#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_১০
#জান্নাত_সুলতানা
ডিসেম্বর জানুয়ারি মাসে শীত টা একটু বেশি লাগে। এখন স্কুল কলেজ ও বন্ধ দিয়েছে। ফারাজ সিদ্দিকী তাই এই সময় টা ফ্যামিলি নিয়ে ট্যুর যাওয়ার প্রস্তাব রাখলেন। বিশেষ কারণ কিছুদিন আগে মেয়ে টা ঘুরতে যাওয়ার জন্য কত না আবদার করেছে। নিজাম সিদ্দিকী বেশ চিন্তায় পড়লেন। সপরিবার দেশের বাইরে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না সেহের জন্য। আর দেশে কোথায় যাবেন সেটা একটা ভাবার বিষয়। যেহেতু মানুষ বেশি তাই দূরে কোথাও গেলে অবশ্যই তাদের ঝামেলা বেশি হবে। জামাই দেবর কে চিন্তিত হতে দেখে তন্বী রহমান সাহস করে বলে উঠলেন,
“আমরা গ্রামে যেতে পারি না?”
দেশের বাইরে থেকে সোজা গ্রাম? পরিবেশ মূহুর্তেই থমথমে হয়ে এলো।
ভদ্রমহিলার কাছে ওনার ভাইয়ের অনেকবার কল এসছে। গ্রামে মাহফিল হচ্ছে। আবার এখন শীত। সপরিবার যেন গিয়ে দুটো দিন থেকে আসে। ওনার ছেলেও আসবে দেশে। বোনের জামাইয়ের সাথে তেমন বনিবনা নেই তাই বোনকে বলছে।
“বেশ তবে তাই চলো।”
“কোথায় আব্বু?”
আফি পেছন থেকে বলে উঠলো। সে সম্পূর্ণ কথা শুনেনি। শুধু বাবার কথাটাই শুনেছে। নিজাম সিদ্দিকী মেয়ের কথার উত্তর দেওয়ার আগেই ফারাজ সিদ্দিকী বলে উঠলো,
“ভাবছি আমরা বড়োরা মিলে তোমার মামা বাড়ি যাব।”
“তোমরা বড়োরা?” আফি ভ্রু কুঁচকে শুধালো। ফারাজ সিদ্দিকী মাথা নাড়েন। আফির পেছনে পেছনে সেহের এলো। চশমা ঠিক করতে করতে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে মলিন স্বরে জানতে চাইলো,
“আমাদের নিবে না?”
“তুমি বড়ো?” ফারাজ সিদ্দিকী গম্ভীর স্বরে আওড়ালেন। নিজাম সিদ্দিকী মাঝে বলেন,
“আহ শুধু শুধু কেনো ওদের বিরক্ত করছ।” এরপর সেহের কে কাছে ডেকে বললেন, “শোনো আমরা সবাই যাবো।”
“আমি বাপু যাবো না।”
তন্বী রহমান দীর্ঘ শ্বাস ফেলেন। শাশুড়ী যাবে না তিনি আগেই জানতেন। যায় ও না কখনো কোথাও। আর বাড়ির কোনো মহিলা, মেয়েদের বাইরে যাওয়াও পছন্দ করে না। এই যে আফি অনার্স করছে। তা তিনি একদম পছন্দ করে না। আফির এইচএসসি শেষ একবার তো বিয়ে প্রায় ঠিক ও করে ফেলেছিলেন মেয়ে টার। নির্ভাণ আর নিজাম সিদ্দিকীর সাথে ফারাজ সিদ্দিকীর জন্য বেশি আগাতে পারেনি।
“মা গেলে মনটা ফ্রেশ লাগবে। অনেকদিন বাইরে কোথাও যাও না তুমি।” নিজাম সিদ্দিকী মাকে বোঝান। এরমধ্যে একে একে সবাই উপস্থিত হয়েছে লিভিং রুমে। সানায়া এসে আফির সাথে দাঁড়ায়। নির্ভাণ ও নেমে এসছে। আর আফি সানায়ার সামনে সোফায় বসলো। সানায়া নজর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মানুষ টাকে দেখলো। সাদা টি-শার্ট এর ওপর ঘি রঙের শার্ট। ফোল্ড করে রাখা শার্টের হাতা। মুখে চাপদাড়ি। মানুষ টা সুন্দর সাথে তার আউটফিড বরাবরই নজরকাঁড়া। এতোদিন ও কী এমন সুন্দর ছিলেন তিনি? সানায়ার এসব ভাবনার মাঝেও এতোক্ষণ এখানে কী কথা হয়েছে সবই আফি সানায়া কে বলে দিয়েছে। সানায়া মামার কথায় মাঝে নিচু স্বরে ফোঁড়ন কেটে বললো,
“মন ফ্রেশ করবে কেনো? ধুলোময়লা সব ধুয়ে যাবে না।”
আফি তৎক্ষনাৎ সানায়ার হাতে চিমটি কাটে। চোখ পাকিয়ে তাকায়। আফিও ফিসফিস করে বলে, “তুই দিনদিন বেয়াদব হচ্ছিস সানা।”
সানায়া মুখে জোর করে হাসি টানে। সেহের পাশ থেকে সেও বোনদের কণ্ঠ অনুসরণ করলো, “আপু তো ঠিকই বলেছে। দাদুন বেশি বেশি করে।”
আফি ওদের দু’জন কে চোখ রাঙায়। সানায়া চমৎকার করে হাসে। এই একজন যে দুনিয়ায় তার বিরুদ্ধে চলে গেলেও বোনের পক্ষে থাকবে।
“এইটুকু ছেলে এখনই যুক্তি দিচ্ছে। সব তোর সাথে থাকার ফল।”
আফির চোখ রাঙানো, কণ্ঠস্বরে ধমকে ধমকে কথা বলার ভাবটা। সবই যেনো ভাইয়ের সাথে মিলে। দুই ভাইবোন একরকম স্বভাবের। সানায়া নাকমুখ কুঁচকে বললো,
“আর তুমি? তুমি তো তোমার ভাই আর দাদির জেরক্স কপি।”
“ফিসফিসানি স্টপ করবি তোরা?”
হঠাৎ ধমকে সানায়া কেঁপে উঠলো। সবাই এতোক্ষণ গ্রামে যাওয়া নিয়ে আলোচনা করছিলো। তবে নির্ভাণের উচ্চস্বর সবাই কথা বলা বন্ধ করে তার দিকে তাকাল। নির্ভাণ ফের ওদের ধমকে ওঠে, “যা এখান থেকে। তোদের এখানে কোনো কাজ নেই।”
প্রথমে সবাই ভেবেছে নির্ভাণ হয়তো তাদের বলেছে। তবে এখন সবার কাছে বিষয় টা পরিষ্কার হলো। সেহের ততক্ষণে এক দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে গেছে। আফি সানায়া ও গুটিগুটি পায়ে চলে গেলো। সানায়া কে কিছু টা জোর করে ধরে নিয়ে যাচ্ছে আফি। এই বেয়াদব মেয়ের জন্যই সবার সামনে ধমক খেতে হয়েছে।
ছাঁদে এসেই সানায়া অন্য একটা ছাঁদ থেকে হাত বাড়িয়ে একটা ফুল ছিঁড়ে নিলো। আফি ফোনে আজকে রাতের জন্য ভালো একটা মুভি সিলেক্ট করতে ব্যাস্ত ছিলো। ঠিক তখনই খেয়াল করলো ওপাশের বিল্ডিংয়ের মহিলা টা ছাঁদে এসছে। আফি চট করে সানায়ার দিকে তাকালো। আর ওর হাতে ফুল দেখে দৌড়ে এসে ওকে টেনে সাইডে নিয়ে গেলো। হাতে তখন ফুল আড়াল করে দাঁড়াল। ভদ্রমহিলা এসেই ফুলগাছ গুলো ঘুরঘুর করে দেখলেন। এরপর চলে যেতে যেতে কিছু বিড়বিড় করলেন তব কিছু টা দূরে সরে আসায় আর ঠিক শোনা গেলো না কথা।
“তুই মানুষ হবি না?” আফি বিরক্তিকর স্বরে বলে উঠলো। সানায়া ফুল কানে গুঁজে নিতে নিতে মন খারাপ করে বললো,
“আমি তো মানুষ আপা।”
“না তুই বাঁদর।”
সানায়া আফির কথায় পাত্তা দেয়না। ফুল কানে সে আফির থেকে ফোন নিয়ে সেলফি তুলতে লাগলো। ফুল হচ্ছে সানায়ার কাছে একটা ইমোশন। এটা সে মাঝেমধ্যে কলেজের গেইটের পাশের গাছগুলো থেকে-ও লুকিয়ে নিয়ে আসে। এটাকে সে মোটেও চুরির আওতায় রাখে না। ভালোবেসে কিছু নিলে সেটাকে চুরি বলে না। অর্থসম্পদ হলে অবশ্য ব্যাপার টা ভিন্ন। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য সানায়া এমনটাই ভাবে। সেহের ভাবুক হয়ে এতো সময় দুই বোনের কথা শুনছিলো। সে খুব বেশি অবুঝ যে ব্যাপার টা তেমন নয়। সে বুঝেও মঝা করতে বলে,
“বাঁদর তো বনে জঙ্গলে গাছে থাকে আপু। তবে সানা আপু আমাদের সাথে কেনো?”
“এই বাঁদর কে জিজ্ঞেস কর। নয়তো ধরে নিয়ে এটাকেও জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আয়।”
আফি হনহনিয়ে ছাঁদ থেকে নেমে গেলো। সেহের হেঁসে কুটিকুটি হচ্ছে। সানায়া ধমকে ওঠে। ফোন এগিয়ে দিয়ে আদেশের স্বরে বললো, “ছবি তুল। সুন্দর করে তুলবি।”
সেহের মাথা নেড়ে ছবি তুলে। সানায়া রংঢং করে পোস দেয়। প্রিয়ম সেহের কে ডাকতে ডাকতে ছাঁদে এলো। আজ শুক্রবার। তবুও সেহেরের টিউটর এসছে পড়াতে। সেহের মোটেও বিরক্ত হয়না। সে ভদ্র ছেলের মতো চলে গেলো পড়তে। প্রিয়ম ও পেছনে গেলো। তার-ও টিউটর বদলে দিয়েছে বাবা এখন একটা ছেলে টিউটর দুই ভাইবোন কে পড়ায়। ছেলেটা অবশ্য ফারাজ সিদ্দিকী রেখে দিয়েছেন।
সানায়া ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো। হয়তো নির্ভাণ ভাইয়ের কথাতেই নতুন টিউটর রাখা হয়েছে। সানায়া রেলিঙের ওপর ওঠে বসলো। আফি যে মুভির নাম লিস্ট করে রেখেছে সানায়া সেখান থেকে একটা নাম ইউটিউবে লিখে সার্চ করলো। তৎক্ষনাৎ পেছন থেকে কেউ ফোন টা ছিনিয়ে নিলো। সানায়া চমকে ওঠে। পড়তেই যাচ্ছিল ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা হাত সানায়া নিজের কোমরে অনুভব করলো। শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেলো ষোড়শীর সানায়ার। বুকের ভেতর হঠাৎ হৃৎস্পন্দনের ধুকপুকানি তীব্র গতিতে বাড়তে লাগল। উষ্ণ নিঃশ্বাস কাঁধে পড়ছে। মানুষ টা যে তার খুব নিকটে তা অনুভব করেই শরীরে রক্তকণিকায় অসহ্য শিহরণ। ফিসফিস করে কোনো রকম বললো,
“ছাড়ুন।”
“একটু আগে যা করতে যাচ্ছিলি সেকেন্ড টাইম ভুলেও এটা আর করবি না।”
শরীরের রক্তহিম করা কণ্ঠস্বর। সানায়া মাথা ঝাকায়। নির্ভাণ ওকে ছেড়ে দিয়ে ফোন টা নিয়ে চলে গেলো। সানায়া যতক্ষণে নিজেকে স্বাভাবিক করে রেলিং থেকে নেমে এলো। ততক্ষণে নির্ভাণ চলে গেছে। সানায়ার শরীর টা তখনও কাঁপছে। সে ফ্লোরে বসে পড়লো। আর একটু আগে করা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কৌতূহল কয়েকগুণ বেড়ে গেলো। কী আছে ওই মুভিতে? ভূতের চেয়েও ভয়ংকর কিছু?
#চলবে……
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
