#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_১২
#জান্নাত_সুলতানা
প্রিয়ম খেতে বসে ঘামছে। তিয়ান লক্ষ্য করলো ব্যাপার টা। প্রিয়মের প্লেটে তখন শুঁটকি মাছের ভর্তা। তিয়ান চট করে মেয়ে টার ঘেমে ওঠার কারণ খুঁজে পেলো। নাক টেনে ভাতের লোকমা মুখে নিতে নিতে আঁড়চোখে প্রিয়ম তিয়ানের দিকে একবার চাইলো৷ পরক্ষণেই নিজের একটু আগে করা কান্ড মনে পড়তেই লজ্জা পেয়ে গেলো মেয়ে টা। পাশে যে কেউ বসে আছে সেদিকে খেয়াল ছিল না। তিয়ান ইকবালের মাথায় থাকা ক্যাপ টা নিয়ে শক্ত স্থান টা ধরে ধীরে ধীরে প্রিয়মকে বাতাস করতে লাগলো। ইকবাল খাওয়া বন্ধ করে হা করে তাকিয়ে থাকে তিয়ানের দিকে। তিয়ান পাত্তা না দিয়ে খেতে শুরু করে আবারও।
অন্যদিকে প্রিয়মের কিশোরী মন ছটফট করে উঠলো। প্রিয়মের অস্বস্তি তিয়ান যেনো বুঝতে পারে। শান্ত স্বরে আস্তে আস্তে বললো, “এতো অকোয়ার্ড হওয়ার কিছু নেই বাচ্চা। নির্ভাণের মতোই ভাবো আমাকে।”
প্রিয়ম দৃষ্টি তুলে নির্ভাণের দিকে তাকালো।সানায়ার পাতে তখন মাছ নেই। নির্ভাণ মাছের কাটা ছাড়িয়ে সানায়া কে দিচ্ছে। তন্বী রহমান বারবার করে বলছেন, “কাটা ভালো করে বেছো নির্ভাণ।” নির্ভাণ গম্ভীর। মায়ের কথায় শুধু চোখ তুলে মায়ের দিকে চাইলো। তন্বী ছেলের চোখের ভাষা পড়তে জানে। আর তাই আপাতত চিন্তা ছেড়ে খাওয়ায় মনোযোগ দিলো।
সানায়া কে তন্বী রহমান ভীষণ যত্নে রাখেন। নিজের মেয়ে কেও এতোটা যত্ন করে না যতোটা তিনি ননদের মেয়ে কে করেন। আরোরা জাহান যখন স্বামী নিখোঁজের পর এক্কেবারের জন্য বাবা বাড়ি চলে এলেন, সানায়ার বয়স তখনই খুব কম। মা ছাড়া কিছুই বুঝেন না বাচ্চা মেয়ে। তখন আরোরা মানসিক ভাবে ঠিক নেই। মেয়ের সেবাযত্ন তিনি তেমন করতে পারতেন না। আর তখন থেকেই তন্বী সানায়া কে বেশি নিজের আশেপাশে রাখতো। খাওয়া, ঘুম সবই তিনি করতেন। এইজন্যই ওনার জন্য সানায়ার যেমন আলাদা টান তেমনই ভদ্রমহিলাও ওকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসেন।
——
সানায়ার নিজের বিছানা ছাড়া তেমন কোথাও ভালো ঘুম হয়না। গতকাল অনেক জার্নি করায় শরীর ক্লান্ত ছিলো আর নতুন যায়গায় ঘুম কিছুতেই চোখে ধরা দিচ্ছিল না। এদিক-ওদিক করে ঘুমিয়েছে শেষ রাতে। তাই সকালে উঠতে একটু দেরি হয়েছে। আফি রুমে ছিলো না। সানায়া ফ্রেশ হয়ে নিচে আসার আগে একবার নির্ভাণের রুমে উঁকি দিলো। কেউ ছিলো না রুমে তখন। ঘড়িতে বেলা সাড়ে নয়টার বেশি সময় বাজে এখন। সে নিচে এসে নাশতা করলো একা। নির্ভাণের মামিরাও খুব ভালো। একজন আপন আরেকজন চাচাতো মামি। তারা যৌথ পরিবার। দেখে বোঝার উপায় নেই তারা দুই চাচাতো ভাই। ভাইদের মাঝে যেমন মিল তেমনই দুই জা একদম দুই বান্ধবী যেনো। খাওয়ার মাঝে সানায়া তন্বী রহমান কে কাছে পেলো একবার। তখন জানতে পারলো সবাই এয়ারপোর্টে গেছে। রাত তিন টা বাজেই চলে গেছে। সকালেই এই বাড়ির বড়ো এবং একমাত্র ছেলে সিলেট বিমানবন্দরে লন্ডন থেকে অবতরণ করেছে। সানায়ার এই খবরে আগ্রহ কমই দেখা গেলো। সে একান্ত চৌধুরী নাম শুনেছে বহুবার। ছোটবেলার কথা ঠিকঠাক মনে নেই কেমন দেখতে হতে পারে ওই লোক। তাই সে খাবার শেষ রান্না ঘরের দিকে পা বাড়াল। রান্না ঘরে তখন পাঁচ জন মহিলা। এবং আরও দু’জন কাজের মহিলা ও তাদের হাতে হাতে কাজে সাহায্য করছিলো। রান্নাবান্নার এলাহি আয়োজন সেটা রান্না ঘরের পরিবেশ দেখেই বুঝে যাচ্ছে। সানায়া গুটিগুটি পায়ে দরজার সামনে দাঁড়াল। ছোট মামি দরজার কাছেই কিছু একটা বানাচ্ছে। হয়তো কাবাব। সানায়া ওনাকে জিজ্ঞেস করলো,
“বাকিরা কোথায় মামুনি?”
“বাড়ির পেছনে বাগানে আছে। খেয়েছিস তুই?”
“হাুঁ।”
মামির সাথে কথা শেষ সানায়া বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। বাগানে বসে ছিলো ওর ছোট মামা এবং ফারাজ সিদ্দিকী সহ ইকবাল। ফারাজ সিদ্দিকী ফোনে কথা বলছেন। আর ইকবালের সাথে নেয়ামত সিদ্দিকী আড্ডা দিচ্ছেন। সানায়া বাড়ির পেছনে এসে দেখলো সবাই পুকুর পাড়ে ঘাটে। আর রাস্তার ওপারে ধানের খিল জমিতে মাহফিলের জন্য আয়োজন করা হচ্ছে। বাড়ির একদম কাছে। পেছনের পাঁচিল গুলো একটু নিচু বলেই প্রায় সব দেখা যায়। তবে পুকুর পাড় থেকে দেখার উপায় নেই কেননা সে-ই স্থান টা একটু নিচু। আর ওখানেই বসে আছে সবাই। ঠান্ডায় অল্প কুয়াশা চারপাশে। সানায়া বাইরে এসে যেনো শীত টা বেশি অনুভব করলো। দ্রুত গিয়ে মাদুরে আফির পাশে বসে আফির গায়ে থাকা চাদরের নিচে নিজের ছোটখাটো শরীর টা নিয়ে ঢুকে গেলো। রাহা রাফা তখন জলপাইয়ের ভর্তা করার জন্য সবকিছু রেডি করছে। প্রিয়ম ও তাদের সাহায্য করছে।
“এতো সকালে ভর্তা?”
“হ্যাঁ আপু। মজা হবে।”
সেহেরের কণ্ঠে উচ্ছাস। সানায়া চুপচাপ বসে রইলো। রাফা খুব সুন্দর করে পাকা জলপাই গুলো মাখাচ্ছে। সানায়ার এতো সকালে এসব টক খাওয়ার ইচ্ছে এতোক্ষণ না থাকলে-ও ভর্তার ঘ্রাণ সানায়ার মর্জি পালটে গেলো। ভর্তা হওয়ার আগ পর্যন্ত রাফা রাহার মুখে একান্ত চৌধুরীর গল্প শুনেই কাটলো। আফি বেশ মনোযোগ দিয়ে এসব শুনছে এবং কেমন চোখ দু’টো চকচক করছে রমণীর। কিসমত ভালো এখানে চোখের ভাষা পড়ার মতো কেউ নেই। সবগুলো ছোট।
“একটু পানি নিয়ে আয় তো রাহা।”
রাফা একটা বালতি রাহার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো।
রাহা তৎক্ষনাৎ শীতে গায়ের চাদর আরও শক্ত করে ধরলো। দাঁতে দাঁত ঠুকর দিলো ইচ্ছে করে। তারপর কাঁপা কাঁপা স্বরে বললো,
“আমি পারবো না। পানি ভীষণ ঠান্ডা আপু।”
“ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেব। তারপর সোজা গোসল দিয়ে উঠবি বেয়াদব মাইয়া।”
রাফা দাঁত কটমট করে। রাহা কিছু বলার আগেই সানায়া বালতি নিয়ে ওঠে গেলো। পানি হাতে লাগতেই ঠান্ডায় কাটা দিয়ে ওঠে শরীর। সানায়া বালতি রেখে হাত ঝাড়তে শুরু করে।
“এই পানিতে গোসল দেওয়া অসম্ভব।”
“কেনো? দিলে কী হবে?”
রাফা অবাক ভ্রু কুঁচকে শুধালো। সানায়া দুই দিকে মাথা নেড়ে বললো,
“বেশি কিছু না। একটা জানাজা পড়াতে হবে। এই আর কী।”
সানায়ার কথা শেষ হতেই সবাই হাসতে শুরু করলো। এরমধ্যে পেছন থেকে কেউ বলে উঠলো, “আচ্ছা তাই না-কি! তবে আমি গোসল দেব। দেখি কী হয় আমার।”
কেউ অবাক তো কেউ ভ্রু কুঁচকে ইকবালের দিকে চাইলো। ইকবাল বেশ ভাবসাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গায়ে একটা শীতের জ্যাকেট এবং ট্রাউজার।
“মনে হচ্ছে চ্যালেঞ্জ নিচ্ছেন?”
সানায়া ভ্রু কুঁচকে রাখে। ইকবাল ততক্ষণে ঘাটলায় নেমে গেছে। জ্যাকেটের জিপার খুলতে খুলতে বললো,
“আবার জিগায়। ইকবাল কখনো ফাঁকা আওয়াজ করে না।”
“তাহলে চ্যালেঞ্জ?”
রাফা নিশ্চিত হতে আবারও জিজ্ঞেস করে।
“ইয়েস লিটল গার্ল।”
রাফা ইকবালের কথায় থতমত খেলো। এই ছেলে তার সেই ফ্লার্ট করছে? মোটেও সুবিধার ঠেকাচ্ছে না এই যুবকের মতিগতি। ইকবাল এরমধ্যে পানিতে ঝাপ দেয়। আর সত্যি সত্যি গোসল দিয়ে ওঠে আসে। ঠান্ডায় বেচারা ঠকঠক করে কাঁপছে। ওরা সবাই অবাক। ইকবাল জ্যাকেট তুলে দ্রুত বাড়ির দিকে চলে যায়। ওরা সবাই বিস্ময় কাটিয়ে ভর্তা খাওয়া শুরু করে। তবে ভর্তা অতিরিক্ত ঝাল হওয়াতে সবার অবস্থা যেমনই হোক সানায়া আর সেহেরের অবস্থা খারাপ। সানায়া খেয়েছে স্বাদ পেয়ে তবে খাওয়া শেষ হতেই বেচারির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়বে অবস্থা এমন হয়েছে। আফি ওকে টেনে দ্রুত বাড়ির দিকে গেলো। তবে বাড়ির ভেতরে যাওয়ার আগেই গেইট দিয়ে দুইটা গাড়ি এবং একটা বাইক বাড়ির ভেতর প্রবেশ করলো। আফি সানায়া দুজনেই থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। নির্ভাণ বাইক পার্ক করে ফোন হাতে উঠোনের একপাশে চলে গেলো। সানায়া নির্ভাণের থেকে চোখ সরিয়ে সামনে গাড়ির দিকে ফের তাকায়। মূহুর্তেই কেমন হুড়োহুড়ি লেগে গেছে। বাড়ির বড়ো ছেলে দীর্ঘ দিন পর দেশে এসছে বাড়ির সব মানুষ তখন উঠোনে উপস্থিত হয়েছে। গাড়ি থেকে একজন সুদর্শন যুবক নামল বেশ কিছু সময় পর। চোখে কালো রোদ চশমা, কালো শার্ট, কালো প্যান্ট। মানুষ টাই শুধু ফরসা চামড়ার নয়তো সম্পূর্ণ আউটফিট যুবকের কালো। মুখে একটা দাড়ির বালাই নেই। সানায়া ঝাল ভুলে গেলো। লাল হওয়া নাক টেনে আফিকে জিজ্ঞেস করলো,
“তিনি একান্ত চৌধুরী?”
“হ্যাঁ।”
আফি কেমন জড়বস্তুর ন্যায় তাকিয়ে আছে সবার সাথে কুশলাদি করতে থাকা ব্যাক্তির দিকে। সানায়া ফের নাক টানে। একান্ত নামের লোকটার মুখমন্ডলে বারকয়েক চোখ ঘুরঘুর করে কিশোরীর। কেমন বিদেশি দেখতে একটা লোক। তিনি কী আগেও এমন ছিলো? না-কি বিদেশ গিয়ে বিদেশের হাওয়া লেগে এমন হয়ে গেছে? চৌধুরী বংশে এমন বিদেশি দেখতে তো কেউ নেই। তবে তিনি কার মতো? সানায়া ভাবুক হলো। আনমনে বলে উঠলো,
“দেখতে কেমন বয়লার মুরগীর মতো লাগছে।”
ওর রসাত্মক কথাবার্তায় পেছন থেকে সেহের দাঁত বের করে হেঁসে কুটিকুটি হচ্ছে। প্রিয়ম ও ঠোঁট চেপে হাসে। কপাল ভালো রাহা কিংবা রাফা নেই। নয়তো তাদের এমন সুন্দর দেখতে ভাইকে কটুক্তি করার অপরাধে দুই বোন মিলে সানায়াকে সত্যি এই শীতের সকালে পুকুরে ফেলে প্রতিশোধ নিতো।
এখানে সবাই হাসলেও হাসি ছিলো না আফির মুখে। সে তখনও তাকিয়ে দেখছিল সেই বিদেশ ফেরত সুদর্শন মানুষ টাকে। যেনো বহুদিনের অপেক্ষিত কোনো ফল সে আজ পেলো।
#চলবে….
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
