বাসর ঘরে ভাঙ্গা কাচের স্তুপের মাঝে বসে আছে এক নববধূ। দৃষ্টি তার সামনের দিকে নিবদ্ধ । নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে পরখ করছে সামনে ভাঙচুর করা মানুষটিকে।রুমের অবস্থা করুণ। কক্ষের একটা কাঁচও আস্ত নেই।ভেঙে টুকরো হয়ে ছিটিয়ে আছে ফ্লোরে।সফেদ পর্দা, বেডশিট সহ বিভিন্ন জিনিস মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আর তার মাঝেই একটু জায়গা করে বসেছে মায়া। পুরো নাম সাইয়্যারা খান মায়া।
সামনের মানুষ টি রেগে আগুন হয়ে আছে।হাতের কাছে যা পাচ্ছে তাই ছুঁড়ে মারছে ফ্লোরে।
একের পর এক জিনিস ভেঙে ক্ষান্ত হলো রুদ্র। যখন ভাঙ্গার মতো আর কিছুই পেলো না তখন তাকালো মায়ার দিকে। মায়ার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই এসবে।সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রুদ্রর দিকে। রুদ্র তেড়ে গেলো মায়ার দিকে।হাতে হেচকা টান দিয়ে টেনে তুলল ওঁকে।সহসা চ*ড় বসালো মায়ার গালে।শক্ত হাতের চ*ড় খেয়েও মায়ার কোনো পরিবর্তন হলো না। টু শব্দটুকু হলো না তার। রুদ্র কটমট দৃষ্টিতে তাকালো মায়ার দিকে। বাহু ধরে ঝাঁ*কিয়ে রা*গী কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো
-”কেনো করলি এমন??কী ক্ষতি করেছি তোর আমি??
-” কী করেছি?? ”
-” কী করেছিস জানিস না??কেন বিয়ে করেছিস?? মানা করেছিলাম না। এখন আমি আরশিকে কী জবাব দিব??
-” বলবি আমাকে বিয়ে করেছিস।”
-“তোর ল*জ্জা করছে না এসব বলতে??”রুদ্র হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলো।
-“আমি ভালোবাসি ওকে।দেড় বছরের সম্পর্ক আমাদের। তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আরেকজনকে বিয়ে করেছি, ঠকিয়েছি তাকে। ”
-” খবরদার ভালোবাসার কথা বলবি না।গা জ্ব*লে আমার।উহু রে!ভালোবাসা।যা আজ একজনের উপর আসলো কাল আরেকজনের উপর।আসলেন আমার রোমিও, তার বারো জুলিয়েট নিয়ে গপ্প শোনাতে।বা*রো ভা*তারি!
-“মায়া, আল্লাহর ওয়াস্তে অফ যা।তোর আরেকটা গাল যেটা লাল হয় নাই, ওটারেও টমেটো বানাইস না।জু*তা খাইস না আমার!”
-“তুই জুতা মারলে আমি মনে হয়, গালে আঙুল দিয়ে বসে থাকবো। দেখ ভাই তোর এত প্যাচাল ভালো লাগছেনা।ঘুম আসছে খুব।ঘুমাবো আমি।” মায়া বিরক্তির স্বরে বললো।
-“আমার ঘুম হারাম করে তোর ঘুম আসছে??”
– ” হ্যাঁ, আসছে। এবার সামনে থেকে দুর হ!”
বলেই বেডের দিকে এগিয়ে গেল।মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে কল দিল কাওকে।তড়িঘড়ি করে বললো
-“বাবাই, একটু কষ্ট করে একজন মেইডকে রুমে পাঠাও তো।”
-” কী হয়েছে প্রিন্সেস?? কোনো সমস্যা।রুদ্র তোমাকে কিছু বলেছে??”
– ” না বাবাই সমস্যা নেই। একটু সাহায্য লাগবে কারো।”
-“আচ্ছা আামি পাঠাই দিচ্ছি।কোনো সমস্যা হলে বলো।”
-“আচ্ছা।”
রুদ্র প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মায়া নিজ থেকেই উত্তর করল-
-” রুমের যা হাল করেছিস পরিষ্কার করতে হবে তো।উপস!প্রেমিকার বিরহে শেষ হয়ে যাচ্ছে!”
ব্যাঙ্গ করে বললো মায়া।ব্যাগ থেকে কাপড় নিচ্ছে মায়া।রুদ্র ভ্রু কুঁচকে বললো
-“কী করতেছস??”
-“নাচছি!আয়, নাচবি, আমার সাথে?তোর ব্রেকআপ আর আমাদের বিয়ের সেলিব্রেশন করলে মন্দ হয় না, কী বলিস!”বলেই ওয়াশরুমে ঢুকলো।
রুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাউচে বসলো। দরজায় নক করছে কেউ অনবরত।রুদ্র বিরক্তির শ্বাস ফেললো।বিরবির করে বকতে বকতে গিয়ে দরজা খুলল।দেখলো সামনে একজন মেইড দাঁড়িয়ে আছে।
-“মায়া ম্যাম ডেকেছে।”
-“ভেতরে এসো।” সরে দাঁড়ালো রুদ্র।
ভেতরে এসে চক্ষু ছানাবড়া হলো তার।রুমের অবস্থা বেহাল।একজনে পরিষ্কার করতে পুরো রাত লেগে যাবে। সবকিছু সুন্দর ভাবে গোছানোর জন্য আরেকজনের সাহায্য দরকার।
-“স্যার আপনি কী বাইরে যাবেন??”
-“না। তুমি পরিষ্কার করো, আমি বেলকনিতে যাচ্ছি।”
দীর্ঘক্ষণ শাওয়ার নেওয়ার পর বের হলো মায়া। মেইড ততক্ষণে সব গুছিয়ে চলে গেছে।রুদ্র রুমের কোথাও নেই। মায়া বেলকনিতে গিয়ে দেখল রুদ্র উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে।মায়া মায়াময় দৃষ্টিতে তাকালো সামনের স্নিগ্ধ,শ্যাম মানুষটির দিকে।মাথায় দুষ্টুমি ভর করলো তাৎক্ষণিক।রুদ্রকে জ্বা*লিয়ে, বিরক্ত করার মতো শান্তি আর কিচ্ছুতে নেই। পেছন থেকে ঝাপটে জড়িয়ে ধরলো মায়া।গাল ঠেকিয়ে দিলো রুদ্রর পিঠে। রুদ্র হকচকিয়ে গেলো। পিছনের মানুষটি কে বুঝতে পেরে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো। মায়া ছাড়লো না। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে রুদ্রকে।রুদ্র ঝারা মেরে সরালো মায়া কে। চিবিয়ে চিবিয়ে বললো
-“তোর সাহস কী করে হলো আমাকে জড়িয়ে ধরার।”
-“নিজের জামাইকে জড়িয়ে ধরতে সাহসের কী প্রয়োজন??”
-“আমি তোকে বউ বলে মানি না। ”
-” তুই মান বা না মান তিন কবুল বলে, আল্লাহ কে সাক্ষী রেখে আমাদের বিয়ে হয়েছে।এর মানে তুই আমার স্বামী।
বাঁকা হেঁসে বললো মায়া।দু’হাত জোড় করার ভঙ্গি করলো রুদ্র।অতিষ্ঠ হয়ে বললো
-“মাফ চাই,ভাই!বল এখন তোর স্বামী হওয়ার সুবাদে কী করতে হবে আমাকে?”
-“আজ আমাদের বিয়ের ফার্স্ট নাইট রুদ্র।কী করতে হবে বুঝো না তুমি?সুজি খাও?” ঠোঁট গোল করে বললো মায়া।
অসম্ভব দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো রুদ্র।দাঁতে দাঁত চেপে বললো
-“এতো নির্ল*জ্জ তুই?”
-“আহারে! আসছে আমার ল*জ্জাবান রে!বা*রো জায়গায় মুখ মে*রে এসে,সে আমারে ল*জ্জায় শেখায়!”
-“আরোটা থা*প্পড় দিতে চাচ্ছি না তোকে!”
-“দিয়ে দেখ। তোর হাতের কী অবস্থা করি আমি!” চোখ টিপলো মায়া।
রুদ্র নাক কুঁচকে বললো
-“তুই একটা অ*শ্লীল! খারাপ ই*ঙ্গিত দিচ্ছিস!”
-“হারামে অভ্যস্ত হতে হতে হালালে পোষাবে না এটাই স্বাভাবিক। বউয়ের ইঙ্গিত অ*শ্লীল মনে হবে তখন।”
-“তোর না ঘুম পাচ্ছিলো।প্লিজ, যা ভাই।তোর কথা এগুলা শুনতে ঘি*ন লাগতেছে শুনতে। বিরক্ত করছিস কেন??”
-“তোকে লাগবে ঘুমানোর জন্য।”
-“নাটক পাইছস।”
-” নাটক না। অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল জামাইয়ের বুকে মাথা রেখে ঘুমাবো।”
-“তোর কোনো ইচ্ছা পূরণ করতে পারব না।”
-“ওক্কে, তাহলে আমি বাবাইকে কল করে বলছি যে তুই আমাকে মেরেছিস!”
-“কখন মারলাম তোকে আমি??”
-“ওই হারামি ভুলে গেছিস নাকি!গালে এখনও টনটনে ব্যাথা আমার।”
– “একদম ভালো হইছে।দেখ তুই বাবা কে কল দিবি না। ”
-“আচ্ছা দিব না। চল আমার সাথে।”
অগত্যা রুদ্র গেলো মায়ার সাথে।নয়তো দেখা গেলো সত্যিই কল দিয়ে শুধু ওর বাবা না পুরো গুষ্টি কে নিয়ে আসলো।কক্ষে যেতেই বাঁকা হাসলো মায়া।বেডের দিকে তাকিয়ে কোণা চোখে তাকালো রুদ্রর দিকে।বললো
-“ফুলে সাজানো হলে, মন্দ হতো না!বাসর,বাসর ফিল আসছে না।কী করা যায় বলতো বাডি?”
রুদ্র গভীর দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে।মনে মনে
নির্ল*জ্জ বলে গালি দিলো কয়েকটা।পিছিয়ে গিয়ে ড্রয়ার খুলে লাইটার নিলো হাতে।মিষ্টি হেঁসে বললো
-“ফুলের বদলে কয়লা থাকলে আরো বেশি ভালো হয় !” বলেই বিছানা ছুঁড়ে মারলো লাইটার।মুহুর্তেই দা*উদা*উ করে আগুন জ্বলতে শুরু করলো।মায়া শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো সেদিকে।রুদ্র ওর দিকে ঘাড় বাকিয়ে তাকিয়ে বললো
-“তোর সংসার এই আগুনে সজ্জিত বিছানার মতোই হবে।প্রতিনিয়ত জ্ব*লে-পু*ড়ে অঙ্গার হবি।ছাই টুকুও বাঁচবে না মায়ু।ছলনার পরিণাম খুব বি*শ্রী ভাবে দিতে হবে।আমার সাথে সুখের সংসারের আশা ছেড়ে দে।ওয়েল কাম টু হেল সুইটহার্ট। বেস্টফ্রেন্ড হিসেবে আমার কিছু দায়িত্ব আছে তো নাকি।”
নিশ্চুপ ওয়াশরুমে গিয়ে এক বালতি পানি নিয়ে এলো মায়া।আক্রোশে পানিটুকু ছুঁড়ে মারলো বিছানার উপর।বালতি রেখে এসে দেখলো রুদ্র কাউচের উপর শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মায়া তপ্তস্বরে,চিল্লিয়ে বললো
-“আমি কোথায় শোবো?বিছানা তো জ্বা*লিয়ে দিয়েছিস, জানো*য়ার!”
-“ইট’স নট মাই রেসপন্সিবিলিটি! তুই কোথায় শুবি সেটা আমার ভাবার বিষয় না!”
-“দেখ তুই যদি মনে করে থাকিস তোর কথায় আমি ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদবো। বাংলা সিনেমার নায়কা সাবানার মতো সব কথা শুনবো,তোর কথায় নিচে শোবো তাহলে তুই ভুল ভাবতেছস।”শান্ত স্বরে বললো মায়া।
-“আমি কখন বললাম, তুই যে নায়িকা সাবানা।রিনা খান কেও ছাড়াই যাবি কূ*টনামি তে।কূ*টনি মহিলা!আল্লাহ মাফ করবে না!”
দীর্ঘশ্বাস ফেলল মায়া।সোফার কাছে গিয়ে ধপ করে রুদ্রর বুকের উপর শুয়ে পরলো।হকচকিয়ে গেলো রুদ্র।কিছু বলতে চাইলেই মায়া সহসা থামিয়ে দিল তাকে।
-” প্লিজ কিছু বলিস না। ঘুমাতে দে। প্রচন্ড মাথা ব্যাথা।আর কোথাও শোয়ার জায়গা নাই।তোর বুকে একটু জায়গা দে!”
চুপ করে থাকলো রুদ্র।চাইতেও কিছু বলতে পারলো না। এ পাগলকে বোঝানো ওর পক্ষে সম্ভব না। ও কোনোদিন জিততে পারেনি মায়ার সাথে।আজও পারলো না।মায়া নিজের মন-মর্জি করলো।রুদ্র মেনে নিলো। বুকের ভিতর ঢিপঢিপ করছে।তড়িৎবেগে, ধ্রিমধ্রিম শব্দ করে লাফাচ্ছে হৃৎপিণ্ড।উপুড় হয়ে ওর বুকের উপর শুয়ে আছে মায়া।সাপের মতো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে আছে ওঁকে। রুদ্রর মনে হলো একটা তুলার বস্তুা ওর গায়ের উপর তুলে দেওয়া হয়েছে।আশ্চর্য! একটা মানুষের ভার এতো হালকা কী করে হতে পারে? আনমনা হয়েই মায়ার চুলে হাত রাখলো রুদ্র।চাদরটা গলা পর্যন্ত টেনে দিলো ওর।
কিছুক্ষন পর ডাকলো ওঁকে। কিন্তু মায়া সাড়া দিল না। সারাদিনের ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পরেছে মেয়েটা।রুদ্রর মায়া হলো মায়ার ক্লান্ত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে। কিন্তু তার যে ঘুম আসছে না। কয়েক ঘন্টার মাঝেই জীবন টা পুরোপুরি পাল্টে গেল।একটা মানুষ অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে জুড়ে গেলো ওর সাথে।সামনের দিনগুলো কেমন হবে জানা নেই রুদ্রর।তবে এটুকু জানা আছে মায়াকে অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে মানতে পারবে না ও কখনোই।মায়ার জায়গা আলাদা।সেখানে ভালোবাসা নামক জিনিসটা কখনো আসবে না।
#চলবে
#উৎসর্গ
#পর্ব:১
#তানজিনা ইসলাম

