আপনার_হৃদয়ে_আমি #পর্ব_১১

0
28

#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_১১
#জান্নাত_সুলতানা

সকালে তিয়ান কিছু খায়নি আজ। হোস্টেলে রান্না তার রুচিতে ঠিকঠাক ওঠে না। গতবার বাড়ি থেকে মা যা সব রান্না করে দিয়ে ছিলো প্রায় সব খাবার শেষ। এখন ক্লাস শেষ বের হয়ে মাথা ঘুরছে। ইকবালের থেকে পানির বোতল নিয়ে একটু পানি খেতেই পেট মোচড় দিলো। শরীর গুলিয়ে সব বেরিয়ে আসার উপক্রম। সে ওয়াক ওয়াক করে সব পানি ফেলে দিলো। সবাই অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালো। ইকবাল বিস্ময় নিয়ে হড়বড়িয়ে বলে উঠলো,

“তুই প্রেগন্যান্ট?”

ওর কথায় জুনিয়র সিনিয়র অনেক ছেলে হতভম্ব হয়ে তাকায় ওদের দিকে। তবে পরক্ষণেই সবাই ব্যাপার বুঝতে পেরে যে যার মতো চলতে লাগলো। তিয়ান তখনও পেট চেপে ঝুঁকে আছে। নির্ভাণ ইকবাল কে চাপা স্বরে ধমক দেয়,

“উলটো পালটা কথা বন্ধ করবি তুই?”

এরপর তিয়ানকে ধরে। তিয়ান ততক্ষণে নিজেকে একটু স্বাভাবিক করে ইকবালের দিকে কটমট করে চাইলো। দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

“প্রেগন্যান্ট মেয়েরা হয় আবাল।”

ইকবাল তখন বোকাবোকা হাসে। এরপর দৌড়ে গেলো ক্যান্টিনের দিকে। নির্ভাণ তিয়ানকে নিয়ে বসেছে মাঠের এক কোণে। ইকবাল এলো হাতে একটা বার্গার আর কফি নিয়ে। এসে দিলো তিয়ানকে। নিজেও বসলো বন্ধুদের সাথে। সিরিয়াস মুখভঙ্গি করে বলে উঠলো,

“কয়েকদিন ভার্সিটি যেহেতু বন্ধ। আমার সাথে আমার বাড়ি থাক।”

“দরকার নেই। আমরা কাল সকালে গ্রামে মামা বাড়ি যাচ্ছি। আমার সাথে চল দুইটায়।”

নির্ভাণ নিজের ফোন দেখতে দেখতে বলে। তিয়ানের বিস্ময় লেগে যায়। নির্ভাণ যাচ্ছে মামা বাড়ি?

“সত্যি?”

ইকবাল লাফিয়ে ওঠে। তিয়ান নিজেকে সামলে গরম কফিতে ধীরে ঠোঁট ছুঁয়ে দেয়। বাবা না থাকায় কখনোই বন্ধুদের নিজের সাথে নিয়ে মায়ের অস্বস্তি এবং বাড়তি খরচাপাতি করতে ইচ্ছে হয়নি। যদিও এ নিয়ে তার দুই বন্ধু কখনোই কিছু বলেনি।

—–

আফি সানায়া রেডি হচ্ছে। সেহের বিছানায় বসে দুই বোনের দিকে চেয়ে আছে। প্রিয়ম গেছে নিচে। সবাই রেডি হয়ে ডাকছিলো। অন্য দিকে এই দুই কন্যা গ্রামে গিয়ে ড্রেস কী পরবে সে-সব সিলেক্ট করে প্যাক করতে করতে সবাই রেডি হয়ে ডাকাডাকি শুরু করে দিয়েছে। তাই আপাতত প্রিয়ম কে পাঠিয়েছে একটু ম্যানেজ করতে। সানায়া হিজাবের শেষ পিনটা লাগাতে লাগাতে বলে উঠলো,

“আপু ওই যে সেদিন টাইটানিক নামের একটা মুভি,,,

“টাইটানিক?” সানায়ার কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে আফি আঁতকে উঠলো। সানায়া আফির এমন মুখভঙ্গি দেখে নিজেও তব্দা খেলো। মাথা নাড়িয়ে বললো,

“হ্যাঁ। কেনো? তুমি তো লিস্ট করেছিলে।”

“আমি আর তুই এক?”

আফি দাঁতে দাঁত চেপে ধরলো। সানায়া ভ্রু কুঁচকে নিলো।

“তুমি মেয়ে আমিও মেয়ে। না-কি তুমি অন্য কিছু?”

সানায়ার খামখেয়ালি সুর আফির মেজাজ খারাপ হলে-ও পেছন থেকে সেহের খ্যাকখ্যাক করে হেসে উঠলো। সব সময় গম্ভীর থাকা মেয়েটাও রুমে প্রবেশ করে উচ্চস্বরে হাসতে লাগলো। আফি, প্রিয়ম এবং সেহেরকে চোখ রাঙায় ফের সানায়ার দিকে তাকিয়ে ধমক দিয়ে বললো,

“এই বেয়াদব মুখেমুখে কথা বলবি না। আমি তোর থেকে তিন বছরের বড়ো ভুলে যাস?”

সানায়া ঠোঁট চেপে হাসে৷ মাথা নুইয়ে দুই দিকে মাথা নেড়ে বোঝায় না। আফি ধুপধাপ পা ফেলে বেরিয়ে যায় রুম থেকে। আফি যেতেই ওরা সবাই আরও এক দফা হাসলো। তবে সানায়া পরক্ষণেই ভাবুক হয়।

——–

“ওখানে গিয়ে একদম কোনো অঘটন ঘটাবে না। আর এমন কিছু করো না যাতে করে কেউ আমাকে নিয়ে বাজে কথা বলার সুযোগ পায়।”

সানায়া বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়ে৷ আরোরা জাহান তখনও বই হাতে রকিং চেয়ারে বসে আছে। তিনি যাবে না সবার সাথে। মা মেয়ে বাড়িতেই থাকবে। সানায়া মন থেকে চাচ্ছিল মা তার সাথে যাক। একটু সময় কাটাক তার সাথে। একটু ভালো করে কথা বলুক। কিন্তু সবার সব চাওয়া-পাওয়া পূরণ হয়না। সানায়ার মায়ের চেয়েও বেশি অভিমান বাবা-র ওপর। বাবা কেনো চলে গেলো? তিনি থাকলে নিশ্চয়ই মা আজ এমন উদাসীন হতো না।
সানায়া বেরিয়ে যেতেই আরোরা চশমা খুলে সেন্টার টেবিলের ওপর রেখে দিলেন। চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো।

দুইটা গাড়িতে মহিলারা এবং সামনে দুইজন করে পুরুষ। নির্ভাণের সাথে তিয়ান, ইকবাল যাচ্ছে। এতে করে ফারাজ সিদ্দিকী এবং নিজাম সিদ্দিকী একটু অসন্তোষ হলেন। তবুও যেহেতু ছেলের বন্ধুদের সাথে তাদের ও দীর্ঘ দিনের পরিচয় তাই তেমন কিছু প্রকাশ ও করতে পারলেন না। সানায়া একটু এদিক-ওদিক ঘুরঘুর করলো। গাড়িতে বসতে চাইছে না সে। তবে বড়ো মামির জোড়াজুড়ির জন্য ওনার পাশে বসতে হলো সানায়া কে। আফি প্রিয়ম অন্য গাড়িতে। গাড়ির সামনে সামনে নির্ভাণ, তিয়ান, ইকবাল তিনজনে তিন বাইক নিয়ে ছুটছে।

——

গ্রামের রাস্তা যখন ধরলো তখন সন্ধ্যা প্রায় হয়ে এসছে। গোধূলি গিয়ে অন্ধকার নামছে। বাজারের কাছে এসে নিজাম সিদ্দিকী, ফারাজ সিদ্দিকী এবং নেয়ামত সিদ্দিকী তিন ভাইয়া নেমে গেলো গাড়ি থেকে। নির্ভাণ ও বাইক এক পাশে রেখে বাবা চাচার সঙ্গে যাচ্ছে। মহিলারা গাড়ি থেকে কেউ নামেনি। অপরিচিত যায়গা এতোগুলা মেয়ে মানুষ তারউপর গ্রাম। নজর বলেও তো একটা ব্যাপার আছে।
সানায়া খেয়াল করলো আধাঘন্টা কিংবা তার বেশি সময় পর-ই সবাই হাতে বাজার ভরতি ব্যাগ নিয়ে বাজারের গলি থেকে বেরিয়ে এলো। সাথে দুইটা পনেরো ষোল বছর বয়সী ছেলেও আছে। সব বাজার একটা ভ্যানে তোলা হচ্ছে।

বড়ো মামা বহুদিন বাদে শ্বশুর বাড়ি পা রাখছেন। কোনো কমতি যে ভদ্রলোক শ্বশুর বাড়ির জন্য রাখেনি তা স্পষ্ট। তারউপর তন্বী রহমানের বাবার বাড়িও যথেষ্ট নামডাক সম্পন্ন বংশ৷ ওনার দাদা জমিদার ছিলো। তাদের সে-ই পুরনো জমিদার বাড়িই রয়েছে। তিনতলার এই বিশাল জমিদার বাড়ি নিয়ে দাদি মাঝেমধ্যে কটাক্ষ করে গল্প বলেন, “তন্বীর দাদা ভালো লোক ছিলেন না৷ পাকিস্তানি শাসকদের সাথে মিলে ভদ্রলোক খুবই অত্যাচার করতেন গ্রামে। তবে তন্বী রহমানের বাবা চাচারা ভালো ছিলো। এইজন্যই তাদের ছেলেসন্তানরা এখনো গ্রামে থাকতে পারছেন।”

গাড়িটা বিশাল গেইট দিয়ে প্রবেশ করতেই বাড়ির বিশাল সদর দরজায় চোখ আটকায়। সেখানে সাত আট জন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। নির্ভাণের এক মামা ভদ্রলোকের এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে একান্ত চৌধুরী বিদেশে। যে খুব শীগ্রই দেশে ফিরবে বলে জানে সবাই। আর মেয়ে রাহা প্রিয়মের সমবয়সী। চাচাতো মামা ওনার একটা মেয়ে মাত্র। মেয়ের নাম রাফা। সে আফির ছোট। সানায়ার বড়ো। দেখতে ভীষণ রকমের সুন্দরী। চোখ গুলো মেয়ে টার বিড়ালের চোখের মতো। লম্বাচওড়া ও অসাধারণ। সাধারণত এমন সুন্দর মেয়ে শতে একজন হয়। সানায়ার অবশ্য এই এতো সুন্দরী মেয়েটাকে কেনো জানি বিরক্তই লাগে তার অবশ্য কারণ আছে। যেমন সে সুন্দরে অন্যতম, তেমন ন্যাকামিতে। আগে যতবার এখানে এসছে এই মেয়ের ন্যাকামি দেখে দেখে তার বিরক্ত ধরে গেছে। তবে প্রকাশ করা হয়নি কখনো।

সবার সাথে কুশলাদি বিনিময় শেষ বড়োদের কে নিচ তলায় গেস্ট রুম গুলোতে থাকতে দেওয়া হলো। যেই রুম গুলো আগে জমিদার বাড়িতে অতিথিশালা নামে পরিচিত ছিলো। সানায়া এই বাড়ির সব কিছু ভালো লাগে। ঘরে মেঝে থেকে শুরু করে দেয়াল এবং ঘরের সকল আসবাপত্র সবকিছুতে একটা জমিদারি ভাবসাব আছে।

আফি, সানায়া একই রুমে যায়গা পেলেও প্রিয়ম কে থাকতে হবে রাহার সাথে। যেহেতু তারা মানুষ বেশি নির্ভাণ এবং তার বন্ধুদের তিনতলায় থাকতে দিয়েছে। সাথে সানায়া আফি কে তিনতলায় থাকতে হবে। সানায়া অবশ্য একটু বিরক্ত হলো। এতো উঁচুতে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে আলসেমি লাগে বিধায় সে রাতে আর নিচেও নামবে না বলে ঠিক করলো। তবে রাফা যখন ওদের খাবার খেতে ডেকে নির্ভাণ কে লাজুক লাজুক মুখে ডাকতেই যাচ্ছিল সানায়া বিরক্তি নিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে নিচে চলে গেলো। আগে এসব দেখতে ভালো লাগলে-ও এখন কেনো জানি এই মেয়ের ন্যাকামি দেখতে একদম ইচ্ছে করছে না তার।

আগের দিনের জমিদার বাড়ির ডাইনিং টেবিলগুলো সাধারণত বিশাল আকারের। যা পরিবার ও অতিথিদের ধারণ ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে সাধারণত দশ থেকে বিশ বা তার বেশি চেয়ারের। এই জমিদার বাড়িতেও একটা বিশাল ডাইনিং এবং রন্ধনশালা আছে। ডাইনিং-এর টেবিলের আকার বিশ প্লাস চেয়ারের দীর্ঘ টেবিল। চিটাগাং সেগুন বা ভারী কাঠের হবে। ভিক্টোরিয়ান বা প্রাচীন ধাঁচের খোদাই করা টেবিল ও চেয়ার। একসাথে অনেক সদস্যের খাওয়ার জন্য দীর্ঘ আয়তাকার টেবিল। সানায়া কোথাও বসবে? সে গুনে গুনে ডানে পাঁচ এবং বাঁ পাশে পাঁচ টা চেয়ার রেখে মাঝের একটা চেয়ার বসলো। সেহের এসে পরক্ষণেই ওর পাশে বসলো। সানায়া পিটপিট করে দেখলো। নির্ভাণ ভাই সিঁড়ি বেয়ে নামছে। পেছনে ধীরে ধীরে রাফা নামছে। সানায়ার তৎক্ষনাৎ নাকের পাটা ফুলে উঠছে। নির্ভাণ সেহেরের পাশের চেয়ারে বসলো। ততক্ষণে সবাই বসছে টেবিলে। রাফা যখনই চেয়ারে বসবে ওর ডাক এলো রান্না ঘর থেকে। ওর মা ডাকছে ওকে। রাফা বারকয়েক নির্ভাণের দিকে তাকিয়ে রান্না ঘরের দিকে গেলো। সবাই তখন ওঠাবসা নিয়ে ব্যাস্ত। সানায়া কী মনে করে ঝট করে নিজের আসন ছেড়ে টুপ করে গিয়ে নির্ভাণের পাশের খালি চেয়ারে বসে গেলো। নির্ভাণ একবার ওর দিকে তাকালেও সানায়া আর তাকায় নি। ওই শীতল চাহনির সাথে মোকাবেলা করার মতো পরিস্থিতিতে সে নেই। রাফা ফিরে এলো৷ মিনিট দুই এক পর। ততক্ষণে শুধু ইকবালের পাশের চেয়ার টা খালি পরে আছে। সানয়া বেশ খুশি হলো মনে মনে। আশ্চর্য! তার কেনো এমন আনন্দ লাগছে? আর সে এটা কেনো করলো? রাফা নির্ভাণ ভাইয়ের পাশে বসলো তার কী আসে যায়! অদ্ভুত! সে একেমন আচরণ করছে!

#চলবে……

[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here