আপনার_হৃদয়ে_আমি #পর্ব_২৪

0
32

#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_২৪
#জান্নাত_সুলতানা

“হেই মিল্ক টি!”

ডাক শুনে অবাক হয়ে পেছনে তাকাল সানায়া। একান্ত চমৎকার হেঁসে তাকিয়ে ওর দিকে। সানায়া মৃদু হাসলো। নিজেকে স্বাভাবিক করে বলে উঠলো, “কেমন আছেন ভাইয়া?”

একান্ত মাথা নাড়লো। বিড়বিড় করে আওড়ায়, “তোমার বোন ভালো থাকতে দিচ্ছে কোথায়!” সানায়া অস্পষ্ট শুনলো। তবে সে শুনেনি এমন ভান করে দাঁড়িয়ে রইলো।

“ভালো। তোমার কী অবস্থা? পরীক্ষা কেমন হলো?”

“আলহামদুলিল্লাহ ভালো ভাইয়া।”

কথোপকথন দীর্ঘ হওয়ার আগেই নির্ভাণ সেখানে এসে উপস্থিত হলো। এক ঝলক একান্ত কে দেখলো। ফের সানায়ার দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে, গমগমে গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“রুমে যাচ্ছিস না কেনো?”

সানায়া থতমত চেহারা নিয়ে আমতা আমতা করে বললো,

“যাই তো।”

পরপরই সে রুমে চলে গেলো। একান্তর মুখে তখন ফিচলে হাসি।

“পোড়া পোড়া গন্ধ পাচ্ছি।” একান্তর চোখে-মুখে দুষ্টু হাসি। নির্ভাণ চোখ লাল করে দাঁতে দাঁত চেপে দিলো এক ধমক,

“শাট আপ একান্ত।”

“ওকে আমি যাচ্ছি তাহলে, ওর সাথে একটু কথা বলে আসি।”

একান্ত এক কদম সামনে এগুতেই নির্ভাণ ওর কলার টেনে ধরলো।
দু’জনেই সমবয়সী হওয়ার সুবাদে তাদের মধ্যে সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠতার। বন্ধুত্বের দূরত্ব চায়নি বলেই নিজের পছন্দকেও একান্ত অপছন্দ বানিয়েছে।

“আই কান্ট বিলিভ দিস, তুই, তোর মতো কেউ এমন একটা চঞ্চল মেয়ে মানুষের প্রেমে পড়েছে।”

নির্ভাণ নিশ্চুপ। উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনে।

“ও ভয় পায় আমাকে।”

দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললো নির্ভাণ। একান্ত ওর কাঁধে হাত রাখে। হাঁটতে হাঁটতে বলে,

“মুখ টা সব সময় হুতোমপেঁচা বানিয়ে রাখবি। তাহলে ভয় পাবে না কী তোকে পছন্দ করবে?” একটু থেমে ফের উপদেশ দেয়, “একটু হাসবি। সুন্দর করে কথা বলবি। বকাঝকা করবি না। ধমক দিবি না। তুই ওকে ফিল করাবি যেনো তুই জেন্টলম্যান।”

নির্ভাণ চোখ রাঙায়। একান্ত মুখ ভেংচি কাটে। বলে, “বুঝেছি তোর দ্বারা এসব হবে না।” ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে একান্ত লিভিং রুমের দিকে চলে যায়৷ নির্ভাণ তখনও দাঁড়িয়ে থাকে সেখানে। আসলেই কী সে বেশি কুল হার্টেড? এখন কী ওই বাচ্চা মেয়ের জন্য তার নিজের পার্সোনালিটি চেঞ্জ করতে হবে? তপ্ত শ্বাস ফেললো সে। চেষ্টা করতে ক্ষতি কিসের?

—-

অনুষ্ঠান কাল। তবে আজই বাড়ির রমরমা পরিবেশ। আত্মীয় স্বজনরা অনেকেই এসছে। আবার কেউ কাল আসবে৷ আফি মাত্র নিজেদের গেস্ট হাউজে একজন বুয়ার সাথে রুম গুছিয়ে বেরিয়ে এসছে। পথিমধ্যে দেখা হলো একান্তর সাথে। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে একান্ত। আফি লোকটাকে দেখে থামলো। একান্ত ওদের বাড়িতে এসছে পর এটাই তার সাথে প্রথম সাক্ষাৎ। আফি মৃদু হাসলো। ভালো-মন্দ কিছু জিজ্ঞেস করবে তার আগেই একান্ত গজগজ করে বলে উঠলো,

“তোর না-কি ভার্সিটিতে ছেলে ফ্রেন্ড হয়েছে? খুব বড়ো হয়ে গেছিস।”

আফি অবাক ভ্রূদ্বয় কুঁচকে কপালে কয়েকটা ভাজ ফেলে জিজ্ঞেস করলো,

“আপনি কী করে জানলেন এটা?”

একান্ত কোনো কথা বলে না। নিশ্চুপ সে রাগে ফুঁসছে আফি তা ঠাহর করতে পারে। তবুও কোনো একটা উত্তরের অপেক্ষায় সে। একান্ত ঘাড় নেড়ে কয়েক কদম এগিয়ে এলো। আফি কিছু টা অপ্রস্তুত হয়ে পেছনে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়। তবে একান্ত তার আগেই ওর কব্জি চেপে ধরলো। আফির বুকের ভেতর তখন হৃৎস্পন্দনের আন্দোলন স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। ভয়ে গলা শুঁকিয়ে এলো। এই লোক তাকে এরূপ পরিস্থিতি ফেলছে আরও কয়েকবার। তখন সে সপ্তদশী সবে। অনুভূতি বোঝার চেয়ে আবেগি বেশি। তবে এখন সে অনুভূতি বুঝে। লোকটার প্রতি অনুভূতি গাঢ়। তবে তা তবুও ফ্যাকাসে। এমন প্লেবয় টাইপ বিহেভিয়ার কেনো করে তিনি? আফির বুক চিড়ে দীর্ঘ শ্বাস বেরিয়ে আসে।

“তোর শিরা-উপশিরার খবর পর্যন্ত আমি জানি। সো বি কেয়ার ফুল।” লোকটার ফিসফিসানি সুর আফির সর্বাঙ্গে কাঁপন ছড়ায়। আফি সরবার আগেই একান্ত পিছিয়ে গেলো। ঘুরে হনহনিয়ে হেঁটে স্থান ত্যাগ করলে মুহূর্তেই। আফি তখনও থম মেরে দাঁড়িয়ে সেখানেই।

——

রাত হচ্ছে। তন্বী রহমান চেয়েও হাতের কাজ আজ শেষ করতে পারছে না। ওদিকে সানায়া আজ চুল শ্যাম্পু করেছে। আরোরা জাহান মেয়ের মাথায় তেল লাগাতে পারে না। বেশিক্ষণ বসে থাকলে কোমর ব্যথা বেড়ে যায়। তন্বী রহমান নয়তো সর্জিনা বেগম লাগিয়ে দেন। অথবা ছোট মামি। কিন্তু আজ মনে হয় কেউই তা করতে পারবে না। সানায়া অবশ্য খুশি।

“কাল অনুষ্ঠান আজ চুলে তেল লাগালে কেমন দেখাবে না! আমি বরং পরশু দিন তেল লাগাব মামুনি।” সে বড়ো মামিকে বলছিলো। তন্বী রহমান হতাশ চোখে দেখে ওকে। সানায়ার চুল ইদানীং আরও লম্বা হয়েছে অনেকটা। অবশ্য মেয়েদের চুল লম্বা হওয়ার সময় টাই যে এখন। তিনি ওকে কিছু বলতেই যাবে তার আগেই আরোরা জাহান উপস্থিত হলো সেখানে। মেয়ের সম্পূর্ণ কথা শুনে গম্ভীর স্বরে বললেন,

“চুলে তেল না লাগালে এগুলো কিভাবে বাঁধবে? দেখেছ চুলের অবস্থা কী হয়েছে?”

সানায়া মাথা নিচু করে রাখে। তবে সে চুলে তেল লাগাবে না। বড়ো মামিকে সুপারিশ ধরলো। তবে লাভের লাভ কিছু হলো না। নির্ভাণ কফির জন্য এসছিলো। এসেই সব শুনেছে। তবুও সে সবাই কে এভাবে মিটিং করতে দেখে নিজের ফুপিমণি কে জিজ্ঞেস করলো, “কী হয়েছে মণি”

“অবাধ্য মেয়ে জন্ম দিয়েছি। কেমন বেয়াদব হয়েছে সবাই বলছে তবুও না-কি চুলে তেল লাগাবে না।” ওনার কথা শেষ হতেই দীর্ঘ শ্বাস ফেললো নির্ভাণ। কিছু বললো না সে। আরোরা জাহান তখনও মেয়ে কে বকতে বকতে নিজের রুমে যাচ্ছে।
সানায়ার পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তাই রুমে ডাকার কোনো বাহানা এখন নেই। নির্ভাণ কিছু একটা ভেবে মাকে বললো,

“আমার জন্য একটা কফি দিয়ো আম্মু।”

এরপর চলে গেলো সে। সানায়া তখনও তন্বী রহমানের আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তন্বী রহমান কফি করতে বলেছে বুয়াকে। এরপর তিনি আবারও সানায়াকে বোঝালেন। চুলে তেল লাগিয়ে দিবেন রাতে। তবে সানায়া যে দিবে না তা যেনো স্পষ্ট চোখে-মুখে।

সানায়া এখন সবার সাথে আফির রুমে আড্ডা দিতে যাচ্ছিল। তবে নির্ভাণ ভাই কে দেখার লোভ ও সামলাতে পারলো না। সে বুয়ার থেকে কফি টা নিয়ে জোর করে হেঁসে বললো, “আমাকে দিন। আমি ওপরে যাচ্ছি।”

বুয়া হেঁসে কফি দিয়ে চলে যায়। সানায়া কফি নিয়ে ওপরে এলো। নির্ভাণের রুমের সামনে দাঁড়াতেই রাশভারি কণ্ঠে অনুমতি এলো, “আয়।”

কোনো আগাম বার্তা ছাড়া কিভাবে নির্ভাণ ভাই বুঝল সে এসছে? সানায়া ভাবুক হয়ে রুমে প্রবেশ করলো। নির্ভাণ সোফায় বসে ছিলো। আর তার সামনে সেন্টার টেবিলের ওপর রাখা ছিলো সানায়ার ইয়া বড়ো তেলের বোতল টা। সানায়া থতমত খায়। নির্ভাণ ফোন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ওর দিকে তাকায়। আঙুল দিয়ে ফ্লোরে ইশারা করে গম্ভীর স্বরে আদেশ করে,

“বোস এখানে।”

“আজ না লাগাই? আমি কাল চুল খুলে রাখবো নির্ভাণ ভাই।” সানায়া ছলছল চোখে তাকিয়ে আবদার করলো। কাল অনুষ্ঠানে ও কী সে চুল বেণী করে ঘুরবে? না। সবাই সুন্দর করে সাজগোছ করবে। চুল ডিজাইন করে বাঁধবে। সে-ও করতে চায় তা।
নির্ভাণের চোখ-মুখ গম্ভীর। সানায়া এতো সময়ের কনফিডেন্স লেভেল তখন শূন্য। মামুনির সামনে সে যতই বাহানা করুক৷ এই মানুষ টার সামনে সে-সব অসম্ভব। গুটিগুটি পায়ে গিয়ে বসলো নির্ভাণের সামনে। নির্ভাণ আলতো হাতে চুলের কাটি টা খুলতেই ঝপ করে চুলগুলো ফ্লোর ছুয়ে সেখানেই বিছানা পাতল। নির্ভাণ ধীরে ধীরে চুল গুলো নিজের কোলে আর সোফায় তুলে। সে এতোক্ষণ গুগল করে জেনে নিয়েছে কিভাবে চুলে তেল লাগাতে হয়৷ সেই মোতাবেক সে তেল লাগাতে শুরু করে। সানায়ার মন খারাপ নিমেষেই উধাও হয়। লজ্জায় রক্তিম হয় গাল। ভালো লাগায়ও দোল দেয় হৃদয়ে।
নির্ভাণ সময় নিয়ে চুলে তেল লাগিয়ে দেয়। গম্ভীর সে টুকটাক করে কথা বলে নিজ মনে বাস করা প্রেয়সীর সঙ্গে। গোপনে নীরব কথোপকথন চালায় দীর্ঘ। বাইরে টের পায় না কেউ। সে চুলে তেল দেওয়া শেষ করে বেণী গাঁথা শুরু করে। সানায়া অবাক হয় তা খেয়াল করে।

“আপনি চুলও বেণী করতে পারেন নির্ভাণ ভাই?” সানায়ার প্রশ্নে ঘোর কাটে নির্ভাণের। থমথমে স্বরে জবাব দেয়,

“শিখেছি।”

“শিখেছি” শব্দ টা নিয়ে ভাবনা পড়ে গেলো সানায়া। কার জন্য শিখেছে? শত শত প্রশ্ন নিয়ে সানায়া বসে রইলো। নির্ভাণে নিজের স্বভাবতই গম্ভীর স্বরে বললো, “আজকেই প্রথম করেছি।” সানায়ার স্বস্তির চেয়ে বেশি মন ছটফট করে ওঠে। খুশি হয় সে। তবে প্রকাশ করা হয় না আর। কিভাবে করবে? যদি তিনি আবার ধমক দেয়!

ছোট বেলায় নির্ভাণ আফির চুল প্রায় বেঁধে দিতো। কেনোনা আফি মায়ের থেকে বেশি ভাইয়ের সাথেই থাকতো। তাই নির্ভাণ স্কুল যাওয়ার সময় প্রায় রেডি করে দিতো ওকে। সানায়া তখন ছোট হওয়া তন্বী রহমান বেশি যত্ন ননদের মেয়েকেই করতো। পরিস্থিতি টাই তখন তেমন ছিলো।
চুল বেণীগাঁথা শেষ নির্ভাণ ওর হাতে তেলের বোতল টা দিয়ে রুম থেকে বের করে দিলো। সানায়ার আনন্দিত মন মূহুর্তেই বিষাদে ভরে ওঠে।

#চলবে……

[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here