#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_৯
#জান্নাত_সুলতানা
“ছোট আব্বু বাড়িতে আছে?”
নির্ভাণ সিঁড়ি বেয়ে হনহনিয়ে নামতে নামতে লিভিং রুমে বসা সবাই কে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করে। একটু পরে ডিনার টাইম। তাই সবাই লিভিং রুমেই আছে। আয়েশা বেগম এগিয়ে আসে।
“কিছু হয়েছে বাবা?”
চিন্তিত স্বর ভদ্রমহিলার। নির্ভাণ পুরো লিভিং রুমে দৃষ্টি বুলিয়ে নেয়ামত সিদ্দিকী কে না দেখে তপ্ত শ্বাস ফেললো এবং ছোট মাকে আশ্বস্ত করে,
“তেমন কিছু না।”
নির্ভাণ ঘুরে লিভিং রুম থেকে আবারও সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে। সানায়া মাঝ সিঁড়ি এসে দাঁড়িয়ে ছিলো ভয়ার্ত মন নিয়ে। নির্ভাণ যাওয়ার সময় গম্ভীর স্বরে বলে গেলো, “পড়তে আয়।”
সানায়া মাথা নাড়ে। তারমানে তিনি সানায়া কে ভুল বুঝেনি। সানায়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। আর নির্ভাণের পিছু পিছু গেলো।
——
ছাঁদে রেলিঙের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ফোনে কিছু করছে নির্ভাণ। রাতের আধার কৃত্রিম আলোর জন্য ছাঁদ গ্রাস করতে না পারলেও কৃত্রিম আলো খুব বেশি দূর পর্যন্ত নিজের আয়ত্তে নিতে পারেনি। ছাঁদের দরজায় দাঁড়িয়ে সানায়া। হাতে মেয়ে টার কফির মগ। তন্বী রহমান এটা ওর হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। কেননা তাকে নিজাম সিদ্দিকী ডাকছে জরুরি কোনো দরকারে। তাই ছেলের জন্য বানানো কফি দিয়া আসার দায়িত্ব সানায়াকে দিয়েছেন।
নির্ভাণের গায়ে সাদা টি-শার্ট। এই এক টি-শার্ট মানুষ টার কতো পরতে ইচ্ছে করে কে জানে! তবে সুন্দর লাগে মানুষ টার গায়ে সাদা রং। সানায়ার আনমনে ভাবা কথাখানা ভেবে নিজেই অবাক। ইদানীং খুব বেশি মন টা তার কেমন এদিক-ওদিক করে। কী করা উচিৎ এটার জন্য?
সানায়া কত সময় দাঁড়িয়ে রইলো ঠিক নেই। নির্ভাণ এরমধ্যে বলে উঠলো, “আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবি?”
বিরক্তি কিছু টা নির্ভাণের কণ্ঠে। সানায়া অন্যমনস্ক ছিলো বিধায় একটু ভরকে গেলো। এলোমেলো পা ফেলে কফি হাতে এসে নির্ভাণের সামনে দাঁড়াল। দ্রুত হাত টা বাড়িয়ে কফি নির্ভাণের সামনে ধরতে গিয়ে ঝাঁকুনি খেয়ে মগ থেকে কফি নির্ভাণের উরুর ওপর পড়লো। কফি ততক্ষণে ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। সানায়া থতমত খেয়ে ঘাবড়ে গিয়ে দ্রুত নির্ভাণের উরুতে হাত রাখলো সেকেন্ড ব্যবধানে নিজের ওড়নার এক প্রান্ত টেনে মুছে ফেললো সেই স্থান। নির্ভাণ ওর হাত ধরে নিজে সোজা হয়ে দাঁড়াল। দাঁতে দাঁত চেপে মানুষ টা রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে হয়তো। সানায়া ভয় পেলো। বোকা বোকা চাহনি মেয়ে টার। নির্ভাণ চোয়াল শক্ত করে বিরক্তিকর স্বরে বলে উঠলো, “কী সমস্যা তোর?”
নির্ভাণ সময় ধরেছে কফি নিয়ে তিন মিনিটের বেশি সময় ছাঁদের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলো এই মেয়ে। এখন আবার এসেই কফি গায়ের ওপর ফেলে দিয়েছে। আশ্চর্য!
“কী হবে, কিছু না তো।”
“মন কোথায় থাকে?”
সানায়া অবাক। মন কোথায় থাকে মানে? এটা তো তার মনেই আছে। তবে কিছু একটা ঠিক নেই। ও মন খারাপ করে নিলো। ভেতরে মেয়ে টার চঞ্চল মন হঠাৎ মুখ ফস্কে বেরিয়ে এলো,
“পরীক্ষা শেষ হলে একটা কিছু করতে হবে আমাকে।”
“মানে?”
নির্ভাণ ওর কথার মানে বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলো। সানায়া নির্ভাণের হাতে কফির মগ দিলো। নির্ভাণ মগ হাতে নিয়ে ভ্রু কুঁচকে নিলো। সানায়া তৎক্ষনাৎ কিছু বলতে যাবে তার আগেই নেয়ামত সিদ্দিকী ছাঁদে এসে উপস্থিত হলেন। সানায়া চুপ করে গেলো। নির্ভাণই ওনার খোঁজ করেছে স্ত্রী থেকে এই খবর পেয়ে তিনি নিজেই নির্ভাণের খোঁজ নিয়ে ছাঁদে চলে এসছে। সানায়া মামাকে দেখে মুখে হাসি ফুটিয়ে নিলো। নেয়ামত সিদ্দিকী ভাগ্নির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “পড়াশোনা কেমন চলছে?”
“পড়াশোনা তো চলতে পারে না মামা। তার পা নেই তো।”
নেয়ামত সিদ্দিকী রসিক লোক। সানায়া মামার সাথে সম্পর্ক বেশ দুষ্টু মিষ্টির। ওর কথায় উচ্চস্বরে হাসলো নেয়ামত সিদ্দিকী। মাথার তালুতে নিজের ওষ্ঠদ্বয় ছুঁয়ে দিয়ে বলেন,”দুঃখিত মামণি। আমি ভুলে গিয়েছিলাম। মনে করিয়ে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।”
সানায়া মিষ্টি করে হাসে। নেয়ামত সিদ্দিকী এরমধ্যে হঠাৎ ওকে তাগাদা দিয়ে বলে উঠলো, “তাড়াতাড়ি নিচে যা। প্রিয়ম খুঁজছে তোকে।”
সানায়া ভারী চিন্তিত হলো। এই অসময়ে কেনো প্রিয়ম খুঁজবে তাকে। মামাকে আর কিছু জিজ্ঞেস না করে মাথা নাড়িয়ে নিচে যাওয়ার জন্য উদ্যত হতেই নির্ভাণ পেছন থেকে বলে উঠলো, “কফি নিয়ে যা।”
“কেনো? আপনি খাবেন না?”
“ঠান্ডা হয়ে গেছে।”
বিরক্তিকর স্বর মানুষ টার। সানায়া নিশ্চুপ হাত বাড়িয়ে কফি নেয়। আর গুটিগুটি পায়ে ছাঁদ থেকে নেমে যায়। পড়তে গেলে পড়ায় মন থাকে না একটা কাজ দিলে ঠিকঠাক তার দ্বারা হয়না। কফিটা ঠান্ডা হওয়ার পেছনে নিজেকেই সম্পূর্ণ দোষী মনে করলো সানায়া।
নির্ভাণ চোখের কোণ দিয়ে শান্ত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে মেয়ে টার যাওয়ার পানে।
“কী হয়েছে বাপ? এতো জরুরি তলব কেনো?”
রয়েসয়ে নিজেও ভাইপোর পাশে দাঁড়াল নেয়ামত সিদ্দিকী। নির্ভাণের তৎক্ষনাৎ মনে পড়ে মেয়ে টা তাকে দেখলে তো দূর থেকে বিভিন্ন ভাবে বোঝাতে চায় তাকে সে পছন্দ করে। কিন্তু সামনা-সামনি কখনো আসেনি বলে সে পাত্তা দেয়নি এতোদিন। কিন্তু ব্যাপার টা এখন বেশ সিরিয়াস। প্রিয়ম ও তাকে বলেছে চিঠি দেয়া নিয়ে। সে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে হতাশার সুরে বলে উঠলো,
“কী টিউটর রেখেছো ছোট আব্বু? ওই মেয়ে কে অন্য কোথাও বিদায় করো।”
“কিছু করেছে না-কি?”
নেয়ামত সিদ্দিকী অবাক হলো। নির্ভাণ এমন ছোটখাটো বিষয় নিয়ে এতো সিরিয়াস তাহলে এটা ভাবার বিষয়।
“হ্যাঁ।”
“খারাপ কিছু?”
“খারাপ করেনি।”
“তাহলে?”
নির্ভাণ চোখ ছোট ছোট করে নেয়ামত সিদ্দিকীর দিকে চাইলো। রসিক লোক ঝট করে বুঝে ফেলেন ভাতিজার সমস্যা। তিনি চোখের চশমা ঠিক করেন। আর বেশ গম্ভীর স্বরে বলেন,
“এটা তো বিরাট খারাপ করেছে।”
“কাউকে ভালো লাগা দোষের কিছু না। কিন্তু ওই মেয়ের নিজের অনুভূতি কনফেশ করার মাধ্যমটা খুবই জঘন্য। বাচ্চা একটা মেয়ে কে মেন্টালি প্রেশার দিচ্ছে।”
“তোমার ছোট আব্বু আছে। টেনশন ফ্রী থাক বাপ।”
নির্ভাণের পিঠে হাত চাপড়ে নেয়ামত সিদ্দিকী ছাঁদ থেকে নেমে যায়। নির্ভাণ দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। আর ছাঁদ থেকে কিছু সময় বাদে নিচে এলো। মূলত তার একটা কফি লাগবেই মাথাটা ভীষণ ধরেছে। সে নিচে এসে অবাক। সানায়া প্রিয়ম সেহের ফ্লোরে বসে টেলিভিশন দেখছে। সেন্টার টেবিলের ওপর এঁটো প্লেট। নিজাম সিদ্দিকীর তাড়া দেওয়ার কারণ বুঝতে অসুবিধা হয়না নির্ভাণের। তবে বাঁদর গুলো ভূতের সিনামে দেখছে। নির্ভাণ ওদের পেছনে এসে দাঁড়াতেই সবগুলো ভয়ে লাফিয়ে উঠলো। সানায়া তো ভয়ে নির্ভাণের পা জড়িয়ে ধরেছে। প্রিয়ম প্রথমে ভয় পেলেও যখনই বুঝতে পারলো পেছনে দাঁড়ানো ব্যাক্তি আর কেউ নয় স্বয়ং নির্ভাণ ভাই তক্ষুণি বেচারি ভূতের ভয় ভুলে নির্ভাণ ভাইয়ের ধমক খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলো। এরমধ্যে আফি কতগুলো চিপস হাতে রান্না ঘর থেকে এসেছে। ওকে দেখে নির্ভাণ অবাক হয়না। সব কিছুর লিডার তার বোনই। সানায়া তখনও পা জড়িয়ে ধরে ভয়ে কিছু বিড়বিড় করছে। আর অবস্থা দেখে সবাই হেঁসে কুটিকুটি হচ্ছে। নির্ভাণ কপালে আঙুল ঘষে। চোয়াল কঠিন করে বলে,
“পা ছাড়।”
সানায়া তৎক্ষনাৎ যেন হুঁশে এলো। সবাই কে হাসতে দেখে লজ্জায় নিশ্চুপ একপাশে দাঁড়িয়ে রইলো বেচারি। নির্ভাণ রান্না ঘরে যায়। ওরা সবাই তখনও বুঝতে পারছে না নির্ভাণ ধমক দিবে না-কি নিজেও টেলিভিশন দেখবে। নির্ভাণ মিনিট পাঁচ পর ফিরে এলো। হাতে কফির মগ। সে এসেই সোফায় বসে। সুযোগ পেলেই সব কয়টা বাঁদর রাতে টেলিভিশন দেখার সুযোগ হাত ছাড়া করে না। মাঝেমধ্যে সে-ও যোগ দেয়। আজও দিলো। সেহের এসে বড়ো ভাইয়ের গা ঘেঁষে বসলো। ভয়ে বারবার চোখের চশমা ঠিক করে একে একে সবাই আবারও টেলিভিশনে মনোযোগ দেয়। সানায়া আফির পাশে বসে। বেচারি ভয়ে আফির সামনে বসে গলা জড়িয়ে ধরে রেখেছে। ভয়ে চোখ চকচক করছে। তবুও নিমেষেই চেয়ে আছে টেলিভিশনের স্ক্রিনে। আফি নিজেও ভয় পাচ্ছে। তবে সে গভীর মনোযোগ সহকারে রক্তমাখা মুখে ভূত টা দেখছে। প্রিয়ম সবার মাঝে বসে। নির্ভাণ সবগুলোর অবস্থা দেখে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ে। ভয় মরেও যদি যায় তবুও বোধহয় এই বেহায়া গুলো ভূতের সিনেমা দেখা ছাড়বে না।
#চলবে…..
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
