#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_১৭
#জান্নাত_সুলতানা
“আমার গার্লফ্রেন্ড আছে? হুম? আমিই জানি না। ব্যাপার টা ইন্টারেস্টিং।”
নির্ভাণের ভারিক্কি সুর। সানায়া আস্তে করে ঢোক গিলে। বইয়ের পৃষ্ঠা এলোমেলো উল্টাতে থাকে। নির্ভাণ ফের গম্ভীর চাপা স্বরে বলে উঠলো,
“কী হলো? আনসার মি।”
“আছে না আপনার গার্লফ্রেন্ড।” সানায়া হড়বড়িয়ে বলে৷ সে জানতে চায়। সে-ও নিশ্চিত হতে চায়। তাই তো আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ছে। নির্ভাণের কুঁচকানো ভ্রু জোড়া বিরক্তি এসে হানা দেয়। দাঁতে দাঁত চেপে শুধালো,
“সেটাই তো। কোথায় আমার গার্লফ্রেন্ড?”
“আমি কী করে জানব?” সানায়া নিশ্চিত হয়। নির্ভাণ ভাইয়ের গার্লফ্রেন্ড নেই। যদিও সে আগে থেকেই জানত এমন গম্ভীর মানুষের প্রেমে কে পড়বে? আর পড়লেই বা কী? স্বীকার করার মতো সাহস তো কখনোই পাবে না। তার যেনো বুকের ভারি ভাবটা হালকা হয়।
নির্ভাণ দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। খাতাটা সানায়ার দিকে ঠেলে দিয়ে গম্ভীর হয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলো। সানায়া তপ্ত শ্বাস ফেলে খাতাটা নিজের কাছে টেনে নেয়। বেড়াতে এসে কার পড়তে ভালো লাগে? মাঝে একদিন একটু এসব থেকে মুক্তি পেলো। আর তারপর আবারও শুরু হয়েছে অত্যাচার। সানায়ার কান্না পায়। বাইরে সবাই আড্ডা দিচ্ছে। আর সে রুমে বসে। তা-ও আবার এই গোমড়া মুখো মানুষ টার সাথে এক ঘরে। যদিও সানায়ার খারাপ লাগছে না এতে। যখন আফির রুম থেকে নির্ভাণ ভাই তাকে পড়তে আসার জন্য ডেকে নিয়ে এলো। রাফার মুখটা তখন চুপসে এইটুকুন। সানায়ার এটা দেখে বেশ ভালো লেগেছে। কিন্তু কেনো লেগেছে? সানায়ার মন খারাপ হয়। কী হচ্ছে তার সাথে? বুঝে না সে। রাফা নির্ভাণ ভাই কে পছন্দ করে। এটা তার কেনো জানি মোটেও সহ্য হচ্ছিল না। আবার একটা বিশাল বড়ো মিথ্যা ও রাফাকে বলেছে। নির্ভাণ ভাইয়ের গার্লফ্রেন্ড আছে শুনে রাফার মন ভেঙেছে। এতে করে তার শান্তি শান্তি ফিল এসেছিল একটা। সানায়া কলম দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে সোফায় বসা নির্ভাণের দিকে আঁড়চোখে তাকায়। সাদা টি-শার্ট গায়ে। কালো একটা প্যান্ট পরা। সব সময় ফিটফাট পরিপাটি এই মানুষ টা। চুল গুলো দারুণ সুন্দর করে সেট করে রাখে। কিছু চুল কপাল ছুয়ে ভ্রু স্পর্শ করার অপেক্ষা মাত্র। একটা মানুষের চুল ও এতো সুন্দর হয়? সানায়া যেনো লক্ষ্য করছে তার স্বাধীনতা কেরে নেওয়া মানুষ টার সব কিছু ইদানীং সে খুব করে নজর দিয়ে দিয়ে দেখছে আর বর্ণনা করছে। এটা কী ভালো লক্ষ্মণ? উঁহু মোটেও নয়। এগুলো প্রেমে পড়ার লক্ষ্মণ। সানায়া হতাশ হয়। কী সব হাবিজাবি ভেবে যাচ্ছে লাগাতার। নির্ভাণ ভাই যদি এসব ঘুণাক্ষরেও টের পায় তবে এবার সত্যি সত্যি ছাঁদ থেকে ফেলে দিবে। সানায়া আতংকে ওঠে। পরক্ষণেই মনটা ছটফট করে ওঠে। কিশোরী মন সুদর্শন এই মানুষ টার সাথে কথা বলার জন্য ইদানীং বড্ড বেহায়াপনা করে। অস্ফুটে ডেকে উঠলো,
“নির্ভাণ ভাই!”
“উম, কী?” নির্ভাণের সাথে সাথে উত্তর। তবে সামনে ফ্রক পরে ফ্লোরে বসে থাকা কিশোরীর দিকে তাকায় না চোখ তুলে। তাকালেই হয়তো নজরে পড়তো সানায়ার ঠোঁটে সেই লাজুক হাসি।
“চুড়ি গুলো আমার হাতের সাইজের। আপনি কিভাবে আমার হাতের সাইজ জানলেন?”
সানায়া ভাবুক। গালে আঙুল চেপে সে ভাবুক হয়। নির্ভাণ কোণ চোখে ওর দিকে চেয়ে দৃষ্টি মোবাইলে রেখে বিড়বিড় করে আওড়ায়,”শুধু হাতের না। তোর অনেক কিছুর সাইজ জানা আমার।”
কথা টা হয়তো অন্য যেকেউ মজার ছলে হলে-ও স্পষ্ট স্বরেই বলতো। তবে নির্ভাণের মতো ইন্ট্রোভার্ট মানুষের থেকে সে কথা আশা করা এই মূহুর্তে অসম্ভব। সে কোনো জবাব দিলো না। সানায়া মাথা নুইয়ে মিনমিন করে আবারও গতকাল রাতের কথা তুললো, “সাদা চুড়ি গুলো কে রেখেছে সত্যি জানতাম না আমি।”
“এতো কিছু জানতে চেয়েছি আমি, হুঁ? ম্যাথ টা সল্ভ কর।”
নির্ভাণের কঠিন স্বরে আদেশ। সানায়া মনে মনে মুখ ভেংচি কাটে। সে কী জানাতে চেয়েছে? না তো। তার মন টাই কেনো জানি ছটফট করছে।
“আমি কী আপনাকে জানাতে চেয়েছি? আমার মন চেয়েছে তাই জানিয়েছি। ধমক দেওয়ার হলে আমার মন কে দিন।” সানায়ার কথায় তব্দা খেয়ে যায় নির্ভাণ। সে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে আর গম্ভীর স্বরে বলে,
“দশ মিনিটের মধ্যে ম্যাথ টা সল্ভ না করতে পারলে আর একটা বাড়তি কথা ও যদি বলেছিস তাহলে আজ সারা রাত তুই এখানেই বসে থাকবি।”
সানায়া মুখে আঙুল তুলে ঠোঁটের ওপর রাখে। বাচ্চাদের মতো মাথা নাড়তে নাড়তে বলে, “কিন্তু মুখ দিয়ে কথা চলে এলে কী করবো?”
“শাট আপ সানা।” নির্ভাণ ফের ধমকে উঠলো। সানায়ার হাসি পায়। ঠোঁট টিপে হাসে। তাকে জ্বালাতন করা মানুষ টাকে এবার সে বিরক্ত করছে। আর মানুষ টা সত্যি বিরক্ত হচ্ছে। সানায়ার ঠোঁটে হাসির সাথে সাথে মাথায়ও বৃদ্ধি আসে, এবার থেকে সে-ও আর চুপচাপ থাকবে না। মন খারাপ করে কথা শুনে চলে যাবে না।
——-
খাবার টেবিলে সানায়া আজো নির্ভাণের পাশের চেয়ার টা দখল করে নিয়েছে। দুপুরে রাফা বসেছিল। কেন জানি এটা একদম সহ্য হচ্ছিল না তার। নির্ভাণ আজো মাছের কাটা ছাড়িয়ে সানায়ার প্লেটে রাখছে। রাফার মা আজ যেনো সকাল থেকে কেমন একটু অদ্ভুত ব্যবহার করছেন। ভদ্রমহিলা বিরক্তিকর দৃষ্টিতে সানায়ার দিকে তাকিয়ে মুখে জোর করে হাসি ফুটিয়ে বলে উঠলো, “সানায়া তো ছোট বাচ্চা না। পুতুলের মতো এভাবে এখনো মাছের কাটা বেছে দিতে হয়? আমাদের রাহা ও মাছের কাটা বাছতে জানে।”
তন্বী রহমান ভাইয়ের বউয়ের কথার পিঠে বললেন, “ও ছোট বাচ্চা না। কিন্তু আমার কাছে এখনো ও সেই ছোট পুতুল। যে এক গ্লাস পানি পর্যন্ত মুখে তুলে খেতে পারতো না। আর আমি যতোদিন পারি ওকে এভাবে পুতুলের মতো করেই রাখব ভাবি।”
তন্বী রহমানের কথা শুনে নিজাম সিদ্দিকী এবং টেবিলের সবাই ওনার দিকে এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালেন। যেখানে বিভিন্ন পরিবারে ভাইয়ের বউয়ের বোনদের দুচোখে সহ্য করতে পারে না সেখানে তন্বী রহমান যেনো ভিন্ন রকম। সানায়ার ছোট মামি বললেন, “হয়তো ও সেহের মতো দেখতে ছোট না। কিন্তু আমাদের কাছে ও এখনো ছোট আর আমরা ওকে ওভাবেই ট্রিট করি।”
রাফার মা কথাটা বলেও যেনো বিপদে পড়ে গেলেন। আসলে তিনি রাফার সম্পর্কে সবই জানেন। একমাত্র মেয়ে বলে কথা। মেয়ের চালচলনে তিনি ধরেছেন মেয়ে নির্ভাণ কে পছন্দ করে। তবে নির্ভাণের আশেপাশে সানায়ার উপস্থিতি ওনাকে ভাবিয়ে তুলছে। ব্যাপার গুলো দুদিন ধরে লক্ষ্য করে এসব মোটেও সুবিধার লাগছে না। ওনার মেয়ে যদি কষ্ট পেয়ে যায়? সে-ই ভয় নিয়েই তিনি সানায়ার ওপর একটু বিরক্ত।
—–
সকাল সকাল গায়ে শীতের কাপড় জড়িয়ে সবাই মাঠে ঘুরতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। আজ দুপুরেই শহরের উদ্দেশ্য বেরুবে তারা। রাতে ঘুমানোর সময় আফির সাথে সানায়া গল্প করতে করতে বলেছিল, “গ্রামে এসে শীতের সকালে শিশির না ছুঁয়ে তারা শহরে চলে যাবে? এটা কী ঠিক হবে?” আফি তখন ফোনে কিছু টাইপ করে যাচ্ছিল। মিনিট দুই এক পেরিয়ে গেলেও তার থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে সানায়া চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো আর তখনই আফি জানাল, “কাল সকালে মাঠে যাব আমরা।”
ব্যাস এরপর পুরো গেরিলা বাহিনীর দল হাজির সকাল সকাল। তারা মোট দশ জন। পাঁচ জন মেয়ে পাঁচ জন ছোট বড়ো ছেলে। এতজন দেখে নেয়ামত সিদ্দিকী নির্ভাণ কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,
“নির্ভাণ সাবধানে বাপ।” একটু থেমে তিনি আবারও বলে উঠলেন, “আমি যাব সিকিউরিটি নিশ্চিত করতে?”
“আহ্ নেমু, তুই ওদের মাঝে গিয়ে কী করবি? তোর না বাতের ব্যথা! যা এখন বিছানায় যা। সূর্য দেখা দিলে বাইরে আসবি।” ফারাজ সিদ্দিকী ছোট ভাই কে মনে করিয়ে দিলেন। ওনার কথার ধরণের জন্য সবাই মুখ টিপে হাসলেন। একজন মেয়র হয়েও এই মানুষ এতো চিল মুডে কিভাবে থাকে কে জানে।
#চলবে……
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
