ্যকে দেখে নিয়ে বললেন,”যা হবার তো হয়েই গিয়েছে। মান সম্মান যা যাবার গিয়েছে। এখন যতটুকু পড়ে আছে তা ঠিক করার পালা।”
রমিজের কথায় দীপ্রর ভেতর স্বস্তি এল। রমিজ দবীরের সাথে আলোচনা করলেন। তারপর বললেন,”অরণ্য, তোমার পরিবার নিয়ে আসো। আমরা কথা বলব দুজনের বিয়ের ব্যাপারে।”
এ কথায় কুহুর চোখে মুখে হাসি ফুটল। ও চাইল দীপ্রর দিকে। দীপ্র ইশারা করল। যার অর্থ, বলেছিলাম সব ঠিক করে দিব।
কদিনে ববিতা একটা কথাও বলেননি মেয়ের সাথে। রাতের খাবার নিয়ে আসলেন আজ। কুহু মাকে দেখে ছলছল নয়নে চাইল। ববিতার ও বুক ভারী হলো। কান্না গিলে নিয়ে বলল,”কদিন ধরে রাতের খাবার খাস না কেন?”
“তুমিও তো খাও না মা।”
“আমি খাই না বলে খাবি না? বড্ড বেশি বড়ো হয়ে গেছ তুমি। আহ্লাদ দেখানো হচ্ছে?”
কুহু এবার শব্দ করে কেঁদে ফেলল। মাকে জাপটে ধরল দু হাতে। ববিতাও মেয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন। মা মেয়ের এই মিলনে চাঁদ ও তার সবটুকু রশ্মি ছড়াতে লাগল।
দুই সপ্তাহ পর নানান ঝামেলা পেরিয়ে অবশেষে দেওয়ান বাড়িতে শান্তির হাওয়া বইতে লাগল। কুহু আর দীপ্র এখনো আলাদা ঘরেই থাকছে। এরই মধ্যে সম্পত্তির ভাগ বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে আনোয়ারকে। শেষ সময়ে তার মাঝে এক রকম অপরাধবোধ দেখা গিয়েছিল। তবে স্ত্রীর কারণে তা খুব একটা দৃশ্যমান হতে পারেনি। আয়ানা এ কদিন বাড়ির বাহিরেই ছিল। আজ ফিরল। একদম অন্য রকম হয়ে ফিরেছে ও। ওকে দেখেই রাত্রি বিড়বিড় করে ওঠল,”এসে গেছে ঝামেলা পাকাতে।”
কুহু কিছু বলল না। চেয়ে রইল শুধু। আয়ানা ওপরে ওঠতে ওঠতে ঠোঁটের ইশারায় তাচ্ছিল্য করল। রাত্রি মুখ খুলতে যেতেই আটকাল কুহু।
“বাদ দাও।”
“ওকে তো চড়ানো দরকার। এই মেয়ে আর ওর মা-বাবা একদম শেষ করে দিল আমাদের।”
“থাক না রাত্রিপু। আমরা বরং আমাদের সময় গুলো উপভোগ করি। আর আয়ানাপুর কথা বাদ দিয়ে তুমি নিজের কথা ভাবো। আজ তোমাকে তোমার হবু শ্বশুরবাড়ি থেকে দেখতে আসবে।”
“ধুর। কীসের আবার দেখাদেখি। ভালো লাগে না। তোরই ভালো কুহু। কি সুন্দর, বাবার বাড়ি আর শ্বশুরবাড়ি দুটোই এক।”
রাত্রির কথা শেষ হতে না হতেই দীপ্রর আগমন হলো। পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে দীপ্র বলল,”একটু শুনে যা তো কুহু।”
“আমি তো রাত্রিপুর সাথে পার্লারে..
ও কথা শেষ করার আগেই রাত্রি বলল,”আরে তুই,কোনো চাপ নিস না। ঐ তো কণাকে দেখা যায়। আমি ওকে নিয়ে যাই।”
“কিন্তু তুমি তো…
“কোনো কিন্তু না। তুই যা তো। হতেও পারে দীপ্র ভাই রোমান্সের জন্য ডাকছে।”
এই বলে হেসে চলে গেল রাত্রি। এদিকে কুহু হাবুলের মতন চেয়ে রইল।
প্রিয় পাঠক, আপনাদের জন্য ৭ টি বই উপহার রেখেছি। দেখুন 👇
https://www.facebook.com/groups/2944711092471263/permalink/4226083584334001/
চলবে…
কলমে ~ #ফাতেমা_তুজ_নৌশি

