আপনার_হৃদয়ে_আমি #পর্ব_১৬ #জান্নাত_সুলতানা

0
27

#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_১৬
#জান্নাত_সুলতানা

সানায়ার হাতে ভিন্ন রঙের চুড়ি দেখে একান্ত অনেক বেশি অবাক হলো। সে জানে না সে কী করছে। তবে সানায়া দেখতে এমনই ছিলো যাকে দেখলে যেকোনো ছেলে পছন্দ করবে। মেয়ে টা দেখতে যেমন মিষ্টি তেমন ব্যবহার। একান্ত প্রথমদিনই মেয়ে টাকে দেখে নিজের মনে কিছু অনুভব করেছে। সে অনেক বেশি আপসেট হয়ে পড়লো। নিজের সাথে আনা গিফট ও সে খুললো না। সবাই কে বিদায় দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো। মেয়েরা সবাই বিরক্ত। এভাবে ডেকে এনে আবার মুখের ওপর না করে দিলো। আশ্চর্য! সানায়া রেগে-মেগে নিজের রুমে চলে গেলো। আফি নিজে রুমে গেলো না। সে-ও লিভিং রুম ফাঁকা পেয়ে বেরিয়ে এলো বাড়ি থেকে। একান্ত বাড়ির পেছনে ছিলো। সেখানে দাঁড়িয়ে সিগারেটে একের পর এক টান দিয়েই যাচ্ছে। আফি এসে পেছনে দাঁড়াল। টের পেলো একান্ত, রাগান্বিত স্বরে তাচ্ছিল্যের হাসি হেঁসে বলে উঠলো, “কেনো এসছিস? দুই ভাইবোন আমাকে শান্তি দিবি না। তাই তো?”

আফির মনটা খারাপ হয়। একান্ত বিদেশ যাওয়ার আগে একবার আফিকে প্রপোজ করেছিল। আফি ছোট ছিলো বিধায় একান্ত কে না করে দিয়েছিল। কিন্তু নির্ভাণ এই খবর পেয়ে সেদিন একান্তর সাথে খুব ঝামেলা করে ছিল।

“মেয়ে দেখলে হুঁশ থাকে না। যে-ই আমার কাছে পাত্তা পেলে না অমনি আমার বাচ্চা বোনের পেছনে লেগে গেলে?”

“তো তোর জন্য আজীবন সিঙ্গেল মরব আমি?”

একান্ত হাত থেকে সিগারেট ফেলে রাগে হিসহিসিয়ে তেড়ে এলো আফির দিকে। আফি ভয় পায় না। দাঁড়িয়ে থাকে স্থির সেখানে। একান্ত এখনো বাচ্চাদের মতো ব্যবহার। নির্ভাণ এইজন্যই বোনের আশেপাশে ঘেঁষতে দেয়নি ওকে।

“সানায়া কে ভাইয়া ভালোবাসে। কিন্তু নিজের স্বভাবের কারণেই নিজের অনুভূতি বুঝতে পারছে না প্লাস স্বীকার করতে পারছে না।”

“প্রথম বার এক বোন দ্বিতীয় বার আরেক বোন। শ্লা। এবার গেলে বিদেশি গার্লফ্রেন্ড নিয়ে দেশে ফিরব আই সয়ার।”

এশারের আজানের জন্য এখনো চারদিকে শুনশান। আফির হাসি পায় আবার মন আঙিনায় বিষন্নতা এসে ভীড় করে। সে কিছু বলতে যাবে কিন্তু মাহফিল আবারও শুরু হলো তখন। কিছু বললেও একান্ত শুনতে পায়নি। সে হনহনিয়ে গেইট দিয়ে বেরিয়ে যায়। আফি হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সেখানেই।

——-

নির্ভাণ সব সময় খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে। নিয়মিত ওয়াকআউট করে সে। এখানে এসে গতকাল এসব করা হয়নি। তারউপর গতকাল মোটামুটি ভালোই কাজ হয়েছে। শরীর কেমন ম্যাজম্যাজ করছিলো রাতে। তাই আজ নিজের রুটিন অনুযায়ী ঘুম থেকে ওঠে গেছে। নির্ভাণ পুশআপ দিচ্ছিল বাড়ির পেছনে। এরমধ্যে নিজের সামন্য হঠাৎ মেয়েলী এক জোড়া পা দেখে নির্ভাণ থামলো। সোজা দাঁড়িয়ে বেঞ্চ থেকে নিজের টাওয়াল নিয়ে গলায় জড়িয়ে রাফার দিকে চাইলো। গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করলো,

“কিছু বলবে রাফা?”

রাফার হাতে একটা বাক্স। নির্ভাণের দিকে সেটা এগিয়ে দিয়ে বলে উঠলো, “এটা আপনার।” সাথে একটা খাম। নির্ভাণ চিঠি দেখে ভ্রু কুঁচকে নিলো। ভদ্রতার খাতিরে শান্ত স্বরে বলে উঠলো,

“কী এটা?”

“ঘড়ি। প্লিজ রাখুন।”

এরপর সে নির্ভাণের হাতে বাক্স টা গুঁজে দিয়ে দ্রুত পায়ে প্রস্থান করলো। নির্ভাণ লেটার খুলে দেখলো না। সেটা পানিতে ফেলে দিলো। আর ঘড়ি টা নিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়াল।

কিছুদিন পর সানায়ার পরীক্ষা। তাই সবাই আপাতত বিদায় নিবে। পরে আবার আসা যাবে। কাল সকালে বেরুবে তারা শহরের উদ্দেশ্য। আজ একটা দিন পুরুষ মানুষ সবাই বিশ্রাম করুক। সকালে ইকবাল আজ ঘুম থেকে দ্রুত উঠলো। রাত বারোটা পর্যন্ত মাহফিল হয়েছে। এরপর তাবারক বিতরণ আরো অন্য সব ঝামেলা শেষ করে তাদের ঘুমতে ঘুমতে রাত তিন টা বেজেছে। তবুও আজ সে অস্থির চিত্তে বিছানা ছেড়ে সকাল সকাল বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। বাড়ি থেকে বেরিয়ে দেখা মিললো নির্ভাণ এবং রাফার। ইকবাল সেদিকে পা বাড়িয়ে হঠাৎ রাফা কে এদিকে আসতে দেখে থমকে দাঁড়াল। মেয়ে টা লাজুক হাসছে। ইকবাল এটা দেখে সামনে আর আগায় না। এখানেই নিজেকে সামন্য আড়াল করে দাঁড়াল। রাফা চলে যেতেই ইকবাল নির্ভাণের কাছে গেলো। নির্ভাণ কিছু না বলেই ঘড়ির বাক্স টা ইকবালের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো, “ধর।”

“আমার?”

বিস্ময় ইকবালের চেহারার রঙ পরিবর্তন হয়ে গেলো। একটু থেমে আবার জিজ্ঞেস করলো, “এটা কে দিলো?”

“রাফা।”

“আমাকে?”

নির্ভাণ কিছু বলার আগেই খপ করে ইকবাল ঘড়ির বাক্স নিয়ে নিলো। এরপর নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলো। নির্ভাণ কিছু না বলেই বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলো। সামনে তিয়ান দাঁড়িয়ে আছে। সে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইকবালের দিকে। ছেলেটা এতো অবুঝ।

“ও অন্য কিছু ভাবতে পারে।” তিয়ান অস্থির কণ্ঠে বললো। নির্ভাণ ফের ইকবালের দিকে চাইলো। রাফা কে নিয়ে ইকবালের মনে কিছু আছে। তিয়ান ইকবাল কে কিছু বলতে এগিয়ে যাচ্ছিল। তবে নির্ভাণ ওকে আঁটকে নিলো। বললো, “অনুভূতি আছে। বুঝতে দে।”

“কিন্তু রাফা মেয়ে টা তোকে পছন্দ করে।” তিয়ানের সোজাসাপটা জবাব। সব সময় নিরব থাকা তিয়ান এই তিনদিনে সেটা ভালোই বুঝেছে। তিয়ানের কথার বিপরীতে নির্ভাণ বলে উঠলো,

“পছন্দ আর ভালোবাসা দুইটার মধ্যে তফাৎ আছে।”

এরপর সে চলে গেলো। তিয়ান থম মেরে দাঁড়িয়ে রইলো। প্রিয়ম সেহের কে নিয়ে মক্তবে এগিয়ে দেওয়ার জন্য ভাইয়ের পেছন পেছনে এলো৷ তিয়ান ওকে দেখেই থতমত খেলো।

“কোথায় যাচ্ছে ভাইবোন মিলে?”

“আমি মক্তবে যাব ভাইয়া।”

সেহের মাথার টুপি ঠিক করতে করতে গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিলো। প্রিয়ম সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। তিয়ান ওর দিকে এক পলক তাকিয়ে সেহেরের কাঁধে হাত রেখে বলে উঠলো,

“চলো আমি এগিয়ে দেই।”

——

বিকেলে নির্ভাণ বাজারে গিয়েছিল। একটু আগেই ফিরেছে সে৷ সাথে এনেছে অনেক চকলেট আর আইসক্রিম। এই শীতের মধ্যে এসব দেখে নিজাম সিদ্দিকী এক দফা ছেলেকে বকাঝকা করে নিলেন। নির্ভাণ কিছু না বলেই সোফায় আয়েশ করে বসে রইলো। নিজাম সিদ্দিকী তা দেখে তেতে উঠলেন।

“বাড়িতে এতোগুলা বাচ্চা। তুমি বড়ো হয়ে এমন অবুঝের মতো কাজ কিভাবে করো?”

“বাচ্চাদের জন্যই এনেছি।”

নির্ভাণের গম্ভীর স্বরে জবাব। নিজাম সিদ্দিকী আরও কিছু বলবে তন্বী রহমান ওনাকে থামিয়ে দিলেন। লিভিং রুমে তখন সবাই উপস্থিত। সানায়া ততক্ষণে রান্না ঘরে চলে গিয়েছে। তন্বী রহমান ওকে প্রথমে একটা আইসক্রিম দিলেন। সেটা শেষ হতেই কতগুলো চকলেট দিয়ে বললেন, “এগুলো রুমে রেখে দিবি।”

বাড়িতে থাকলে আফি সানায়ার এসব বিষয়ে বেশি খেয়াল রাখে। সানায়া মামুনির কথামতো নিজের রুমের দিকে চলে গেলো।

নির্ভাণ পেছন থেকে ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। মেয়েটার মোটা চুলের বেণী হাঁটার তালে তালে এদিক-ওদিক দোল খাচ্ছে। বাচ্চাদের মতো মুখে চওড়া একটা হাসি৷ নির্ভাণের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই প্রসারিত হয়। হালকা হয় মন।

—–

সন্ধ্যায় আফি ফোনে কিছু একটা করছিল তখন রাফা, রাহা এলো। সানায়ার অসুস্থ বিধায় গুটিশুটি মেরে এক পাশে শুয়ে আছে। রাফা বিছানায় আফির পাশে বসে বললো,

“আপু কাল তো তোমরা চলে যাবা।”

রাফার বিষণ্ণ সুর। আফি মোবাইল রেখে দেয়। সানায়া শুয়ে শুয়ে মুখ ভেংচি কাটে। মনে মনে আওড়াল,”মন খারাপ কী আর সাধে? সে তো আমি খুব ভালো জানি।”

“সানা কিছু বললি?” আফি ভ্রু কুঁচকে জানতে চায়। সানায়া দ্রুত শোয়া থেকে ওঠে বসে দুইদিকে মাথা নেড়ে জবাব দিলো, “কই না তো।”

আফি যদিও সম্পূর্ণ কথা শুনেনি। তবে সানায়া যে রাফাকে কিছু বলেছে সেটা ভালোই বুঝেছে।

“মন খারাপ কেনো করছিস? আবার আসব আমরা।” আফি রাফার গাল ছুঁয়ে দেয়। রাফার সাথে টুকটাক কথা হলো। রাফার বেশিরভাগ কথাই নির্ভাণকে ঘিরে।

“নির্ভাণ ভাইয়ার গার্লফ্রেন্ড নেই আপু?”

কথার এক পর্যায়ে এমন প্রশ্নে আফি সানায়া দুজনেই থমকে গেলো। হতভম্ব হয়ে দুজনেই একে-অপরের দিকে চাইলো। সানায়া কিয়ৎক্ষণ নিশ্চুপ থেকে হঠাৎ করে বলে উঠলো, “হ্যাঁ আছে তো। কেনো আপু তুমি জানো না?”

সানায়ার কথায় রাফার মুখে অবিশ্বাস্যের ছাপ ফুটে উঠলো। সে নিশ্চিত হতে আবারও শুধালো,

“সত্যি আছে?”

আফির দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটা। আফি কী বলবে বুঝতে পারছে না। এতো বড়ো মিথ্যা তার ভাই যদি এটা জানতে পারে তাহলে খবর আছে। অন্যদিকে সানায়া আফির হাতে বারবার চিমটি কেটে যাচ্ছে। আফি দিশাবিশা না পেয়ে সানায়ার সাথে সহমত হলো,

“হ্- হ্যাঁ।”

পরপরই দরজায় দৃষ্টি যেতেই থমকে গেলো আফি। সানায়ার হাতে উলটো নিজেও চিমটি কাটে। ইশারায় সানায়াকে দরজার দিকে দেখাল। সানায়া ভ্রু কুঁচকে দরজার দিকে তাকাতেই ভ্রু শীতল হলো। দৃষ্টি ভীত হলো। গলা শুঁকিয়ে এলো। আজকে তার রক্ষে নেই। নির্ভাণ নিষ্প্রভ দৃষ্টে চেয়ে আছে। চাহনিতে খেয়ে ফেলা টাইপ একটা ভাব আছে সুদর্শন মানুষ টার। আর হাতের নাগালে পেলে নিশ্চিত তিনতলা ছাঁদ থেকে তার ছোট দেহখানা নিচে ফেলতে দ্বিতীয় বার ভাববে না এই যুবক। সানায়ার এখন খুব করে মন চাইলো গায়েব হয়ে যেতে। যদি তার ক্ষমতা থাকত তবে সত্যি সে সেই ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এই মূহুর্তে এখান থেকে গায়েব হয়ে যেতো।

#চলবে……..

[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here