#উৎসর্গ
#পর্ব:২৬
#তানজিনা ইসলাম
নিরিবিলি রাত।মায়া নিজের কক্ষে পরে পরে ঘুমোচ্ছে। একসাথে চারটা ঘুমের মেডিসিন খেয়ে তারপর ঘুমিয়েছে।এখন আর এক-দুই টা ঘুমের ঔষধে কাজ করে না।এই কয়েকদিনে এতো ঘুমের ঔষধ খেয়েছে মায়া, যে এখন আর ঘুমের মেডিসিন নেওয়া ছাড়া ঘুম আসেনা। তারওপর আজকে আবার রুদ্রর সাথে দেখা হয়েছে। ভার্সিটি থেকে আসার পর মনে হয় শ-বারের উপর কল করেছে রুদ্র।কিন্তু মায়া একবারো রিসিভ করেনি।হঠাৎ রুদ্রর এই পরিবর্তন ওর মাথায় ঢুকছে না।যেখানে পঁচিশ দিনে রুদ্র একবারো কল করেনি,সেখানে শুধুমাত্র একদিন দেখা হওয়ার পর এতো পরিবর্তন।আবার মায়া বাড়াচ্ছে ছেলেটা।মায়া একটু একটু করে নিজেকে শক্ত করেছিলো কিন্তু আবার রুদ্র সব ভেস্তে দিতে এসেছে।রুদ্র সম্পৃক্ত কিছু দেখলেই এখন মায়ার খারাপ লাগে,কষ্ট হয়।
রুদ্রর ফোনের জ্বালায় মায়া মোবাইল সুইচড অফ করে রেখেছিলাে।রাতের খাবার তাড়াতাড়ি খেয়ে, ঘুমের ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়েছিলো। যাতে রুদ্রর কল ধরতে না হয়।যদি আজকে রাতে ঘুম না আসতো তাহলে নির্ঘাত পুরো রাত কেঁদে কাটাতে হতো মায়ার।
রুদ্র দেয়ালের পাঁচিল টপকে খান মঞ্জিলে ঢুকলো। মাটির ঘাস মাড়িয়ে চুপি চুপি হাটতে থাকলো।দারোয়ান নিজের ডিউটি বাদ দিয়ে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। রুদ্র হাটা থামিয়ে দারোয়ানের সামনে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালো।এই ব্যাটাকে নিশ্চয়ই মাইনে দিয়ে ঘুমানোর জন্য রেখেছে। নয়তো আজ পর্যন্ত যতবার রাতে এসেছে ততবার একে ঘুমন্ত অবস্থায় পেয়েছে।কিন্তু চোর আসলেও মনে হয় না কিছু চুরি করতে পারবে।এর নাক ডাকার আওয়াজে এমনিতেই পালাতে হবে।রুদ্রর মন চাইলো এর নাক চিপে ধরতে। কিন্তু নিজের এই অগাধ ইচ্ছে কে চাপিয়ে রাখলো রুদ্র।এখন ও স্বাভাবিক ভাবে আসেনি।এ যদি ওকে চোর ভেবে চিৎকার শুরু করে তাহলেতো সমস্যা হয়ে যাবে।
রুদ্র মায়ার বেলকনির সামনে গিয়ে পাইপ বেয়ে উপরে উঠলো।বেলকনির দরজা পুরোটাই খোলা।আরে এই তো মেঘ না চাইতেই জল,রুদ্র মনে মনে ভাবলো।
রুদ্র পা টিপে টিপে কক্ষে প্রবেশ করলো। মায়াকে ঘুমোতে দেখে ওর কাছে এগিয়ে গেলো। হাটু ভাজ করে বসলো মায়ার মুখ বরাবর।কাঁধ সমান চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখের উপর পরে আছে।মুখের সামনে আসা চুলগুলো রুদ্র আলতো হাতে সরিয়ে দিলো।চুলে হাত বুলিয়ে দিলো, পাছে মায়া টের না পায়।চোখের নিচে কালো দাগ পরে গেছে মেয়েটার।আগের থেকে শুকিয়ে গেছে অনেকটা।ঠোঁট দু’টো শুকিয়ে চৌচির, চোখের পাতা ফুলে আছে।
রুদ্রর মন খারাপ হয়ে গেলো ভীষণ। অক্লিষ্টে ঢোক গিললো ও। মেয়েটা দুদিন পরপরই অসুস্থ হয়ে পরে।জ্বর হলেতো আর কথায় নেই।একটু যদি যত্ন নেয় নিজের শরীরের।
রুদ্র দুহাত বিছানায় রেখে তারউপর থুতনি রাখলো।ঘুমন্ত মায়াকে উদ্দেশ্য করে বললো
-“অনেক বেশিই কষ্ট দিয়ে ফেলেছি তোকে তাই না? কী অবস্থা করেছিস নিজের! নিজেকেই তো ভালোবাসতে পারলি না, আমাকে কী ভালোবাসবি!
আমি জানি, অনেক খারাপ আমি।কিন্তু এই খারাপ মানুষটাকে কেন এভাবে ভালোবাসলি মায়া?তোর এই ভালোবাসার বিনিময়ে তো কষ্ট ছাড়া কিছুই দিতে পারিনি তোকে।তুই আমার জন্য অপেক্ষা করেছিলি? এই পঁচিশ দিনে নিশ্চয়ই অনেক কেঁদেছিস তুই তাই না!
মায়ু বিশ্বাস কর অনেকবার নিতে আসতে চেয়েছি তোকে!
অনেকবার কল করতে চেয়েছি। কীভাবে যে খারাপ লাগতো আমার!কিন্তু পারিনি আসতে। কোনমুখে আসতাম?আর তোর জেদ,অভিমান তো আমি জানি।তুই যে কখনোই আমার সাথে ফিরে যেতি না সেটাও জানতাম।কিন্তু এতোটা অসুস্থ হয়ে পরবি সেটা বুঝিনি রে।আমি তোকে ছাড়া থাকতে পারছি না। কেমন যেন শূণ্যতা চারিদিকে। খালি খালি লাগছে সবকিছু। তাই অনেক প্ল্যান করে তোকে তুলে নিয়ে যেতে হবে।তুই যে সোজা কথায় যাবি না সেটা জানি আমি।”
রুদ্র চেয়ে থাকলো মায়ার ঘুমন্ত মুখের দিকে।ঘুমন্ত মায়ার গালে একটু হাত ছোয়াতে মন চায়লো রুদ্রর।কিন্তু ছুতে পারলো না।মনের ভেতরের অনুতাপ,অনুশোচনা যে তা হতে দিচ্ছে না।
,
কেটে গেছে সাতদিন।মায়া কিছুটা সুস্থ হয়েছে এই কয়েকদিনে। মুস্তাফিজ খান ড্রইংরুমে বসে খাইয়ে দিচ্ছেন মেয়েকে।আজ অফিসে যান নি তিনি।মায়া সোফায় বসে আছে,আর তিনি খুবই যত্নের সহিত লোকমা তুলে পরোটা খাইয়ে দিচ্ছে ওঁকে। দু’জন গল্প করছে নিজেদের মতো।
মাহেরা খান কফিতে চুমুক দিচ্ছে আর বাবা মেয়ের কাহিনি দেখছে।মায়া খাওয়া শেষ করে মাহেরা খানকে উদ্দেশ্য করে বললো
-“আম্মু জানো,আমার মনে হচ্ছে বাসায় চোর ঢুকছে কয়েকদিন ধরে।
-“কী বলো?চোর কীভাবে ঢুকবে?”
মাহেরা খান কপাল কুঁচকে বললেন।
-“জানি না।কিন্তু আমার প্রতি রাতেই মনে হয় কেও আমার রুমে ঢোকে।কিন্তু আমি ঘুমের জন্য চোখ খুলতে পারি না।”
-“যদি চোর ঢুকতোই তাহলে কিছু না কিছু চুরি তো অবশ্যই করতো।কিন্তু বাড়ির কিছুই তো চুরি যায়নি। চোর নিশ্চয়ই এমনি এমনি আসবে না।
মুস্তাফিজ খান চিন্তিত হয়ে বললেন।
মাহেরা খান মায়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন
-“সেটাই তো।আমার মনে হয় জ্বরের কারণে তুমি হ্যালুসিনেশনে ভুগছো।এক্সামের জন্য টেনশন করা একটু কমাও।”
-“হয়তো।”
মায়া চুপ হয়ে গেলো।মাহেরা খান উঠে কিচেনে চলে গেলেন,
কেওই আর কোনো কথা বললো না।
মাহেরা খানের ফোন বাজছে। উনি কিচেন থেকে চিল্লিয়ে বললেন
-“মায়া কে কল করেছে দেখো।”
-“আমি নিয়ে আসছি।”
মায়া কক্ষে গিয়ে ফোন নিয়ে এসে বাবার পাশে বসলো।ফোনের স্ক্রিনে রাফানা চৌধুরীর নাম্বার ভাসছে।মায়ার ভ্রু কুচকে এলো।এই অসময়ে হঠাৎ তার মামনির কল।আবার হয়তো মায়ার কথা মনে পরছে তার।ভেবেই মায়া মৃদু হাসলো।ফোন রিসিভ করে উৎফুল্ল কন্ঠে বললো
-“মামনি।কেমন আছো তুমি?”
ওপাশ থেকে রাফানা চৌধুরীর ভাঙা ভাঙা কন্ঠ ভেসে এলো
-“মায়া,আমি মনে হয় আর বাঁচবো না।আমাকে একবার দেখতে আয়।তোকে খুব করে দেখতে মন চায়ছে। আর যদি কোনোদিন দেখতে না পাই,তাই শেষবারের মতো দেখতে চাই তোকে।”
মায়া যতটা উৎফুল্লতা নিয়ে ফোন রিসিভ করেছিলো তার সবটাই হারিয়ে গেলো।আতঙ্কিত কন্ঠে রাফানা চৌধুরীকে বললো
-“মামনি।কী হয়েছে তোমার?এভাবে বলছো কেন?”
কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এলো না।
মুস্তাফিজ খান মেয়ের আতঙ্কিত কন্ঠ শুনে চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন
-“কী হয়েছে প্রিন্সেস? এমন করছো কেন?”
-“বাবা।মামনি,মামনির কিছু একটা হয়েছে।আমাকে শেষবারের মতো দেখতে যেতে বলছে।তারপর, আর কিছু বললো না।”
মায়ার আতঙ্কে কন্ঠ রোধ হয়ে আসছে।মুস্তাফিজ খান মেয়েকে শান্ত করার চেষ্টা করেন।মাহেরা খান দুজনের কথা শুনে রান্নাঘর থেকে ছুটে আসেন।
মায়ার বুক কাঁপছে। কী হয়েছে মানুষটার কে জানে!
মায়া নিজের বাবাকে উদ্দেশ্য করে বললো
-“বাবা। আমাকে ঐ বাড়ি নিয়ে চলো।মামনির কিছু একটা হয়েছে।”
-“কী হয়েছে রাফানা আপার?”
মাহেরা খান দুজনের উদ্দেশ্যে বললেন।
মুস্তাফিজ খান সব বুঝিয়ে বললেন তাকে।তারপর মায়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন
-“তুমি গিয়ে আগে ব্যাগ গোছাও মায়া।তারপর গাড়িতে গিয়ে বসো। আমি চাবি নিয়ে আসছি।”
মায়া মাথা নেড়ে হন্তদন্ত হয়ে উপরে উঠলো। কক্ষে গিয়ে প্রয়োজনীয় বইখাতা নিজের ব্যাগে ভরলো।নিজের মুঠোফোন হাতে নিয়ে দেখলো চারটা মিসড কল এসেছে রাফানা চৌধুরীর নাম্বার থেকে।ইশ!কেনো যে ফোনটা উপরে রেখে গেলো।মানুষটা মায়াকে এই মোবাইলে না পেয়ে মাহেরা খানের মোবাইলে ফোন দিয়েছিলো।মায়া দ্রত নিজের মোবাইল হাতে নিলো।ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দৌড়ে নিচে নামলো।মাহেরা খান কে বিদায় দিয়ে দ্রুত পায়ে গিয়ে গাড়িতে উঠলো।
মুস্তফিজ খান আগে থেকেই ড্রাইভিং সিটে বসেছিলেন।মায়া ওঠার পর গাড়ি স্টার্ট দিলেন।
মায়ার আতঙ্কে হাত পা কাঁপছে। পুরো বাড়িতে রাফানা চৌধুরী একা।রুয়ান চৌধুরী দেশের বাইরে। আর রুদ্র তো এ টাইমে অফিসে থাকে।মানুষটা এখন কেমন আছে কে জানে?
মায়া বারবার নিজের বাবাকে তাগাদা দিচ্ছে গাড়ি জোরে চালানোর জন্য। মুস্তাফিজ খান মায়াকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।কিন্তু মায়া শান্ত হতে পারছে না।
অবশেষে গাড়ি গন্তব্যে এসে পৌঁছালো।মায়া নিজের ব্যাগ না নিয়েই দৌড়ে বের হয়ে গেলো।
মায়া বড় বড় পা ফেলে রাফানা চৌধুরীর কক্ষে গেলো।রাফানা চৌধুরী কক্ষে উপুড় হয়ে মেঝেতে পরে আছেন।মায়া দৌড়ে তার কাছে গিয়ে নিজের কোলের উপর তার মাথা রাখলো।কপালে হালকা কেটে, রক্ত পরছে।মায়া তার গালে হাত দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো
-“মামনি,মামনি।কী হয়েছে তোমার?দেখো আমি এসেছি।দেখবে না আমাকে?”
মুস্তফিজ খান এসে মায়ার পাশে বসলেন। হাতে রাখা মায়ার ব্যাগটা পাশে রাখলেন।মায়া ভাঙ্গা গলায় নিজের বাবাকে বললো
-“বাবা, মামনি কথা বলছে না।চোখ খুলে আমাকে দেখছে না।মামনিকে একবার আমাকে দেখতে বলো।”
মুস্তাফিজ খান মায়াকে বললেন
-“হামিদকে কল করেছি আমি।আসছে সে।তুমি নিজেকে শক্ত করো আগে।নয়তো নিজের মামনি কে কী করে দেখবে? শান্ত হও। কান্না করো না৷ হামিদ চলে আসবে, এক্ষুনি।”
রাফানা চৌধুরী পিটপিট করে চোখ খুললেন।কেউ একজন তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।মায়া রাফানা চৌধুরীর গায়ের উপর দেওয়া কম্বলটা আরেকটু টেনে দিলো। ওনাকে চোখ খুলতে দেখে খুশিতে চেচিয়ে বললো
-“মামনি। চোখ খুলেছো তুমি।”
রাফানা চৌধুরী মাথার পাশে মায়াকে বসতে দেখে ঠোঁট ভেঙে কেঁদে দিলেন।মায়া শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তাকে।রাফানা চৌধুরী মায়াকে একহাতে জড়িয়ে ধরে অভিমানের সুরে বললো
-“এতদিন পর মনে পরলো আমাকে?মরে গেলেও তো মনে হয় খবর পেতি না।দুটো ছেলে মেয়ে আছে আমার কিন্তু কারোরই আমার সাথে কথা বলার সময় নেই।”
-“এভাবে বলছো কেন মামনি।বিশ্বাস করো তোমাকে অনেক মনে পরেছে আমার।কিন্তু তুমি এটা কী করলে?নিজের খেয়াল কেন রাখলে না?”
-“খেয়াল রেখে কী করবো?কেও আছে আমার?কারোই তো আমার সাথে থাকার ইচ্ছে নেই। পুরোটা দিন কার একা থাকতে ইচ্ছে করে?”
-“এমন করে কেনো বলছো।আচ্ছা তোমাকে অনেকগুলা সরি।আর এমন করবো না।সবসময় ফোন করবো তোমাকে।”
দুজনের এসব কথার মাঝেই মুস্তাফিজ খান আর হামিদ ইয়াসির কিছু নিয়ে আলোচনা করতে করতে কক্ষের ভিতর ঢুকলেন।রাফানা চৌধুরী তাদের দেখে উঠে বসতে চাইলেন।কিন্তু মাথা ব্যাথার কারণে উঠে বসতে পারলেন না।তার কপালের একপাশে কাটা জায়গায় ছোট ব্যান্ডেজ লাগানো।মায়া তার মাথায় কাপড় দিয়ে দিলো।তাকে আটকে দিয়ে উঠে বসতে দিলো না।
মুস্তফিজ খান বাঁধা দিয়ে বললেন
-“উঠার দরকার নেই ভাবি।এখন কেমন লাগছে আপনার?”
-“জ্বি ভালো লাগছে এখন।আমার মেয়েটাকে দেখেই শান্তি লাগছে।”
-“কিছু নিয়ে চিন্তা করছিলেন মনে হয়।প্রেশারতো একেবারে লো হয়ে গিয়েছিল।”
-“না,না তেমন কিছু না।মাঝে মাঝে এভাবে প্রেশার লো হয়ে যায়। ব্যালেন্স রাখতে না পেরে, মেঝেতে পরে গিয়েছিলাম। আপনারা দাঁড়িয়ে কেনো? বসুন না।”
-“বসতে পারবো না ভাবি।পেশেন্ট দেখার টাইম হয়ে গেছে। মুস্তাফিজের কল পেয়েই তাদের ফেলে চলে এসেছি।এবার আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিন।”
হামিদ ইয়াসির নম্র কন্ঠে বললেন।
-“একি কিছু মুখে না দিয়েই চলে যাবেন?আজ তো সবাইকে কাজে আসতেও মানা করে দিয়েছি। মায়া একটু চা দিতে পারবি ওনাদেরকে?
”
-“অবশ্যই মামনি।কেনো পারবো না?আঙ্কেল তুমি বসো না।আমি এখনি গিয়ে চা বানিয়ে আনছি।”
হামিদ ইয়াসির মানা করলেন।বললেন
-“তােমার শুধু শুধু কষ্ট করার দরকার নেই। তুমি তোমার মামনির পাশে বসে থাকো।আমার ইমিডিয়েটলি হসপিটালে যেতে হবে।আরেকদিন এসে তোমার হাতের বানানো চা খেয়ে যাবো।”
হামিদ ইয়াসির সবার থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।মুস্তাফিজ খান সাইডটুলে বসে মায়া আর রাফানা চৌধুরীর সাথে টুকটাক কথা বলছেন।
তখনই রুদ্র কোত্থেকে দৌড়ে এসে কক্ষে ঢুকলো।তিনজনে একযোগে অবাক হয়ে তাকালো তার দিকে।তিনজনের তাকানোর ধরন দেখে রুদ্র থতমত খেলো।
মায়া উঠে দাঁড়িয়ে রাগী গলায় বললো
-“এতক্ষণে আসার সময় হলো তোর।মামনি কতবার তোকে কল দিয়েছে জানিস?”
রুদ্র ভেজা গলায় বললো
-“আমি মিটিং এ ছিলাম তাই মোবাইল সুইচড অফ করে রেখেছিলাম। আমার মোবাইল এখনো অফ। বাইরে হামিদ আঙ্কেলের সাথে দেখা হওয়ার পরই আম্মুর অসুস্থতার কথা জানতে পেরেছি।”
রুদ্র দ্রুত পায়ে এসে রাফানা চৌধুরীর কাছে বসলো।পাশে বসে তার হাত ধরে বললো
-“আই এম সরি আম্মু। আমি বুঝতে পারিনি যে তুমি এতটা অসুস্থ হয়ে পরবে।বিশ্বাস করো আমি তোমার কলও দেখতে পাইনি।”
তারপর কপালের কাটা জায়গায় আলতো হাত ছুয়ে বললো
-“কতটা কেটে গেছে। অনেক ব্যাথা পেয়েছো তাই না?”
রাফানা চৌধুরী রুদ্রর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।রুদ্রর চোখে পানি টলমল করছে।
মুস্তফিজ খান রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে বললো
-“তোমার আম্মুর প্রেশার লো হয়ে গিয়েছিল। মাথা ঘুরে পরে গিয়েছিল তাই কেটে গেছে।”
-“থ্যাংক্স বাবাই।তোমরা সময়মতো না আসলে কী যে হতো!”
রুদ্র কৃতজ্ঞতা নিয়ে বললো।
-“থ্যাংক্স দিয়ো না ইয়াং ম্যান।এটা আমার কর্তব্য।”
কিছু সময় নিরবতায় কেটে গেলো। মুস্তাফিজ খান নিরবতা ভেঙে বললেন
-“এবার আমায় যেতে হবে।অনেক্ষণ তো থাকলাম।রাত হয়ে আসছে।”
রুদ্র অনুরোধ করে বললো
-“রাতের খাবারটা খেয়ে যাও।”
-সম্ভব না। তােমার মামনি একা আছে বাড়িতে।আবার আসব তোমার মামনিকে নিয়ে।”
তারপর মায়াকে উদ্দেশ্য করে বললো
-“তুমি কী এখন আমার সঙ্গে চলে যাবে?নাকি থাকবে এখানে?”
মায়া রাফানা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে মিনমিন করে বললো
-“হুম।তোমার সাথেই যাবো।”
-“চলে যাবি মানে?যদি চলে যেতেই হয় আর আসলি কেন?অসুস্থ মা কে ফেলে চলে যাবি।তুই আমাকে নিজের মা না ভাবলেও আমি তোকে নিজের মেয়ে ভাবি।কোথাও যাচ্ছিস না তুই?”
রাফানা চৌধুরী কাঠ কাঠ কন্ঠে বললেন।
মায়া সাফাই গাওয়ার সুরে বললো
-“মামনি তুমি আমার মা’ই। আই প্রমিস প্রতিদিন ভার্সিটি থেকে এসে আগে তোমাকে দেখে যাবো।কিন্তু এখন আমাকে যেতে হবে।আমার এক্সাম শেষ হলেই একেবারের জন্য চলে আসব।”
-“না।কোনো কথা শুনতে চায় না আমি। মেয়েদের বিয়ের পর অতোদিন বাপের বাড়িতে থাকতে নেই। এখন এটাই তোর বাড়ি, এই বাড়িতেই থাকতে হবে তোকে।যদি চলে যাস তাহলে কোনোদিন আমার সাথে আর কথা বলবি না।”
মায়া উত্তর দিতে পারলো না। আমতা আমতা করে কিছু বলবে তার আগেই মুস্তাফিজ খান বললো
-“এভাবে যখন বলছে তোমার মামনি তখন থেকে যাও।একা বাড়িতে থাকে নিশ্চয়ই ভালো লাগে না।তুমি থাকলে অন্তত কারো সঙ্গ পাবে।”
-“সেটাই তো।”রুদ্র ফটাফট বললো।মায়া কোণা চোখে তাকালো ওর দিকে। কঠোর স্বরে বললো
-“আমি যাবো বাবা। থাকবো না এখানে।আমার এক্সাম।”
রাফানা চৌধুরী কান্না কাটি শুরু করলেন। উনি মায়াকে যেতে দেবেন না। মায়াকে ছাড়া ওনার ভালো লাগে না। অসহায় লাগে নিজেকে। মুস্তাফিজ খান মেয়েকে বোঝালেন। রাফানা চৌধুরী বাচ্চাদের মতো মায়ার আঙুল ধরে রেখেছে, ছাড়ছে না কোনোমতেই। মায়া দুর্বল হয়ে গেলো ওনার কান্নায়, শুধু ওনার দিকে তাকিয়ে হার মেনে নিলো।
-“আচ্ছা তাহলে এবার আমি যাই।দেরি হয়ে যাবে নয়তো।”বলেই মুস্তাফিজ খান বাইরে চলে গেলেন।রুদ্র এগিয়ে দিতে গেলো তাকে।
রুদ্র ফিরে এসে তার মায়ের কাছে বসলো আবার। মায়ার দিকে তাকিয়ে দেখলো সে ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।রুদ্র ঠোঁট টিপে হাসতেই মায়া ভেংচি কাটলো।
রাফানা চৌধুরী দুজনকে উদ্দেশ্য করে বললো
-“এবার তোরা রুমে গিয়ে রেস্ট নে।আমি একটু ঘুমাই। ”
মায়া রাফানা চৌধুরীর কথায় সাই জানিয়ে উঠে দাড়ালো।নিজের ব্যাগ নিয়ে কক্ষের বাইরে এলো।রুদ্রও মায়ার পিছুপিছু বেরিয়ে এলো।
মায়া ব্যাগ থেকে বই বের করছে।তখনই রুদ্র কোত্থেকে টপকে পরে বললো
-“তুই চলে যেতে চাইলি কেন?”
-“মন চেয়েছে তাই।”
মায়া রুদ্রর দিকে না তাকিয়েই উত্তর দিলো।
-“যা মন চাই তাই করতে পারবি?”
-“তুই করতে পারলে আমি কেন পারবো না।”
-“কী করেছি আমি?”
-“কিছু করিসনি।”
-“কথা ঘোরাচ্ছিস তুই।এসে আবার চলে যেতে চাইলি কেন?”রুদ্র উৎকন্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করলো।
-“এসেছি মামনির জন্য। আর অন্যের বাড়িতে থাকতে যাবো কেনো তাই চলে যেতে চেয়েছিলাম।কিন্তু মামনির জন্য পারলাম না।”
-“মায়ু,এটা তোর বাড়ি না?”
রুদ্র অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো।
মায়া মলিন হেসে বললো
-“না রে।এটা তোর বাড়ি।এখানে আমার কোনো অধিকার নেই।যদি থাকতো তাহলে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারতি না।এখন হয়তো তোর বিরক্তি কমেছে,কিন্তু আমার ভয় লাগছে আবার কখন তোর বিরক্তি শুরু হয় আমার উপর।আর আবার তুই বাড়ি থেকে বের করে দিস আমাকে। নিজের বাড়ি থাকতে অন্যের বাড়িতে এভাবে ছ্যাচড়ার মতো পরে থাকার কোনো মানেই হয় না।
রুদ্র থমকে গেলো। উদ্বিগ্ন কন্ঠে আওড়ালো
-“বের করে দিয়েছি তোকে।এতো বড় কথা তুই বলতে পারলি?আমিতো শুধু একটু সময় চেয়েছিলাম। ”
-“সময় দিয়েছিতো তোকে।আরো বেশি সময় দেওয়ার জন্যই তো চলে যেতে চেয়েছিলাম।”
-“মায়ু,আমি জানি আমি অনেক খারাপ বিহেভ করেছি তোর সাথে।যার কোনো ক্ষমা হয় না।কিন্তু আমার যে তোকে অনেক কিছু বলার আছে। আগে শোন তারপর নাহয় বিচার করিস আমার।”
মায়া হাসলো।হেসে বললো
-“আমি কে হই তোর বিচার করার রুদ্র?কেও আমি? কেও না? তোর জন্য আমি আমার সবকিছু শেষ করে দিলেও তুই আমাতে গোণায়ও ধরিস না।বাদ দে এসব, আমাকে ফ্রেশ হতে হবে। আমি যাচ্ছি।”
-“কই যাবি?
-“অন্য রুমে। ”
-“অন্য রুমে কেন?”
-“থাকার জন্য।ঘুমাবো কই নয়তো?”
-“আজিব!যেখানে আগে ঘুমাতি সেখানে।এই রুমেই তো থাকতি তাই না!তবে অন্য রুমে যাবি কেন?”
-“এই রুমে তো তুই থাকবি।আর তোরতো আমার সাথে থাকতে রুচিতে লাগে,তাই অন্য রুমে চলে যাচ্ছি। ”
মায়া যেতে ধরলেই, রুদ্র মায়ার হাত শক্ত করে আকড়ে ধরলো।ভাঙ্গা গলায় বললো
-“প্লিজ এমন করিস না।আমার কথাগুলো একটু শোন।আর কখনো তোর সাথে এমন করবো না আমি, প্রমিস। কিন্তু আগে নিজেকে এক্সপ্লেইন তো করতে দে।তারপর নাহয় আমাকে ধরে মারিস।প্লিজ একটা সুযোগ দে সবকিছু বলার।সরি তো।”
-“সরি ফর হুয়াট? আমাকে শেষ করে দেওয়ার জন্য? ভেতরে ভেতরে আমাকে মেরে ফেলার জন্য?আমার অনুপস্থিতে আরেকটা মেয়েকে যত্ন করার জন্য? আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে আরেকটা মেয়ের সাথে ভালোবাসা দেখানোর জন্য? পঁচিশটা দিন আমার একটু খবর না নেওয়ার জন্য? কীসের জন্য সরি? বল আমাকে।এতোগুলো দিন যে আমাকে ছাড়া কাটিয়ে দিতে পারে, যার একবার আমাকে মনে পরে না পর্যন্ত, একটু খোঁজ নেয়না আমার, সে সারাজীবন থাকতে পারবে আমাকে ছাড়া। একবার খবর পর্যন্ত নিসনি তুই, আমি বেঁচে আছি কিনা মরে গেছি। আমাকে মেরে ফেলেছিস তুই! একটা মানুষকে খুন করার পর, তুই তাকে সরি বলছিস রুদ্র। তোর লজ্জা করছে না?”
রুদ্র অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো মায়ার দিকে। ওর চোখে থইথই অশ্রু। উপচে পরবে যেকোনো সময়।
মায়া এতক্ষণে চোখ তুলে তাকালো রুদ্রর দিকে।রুদ্র গভীর চোখে চেয়ে আছে।দু চোখে মায়াকে কিছু বলতে চাওয়ার তীব্র আকাঙ্খা। মায়া যত কষ্ট করে,যত সময় নিয়ে নিজের মনটা শক্ত খোলসে আবৃত করেছিলো তা যেন মুহূর্তেই ভেঙে চূর্ণ -বিচূর্ণ হয়ে যাবে।মায়া হাজার চেয়েও শক্ত রাখতে পারছে না নিজেকে।মানুষটার সামনে যে ও বরাবরই হেরে যায়,হাজার চেষ্টা করেও শক্ত থাকতে পারে না।আচ্ছা, আরেকটা সুযোগ দিলে কী ও আবার কষ্ট পাবে?আবার হৃদয়টা খন্ড-বিখন্ড হয়ে ভেঙে যাবে?রুদ্রর এসব ব্যবহার কী শুধুই সাময়িক?নাকি আবার বদলে যাবে ও? বদলে না গেলেও, যে মানুষটা ওঁকে মরে যেতে বলতে পারে, বেঁচে থাকতে তার সঙ্গ নিয়ে থাকা যায়! নিজের আত্মাকে আর কতোটা কষ্ট দেবে ও? আর কতোভাবে অপমান করবে নিজের সত্ত্বাকে!
#চলবে

